২০২৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর সকালে, দেশজুড়ে শীতের পিঠার মৌসুম যখন চলছে, অনলাইন সংবাদমাধ্যম জাগো নিউজ ২৪-এর লাইফস্টাইল ডেস্ক ঘরে বানানোর উপযোগী ক্ষীরসা পিঠার একটি সহজ রেসিপি প্রকাশ করে। এই পিঠায় চালের গুঁড়ার মোটা রুটির ভেতরে থাকে ক্ষীরের পুর, অর্থাৎ বাঙালি রান্নাঘরে দুধ জ্বাল দিয়ে ঘন করা মিষ্টি ক্ষীর; তারপর অল্প আঁচে ডুবো তেলে বাদামি করে ভাজা হয়। রেসিপির শুরুতেই বলা হয়েছিল, শীত মানেই পিঠার উৎসব; খেজুরের রস বা গুড়ের মিষ্টি স্বাদে ভরা বাহারি পিঠার স্বাদ মুখে লেগে থাকে। তবে শীতের পিঠা মানেই শুধু খেজুরের গুড় নয়, আরও অনেক ধরনের পিঠার আয়োজন হয়, আর তেমনই এক লোভনীয় পিঠা হলো ক্ষীরের পুর দেওয়া ক্ষীরসা পিঠা, যার স্বাদ ভোলা কঠিন।
নিচে রেসিপিটি জাগো নিউজ যেভাবে প্রকাশ করেছিল সেভাবেই দেওয়া হলো, উপকরণ ও ধাপগুলো তালিকা আকারে সাজিয়ে। এরপরের অংশগুলোতে রয়েছে বাংলায় ক্ষীর বলতে কী বোঝায় এবং একই নামের পায়েস থেকে তা কীভাবে আলাদা, দেশের শীতের পিঠার মধ্যে এই পিঠার জায়গা কোথায়, এর চালের গুঁড়া ও দুধ কোথা থেকে আসে, আর রেসিপি প্রকাশের তারিখ পর্যন্ত স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ কাঁচা খেজুরের রস, তেলে ভাজা, রান্না করা দুধ ও চিনি নিয়ে কী বলেছিল।
জাগো নিউজের রেসিপি
উপকরণ
জাগো নিউজ উপকরণগুলো দুই ভাগে দিয়েছিল: একটি পুরের জন্য, অন্যটি ডো বা খামিরের জন্য। মাপগুলো সাধারণ রান্নাঘরের মাপ: এক কেজি তরল দুধ, গুঁড়া উপকরণ ও চালের গুঁড়ার জন্য কাপ, আর এক চিমটি এলাচ। এক কাপে কত গ্রাম তা রেসিপিতে বলা হয়নি, আর পানি ও লবণের পরিমাণ রাঁধুনির বিবেচনার ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
পুরের জন্য যা লাগবে:
- তরল দুধ: ১ কেজি
- গুঁড়া দুধ: আধা কাপ
- কনডেন্সড মিল্ক: আধা কাপ
- এলাচ গুঁড়া: ১ চিমটি
ডো তৈরির জন্য যা লাগবে:
- চালের গুঁড়া: ২ কাপ
- লবণ: সামান্য
- পানি: পরিমাণমতো
ভাজার জন্য ডুবো তেল লাগবে, যা রেসিপির উপকরণ তালিকায় আলাদা করে লেখা হয়নি এবং যার পরিমাণও বলা হয়নি।
যেভাবে তৈরি করবেন
- পুরের জন্য প্রথমে দুধ জ্বাল দিয়ে নিন।
- এবার পুরের বাকি সব উপকরণ মিশিয়ে নাড়ুন।
- মিশ্রণ ঘন না হওয়া পর্যন্ত নাড়তে থাকুন।
- আঠালো ভাব এলে চুলা থেকে নামিয়ে ঠান্ডা করে নিন।
- চালের গুঁড়া দিয়ে রুটির মতো ডো তৈরি করুন।
- ডো থেকে মোটা রুটির মতো গোল করে তার ভেতরে ক্ষীরের পুর দিন এবং মুখ জোড়া লাগিয়ে বন্ধ করুন।
- ডুবো তেলে অল্প আঁচে পিঠাগুলো ভাজুন।
- বাদামি হয়ে এলে তেল থেকে তুলে গরম গরম পরিবেশন করুন মজাদার ক্ষীরসা পিঠা।
