সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৮°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৬২%বাতাস ৫ কিমি/ঘ

ছাদবাগানে সফল হতে কোকোপিট, খৈল ও নিম ব্যবহারের নয়টি পরামর্শ

টবের গাছকে খাবার দিতে হয়: কোকোপিট মেশানো মাটি, সরিষার খৈল-পচা পানি, নিম স্প্রে আর হাতে পরাগায়নসহ ছাদবাগানের নয়টি পরামর্শ, শেকৃবি ও বারির গবেষণায় মিলিয়ে দেখা।

ছাদবাগানে সফল হতে কোকোপিট, খৈল ও নিম ব্যবহারের নয়টি পরামর্শ
ছাদকৃষি

২০২০ সালের শেষ দিকে ঢাকার একটি ছাদে টব আর ড্রামে ফলছিল লেবু, ডালিম, পেয়ারা ও আম; সঙ্গে বরবটি, বেগুন, লাউ, কলমিশাক, পুঁইশাক, ঝিঙা ও পেঁপে, আর নিম ও অ্যালোভেরার মতো ঔষধি গাছ। বাগানটি ঢাকা মেডিকেল কলেজের এক চিকিৎসকের। তিনি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেছিলেন, বন্ধুদের দেখে করোনাকালে তিনি ছাদবাগানে আগ্রহী হন, আর সে বছরের মে মাস থেকে তাঁর পরিবারকে বাজার থেকে খুব বেশি সবজি কিনতে হয়নি।

সব ছাদে এমন ফল মেলে না। অনেক বাগানী নিয়ম করে পানি দেন, যত্ন নেন, তবু ফল আসে কম। কারণ প্রায়ই ছোট ছোট কিছু ভুল, যা এড়ানো যায়। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে দ্য এগ্রো নিউজ ছাদবাগানীদের জন্য নয়টি টিপস প্রকাশ করে। এই লেখায় সেই টিপসগুলো রাখা হয়েছে, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (শেকৃবি), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্প্রসারণ বিভাগের গবেষণার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে। পড়ে জানবেন মাটি কীভাবে মেশাবেন, টবের গাছকে কীভাবে খাবার দেবেন, মাটির ছত্রাক ও পোকা কীভাবে সামলাবেন, আর ফুল থেকে কীভাবে ফল পাবেন। যেখানে মাত্রা জরুরি, সেখানে কোন কর্তৃপক্ষ তা দিয়েছে বলা হয়েছে; যেখানে কেউ দেয়নি, সেখানে কৃষি অফিসে যেতে বলা হয়েছে। একই নয়টি টিপস ২০২১ সালের ডিসেম্বরে দৈনিক ইত্তেফাকেও ছাপা হয়েছিল।

ঢাকার ছাদবাগান: সংখ্যা কত, পাশে কারা


এই লেখার আগের কয়েক বছরে রাজধানীতে ছাদবাগান দ্রুত বেড়েছে। কৃষি তথ্য সার্ভিসের (এআইএস) তথ্য উদ্ধৃত করে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২০ সালের নভেম্বরে জানায়, ঢাকায় প্রায় সাড়ে ৪ লাখ ছাদ আছে, যার আয়তন ৪ হাজার ৫০০ হেক্টরের বেশি। তখন রাজধানীতে ছাদবাগান ছিল প্রায় ৩০ হাজার, অর্থাৎ মোট ছাদের প্রায় ৭ শতাংশে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত তিন বছরের একটি নগর কৃষি প্রকল্প নেয়, যার লক্ষ্য ছিল ঢাকায় ৬০০টি ছাদবাগান গড়া। ২০২০ সালের নভেম্বরে প্রকল্প পরিচালক জানান, ততদিনে ৫০০টি বাগান গড়া হয়েছে, আর ঢাকার প্রায় ৬ হাজার ৯৭৫টি ছাদবাগান অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে আছে।

