চলতি আমন মৌসুমে ধান কাটার স্বাভাবিক সময়ের কয়েক সপ্তাহ আগেই, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে সাতক্ষীরার কৃষকেরা উচ্চ ফলনশীল ও লবণাক্ততা সহনশীল জাত বিনাধান-২৩ কাটতে শুরু করেন। ২০২৫ সালের ২১ সেপ্টেম্বর বিকেলে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ঘোনা ইউনিয়নের ছনকা গ্রামে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিনা) সাতক্ষীরা উপকেন্দ্রের উদ্যোগে মাঠ দিবস অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ধান কাটা কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) উপপরিচালক কৃষিবিদ সাইফুল ইসলাম। জাগো নিউজ ২৪ ঘটনাটি ২০২৫ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশ করে।
মাঠ দিবসে উপস্থিত ছিলেন বিনা উপকেন্দ্র সাতক্ষীরার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ড. মো. কামরুজ্জামান, সদর উপজেলার অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা প্লাবনী সরকার, বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. মশিউর রহমান এবং মিলন কবীর। স্থানীয় কৃষকেরাও সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। যাঁরা জাতটি চাষ করেছিলেন, তাঁরা জানান প্রায়ই লবণাক্ত ও জলাবদ্ধ থাকা জমিতে বর্ষার মৌসুমটি এই ধান কীভাবে পার করেছে।
মাঠ দিবসে কর্মকর্তারা যা বললেন
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সাইফুল ইসলাম বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলে ধান উৎপাদনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতা, আর বিনাধান-২৩ এসব প্রতিকূলতা সহ্য করতে সক্ষম। তিনি জাতটিকে সম্ভাবনাময় বলে উল্লেখ করেন, যা কম খরচে কম সময়ে বেশি উৎপাদন দেয়। তাঁর ভাষায়, 'অন্য জাতের তুলনায় ১৫ দিন আগে ধান কাটা যায়। এরপর অগ্রিম সরিষাসহ অন্য ফসল চাষ করা সম্ভব।' এ অঞ্চলের আবহাওয়ার উপযোগী হওয়ায় আগামীতে এ জাতের চাষ আরও বাড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তিনি আরও বলেন, সেদিন এ জাতের ধান কাটার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে চলতি মৌসুমে প্রথম আমন ধান কাটা শুরু হলো; এটি অনুষ্ঠানে দেওয়া তাঁর বক্তব্য, জাগো নিউজ ২৪ সেভাবেই তা প্রকাশ করেছে।
ড. মো. কামরুজ্জামান বলেন, বিনাধান-২৩ মূলত জোয়ার-ভাটা ও লবণাক্ত এলাকার কৃষকদের জন্য উদ্ভাবন করা হয়েছে। তিনি বলেন, 'এর জীবনকাল মাত্র ১১৫-১২৫ দিন। তবে সাতক্ষীরায় মাত্র ১১২ দিনে ধান কাটা হচ্ছে। ফলে কৃষকেরা কম সময়ে ধান ঘরে তুলতে পারেন।' তিনি জানান, কম সার ও কম সেচেই এ জাতে ভালো ফলন হয়, যা উৎপাদন খরচ কমায়। জাতটি ৮ ডিএস/মিটার (ডেসিসিমেন্স প্রতি মিটার, মাটি ও পানির লবণাক্ততা মাপার একক) পর্যন্ত লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে এবং ১৫ দিন পর্যন্ত পানির নিচে টিকে থাকতে পারে। এসব কারণে সাতক্ষীরার মতো উপকূলীয় অঞ্চলে জাতটি দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্লাবনী সরকার বলেন, উপকূলীয় কৃষকেরা বরাবরই প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হন। বিনাধান-২৩ ব্যাপকভাবে চাষ হলে কৃষকেরা লাভবান হবেন, ধান উৎপাদন বাড়বে এবং খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার হবে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলে জাতটি আরও বিস্তৃত হলে ধান উৎপাদনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে, কৃষকেরা কম খরচে বেশি ফলন পাবেন।
ছনকা গ্রামের কৃষকদের অভিজ্ঞতা
ছনকা গ্রামের কৃষক মনিরুল ইসলাম বলেন, ধানটি তাঁদের এলাকার জন্য খুব ভালো। কম লবণাক্ত ও পানি জমে থাকা জমিতে এর চাষে তিনি কোনো সমস্যা পাননি; খরচ কম, ফলন বেশি। জৈব সার ব্যবহার করায় রাসায়নিক সার ও কীটনাশক খুব কম লেগেছে বলে জানান তিনি। আগের আমন ধানের চেয়ে এবার বেশি ফলন পেয়েছেন বলে তাঁর দাবি। সে মৌসুমে তিনি এক বিঘা জমিতে চাষ করেছিলেন, পরের বছর পাঁচ বিঘায় চাষ করবেন বলে জানান।
একই এলাকার কৃষক সিরাজুল ইসলাম বলেন, আগে তাঁরা দুশ্চিন্তায় থাকতেন, অতিরিক্ত বৃষ্টিতে জমিতে পানি ঢুকলে ধান নষ্ট হয়ে যাবে। তাঁর কথায়, 'কিন্তু এবার বিনাধান-২৩ চাষ করে দেখি ১৫ দিন পানির নিচে থেকেও ক্ষতি হয়নি। এতে আত্মবিশ্বাস বেড়েছে।' অনুষ্ঠানে উপস্থিত অন্য কৃষকেরা জানান, জাতটির ফলন ও সহনশীলতা দেখে তাঁরা পরের বছর আরও বেশি জমিতে এটি চাষ করতে চান।
বিনাধান-২৩ কী ধরনের জাত
বিনাধান-২৩ বিনা উদ্ভাবিত আমন মৌসুমের একটি ধানের জাত। বিনার নিজস্ব বর্ণনায় জাতটি স্বল্পমেয়াদি, জীবনকাল ১১৫-১২৫ দিন, এবং অধিক ফলনশীল। এটি আলোক অসংবেদনশীল, অর্থাৎ ফুল আসার জন্য শরতের ছোট দিনের অপেক্ষায় থাকে না। দেশের জোয়ার-ভাটা, লবণাক্ততা ও বন্যাকবলিত এলাকায় আমন মৌসুমে চাষের জন্য জাতটি সুপারিশ করা হয়েছে। বিনা জানায়, পরিপক্ক অবস্থায় জাতটি ৮ ডিএস/মিটার মাত্রার লবণাক্ততা এবং ১৫ দিন পর্যন্ত জলমগ্নতা সহ্য করতে পারে। এর চাল মাঝারি চিকন। মাঠ দিবসে বিজ্ঞানীরা যে দুটি মাত্রার কথা বলেছেন, তা প্রতিষ্ঠানটির জাত-বর্ণনার সঙ্গে মিলে যায়।
বিনার তথ্য অনুযায়ী, মাঝারি উঁচু থেকে নিচু জমি এ ধান চাষের উপযোগী। প্রতিষ্ঠানটি যেসব উপকূলীয় জেলায় জাতটি চাষোপযোগী বলে উল্লেখ করেছে, তার মধ্যে আছে বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলা, খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও চট্টগ্রাম। বিনা জাতটির গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ৫.৩ টন এবং সর্বোচ্চ ফলন হেক্টরপ্রতি ৫.৮ টন বলে জানিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি আরও জানায়, এ জাতে রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ তুলনামূলক কম এবং জাতটি মাজরা পোকার প্রতি মধ্যম প্রতিরোধক্ষমতাসম্পন্ন।
দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ২০২০ সালের মার্চে জানায়, ছয় বছরের গবেষণায় জাতটি উদ্ভাবন করেন বিনার তৎকালীন পরিচালক (প্রশাসন) ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম, এবং জাতীয় বীজ বোর্ড কৃষক পর্যায়ে চাষের জন্য এটি অনুমোদন দেয়। পত্রিকাটির প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৫ দিন পর্যন্ত পানির নিচে থাকার পরও জাতটি স্বাভাবিক ফলন দেয়, ৮.০ ডিএস/মিটার পর্যন্ত লবণাক্ততা সহ্য করে এবং জোয়ার-ভাটা, লবণাক্ত ও বন্যাপ্রবণ এলাকায় আমন মৌসুমে চাষের উপযোগী। লক্ষ্যভুক্ত কৃষকদের কাছে জাতটি পৌঁছাতে বিনা বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) ও ডিএইর সঙ্গে কাজ করার পরিকল্পনা করেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ ছিল। একই প্রতিবেদনে দেশের লবণাক্ত জমি প্রায় ১০ লাখ হেক্টর এবং জলমগ্নতাপ্রবণ জমি প্রায় ২৬ লাখ হেক্টর বলে জানানো হয়।
বন্যাপ্রবণ এশিয়ায় পানির নিচে টিকে থাকার ক্ষমতা দীর্ঘদিন ধরেই ধান প্রজননবিদদের লক্ষ্য। যুক্তরাজ্যের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিভাগের (ডিএফআইডি) ২০১১ সালের একটি কেস স্টাডিতে বলা হয়, আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইরি) ও বিভিন্ন দেশের অংশীদারেরা মার্কার-সহায়ক ব্যাকক্রসিং পদ্ধতিতে সাব-ওয়ান নামের একটি জিন জনপ্রিয় জাতগুলোতে স্থানান্তর করেন, যাতে কৃষকের পছন্দের বৈশিষ্ট্য অটুট রেখে সেগুলো দুই সপ্তাহ পর্যন্ত সম্পূর্ণ ডুবে থেকেও টিকে থাকতে পারে। বিনাধান-২৩-এর ১৫ দিন পর্যন্ত জলমগ্নতা সহ্য করার তথ্য বিনার দেওয়া; প্রতিষ্ঠানটির জাত-বর্ণনায় এই সহনশীলতা কোন পদ্ধতিতে আনা হয়েছে, তা বলা নেই।
যেভাবে এই জাতের চাষ করা হয়
বিনা জানায়, বিনাধান-২৩-এর চাষাবাদ পদ্ধতি অন্যান্য উচ্চ ফলনশীল রোপা আমন জাতের মতোই। প্রতিষ্ঠানটির জাত-বর্ণনায় দেওয়া সুপারিশগুলো হলো:
- বীজতলায় বীজ বপন: জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে জুলাইয়ের দ্বিতীয় সপ্তাহ (১-৩০ আষাঢ়)।
- বীজের হার: হেক্টরপ্রতি ২৫-৩০ কেজি বা একরপ্রতি ১০-১২ কেজি; পুষ্ট ও রোগমুক্ত বীজ ব্যবহার করতে হবে, বপনের আগে বীজ শোধনের পরামর্শ দেয় বিনা।
- বীজতলার সার: উর্বর জমিতে বীজতলা করলে সার লাগে না; অনুর্বর জমিতে প্রতি বর্গমিটারে ১.৫-২.০ কেজি গোবর বা কম্পোস্ট দিতে হবে, চারা হলুদ হয়ে গেলে অল্প ইউরিয়া উপরি প্রয়োগ করা যায়।
- মূল জমিতে হেক্টরপ্রতি সার: ইউরিয়া ১৬০-১৮০ কেজি, টিএসপি ৮০-১০০ কেজি, এমওপি ৬০-৮০ কেজি, জিপসাম ৬০-৮০ কেজি ও দস্তা ১.০-৪.০ কেজি। শেষ চাষের আগে সব টিএসপি ও এমওপি দিতে হবে; ইউরিয়ার অর্ধেক চারা রোপণের ৭-৮ দিন পর এবং বাকি অর্ধেক ২০-২৫ দিন পর, জমির উর্বরতা বুঝে। বিনা মনে করিয়ে দেয়, টিএসপি ও দস্তা সার একসঙ্গে প্রয়োগ করা যাবে না।
- সেচ: এ জাতে সেচের খুব একটা প্রয়োজন হয় না, তবে দরকার হলে সেচ দিতে হবে; ধান পাকার ১০-১২ দিন আগে জমির পানি সরিয়ে ফেলা ভালো।