এই পরিমাণ উপকরণে কয়টি পিঠা হবে, দুধ কতক্ষণ জ্বাল দিতে হবে, কিংবা অল্প আঁচ ছাড়া তেল কতটা গরম হবে, রেসিপিতে তা বলা নেই। এ ধরনের বেশির ভাগ ঘরোয়া রেসিপির মতোই এসব রাঁধুনির অভিজ্ঞতার ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
ক্ষীরসা পিঠা কেমন পিঠা
পিঠা হলো ঘরে বানানো নানা রকম পিঠা-পুলির বাংলা নাম, যার বেশির ভাগই চালের গুঁড়ার তৈরি। অনলাইন বিশ্বকোষ উইকিপিডিয়া পিঠাকে প্যানকেক, ডাম্পলিং বা ফ্রিটারের মতো এক বৈচিত্র্যময় খাবার হিসেবে বর্ণনা করেছে, যা মিষ্টি বা ঝাল দুই রকমই হয় এবং সাধারণত খামির বা গোলা থেকে তৈরি করে ভাপে, তেলে ভেজে বা তাওয়ায় সেঁকে রান্না করা হয়। কিছু পিঠার ভেতরে পুর থাকে। পুরভরা পিঠার বাইরের খামিরের আবরণকে বলা হয় খোল, আর ভেতরের অংশকে বলা হয় পুর। ক্ষীরসা পিঠা এই পুরভরা পিঠার দলে পড়ে: এর খোল চালের গুঁড়ার খামির, আর পুর ক্ষীর।
একই সূত্র জানায়, মিষ্টি পিঠা সাধারণত চিনি, গুড়, খেজুরের রস বা তালের রস দিয়ে তৈরি হয় এবং প্রায়ই এলাচ বা কর্পূর দিয়ে সুগন্ধি করা হয়; আর পিঠা তেল বা ঘিয়ে ভাজা, আগুনে সেঁকা, ভাপে সেদ্ধ বা বেক করা হতে পারে। জাগো নিউজের রেসিপিতে সুগন্ধের জন্য এলাচ আর রান্নার জন্য ডুবো তেলে ভাজার কথা আছে, আর মিষ্টতা আসে খেজুরের গুড় থেকে নয়, কনডেন্সড মিল্ক থেকে; রেসিপির ভূমিকাও সেই কথাই বলে।
আরও কয়েকটি পরিচিত বাঙালি পিঠায় ক্ষীর ব্যবহার হয়। পুলি পিঠাকে বর্ণনা করা হয়েছে নারকেলের মিশ্রণ বা ক্ষীরের পুর দেওয়া ডাম্পলিংয়ের মতো পিঠা হিসেবে, যা ভাজা বা ভাপে রান্না করা হয়; আর পাটিসাপটা হলো গুড়-নারকেল বা ক্ষীরের পুর দেওয়া পাতলা পিঠা। ক্ষীরসা পিঠায় একই ধরনের পুর থাকে, তবে তা মোটা খামিরের রুটিতে মুড়ে তেলে ভাজা হয়, ফলে বাইরে মুচমুচে বাদামি খোল আর ভেতরে নরম মিষ্টি পুর।
বাংলার ক্ষীর: দুধ জ্বাল দিয়ে ঘন করা, পায়েস নয়
উপমহাদেশের নানা অঞ্চলে ক্ষীর শব্দের অর্থ নানা রকম, আর এই রেসিপির জন্য পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের বড় অংশে ক্ষীর বা পায়াসম হলো চালের পুডিং: দুধ, চিনি বা গুড় আর চাল একসঙ্গে জ্বাল দেওয়া, কখনো এলাচ, জাফরান, বাদাম বা সেমাই মিশিয়ে। বাংলায় এই খাবারটি সাধারণত পায়েস নামে পরিচিত। ক্ষীর শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ক্ষীরা থেকে, যার অর্থ দুধ বা দুধের তৈরি খাবার।