তারও আগে, ২০১৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) ও ডিএই ঢাকা ও চট্টগ্রামে নগর উদ্যানফসল উৎপাদন বাড়াতে ২ লাখ ৯৯ হাজার মার্কিন ডলারের একটি প্রকল্প চালায়। এফএওর তথ্যমতে, প্রকল্পে ২৫০টি প্রদর্শনী ছাদবাগান গড়া হয়, ৮০০ নগরবাসী ছাদবাগানের প্রযুক্তি নিয়ে প্রশিক্ষণ পান, ৪৫ জন স্থানীয় তরুণকে মালি হিসেবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ভবনের ভার বহনের ক্ষমতা যাচাই, জায়গার ব্যবহার, গাছ ও জাত বাছাই, উপকরণ ও বীজ সংগ্রহ, মাটি তৈরি আর ফসল পঞ্জিকা নিয়ে একটি নির্দেশিকাও তৈরি হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ও বাগানীদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে। ২০১৮ সালে শেকৃবির কৃষি উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগ সাতটি দলে ২০০ জনের বেশি নগরবাসীকে ছাদকৃষির প্রশিক্ষণ দেয়; বিষয় ছিল মাটির গঠন, বালাইনাশক, বীজের উৎস ও উদ্ভিদ প্রজনন। ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ বর্গফুটের একটি মডেল বাগানের খরচ ধরা হয়েছিল ৪০ হাজার টাকা। ২০২২ সালের আগস্টে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানায়, অর্থের অভাবে ২০১৮ সালের পর প্রশিক্ষণটি বন্ধ হয়ে যায়; সে সময় দেশে ছাদবাগান ছিল প্রায় ৫ লাখ।

২০২৪ সালের ৯ ডিসেম্বর ঢাকা ইউনিভার্সিটি জার্নাল অব আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেসে প্রকাশিত এক গবেষণার হিসাবে ঢাকায় ছাদবাগানের আয়তন ২৫৭.৯৫ হেক্টর, যা শহরের ৮০ হাজার ২২০ হেক্টর লাগোয়া ছাদের ০.৩২ শতাংশ। গবেষণায় দেখা যায়, এসব বাগান শহরের তাজা সবজি ও ফলের চাহিদার প্রায় ০.৩ শতাংশ মেটায়। বাগানী পরিবারগুলো নিজেদের ফলানো ফসলের প্রায় ৭৫ শতাংশ নিজেরাই খায়, আর বাগান তাদের সবজির প্রায় ৬ শতাংশ ও ফলের প্রায় ১৮ শতাংশ জোগায়।

নীতিতেও এর ছাপ পড়েছে। দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস জানায়, ২০২১ সালের জানুয়ারিতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ছাদবাগান থাকা বাড়ির হোল্ডিং করে ১০ শতাংশ ছাড়ের ঘোষণা দেয়। ২০২৩ সালের জুনে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এই ছাড় দেশের সব সিটি করপোরেশন ও পৌর এলাকায় দেওয়ার ঘোষণা দেয়।

টবের গাছকে কেন খাবার দিতে হয়


টিপসের প্রথম কথাটি সহজ: টবে বা ড্রামে গাছ লাগালে তাকে খাবার দিতে হবে। মাঠের গাছ শিকড় ছড়িয়ে দূর থেকে পানি ও পুষ্টি টেনে নেয়; টবের গাছ পায় শুধু টবে যা আছে তা-ই। তাই বাগানীকে খাবার জোগাতে হয়, রোগবালাই হলো কিনা বুঝে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হয়, আর ধৈর্য ধরতে হয়।

জৈব সার পুষ্টি ছাড়ে ধীরে। ভারতের তামিলনাড়ু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিপ্রযুক্তি পোর্টাল জানায়, ভালোভাবে পচা গোবর সারে প্রায় ০.৫ শতাংশ নাইট্রোজেন, ০.২ শতাংশ ফসফেট ও ০.৫ শতাংশ পটাশ থাকে। খৈলের পুষ্টি খনিজে রূপ নেওয়ার পর প্রয়োগের ৭ থেকে ১০ দিন পরে ফসল তা পায়। এ কারণে টবে একবারে বেশি না দিয়ে নিয়মিত অল্প অল্প খাবার দেওয়াই ভালো।