- আগাছা: চারা রোপণের পর আগাছা দেখা দিলে নিড়ানি বা হাত দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে, সেই সঙ্গে মাটি নরম করে দিতে হবে।
- রোগবালাই ও পোকামাকড়: বিনার মতে পোকামাকড় দমনে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (আইপিএম) সবচেয়ে ভালো। মাজরা পোকা, খোলপোড়া (শিথ ব্লাইট) বা ব্লাস্ট দেখা দিলে নিজের জমির জন্য উপযুক্ত দমন ব্যবস্থা ও মাত্রা জানতে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নিতে হবে।
মাঠ দিবসে জাতটির ফলাফল বোঝার দুটি মাপকাঠি ছিল: বিনার দেওয়া হেক্টরপ্রতি ৫.৩ টন গড় ফলন এবং ছনকার কৃষকদের অভিজ্ঞতা। আগের আমন ধানের সঙ্গে তুলনাটি কৃষকদের নিজস্ব; ছনকার জমিতে মাপা কোনো ফলনের হিসাব জাগো নিউজ ২৪-এর প্রতিবেদনে ছিল না।

দক্ষিণ-পশ্চিমে লবণ আর জলাবদ্ধতা
উপকূলীয় দক্ষিণ-পশ্চিমে কৃষির পথে লবণাক্ততা দীর্ঘদিনের বাধা। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) তথ্য উদ্ধৃত করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের গবেষকদের ২০১৮ সালের একটি গবেষণা, যা 'ইকোসিস্টেম সার্ভিসেস ফর ওয়েল-বিইং ইন ডেল্টাস' গ্রন্থে প্রকাশিত, জানায় যে খুলনা ও বরিশাল বিভাগের উপকূলীয় ও দূরবর্তী ২৮ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর জমির মধ্যে ১০ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর জমি বিভিন্ন মাত্রার লবণাক্ততায় আক্রান্ত। ১৯৭৩ সালে লবণাক্ত এলাকা ছিল ৮ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর, ২০০৯ সালে তা বেড়ে প্রায় ১০ লাখ ৫০ হাজার হেক্টরে দাঁড়ায়।
একই গবেষণায় লবণাক্ততার একটি স্পষ্ট মৌসুমি ধারা তুলে ধরা হয়েছে। জানুয়ারি থেকে মাটির ওপরের স্তরে লবণাক্ততা বাড়তে থাকে, সাধারণত এপ্রিল বা মে মাসে তা সর্বোচ্চে পৌঁছায়, তারপর বর্ষা শুরু হলে কমতে থাকে এবং বৃষ্টিতে লবণ ধুয়ে যাওয়ায় সাধারণত সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরে সর্বনিম্নে নামে। গবেষণায় আরও বলা হয়, শুকনো মৌসুমে গঙ্গার প্রবাহ কমে যাওয়ায় সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটের আশপাশে নদীর পানি বিশেষভাবে লবণাক্ত থাকে, আর লোনা পানির চিংড়ি চাষও মূলত এই জেলাগুলো ঘিরে। মাটির লবণাক্ততা, সেচের ভালো পানির অভাব ও পানি নিষ্কাশনের সমস্যার কারণে শুকনো মৌসুমে বিস্তীর্ণ জমি পতিত পড়ে থাকে।
সমস্যার অন্য দিক জলাবদ্ধতা। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে টানা চার দিনের ভারী বৃষ্টির পর সাতক্ষীরা সদর উপজেলায় বেতনা নদীর বাঁধ ভেঙে যায়। ঢাকা ট্রিবিউন ২০২৪ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর জানায়, দুই উপজেলার তিনটি ইউনিয়নের অন্তত ৫০টি গ্রাম প্লাবিত হয়, ছয় হাজার মাছের ঘের ও দেড় হাজার পুকুর ভেসে যায় এবং মৎস্য ও কৃষি খাতে ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ৭০০ কোটি টাকা। সাতক্ষীরা ডিএইর উপপরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম পত্রিকাটিকে জানান, আমন মৌসুমে অতিবৃষ্টিতে ৫ হাজার ৪৫২ হেক্টর জমি আক্রান্ত হয় এবং ১৪৯ হেক্টরের ফসল নষ্ট হয়, যার ক্ষতি ৯ কোটি টাকার বেশি।