বাংলায় ক্ষীর, যাকে মেওয়াও বলা হয়, ভিন্ন জিনিস: দুধ জ্বাল দিয়ে ঘন করা। উইকিপিডিয়ার বাঙালি মিষ্টি ক্ষীর বিষয়ক নিবন্ধ অনুযায়ী, গরু বা মহিষের দুধ দীর্ঘ সময়, সাধারণত এক ঘণ্টারও বেশি, জ্বাল দিয়ে আসল পরিমাণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশে নামিয়ে আনলে তা ক্ষীর হয়। মিষ্টতা ও স্বাদ বদলাতে কখনো জ্বাল দেওয়ার সময় চিনি, অ্যারারুট বা সুজি মেশানো হয়। দুধ যদি আরও জ্বাল দিয়ে আসল পরিমাণের এক-চতুর্থাংশ বা এক-পঞ্চমাংশে নামানো হয়, তবে তা হয় খোয়া, যা ক্ষীরের চেয়ে শক্ত। বাঙালি ময়রারা বহু মিষ্টির ভিত্তি হিসেবে ক্ষীর ব্যবহার করেন, যেমন রসমালাই, যেখানে ছানার ছোট বল ক্ষীরে ডুবিয়ে রাখা হয়; খুলনা বিভাগের মেহেরপুরের ক্ষীরকদম আরেকটি উদাহরণ। ক্ষীর তৈরিতে যে দীর্ঘ ধৈর্য লাগে, তা থেকেই বাংলা প্রবাদ এসেছে: সবুরে মেওয়া ফলে।
একই বিশ্বকোষে খোয়া তৈরির বর্ণনা আছে: পূর্ণ ননিযুক্ত দুধ বড় অগভীর লোহার কড়াইয়ে মাঝারি আঁচে কয়েক ঘণ্টা ধরে ফুটিয়ে, আর দুধ যেন পুড়ে না যায় সে জন্য আদর্শ তাপমাত্রা প্রায় ৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সেখানে একটি দ্রুত পদ্ধতির কথাও আছে: ননি তোলা দুধে পূর্ণ ননিযুক্ত গুঁড়া দুধ মিশিয়ে ঘন না হওয়া পর্যন্ত জ্বাল দেওয়া, যদিও এভাবে তৈরি জিনিসে প্রথাগত খোয়ার সব বৈশিষ্ট্য না-ও থাকতে পারে। জাগো নিউজের রেসিপি এই দ্রুত পথটিই নেয়। ফুটন্ত তরল দুধে গুঁড়া দুধ ও কনডেন্সড মিল্ক দিয়ে ঘন ও আঠালো না হওয়া পর্যন্ত নাড়তে হয়, ফলে শুধু দুধ জ্বাল দেওয়ার চেয়ে অনেক কম সময়ে পুর জমে যায়।
কনডেন্সড মিল্ক হলো গরুর দুধ, যা থেকে প্রায় ৬০ শতাংশ পানি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, আর বেশির ভাগ সময় এতে চিনি মিশিয়ে সুইটেনড কনডেন্সড মিল্ক হিসেবে বিক্রি করা হয়: খুব ঘন ও মিষ্টি একটি পণ্য, যা টিনজাত অবস্থায় না খুললে ফ্রিজ ছাড়াই বছরের পর বছর ভালো থাকে। এই রেসিপিতে এটি একসঙ্গে দুটি কাজ করে, পুরকে ঘন করে আর মিষ্টি করে; তাই উপকরণ তালিকায় আলাদা চিনি নেই।

বাঙালির ঘরে পিঠা আর শীতের মৌসুম
এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ প্রকাশিত জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া পিঠাকে বর্ণনা করেছে ঘরে তৈরি ঐতিহ্যবাহী খাবার হিসেবে, যা সাধারণত নিত্যদিনের খাবার নয়। বর বা কনে বরণ, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের আগমন, পারিবারিক অনুষ্ঠান এবং অতিথি আপ্যায়নে পিঠা পরিবেশন করা হয়। অনেক সময় শিশুরা কিংবা পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্যরা পিঠা বানানোর আবদার করেন, আর মা, দাদি বা নানিরা পিঠা তৈরি করেন; কোথাও কোথাও প্রতিবেশীরা একসঙ্গে মিলে পিঠা বানান এবং কাজটিকে একটি সামাজিক আয়োজনে পরিণত করেন।