মাটির মিশ্রণ: কোকোপিট, জৈব সার ও গবেষণার ফল


টিপসে বলা হয়েছে, মাটির সঙ্গে অবশ্যই কিছু কোকোপিট মেশাবেন। কোকোপিট বা কয়ার পিথ হলো নারকেলের ছোবড়ার গুঁড়া। এটি স্পঞ্জের মতো অনেক পানি ধরে রাখে, আবার হালকা বলে ছাদে ওজনের চাপ কম পড়ে। মিশ্রণে কোকোপিট থাকলে মাটি ভেজা থাকে কিন্তু স্যাঁতসেঁতে হয় না, আর অতিবৃষ্টিতেও গোড়ায় পানি জমে না। গোড়া স্যাঁতসেঁতে হলে নানা রোগ হয়; তাই মাটি ভেজা থাকবে, তবে কখনো জলাবদ্ধ নয়। টিপস অনুযায়ী কোকোপিটে চারা দ্রুত গজায় ও ভালো বাড়ে।

কোকোপিট ব্যবহারে একটু সতর্কতা লাগে। ২০০১ সালে কমিউনিকেশনস ইন সয়েল সায়েন্স অ্যান্ড প্ল্যান্ট অ্যানালাইসিস সাময়িকীতে সি. দে ক্রেইজ ও জি.জে.এল. ভ্যান লিউয়েনের গবেষণায় দেখা যায়, নেদারল্যান্ডসের উদ্যানচাষে কয়ার ডাস্ট ব্যবহারে কিছু টবের গাছের বৃদ্ধি আটকে গিয়েছিল। কারণ এতে পটাশিয়াম ও সোডিয়াম বেশি ছিল, আর এটি ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়াম আটকে রাখছিল। ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়ামযুক্ত দ্রবণে ধুয়ে শোধনের পর বেগোনিয়া, চন্দ্রমল্লিকা ও শেফলেরা পিটের মতোই ভালো বেড়েছে। তাই ধোয়া কোকোপিট কিনুন, নয়তো ব্যবহারের আগে ভালো করে ধুয়ে নিন।

ভারতের তামিলনাড়ুতে কয়ার পিথ বা নারকেলের ছোবড়ার গুঁড়ার একটি আঁটি, যা কোকোপিট নামে বিক্রি হয়। ছবি: Thamizhpparithi Maari / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
ভারতের তামিলনাড়ুতে কয়ার পিথ বা নারকেলের ছোবড়ার গুঁড়ার একটি আঁটি, যা কোকোপিট নামে বিক্রি হয়। ছবি: Thamizhpparithi Maari / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

জৈব সারের মধ্যে টিপসে প্রথমে পাতা-পচা সার, তারপর ভার্মি কম্পোস্ট, তারপর গোবর সারকে রাখা হয়েছে। পাতা-পচা সার সহজে মেলে না, দামও বেশি; ভার্মি কম্পোস্ট সহজলভ্য। মূল টিপসে মাটির সঙ্গে কমপক্ষে ৪০ শতাংশ জৈব সার মেশানোর কথা বলা হয়েছিল।

