জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি ও ক্ষেতলাল উপজেলার তিনটি হিমাগারে রাখা আলু তাঁদের না জানিয়ে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে বলে ২০২৫ সালের নভেম্বরের শুরুতে অভিযোগ করেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। অভিযোগ ওঠে সাথী, মোল্লা ও হাফিজার রহমান হিমাগারের বিরুদ্ধে। সংরক্ষিত আলু তুলতে এসে তাঁরা বিক্রির খবর জানতে পারেন। হিমাগার কর্তৃপক্ষ জাগো নিউজকে জানায়, আলু পচে যাওয়ার আশঙ্কায় ও জায়গা খালি করতে আগেভাগে বিক্রি করতে হয়েছে।
কৃষকদের অভিযোগ
প্রথম আলোর ৭ নভেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিন হিমাগার থেকে প্রায় ৫৫ হাজার বস্তা আলু কৃষক ও ব্যবসায়ীদের না জানিয়ে বিক্রি করা হয়, যার মধ্যে প্রায় ১০ হাজার বস্তা ছিল বীজ আলু। পত্রিকাটির হিসাবে পাঁচবিবির চানপাড়ার সাথী হিমাগার প্রায় ২০ হাজার বস্তা, ক্ষেতলালের ভাসিলার মোল্লা হিমাগার ৩০ হাজার বস্তা এবং আয়মাপুরের হাফিজার রহমান বীজ হিমাগার প্রায় ৫ হাজার বস্তা আলু বিক্রি করে। কৃষকেরা জানান, সংরক্ষণের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ১৫ নভেম্বর।
শালাইপুর গ্রামের কৃষক আব্দুর রাজ্জাক জাগো নিউজকে বলেন, তিনি সাথী হিমাগারে ৯০০ বস্তা আলু রেখেছিলেন; বিক্রির আগে তাঁকে কিছু জানানো হয়নি, পরে শুনেছেন সব বিক্রি হয়ে গেছে। আরেক কৃষক আমজাদ হোসেন জানান, মোল্লা হিমাগারে রাখা তাঁর ৩০০ বস্তা আলু তুলতে গিয়ে তিনি কিছুই পাননি। পাঁচবিবির চানপাড়ার কৃষক জাহিদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, তিনি সাথী হিমাগারে ১০০ বস্তা বীজ আলু রেখেছিলেন এবং রোপণের জন্য জমিও তৈরি করেছিলেন, কিন্তু হিমাগারে এসে দেখেন আলু নেই।

হিমাগার কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
সাথী হিমাগার লিমিটেডের ব্যবস্থাপক শামসুল হক প্রথম আলোকে বলেন, সে বছর কৃষকেরা ধারণক্ষমতার চেয়ে ২৬ হাজার বস্তা বেশি আলু জোর করে রেখেছিলেন, ফলে কিছু আলু নষ্ট হতে শুরু করে। তাঁর দাবি, আলু তোলার জন্য নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। তিনি জানান, কৃষকদের এখন বাজারদর অনুযায়ী টাকা দেওয়া হচ্ছে এবং কেউ বীজ আলু চাইলে হিমাগারের নিজস্ব বীজ আলু দেওয়া হচ্ছে।
মোল্লা হিমাগারের ব্যবস্থাপক মোস্তাফিজার রহমান বলেন, যেসব ব্যবসায়ীর অনেক বেশি আলু ছিল, তাঁদের মধ্যে বড় ৪৫ জনের লিখিত অনুমতি নিয়ে অর্ধেক আলু বিক্রি করা হয়েছে এবং বাজারদরে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে। হাফিজার রহমান বীজ হিমাগারের ব্যবস্থাপক বেলাল সরদার জানান, হিমাগারে অনেক বেশি আলু থাকায় তাঁরা ব্যবসায়ীদের রাখা ৪ হাজার ৮০০ বস্তা আলু না জানিয়ে বিক্রি করেছেন এবং এখন ক্ষতিপূরণ দিচ্ছেন।

প্রশাসন ও সংশ্লিষ্টদের অবস্থান
জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মেহেদী হাসান জাগো নিউজকে বলেন, সময়সীমার আগে আলু বিক্রি সম্পূর্ণ বেআইনি এবং কৃষকের অনুমতি ছাড়া কোনো ফসল বিক্রি করা যায় না। প্রথম আলোকে তিনি জানান, বিষয়টি তিনি নিজে তদন্ত করছেন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ ও বিচার চান।
বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী জানান, চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে, অর্থাৎ ১৫ নভেম্বরের আগে কোনো কৃষকের আলু বিক্রি না করতে হিমাগার মালিকদের চিঠি দেওয়া হয়েছিল; কৃষকেরা লিখিত অভিযোগ দিলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জয়পুরহাট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক আনোয়ারুল হক আনু দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।
দরপতনের মৌসুমে আলুর মজুত
ঘটনাটি ঘটে আলুর দরপতনের মধ্যে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয়ের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রথম আলো ৫ নভেম্বর জানায়, আগের মৌসুমে জয়পুরহাটে ৪৩ হাজার ৪৭০ হেক্টর জমিতে ১০ লাখ ৬১ হাজার মেট্রিক টন আলু উৎপাদিত হয় এবং জেলার ২১টি হিমাগারে ৩৪ লাখ ৪৫ হাজার বস্তা আলু রাখা হয়। সরকার হিমাগার ফটকে প্রতি কেজি আলুর দাম ২২ টাকা নির্ধারণ করলেও তা কার্যকর হয়নি; তখন আলু বিক্রি হচ্ছিল কেজি ৯ থেকে ১০ টাকায়, অথচ উৎপাদন থেকে সংরক্ষণ পর্যন্ত খরচ পড়েছিল ২৪ থেকে ২৫ টাকা।
জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তার হিসাবে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত হিমাগারগুলোতে ১৩ লাখ ৮০ হাজার বস্তা আলু ছিল, যার অর্ধেক বীজ আলু। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এ কে এম সাদিকুল ইসলাম বলেন, চাহিদার চেয়ে উৎপাদন বেশি হওয়ায় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা সংরক্ষণ করেও ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না।

ছবি: Whispyhistory / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রথম আলো (৫ ও ৭ নভেম্বর ২০২৫)





মন্তব্য
(০)