২০২৫ সালের মৌসুমও শুরু হয় ভারী বৃষ্টি দিয়ে। ঢাকা ট্রিবিউন ২০২৫ সালের ১৫ জুলাই জানায়, সাগরে লঘুচাপের প্রভাবে সাতক্ষীরার বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়, পৌরসভার বেশির ভাগ এলাকা এবং সদর উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নের পরিবারগুলো পানিবন্দী হয়ে পড়ে। জেলা আবহাওয়া অফিস ২৪ ঘণ্টায় ১০০ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করে, তার আগে ৪ জুলাই হয়েছিল ১২৯ মিলিমিটার। ডিএইর উপপরিচালক জানান, ১৬২ হেক্টর আউশ, ১০৬ হেক্টর আমনের বীজতলা ও ৪৪ হেক্টর শাকসবজি আক্রান্ত হয়, ক্ষতি প্রায় দেড় কোটি টাকা। এই প্রেক্ষাপটেই ছনকার কৃষকেরা এমন এক জাতের কথা বলছিলেন, যা ১৫ দিন পানির নিচে থেকেও টিকে ছিল।

সাতক্ষীরা ও এর কৃষি
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, খুলনা বিভাগের সাতক্ষীরা জেলা দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে ৩ হাজার ৮১৭.২৯ বর্গকিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত। এর উত্তরে যশোর জেলা, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে খুলনা জেলা এবং পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য। জেলার নদীগুলোর মধ্যে আছে কপোতাক্ষ, বেতনা, ইছামতী, রায়মঙ্গল ও হাড়িয়াভাঙ্গা। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জেলার সাতটি উপজেলায় জনসংখ্যা ছিল ১৯ লাখ ৮৫ হাজার ৯৫৯; উপজেলাগুলোর মধ্যে শ্যামনগর সবচেয়ে বড়, আর সুন্দরবনের একটি অংশ এই জেলার মধ্যে পড়েছে।
কৃষিই এখানকার প্রধান জীবিকা। আদমশুমারির তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাপিডিয়া জানায়, জেলার ৬২.৫৬ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি। মাঠ দিবসটি যে সাতক্ষীরা সদর উপজেলায় হয়েছে, তার আয়তন ৩৯৮.৫৭ বর্গকিলোমিটার এবং ইউনিয়ন ১৪টি, ঘোনা তার একটি; ২০১১ সালের আদমশুমারিতে ঘোনা ইউনিয়নে পুরুষ ৭ হাজার ৭৬৬ জন ও নারী ৭ হাজার ৯৩৫ জন গণনা করা হয়। উপজেলার প্রধান ফসল ধান, পাট, গম, আখ, সরিষা, আলু, ডাল ও সবজি, আর প্রধান রপ্তানিপণ্যের মধ্যে আছে ধান, চাল ও চিংড়ি। উপজেলার নদীগুলোর মধ্যে আছে ইছামতী, বেতনা ও খোলপেটুয়া।
বিনা ও এর সাতক্ষীরা উপকেন্দ্র
বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন জাতীয় কৃষি গবেষণা ব্যবস্থার একটি প্রতিষ্ঠান। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, এর সূচনা ১৯৬১ সালে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত অ্যাটমিক এনার্জি অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চ সেন্টার থেকে; ১৯৭২ সালের পর এর নাম হয় ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার অ্যাগ্রিকালচার, আর ১৯৭৫ সালে ময়মনসিংহে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে স্থানান্তরিত হয়ে প্রতিষ্ঠানটি বর্তমান নাম পায়। প্রচলিত প্রজনন, মাটি ও ফসল ব্যবস্থাপনা এবং বালাই গবেষণার পাশাপাশি বিনা পরমাণু কৌশল ব্যবহার করে, যার মধ্যে আছে বীজে বিকিরণ প্রয়োগ করে উপকারী মিউটেশন তৈরি।
২০১৮ সালে এফএও ও আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) যৌথ আন্তর্জাতিক সিম্পোজিয়ামে বিনার বিজ্ঞানীদের উপস্থাপিত একটি সারসংক্ষেপে এ কাজের কয়েকটি উদাহরণ আছে: উচ্চ তাপমাত্রা সহনশীল নাবি বোরো জাত বিনাধান-১৪; ২০১৭ সালে অবমুক্ত স্বল্পমেয়াদি ও খরা সহনশীল বিনাধান-১৯; ১২ ডিএস/মিটার লবণাক্ততা সহনশীল গমের জাত বিনাগম-১; এবং ফুল আসা থেকে পরিপক্বতা পর্যন্ত ৮ ডিএস/মিটার লবণাক্ততা সহনশীল চীনাবাদামের চারটি জাত।
বিনার সাতক্ষীরা উপকেন্দ্র ১৯৯৯ সালে জেলা শহর থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে বিনেরপোতায় স্থাপিত হয়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) ও বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) আঞ্চলিক কেন্দ্রের সঙ্গে একই চত্বরে এর অবস্থান, আয়তন ২৭ একর। বিনার তথ্য অনুযায়ী, উপকেন্দ্রটির প্রধান কাজ লবণাক্ততা সহিষ্ণু ফসলের জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনের গবেষণা, খুলনা অঞ্চলের মাটি ও আবহাওয়ায় বিনার জাত ও মিউট্যান্টের উপযোগিতা যাচাই, এবং বীজ উৎপাদন, প্রদর্শনী প্লট ও ছনকার মতো মাঠ দিবসের মাধ্যমে সেগুলো কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
আমন মৌসুম ও জাতীয় চিত্র
বাংলাদেশে ধান হয় তিন মৌসুমে: বোরো, আউশ ও আমন। মার্কিন কৃষি বিভাগের বৈদেশিক কৃষি সেবার (ইউএসডিএ এফএএস) ঢাকা দপ্তর ২০২৫ সালের ২৫ আগস্টের 'গ্রেইন অ্যান্ড ফিড আপডেট' প্রতিবেদনে আমনের স্বাভাবিক সময়সূচি দেয়: রোপণ জুলাই-আগস্টে, কাটা নভেম্বর-ডিসেম্বরে। প্রতিবেদনে বলা হয়, উত্তরাঞ্চলের অনেক কৃষক ২০২৫ সালের জুলাইয়ের শুরুতেই আমন রোপণ শুরু করেন, আর দক্ষিণাঞ্চলের কৃষকেরা সাধারণত আগস্টের শুরুতে রোপণ শুরু করে মাসের শেষে শেষ করেন, কেউ কেউ সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত রোপণ চালিয়ে যান। সে হিসাবে সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে ধান কাটা স্বাভাবিক সময়সূচির তুলনায় আগাম, আর বিনাধান-২৩-এর স্বল্প জীবনকালই তা সম্ভব করেছে।
