টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলার হাবলা ইউনিয়নের পাটখাগুড়ি গ্রামের ২৮ বছর বয়সী আল আমিন বাসার ছাদে ড্রামে আনার বা ডালিমের বাগান গড়ে তুলে কলমের চারা বিক্রির ব্যবসা দাঁড় করিয়েছেন। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে জাগো নিউজ ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যম নিউজ টাঙ্গাইলের প্রতিবেদনে তাঁর এই উদ্যোগের কথা উঠে আসে। ক্যানসারে আক্রান্ত মায়ের জন্য শুরু করা বাগান মায়ের মৃত্যুর পরও বড় হয়েছে; তাঁর কলম করা চারা তখন দেশের নানা এলাকার ছাদবাগানে যাচ্ছিল। তিনি বজলুর রহমানের ছেলে। ছয়টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত বাসাইল উপজেলার জনসংখ্যা ২০২২ সালের জনশুমারিতে ছিল ১,৮৮,৯৩৬।
মায়ের জন্য ছাদে ড্রামে আনার
আল আমিনের মা ২০২৩ সালে ক্যানসারে আক্রান্ত হন, আর চিকিৎসকেরা তাঁকে নিয়মিত আনার খাওয়ানোর পরামর্শ দেন। আল আমিন তখন একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করতেন। তাঁর ভাষ্য, "বাজারের আনারগুলোতে কেমিক্যাল থাকে। ওই সময় আনার ফল কিনতে ৫০০-৬০০ টাকা লাগতো। এই টাকা দিয়ে আনার কেনা আমার জন্য কষ্টকর ছিল।" তাই তিনি প্রথমে বাড়ির উঠানের কোণে কয়েকটি চারা লাগান।
ছাদে বাগান করার কোনো পরিকল্পনা প্রথমে ছিল না। পরে ইউটিউবে ছাদে আনার চাষের ভিডিও দেখে তিনি গাজীপুরের টঙ্গী থেকে কয়েকটি ছোট চারা কিনে ছাদে ড্রামে লাগান; তখন ছাদে ওঠার সিঁড়িও ছিল না। মায়ের শরীর খারাপ হতে থাকলে তিনি চাকরি ছেড়ে দেন, আর এর এক সপ্তাহ পর ২০২৫ সালের মে মাসে মা মারা যান। আল আমিন বলেন, "মায়ের জন্যই আনার বাগান গড়ে তুলেছিলাম। মা আমার জন্য অনুপ্রেরণা ছিলেন।"

২৬ জাতের কলমের চারা যাচ্ছে সারা দেশে
জাগো নিউজকে আল আমিন জানান, তখন তাঁর ছাদে ও মাটিতে মিলিয়ে প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার আনার চারা ছিল; যেসব গাছে ফল ধরেছে সেগুলো ছাদে রাখা। আনারের পাশাপাশি ছাদে আঙুর, কমলা ও মাল্টাও চাষ করছিলেন তিনি। গাছগুলো তিনি নিজেই কলম করেন। তাঁর সংগ্রহে ছিল ২৬টি জাত, এর মধ্যে ভারতের মহারাষ্ট্রের সুপার ভাগোয়া ও মৃদুলা, গুজরাটি আনার, থাইল্যান্ডের থাই আনার, অস্ট্রেলিয়ার আনার ও পাকিস্তানি আনার। নিউজ টাঙ্গাইলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁর বাগানে ২০০ থেকে ২০০০ টাকা দামের চারা ছিল। খরচ বাদে মাসে ৬০ থেকে ৮০ হাজার টাকা আয়ের কথা জানান তিনি।
বাসাইল উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মুহাম্মদ আবু ইলিয়াস তালুকদার জাগো নিউজকে বলেন, "আল আমিন সফল তরুণ উদ্যোক্তা।" তিনি জানান, আল আমিনের বাগানের চারা দেশের বিভিন্ন এলাকায় যাচ্ছে এবং কৃষি বিভাগ বিভিন্ন সময় তাঁকে পরামর্শ দেওয়ার চেষ্টা করেছে। বাগান দেখতে আসা হাবিবুল্লাহ শেফুল বলেন, ছাদে এত সুন্দর আনার হতে পারে তা তাঁর জানা ছিল না; স্থানীয় বাসিন্দা মিজানুর রহমানও নিজের ছাদে এমন বাগান করার ইচ্ছার কথা জানান।

আনার গাছ ও মহারাষ্ট্রের জাতগুলো
আনারের বৈজ্ঞানিক নাম Punica granatum। এটি দেড় থেকে পাঁচ মিটার উঁচু ঝোপ বা ছোট গাছ, যার আদি নিবাস ইরান ও আশপাশের অঞ্চল; প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে সেখানে এর চাষ শুরু হয়। গাছটি খরা সইতে পারে, তবে বেশি ভেজা এলাকায় ছত্রাকজনিত রোগে শিকড় পচে যেতে পারে। গুটিকলম, ডালের কাটিং ও টিস্যু কালচারে এর চারা তৈরি করা যায়। বিশ্বে সবচেয়ে বেশি আনার উৎপাদন করে ভারত ও চীন।
আল আমিনের সংগ্রহের মৃদুলা জাতটি ১৯৯৪ সালে মহারাষ্ট্রের মহাত্মা ফুলে কৃষি বিদ্যাপীঠ (রাহুরি) অবমুক্ত করে; এর দানা গাঢ় রক্তলাল, নরম ও মিষ্টি। একই প্রতিষ্ঠান ২০০৩ সালে ভাগোয়া এবং ২০১৩ সালে ফুলে ভাগোয়া সুপার জাত অবমুক্ত করে। দ্য ফার্মা ইনোভেশন জার্নালে ২০২৩ সালে প্রকাশিত এক পর্যালোচনায় এই জাতগুলোকে কম আর্দ্রতার শুকনো আবহাওয়ার উপযোগী বলা হয়েছে। ভারতের আইসিএআর-জাতীয় ডালিম গবেষণা কেন্দ্রের (এনআরসিপি) তথ্যমতে, সুপার ভাগোয়া ভাগোয়ার চেয়ে ১৫ থেকে ২০ দিন আগে পাকে এবং আকার ও রঙে ভালো, তবে কেন্দ্রটির নিজস্ব মাঠে দুই জাতের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া যায়নি।
কেন্দ্রটি চারা কেনার ক্ষেত্রেও সতর্ক করে: আক্রান্ত বাগান থেকে তৈরি গুটিকলম ও কাটিংয়ের গিঁটে ব্যাকটেরিয়াজনিত ব্লাইট রোগের জীবাণু লুকিয়ে থাকতে পারে। তাই নার্সারির মাতৃগাছ রোগমুক্ত কি না দেখে নেওয়া এবং ভালো শিকড় হওয়া দুই থেকে তিন মাস বয়সী গুটিকলম কেনার পরামর্শ দেয় তারা। গাছ লাগানোর তিন বছর পর থেকে ফল নেওয়ার পরামর্শও দেয় কেন্দ্রটি; গাছ খুব সতেজ হলে দুই বছর পরই নেওয়া যায়।

ছবি: TopuThakur / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, নিউজ টাঙ্গাইল, আইসিএআর-জাতীয় ডালিম গবেষণা কেন্দ্র (সোলাপুর), দ্য ফার্মা ইনোভেশন জার্নাল, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)