ঢাকার ছাদে করা গবেষণা বলছে, এর চেয়ে কম অনুপাতেও ভালো ফল মেলে। শেকৃবির ছাদবাগানে ২০১৭ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৮ সালের মার্চ পর্যন্ত বারি টমেটো-১৪ নিয়ে বিভিন্ন মাটির মিশ্রণ পরীক্ষা করা হয়। সবচেয়ে বেশি ফলন, গাছপ্রতি ২.১৫ কেজি, আসে প্লাস্টিকের টবে ওজনের হিসাবে ৮০ শতাংশ মাটি, ১০ শতাংশ গোবর ও ১০ শতাংশ ভার্মি কম্পোস্ট মিশিয়ে, সঙ্গে রাসায়নিক সার দিয়ে। শেকৃবির আরেকটি ছাদ-পরীক্ষায়, ২০১৮ সালের মে থেকে অক্টোবর, বারি বেগুন-৮ চাষ করা হয়। সেখানে সবচেয়ে বেশি ফলন, গাছপ্রতি ৭৪০.১৬ গ্রাম, আসে প্লাস্টিকের টবে ৭০ শতাংশ মাটি, ২০ শতাংশ গোবর ও ১০ শতাংশ ভার্মি কম্পোস্টের সঙ্গে সুপারিশকৃত মাত্রার রাসায়নিক সার দিয়ে। পরীক্ষিত মিশ্রণের মধ্যে ৩০ ও ৪০ শতাংশ গোবরের মিশ্রণও ছিল।

মিশ্রণ যা-ই হোক, প্রতিটি টব, ড্রাম ও ক্রেটে পানি বের হওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে। তলায় ছিদ্র আর ঝুরঝুরে, হালকা মাটি থাকলে শিকড় পানিতে ডুবে থাকে না।

সরিষার খৈল-পচা পানি ও পুকুরের তলার কাদা


টিপসে সরিষার খৈল-পচা পানিকে বলা হয়েছে গাছের 'বিরিয়ানি'। সরিষা থেকে তেল বের করার পর যা থাকে, তা-ই খৈল। মাটির হাঁড়িতে অল্প পানিতে খৈল পচাতে হবে কমপক্ষে ৫ দিন; ৭ থেকে ১৫ দিন হলে আরও ভালো। পরে আরও পানি মিশিয়ে দিতে হবে। এতে একটু গন্ধ হয়, তাই সামান্য গুড় দেওয়া যায়; হাঁড়ি ছাদে রাখলে গন্ধ ঘরে আসে না। টিপস অনুযায়ী বৃষ্টির সময় খৈল-পচা পানি দেওয়া যাবে না।

সরিষার খৈলে পুষ্টি অনেক। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (১৯৯৭) তথ্য উদ্ধৃত করে ২০১৭ সালে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্র জানায়, এতে নাইট্রোজেন ৫.১ থেকে ৫.২, ফসফরাস ১.৮ থেকে ১.৯ এবং পটাশিয়াম ১.১ থেকে ১.৩ শতাংশ থাকে, সঙ্গে সালফার, দস্তা ও বোরনের মতো গৌণ ও অণুপুষ্টি। একই গবেষণাপত্র বলছে, তেল বের করার পর বীজের প্রায় ৬০ শতাংশই খৈল হিসেবে থাকে; খৈল ধীরে খনিজে রূপ নেয়, তবে নাইট্রেট সারের তুলনায় এতে গ্যাস হয়ে নাইট্রোজেন অনেক কম হারায়; আর খৈল কৃমিজাতীয় নেমাটোডের বৃদ্ধি কমাতে দেখা গেছে।

যেসব গবেষণা ও সম্প্রসারণ সূত্র দেখা হয়েছে, তার কোনোটিতে টবের জন্য খৈল-পচা পানি কতটা পাতলা করতে হবে তার মাত্রা নেই, তাই এখানেও কোনো মাত্রা দেওয়া হলো না। আপনার ফসলে কতটা ঘন দ্রবণ দেবেন, তা মেট্রোপলিটন বা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কাছে জেনে নিন, আর শুরু করুন হালকা দ্রবণ দিয়ে। টিপসে পুকুরের তলার পাঁক কাদাকেও গাছের জন্য খুব উপকারী বলা হয়েছে।

ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সার, কেঁচোর সাহায্যে তৈরি জৈব সার। ছবি: মৌচুমী / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)
ভার্মি কম্পোস্ট বা কেঁচো সার, কেঁচোর সাহায্যে তৈরি জৈব সার। ছবি: মৌচুমী / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)