আমন বর্ষার ফসল, ঐতিহাসিকভাবে পুরোপুরি বৃষ্টিনির্ভর। ডিএইর তথ্য ব্যবহার করে ইউএসডিএর একই দপ্তর ২০২৪-২৫ সালের আমন ফসল ৫৬ লাখ হেক্টর জমিতে ১ কোটি ৪০ লাখ টন চাল বলে প্রাক্কলন করে; ২০২৪ সালের আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বন্যায় প্রায় ২ লাখ হেক্টর আমনখেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ২০২৫-২৬ সালের জন্য, ভালো আবহাওয়া ধরে নিয়ে, দপ্তরটি ৫৮ লাখ হেক্টর জমিতে ১ কোটি ৪৭ লাখ টন উৎপাদনের পূর্বাভাস দেয়। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০২৫ সালের জুলাইয়ে চালের দাম দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়: ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে মোটা চালের গড় খুচরা দাম ছিল কেজিপ্রতি ৫৭.৫ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ১২.৩ শতাংশ বেশি, আর সুগন্ধিহীন সরু চালের দাম ছিল ৮০ টাকা।
আমনের গুরুত্ব দীর্ঘদিনের। বাংলাপিডিয়া জানায়, ২০০৯-১০ সালে দেশের ধানি জমির প্রায় ৪৬ শতাংশে রোপা আমন হতো, বোরো হতো ৪১ শতাংশে; রোপা আমন সারা দেশে চাষ হলেও বোনা আমন হয় মূলত দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে।
আগাম কাটা এবং পরের ফসল
সরিষা নিয়ে উপপরিচালকের বক্তব্যের মূল কথা সময়। সেপ্টেম্বরে ধানমুক্ত হওয়া জমিতে শীতের ফসল সময়মতো বোনা যায়। বিনার তেলবীজের জাতগুলো দেখায় সেই ফসল কেমন হতে পারে: বিনা জানায়, বিনাসরিষা-৪ ও বিনাসরিষা-৯-এর জীবনকাল প্রায় ৮০-৮৫ দিন, জাত দুটি ৬-৮ ডিএস/মিটার মাত্রার লবণাক্ত জমিতে চাষযোগ্য, ভারী বৃষ্টিজনিত সাময়িক জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে এবং মাটিতে অতিরিক্ত রস থাকলে চাষ না দিয়েও বোনা যায়।
বিনার তথ্যমতে, বিনাসরিষা-৪ বোনার উপযুক্ত সময় অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ থেকে মধ্য নভেম্বর, তবে ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত নাবিতে বুনলেও সন্তোষজনক ফলন পাওয়া যায়। বিনাসরিষা-৪-এর গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ২.০ টন ও সর্বোচ্চ ২.৪ টন, আর বিনাসরিষা-৯-এর গড় ফলন ১.৬ টন ও সর্বোচ্চ ২.০ টন। প্রতিষ্ঠানটির পরামর্শ, শতকরা ৭০-৮০ ভাগ ফল বাদামি হলে সরিষা কাটতে হবে, কারণ বেশি পেকে গেলে ফল ফেটে বীজ ঝরে যেতে পারে।
ছনকার কৃষকদের পরিকল্পনা অবশ্য আরও সরল। মনিরুল ইসলাম বিনাধান-২৩-এর চাষ এক বিঘা থেকে পাঁচ বিঘায় নিতে চেয়েছেন, আর মাঠ দিবসে উপস্থিত কৃষকেরা পরের বছর আরও বেশি জমিতে জাতটি চাষের আগ্রহের কথা জানিয়েছেন।

ছবি: বলরাম মহলদার / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৩.০)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা), দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ইউএসডিএ বৈদেশিক কৃষি সেবা (গ্রেইন অ্যান্ড ফিড আপডেট, ২৫ আগস্ট ২০২৫; গ্রেইন অ্যান্ড ফিড অ্যানুয়াল, ৩১ মার্চ ২০২৫), সালেহীন ও অন্যান্য, ইকোসিস্টেম সার্ভিসেস ফর ওয়েল-বিইং ইন ডেল্টাস (২০১৮), ঢাকা ট্রিবিউন, বাংলাপিডিয়া, প্লান্ট মিউটেশন ব্রিডিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিষয়ক এফএও/আইএইএ আন্তর্জাতিক সিম্পোজিয়াম (২০১৮), যুক্তরাজ্যের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিভাগ




মন্তব্য
(০)