বেশির ভাগ পিঠাই মিষ্টি, তবে ঝাল পিঠাও আছে। সারা বছরই কিছু পিঠা তৈরি হয়, তবে বাংলাপিডিয়া বলছে শীতকালের পিঠা সবচেয়ে সুস্বাদু, কারণ এ সময় খেজুরের রস এবং খেজুর ও আখের গুড় পাওয়া যায়। পিঠার মৌসুম শুরু হয় হেমন্তে, যখন কৃষকেরা মাঠ থেকে ধান ঘরে তোলেন। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি একটি পিঠা প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিল, যেখানে ১০৬ ধরনের পিঠা প্রদর্শিত হয়। সারা দেশে পরিচিত পিঠার মধ্যে বাংলাপিডিয়া চিতই, পাটিসাপটা, পাকান, ভাপা, আন্দশা, কুলশি, কাটা পিঠা, ছিট পিঠা, গোকুল পিঠা, চুটকি পিঠা, মুঠি পিঠা, জামদানি পিঠা, হাঁড়ি পিঠা, নকশি পিঠা, পাতা পিঠা ও বিবিখানা পিঠার নাম উল্লেখ করেছে। একই পিঠা এলাকাভেদে প্রায়ই ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত।
জ্ঞানকোষটি একটি পরিবর্তনের কথাও লিখেছে। শহরে কেক, পেস্ট্রি ও বাণিজ্যিকভাবে তৈরি অন্যান্য খাবার ধীরে ধীরে ঘরে বানানো পিঠার জায়গা নিচ্ছে, তবু পিঠার কদর কমেনি: শহরে পিঠা প্রদর্শনী জনপ্রিয় আয়োজনে পরিণত হয়েছে, বিশেষায়িত দোকানে দামি পিঠা বিক্রি হয়, আর রাস্তার মোড়ে ছোট বিক্রেতারা সস্তা পিঠা বিক্রি করে জীবিকা চালান। উইকিপিডিয়া যোগ করেছে, বিশেষ কিছু পিঠা নবান্নের মতো ফসল তোলার উৎসব এবং জানুয়ারির মাঝামাঝি পৌষ পার্বণ বা মকর সংক্রান্তির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত, আর হেমন্ত ও শীতে সারা বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে পিঠা মেলা ও পিঠা উৎসব হয়।

চালের গুঁড়া আর ২০২৫ সালের আমন মৌসুম
ক্ষীরসা পিঠার খোল চালের গুঁড়া, লবণ আর পানি দিয়ে তৈরি, আর বাঙালির পিঠার মৌসুম চলে ধানের পঞ্জিকা ধরে। বাংলাপিডিয়া পিঠার মৌসুমের শুরু ধরেছে হেমন্তে, যখন কৃষকেরা মাঠ থেকে ধান কাটেন, আর সেই ধান হলো আমন।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২৫ সালের ১৮ নভেম্বর জানায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকার ৪ দশমিক ৪১ কোটি টনের বেশি চাল ও গম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এর আওতায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) আগের সপ্তাহে তৈরি এক প্রতিবেদনে ৫৯ লাখ হেক্টরের বেশি জমি থেকে ১ দশমিক ৮১ কোটি টনের বেশি আমন চাল উৎপাদনের আশা করা হয়। জাতভেদে ডিএই প্রায় ১৭ দশমিক ৫০ লাখ টন হাইব্রিড আমন, ১ দশমিক ৫১ কোটি টন উচ্চফলনশীল জাত, ৯ দশমিক ৭৫ লাখ টন স্থানীয় জাত এবং প্রায় ৩ দশমিক ৩০ লাখ টন বোনা বা গভীর পানির আমনের হিসাব দেয়। ওই প্রতিবেদনের সময় প্রায় ২০ শতাংশ ধান কাটা হয়েছিল, আর ডিএইর মাঠ পরিষেবা উইংয়ের পরিচালক বলেছিলেন, ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে কাটা শেষ হবে।