মাটির ছত্রাক ও ট্রাইকোডার্মা


মাটিতে অনেক ক্ষতিকর ছত্রাক থাকে, যা চারা মেরে ফেলার জন্য যথেষ্ট। টিপসে মাটি তৈরির সময় উপকারী ছত্রাকের একটি পণ্য মেশানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের পণ্যের মূল উপাদান ট্রাইকোডার্মা, এমন এক ছত্রাক যা মাটির রোগ সৃষ্টিকারী ছত্রাক দমনে ব্যবহার হয়। টিপস অনুযায়ী এটি জৈব সারের কাজও করে, মাটিকে ঝুরঝুরে ও হালকা রাখে।

বারি এ নিয়ে গবেষণা করেছে। ২০১০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত গাজীপুরে নেট হাউসে করা পরীক্ষার ফল ২০১৭ সালের মার্চে বাংলাদেশ জার্নাল অব অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চে প্রকাশিত হয়। বারির বিজ্ঞানীরা চালের কুঁড়া, গমের ভুসি, খেসারির ভুসি ও সরিষার খৈলে ট্রাইকোডার্মা হারজিয়ানাম জৈব ছত্রাকনাশক তৈরি করেন। পরীক্ষিত পাঁচটি মিশ্রণই ট্রে-মাটি ও বীজতলায় রাইজোকটোনিয়া সোলানি ছত্রাকে হওয়া বেগুন চারার রোগ দমনে সমান কার্যকর ছিল, আর শোধিত চারার কাণ্ড ও শিকড় লম্বা ও ভারী হয়েছিল। কতটা মেশাবেন, তা পণ্যের লেবেল ও কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ মেনে ঠিক করুন।

ভালো বীজ, বীজ শোধন, ঘনত্ব ও মাচা


যা-ই লাগান, ভালো জাতের বীজ কিনা নিশ্চিত হয়ে নিন। ভালো বীজে ভালো ফসল; খারাপ বীজে পরের সব যত্ন বৃথা যায়। টিপসে বীজ থেকে নিজে চারা করাকে উত্তম বলা হয়েছে, কারণ বাজার থেকে কেনা চারা বলা জাতেরই কিনা, তার নিশ্চয়তা নেই।

ছত্রাকনাশক মেশানো পানিতে কিছু সময় বীজ ভিজিয়ে রেখে বীজ শোধন করা যায়। কোন ছত্রাকনাশক কতটা লাগবে, তা ফসলভেদে আলাদা; তাই কৃষি অফিসে জেনে নিন ও লেবেল মেনে চলুন।

গাছ বেশি মানেই ফলন বেশি, এ ধারণা ভুল। ঘন করে লাগালে টবের সামান্য খাবার নিয়ে গাছে গাছে টানাটানি হয়, কেউই প্রয়োজনীয় পুষ্টি পায় না। টিপসে স্পষ্ট সীমা দেওয়া হয়েছে:

  • একটি টবে একটি গাছ।
  • একটি ফলের ক্রেটে মাত্র দুটি গাছ।
  • প্রতিটি ক্রেট ও টবে পানি নিষ্কাশনের ছিদ্র।
  • লতানো সবজির জন্য একটু গভীর পাত্র।
  • ছাদে মাটিতে খুঁটি পোঁতা যায় না, তাই ফলের ক্রেটের চারপাশে লাঠি বেঁধে মাচা দিন।

পোকা দমনে নিম, ইপসম সল্টে সাবধানতা


ক্ষতিকর পোকামাকড় নিম পছন্দ করে না; টিপসে প্রতি সাত দিনে একবার সব গাছের পাতায় নিম কীটনাশক স্প্রে করার কথা বলা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগন স্টেট ইউনিভার্সিটির ন্যাশনাল পেস্টিসাইড ইনফরমেশন সেন্টার জানায়, নিম তেল নিমগাছের বীজ থেকে পাওয়া জৈব বালাইনাশক। এর প্রধান সক্রিয় উপাদান অ্যাজাডিরাক্টিন পোকার খাওয়া কমায়, পোকা তাড়ায় এবং পোকার হরমোনে বাধা দেয়, ফলে পোকার বেড়ে ওঠা ও ডিম পাড়া কঠিন হয়।

