লালমনিরহাট জেলার পাঁচ উপজেলায় ২০২৪ সালের অগ্রহায়ণ মাসজুড়ে আমন ধান কাটা, মাড়াই ও ঘরে তোলার কাজ চলেছে। জাগো নিউজ ২৪-এর ১ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অনুকূল আবহাওয়া আর কম রোগবালাইয়ের কারণে এ মৌসুমে জেলায় আমনের বাম্পার ফলন হয়েছে, আর কৃষকের ঘরে ঘরে নবান্ন উৎসবের আমেজ ছড়িয়েছে।
ফলন, দাম ও আবাদের হিসাব
প্রতিবেদন অনুযায়ী, তখন বাজারে প্রতি মণ ধান ১,২০০ থেকে ১,২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। কৃষকেরা এ বছর প্রতি বিঘায় ২৫ থেকে ৩০ মণ ধান পাওয়ার আশা করছিলেন। মাঠে কিষান-কিষানিরা ধান কাটা, মাড়াই, সেদ্ধ করা ও শুকানোর কাজে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছিলেন।
লালমনিরহাট কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, জেলায় ৮৬ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে আমন ধানের চাষ হয়েছিল, যা লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যায়। প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত জেলার ৯০ শতাংশ ধান কাটা হয়ে গিয়েছিল।
পাশের রংপুর জেলাতেও একই চিত্র ছিল। বাংলা ট্রিবিউনের ৯ নভেম্বর ২০২৪ তারিখের প্রতিবেদনে বলা হয়, রংপুরে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৬৬ হাজার ৭২৩ হেক্টর, আবাদ হয়েছিল ১ লাখ ৬৬ হাজার ৯৪০ হেক্টরে, আর সেখানকার কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন।
সরকারি ক্রয়ের দামও এ সময় ঘোষণা হয়েছিল। দ্য ডেইলি স্টারের ৬ নভেম্বর ২০২৪ তারিখের প্রতিবেদন অনুযায়ী, খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটি আমন মৌসুমে প্রতি কেজি ধান ৩৩ টাকা, সেদ্ধ চাল ৪৭ টাকা এবং আতপ চাল ৪৬ টাকায় কেনার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৭ নভেম্বর থেকে পরের বছরের মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত এই সংগ্রহ চলার কথা ছিল।

খরচ আর যাতায়াত নিয়ে কৃষকের উদ্বেগ
ভালো ফলনের মধ্যেও কৃষকেরা খরচ নিয়ে উদ্বেগের কথা জানান। তাঁদের ভাষ্য, সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি বাড়ায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে। তবে অন্য বছরের তুলনায় আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় পোকামাকড়ের আক্রমণ কম ছিল, ফলে ফলন ভালো হয়েছে এবং দামও ভালো পাওয়া যাচ্ছিল।
হাতীবান্ধা উপজেলার নিজ শেখ সুন্দর গ্রামের আকবর আলী বলেন, ওই এলাকায় ভালো রাস্তাঘাট না থাকায় প্রতিবছর আমন ধান পরিবহনে তাঁদের বাড়তি টাকা খরচ হয়।
সদর উপজেলার কৃষক মহসিন আলী বলেন, বাজারে দিন দিন সার ও কীটনাশকের দাম বাড়ছে, আর এভাবে দাম বাড়তে থাকলে তাঁদের চাষাবাদ বন্ধ হয়ে যাবে। তিনি সারের দাম কমাতে সরকারের প্রতি দাবি জানান।
কৃষি বিভাগের বক্তব্য
হাতীবান্ধা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে তিনি জেনেছেন, এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আমনের বাম্পার ফলন হয়েছে এবং এই ফলনে কৃষকেরা আর্থিকভাবে লাভবান হবেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের লালমনিরহাট জেলার উপপরিচালক মো. সাইফুল আরিফিন বলেন, এ বছর জেলায় আমন ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে এবং অন্য বছরের তুলনায় পোকামাকড়ের আক্রমণ কম দেখা গেছে। তিনি জানান, কৃষি কর্মকর্তারা প্রতিটি ইউনিয়নে কৃষকদের আধুনিক চাষাবাদে সহযোগিতা করছেন, আর কৃষকেরা ধানের ভালো দামও পাচ্ছেন।
আমন, নবান্ন ও লালমনিরহাট
আমন বাংলাদেশে ধান চাষের তিন মৌসুমের একটি। উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, রোপা আমন সাধারণত জুলাই-আগস্টে রোপণ করা হয় এবং নভেম্বর-ডিসেম্বরে কাটা হয়; এই ধান প্রধানত বৃষ্টির পানির ওপর নির্ভর করে।
বাংলাপিডিয়া জানায়, নবান্ন মানে নতুন অন্ন, অর্থাৎ নতুন আমন ধান ঘরে তোলার উৎসব। এক সময় হিন্দু সম্প্রদায় অগ্রহায়ণে এ উৎসব পালন করত; এখন সব সম্প্রদায়ের মানুষ, হিন্দু ও মুসলিম সমানভাবে, নবান্ন উদ্যাপন করেন। এ উপলক্ষে নতুন চালের নানা রকম পিঠা তৈরি হয় এবং পিঠা উৎসব হয়।

লালমনিরহাট রংপুর বিভাগের একটি সীমান্ত জেলা। এর উত্তরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার ও জলপাইগুড়ি জেলা। জেলাটি তিস্তার প্লাবনভূমিতে অবস্থিত এবং এর বেশির ভাগই কৃষিজমি। জেলার পাঁচটি উপজেলা হলো লালমনিরহাট সদর, আদিতমারী, কালীগঞ্জ, হাতীবান্ধা ও পাটগ্রাম।

ছবি: Balaram Mahalder / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলা ট্রিবিউন, দ্য ডেইলি স্টার, বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)