এক মাস পর উত্তরাঞ্চলের আঞ্চলিক হিসাব থেকে ফলন কেমন হলো তা দেখা যায়। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসস ২০২৫ সালের ২১ ডিসেম্বর রংপুর থেকে জানায়, মৌসুমের শুরুতে খরার মতো পরিস্থিতি সত্ত্বেও ডিএইর রংপুর অঞ্চলের পাঁচ জেলা রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও নীলফামারীর কৃষকেরা ৬ লাখ ২১ হাজার ৩৯৮ হেক্টর জমি থেকে ২০ লাখ ৬১৪ টন চাল উৎপাদন করেছেন, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২০ লাখ ১০ হাজার ৫০৫ টন। অঞ্চলটির ডিএইর অতিরিক্ত পরিচালক জানান, গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ৩ দশমিক ২৩ টন চাল, যা আগের বছর ছিল ৩ দশমিক ২১ টন। স্থানীয় বাজারে মোটা আমন ধান প্রতি মণ (৪০ কেজি) ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকায় এবং চিকন জাত ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল, আর সংস্থাটি জানায়, গ্রামাঞ্চলে কৃষকেরা নতুন আমন ধান দিয়ে নবান্ন উৎসব পালন করছিলেন।
দেশে দুধ: উৎপাদন, চাহিদা আর গুঁড়া দুধ
এই রেসিপির পুর শুরু হয় এক কেজি তরল দুধ দিয়ে, আর দুধ দেশের প্রাণিসম্পদ খাতের প্রধান পণ্যগুলোর একটি। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের (ডিএলএস) ২০২৪-২৫ সালের লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্লান্স সারণি, যা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য থেকে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তৈরি, অনুযায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দুধের সাময়িক উৎপাদন ছিল ১৫৫ দশমিক ৩৮ লাখ টন, যা ২০২৩-২৪ সালে ছিল ১৫০ দশমিক ৪৪ লাখ টন এবং ২০১৫-১৬ সালে ৭২ দশমিক ৭৫ লাখ টন। মাথাপিছু দৈনিক ২৫০ মিলিলিটার ধরে ডিএলএস চাহিদা হিসাব করেছে ১৬২ দশমিক ৩৩ লাখ টন, আর প্রাপ্যতা দেখিয়েছে মাথাপিছু দৈনিক ২৩৯ দশমিক ২৯ মিলিলিটার। একই সারণিতে ২০২৪-২৫ সালে দেশে ২৫১ দশমিক ৭১ লাখ গরু ও ১৫ দশমিক ৩২ লাখ মহিষের হিসাব রয়েছে।
এই ঘাটতি পুরোনো। বাংলাপিডিয়ার দুধ বিষয়ক ভুক্তিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে মোট দুধ উৎপাদন জাতীয় চাহিদার চেয়ে অনেক কম, তাই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গুঁড়া দুধ আমদানি করা হয়, আর প্রাপ্ত দুধের বড় অংশ দিয়ে নানা দুগ্ধজাত পণ্য তৈরি হয়। এই রেসিপিতে ব্যবহৃত গুঁড়া দুধ ও কনডেন্সড মিল্ক সেই বৃহত্তর সরবরাহেরই অংশ।