কেন্দ্রটির তথ্যমতে, নিম তেল পাখি, স্তন্যপায়ী প্রাণী, মৌমাছি ও গাছের জন্য প্রায় বিষমুক্ত, তবে মাছ ও জলজ প্রাণীর জন্য সামান্য বিষাক্ত, আর চোখ ও ত্বকে সামান্য জ্বালা করতে পারে। তাই স্প্রে মাছের পাত্র ও পুকুর থেকে দূরে রাখুন, আর কতটা মেশাবেন ও কী পরে স্প্রে করবেন, লেবেলের নির্দেশ মেনে চলুন।

নিমপাতা; নিমগাছের বীজ থেকে পাওয়া তেল জৈব বালাইনাশক হিসেবে ব্যবহার হয়। ছবি: Miansari66 / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)
নিমপাতা; নিমগাছের বীজ থেকে পাওয়া তেল জৈব বালাইনাশক হিসেবে ব্যবহার হয়। ছবি: Miansari66 / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)

টিপসে মাসে একবার ইপসম সল্ট স্প্রের কথাও ছিল। ইপসম সল্ট হলো ম্যাগনেসিয়াম সালফেট। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটির নগর উদ্যানতত্ত্ব সম্প্রসারণ বিশেষজ্ঞ লিন্ডা চকার-স্কট বাড়ির বাগানীদের এটি ব্যবহার না করার পরামর্শ দেন, কারণ এর উপকার কেবল সেই নিবিড় চাষে, যেখানে মাটিতে ম্যাগনেসিয়ামের ঘাটতি জানা আছে। তাঁর কাজের সারসংক্ষেপ টেনে ইউনিভার্সিটি অব ওয়াশিংটনের মিলার লাইব্রেরি এর বদলে কম্পোস্ট দেওয়ার পরামর্শ দেয়। মাটি বা পাতা পরীক্ষায় ম্যাগনেসিয়ামের ঘাটতি ধরা পড়লেই কেবল এটি ব্যবহার করুন।

দ্রুত ফলনের শাক, শসা ও মালচিং


শুরুতে দ্রুত ফল পেতে টিপসে ডাঁটা, পুঁইশাক, লালশাক ও ধনেপাতা লাগানোর কথা বলা হয়েছে, যা মাত্র ২৫ দিনে খাওয়া যায়। দ্রুত ফসল তুললে নতুন বাগানী উৎসাহ পান। লালশাক লাগালে নেট দিয়ে ঘিরে দিতে হবে।

পুঁইশাকের পাতায় দাগ হলে টিপস অনুযায়ী দাগি পাতা কেটে দিন, পরামর্শ নিয়ে ছত্রাকনাশক স্প্রে করুন, নয়তো গাছ তুলে আবার লাগান। টিপসে বলা হয়েছে, ইউরিয়া দিলে পুঁইশাক দ্রুত বাড়ে, আর ডিএপি সার শসার বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। তবে সার দিন হিসাব করে: যুক্তরাষ্ট্রের অ্যালাবামা কো-অপারেটিভ এক্সটেনশন সতর্ক করে, অতিরিক্ত নাইট্রোজেনে গাছ শুধু পাতায় বাড়ে, তাতে ফুল ঝরে যেতে পারে, আর যেকোনো সার বেশি দিলে গাছের চারপাশে লবণের মাত্রা বাড়ে। শসা গাছে মাঝে মাঝে ছত্রাকনাশক স্প্রেও লাগে।