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী গরুর দুধের গড় উপাদান ৮৭ দশমিক ৬ শতাংশ পানি, ৩ দশমিক ৭ শতাংশ চর্বি, ৩ দশমিক ২ শতাংশ আমিষ, ৪ দশমিক ৮ শতাংশ ল্যাকটোজ এবং শূন্য দশমিক ৭২ শতাংশ খনিজ বা ছাই; পূর্ণ দুধ ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, রিবোফ্লাভিন, আমিষ ও ভিটামিন এ-এর চমৎকার উৎস। জ্ঞানকোষটি জানায়, বাংলাদেশে বেশির ভাগ দুধ অন্তত ২০ মিনিট ফুটিয়ে খাওয়া হয়, আর কয়েকটি শহরে পাওয়া পাস্তুরিত দুধ অন্তত ৬৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ৩০ মিনিট বা অন্তত ৭২ ডিগ্রিতে ১৫ সেকেন্ড গরম করে তারপর দ্রুত ঠান্ডা করা হয়। ক্ষীরের পুরের জন্য দীর্ঘ সময় দুধ জ্বাল দেওয়া ব্যবহারের আগে ভালো করে দুধ ফোটানোর সেই ঘরোয়া অভ্যাসের সঙ্গেই মেলে।
খেজুরের রস, গুড় আর নিপাহ ভাইরাসের সতর্কতা
জাগো নিউজের রেসিপি শুরু হয়েছে খেজুরের রস ও গুড়ের কথা দিয়ে, যে স্বাদের সঙ্গে বেশির ভাগ বাংলাদেশি শীতের পিঠাকে মেলান। বাংলাপিডিয়ার গুড় বিষয়ক ভুক্তিতে বলা হয়েছে, গাছিরা নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত গাছের মাথার নরম অংশ চেঁছে রস সংগ্রহ করেন, আর ডিসেম্বরের শুরুতে গাছের মাথা রস নেওয়ার জন্য প্রস্তুত করা হয়। সরু বাঁশের নল দিয়ে সারা রাত রস হাঁড়িতে জমা হয়, ছয় দিনের চক্রে: প্রথম রাতের রস জিরান, যা মিষ্টতা ও পরিমাণে সবচেয়ে ভালো; দ্বিতীয় রাতের রস দোকাট; তৃতীয় রাতের রস ঝরা; এরপর গাছকে তিন দিন বিশ্রাম দেওয়া হয়। একটি গড়পড়তা সুস্থ গাছ দিনে প্রায় ৬ লিটার রস দেয়, সবচেয়ে বেশি রস মেলে ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে, আর গেঁজে যাওয়া ঠেকাতে রস দ্রুত জ্বাল দিতে হয়। যশোরের খাজুরা গুড় ও মাদারীপুরের হাজারি গুড় সবচেয়ে পরিচিত।
কাঁচা খেজুরের রসে গুরুতর ঝুঁকি আছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ২০২৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর তাদের রোগ প্রাদুর্ভাব সংবাদে জানায়, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২৯ আগস্টের মধ্যে বাংলাদেশ বরিশাল, ঢাকা ও রাজশাহী বিভাগের চার জেলা থেকে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে চারজনের মৃত্যুর নিশ্চিত তথ্য জানিয়েছে। তাঁদের প্রথম তিনজনের কাঁচা খেজুরের রস খাওয়ার ইতিহাস ছিল। ২০০১ সালে প্রথম শনাক্ত প্রাদুর্ভাবের পর থেকে বাংলাদেশ তার নজরদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে ৩৪৭ জন নিপাহ রোগী নথিভুক্ত করেছে, মৃত্যুহার ৭১ দশমিক ৭ শতাংশ; আর ২০২৪ সালে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত পাঁচজন রোগীর সবাই মারা যান। ডব্লিউএইচও উল্লেখ করেছে, রোগী পাওয়ার সাধারণ মৌসুম ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল, ঠিক খেজুরের রস সংগ্রহের মাসগুলো।