কড়া রোদে গাছের গোড়া বিশেষ পলিথিন, শুকনো পাতা বা খড় দিয়ে ঢেকে মালচিং করুন। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডার সম্প্রসারণ বিভাগ জানায়, মালচ গরমে মাটি ও শিকড় ঠান্ডা রাখে এবং পানি বাষ্প হয়ে যাওয়া কমায়, ফলে গাছের পানি কম লাগে; তারা ২ থেকে ৩ ইঞ্চি পুরু জৈব মালচ দেওয়ার পরামর্শ দেয়।

ফুল কেন ঝরে, হাতে পরাগায়ন কীভাবে


ফুল আসার পর টিপসে ব্র্যান্ডের নাম ধরে দুটি পণ্য শেষ বিকেলে পাতায় স্প্রে করার, আর দুই গ্রুপের ছত্রাকনাশক ১৫ দিনে একবার স্প্রে করার কথা বলা হয়েছে। বাসায় একটি অণুখাদ্য রেখে মাসে অন্তত একবার স্প্রে করার পরামর্শও আছে। শুধু নিবন্ধিত পণ্য ব্যবহার করুন, লেবেলের মাত্রায় ও কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে।

অতিরিক্ত গরম, বৃষ্টি, খাদ্যের অভাব, রোগ বা আবহাওয়ার হঠাৎ ওঠানামায় ফুল ঝরে পড়তে পারে; পরাগায়ন না হলেও ঝরে। টমেটোর ক্ষেত্রে গরমই বড় কারণ। অ্যালাবামা কো-অপারেটিভ এক্সটেনশনের ২০২৩ সালের জুনে সংশোধিত, বিশেষজ্ঞ-পর্যালোচিত একটি নির্দেশিকা বলছে, দিনের তাপমাত্রা ৮৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট আর রাতের তাপমাত্রা ৭২ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি হলে টমেটোর ফুল প্রায়ই ঝরে যায়; ৫৫ ডিগ্রি ফারেনহাইটের নিচের তাপমাত্রাও ফল ধরা আটকাতে পারে। এক সপ্তাহ বা তার কম সময়ের গরমে সাধারণত বড় সমস্যা হয় না। নির্দেশিকাটি গাছ সুস্থ রাখা, ঠিকমতো পানি দেওয়া এবং প্রতিদিন অন্তত ছয় ঘণ্টা পূর্ণ রোদ পাওয়ার ব্যবস্থা করার পরামর্শ দেয়।

লাউ, কুমড়া ও শসাজাতীয় ফসলে পরাগায়ন না হওয়া বড় কারণ। ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটির হর্টসেন্স জানায়, পরাগায়ন না হলে ফল বাড়তে শুরু করেও ছোট থেকে যায়, ফুলের দিক থেকে পচে, হলুদ হয়ে ঝরে পড়ে; ছোট বাগানে হাতে পরাগায়ন ভালো কাজ করে। টিপসে পুরুষ ফুলের পরাগধানী স্ত্রী ফুলের গর্ভমুণ্ডে ঘষে দিতে বলা হয়েছে। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার মাস্টার গার্ডেনারের এক নির্দেশিকা আরও কিছু খুঁটিনাটি দেয়:

  • ফুল চিনুন: পুরুষ ফুলের বোঁটা সরু ও সোজা; স্ত্রী ফুলের বোঁটা মোটা, ফুলের ঠিক নিচে ফোলা অংশ থাকে, যা পরে ফল হয়।
  • স্ত্রী ফুল ফোটার পরপরই সকালে পরাগায়ন করুন, কারণ এটি মাত্র এক দিন ফোটে।
  • নরম তুলি দিয়ে পুরুষ ফুলের হলুদ পরাগ তুলে স্ত্রী ফুলের মাঝখানে লাগান, অথবা পুরুষ ফুল ছিঁড়ে পাপড়ি সরিয়ে সরাসরি স্ত্রী ফুলে ছোঁয়ান।
  • প্রতিটি স্ত্রী ফুলে একই কাজ করুন; তরমুজ, শসা ও মিষ্টিকুমড়াতেও এ পদ্ধতি চলে।
জার্মানিতে তোলা শসার স্ত্রী ফুল, পেছনে কচি ফল। ছবি: Schlaghecken Josef / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
জার্মানিতে তোলা শসার স্ত্রী ফুল, পেছনে কচি ফল। ছবি: Schlaghecken Josef / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