ফলখেকো বাদুড় এই ভাইরাসের প্রাকৃতিক বাহক, আর খোলা হাঁড়িতে রস জমার সময় বাদুড় তা দূষিত করতে পারে। নিপাহ সংক্রমণের নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ বা টিকা নেই। ডব্লিউএইচওর পরামর্শ হলো খেজুরের রস ও অন্যান্য তাজা খাবারে বাদুড়ের নাগাল বন্ধ করা, সদ্য সংগ্রহ করা খেজুরের রস খাওয়ার আগে ফুটিয়ে নেওয়া, ফল ভালো করে ধুয়ে খোসা ছাড়িয়ে খাওয়া এবং বাদুড়ে খাওয়া চিহ্নযুক্ত ফল ফেলে দেওয়া। কাঁচা খেজুরের রস খাবেন না। ফোটানো রস থেকে তৈরি গুড় ও পিঠাই মৌসুমের মিষ্টি উপভোগের নিরাপদ উপায়।

ডুবো তেলে ভাজা আর দুধের পুর নিরাপদ রাখা
ক্ষীরসা পিঠা ডুবো তেলে ভাজা হয়, তাই কোন চর্বি ব্যবহার হচ্ছে তা গুরুত্বপূর্ণ। আংশিক হাইড্রোজেনেটেড তেল, দেশে যা ডালডা বা বনস্পতি ঘি নামে পরিচিত, শিল্পোৎপাদিত ট্রান্স ফ্যাটের প্রধান উৎস, যা হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ২০২১ সালের ২ ডিসেম্বর জানায়, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) ডব্লিউএইচওর সর্বোত্তম চর্চা অনুসরণ করে খাদ্যদ্রব্যে ট্রান্স-ফ্যাটি এসিড নিয়ন্ত্রণ প্রবিধানমালা, ২০২১ গ্রহণ করেছে, যার লক্ষ্য ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সব তেল, চর্বি ও খাদ্যদ্রব্যে ট্রান্স ফ্যাট মোট চর্বির সর্বোচ্চ ২ শতাংশে সীমিত রাখা। একই প্রতিবেদনে ২০১৯ সালের একটি গবেষণার কথা বলা হয়, যাতে ঢাকার শীর্ষস্থানীয় আংশিক হাইড্রোজেনেটেড তেলের ব্র্যান্ডগুলোর ৯২ শতাংশ নমুনায় ট্রান্স ফ্যাটের মাত্রা ২ শতাংশের সীমা ছাড়িয়েছিল; আর ডব্লিউএইচওর হিসাবে ট্রান্স ফ্যাটজনিত হৃদ্রোগে মৃত্যুর বোঝা সবচেয়ে বেশি এমন ১৫টি দেশের একটি বাংলাদেশ।
পুরের ব্যাপারেও সতর্কতা দরকার। ডব্লিউএইচওর ২০০৬ সালে প্রকাশিত ফাইভ কিজ টু সেফার ফুড বা নিরাপদ খাদ্যের পাঁচটি চাবিকাঠি নির্দেশিকা ঘরের রান্নাঘরের জন্য পাঁচটি নিয়ম দিয়েছে: পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকুন; কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখুন; ভালোভাবে রান্না করুন; খাবার নিরাপদ তাপমাত্রায় রাখুন; এবং নিরাপদ পানি ও কাঁচামাল ব্যবহার করুন। নির্দেশিকাটি মাংস, সামুদ্রিক খাবার, রান্না করা ভাত, রান্না করা পাস্তা, পনির ও ডিমের সঙ্গে দুধকেও