কোনো ফসল বারবার নষ্ট হলে পাতা বা ছবি নিয়ে বিশেষজ্ঞের কাছে যান। এফএও ও ডিএইর প্রকল্পটি ঢাকা ও চট্টগ্রামে মেট্রোপলিটন কৃষি কর্মকর্তা ও উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে কাজ করেছিল। পোকা, সার ও বালাইনাশকের মাত্রা জানতে উপজেলা বা মেট্রোপলিটন কৃষি অফিসই ঠিক জায়গা।

ছবি: AbuSayeed / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সূত্র: দ্য এগ্রো নিউজ; দৈনিক ইত্তেফাক (১৮ ডিসেম্বর ২০২১); দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (১৬ নভেম্বর ২০২০; ১ আগস্ট ২০২২); এফএও বাংলাদেশ (ঢাকা ও চট্টগ্রামের নগর উদ্যানফসল প্রকল্প); ঢাকা ইউনিভার্সিটি জার্নাল অব আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস (৯ ডিসেম্বর ২০২৪); দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস (১৪ জুন ২০২৩); শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাদবাগান গবেষণা (২০১৭-২০১৮); সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় জার্নাল (২০১৭); বাংলাদেশ জার্নাল অব অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চ (মার্চ ২০১৭); কমিউনিকেশনস ইন সয়েল সায়েন্স অ্যান্ড প্ল্যান্ট অ্যানালাইসিস (২০০১); তামিলনাড়ু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাগ্রিটেক পোর্টাল; ন্যাশনাল পেস্টিসাইড ইনফরমেশন সেন্টার (২০১২); ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটি এক্সটেনশন; অ্যালাবামা কো-অপারেটিভ এক্সটেনশন সিস্টেম (২০২৩); ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া কো-অপারেটিভ এক্সটেনশন (২০১৯); ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডা আইএফএএস এক্সটেনশন।

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

ছাদকৃষি

সম্পর্কিত খবর

ছাদকৃষি

ইউটিউব দেখে ছাদে আর আঙিনায় ড্রাগন, বছরে লাখ টাকা লাভ মতলবের বিদেশফেরত হানিফের

চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণে বাড়ির ১,৪০০ বর্গফুট ছাদে ও সাড়ে ৬ শতক আঙিনায় ২০২৪ সালে ড্রাগন লাগিয়েছিলেন ৬২ বছরের আবু হানিফ; এখন বছরে লাখ টাকার বেশি লাভ করছেন, এবার ইজারা নিয়েছেন আরও ৬০ শতক জমি।

প্রথম আলো১২ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
ছাদকৃষি

ছাদের জলাধারে দুই হাজার ঝিনুকে মুক্তা চাষ, অভয়নগরের কলেজছাত্রের উদ্যোগ

যশোরের অভয়নগরের কলেজছাত্র আব্দুর রহমান ২০২১ সালে ফেসবুক দেখে মুক্তা চাষ শুরু করেন; এখন ছাদের কৃত্রিম জলাধারে দুই হাজার আর বোনের বাড়ির পুকুরে সাড়ে তিন হাজার ঝিনুক আছে তাঁর।

কৃষি সময়১২ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
ছাদকৃষি

প্রবাস থেকে ফিরে মুন্সিগঞ্জে ছাদকৃষি গড়লেন এক উদ্যোক্তা

প্রবাসজীবন শেষ করে দেশে ফিরে মুন্সিগঞ্জের এক উদ্যোক্তা নিজের ভবনের ছাদে গড়ে তুলেছেন ফল-ফসলের বাগান; তাঁকে নিয়ে শাইখ সিরাজের ভিডিও প্রতিবেদন।

শাইখ সিরাজ৯ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের ভিডিও

মন্তব্য

(০)