এমন খাবারের তালিকায় রেখেছে, যেখানে অণুজীব বাড়ার আদর্শ পরিবেশ থাকে। এতে বলা হয়েছে, একটি ব্যাকটেরিয়া মাত্র ১৫ মিনিটে দুটি হতে পারে, ফলে ছয় ঘণ্টার মধ্যে একটি ব্যাকটেরিয়া ১৬ মিলিয়নের বেশি হয়ে যেতে পারে। নির্দেশিকা ৫ থেকে ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসকে বিপজ্জনক তাপমাত্রা অঞ্চল বলেছে, যেখানে অণুজীব খুব দ্রুত বাড়ে ও বংশবৃদ্ধি করে।
মোড়ানোর আগে যে ক্ষীরের পুর ঠান্ডা করতে হয়, তার জন্য নির্দেশিকার নিজস্ব তালিকাই প্রযোজ্য: রান্না করা খাবার দুই ঘণ্টার বেশি ফ্রিজের বাইরে রাখাকে এতে অনিরাপদ ধরা হয়েছে, রান্নার দুই ঘণ্টার মধ্যে বেঁচে যাওয়া খাবার ঠান্ডা জায়গায় রাখাকে নিরাপদ চর্চা বলা হয়েছে, আর রান্না করা খাবার আবার গরম করলে পুরোটা ভালোভাবে গরম না হওয়া পর্যন্ত গরম করতে বলা হয়েছে। রেসিপিতে যেমন বলা আছে, পিঠাগুলো তেল থেকে তুলে গরম গরম পরিবেশন করা হয়।
উৎসবের মিষ্টিতে চিনি
ক্ষীরসা পিঠা উৎসবের মিষ্টান্ন, প্রতিদিনের খাবার নয়, আর এর মিষ্টতার প্রায় পুরোটাই আসে কনডেন্সড মিল্ক থেকে। ডব্লিউএইচও ২০১৫ সালের ৪ মার্চ চিনি গ্রহণ বিষয়ে যে নির্দেশিকা দেয়, তাতে প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশুদের দৈনিক মোট শক্তি গ্রহণের ১০ শতাংশের নিচে ফ্রি সুগার বা মুক্ত চিনি রাখার সুপারিশ করা হয়েছে, আর বলা হয়েছে, তা ৫ শতাংশের নিচে, অর্থাৎ দিনে মোটামুটি ২৫ গ্রাম বা ছয় চা-চামচে নামাতে পারলে বাড়তি স্বাস্থ্য সুবিধা মিলবে। মুক্ত চিনি বলতে বোঝায় উৎপাদনকারী, রাঁধুনি বা ভোক্তা খাবার ও পানীয়তে যে চিনি যোগ করেন, সেই সঙ্গে মধু, সিরাপ ও ফলের রসে প্রাকৃতিকভাবে থাকা চিনি। দুধে প্রাকৃতিকভাবে থাকা চিনি এই নির্দেশিকার আওতায় পড়ে না, কারণ ডব্লিউএইচও এর ক্ষতিকর প্রভাবের কোনো প্রমাণ পায়নি; তবে সুইটেনড কনডেন্সড মিল্কে যোগ করা চিনি মুক্ত চিনি হিসেবেই গণ্য।
ডব্লিউএইচও এই সুপারিশ করেছে এমন প্রমাণের ভিত্তিতে যে যাঁরা কম চিনি খান তাঁদের শরীরের ওজন কম থাকে, আর মুক্ত চিনি বেশি খেলে দাঁতের ক্ষয় বেশি হয়। ডায়াবেটিস বা চিনি ও চর্বি খাওয়ায় বিধিনিষেধ আছে এমন কোনো রোগ থাকলে শীতের খাবারের তালিকায় তেলে ভাজা মিষ্টি পিঠা রাখার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
ছবি: Mmrsafy / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাপিডিয়া (এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ), প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের মাধ্যমে), বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের মাধ্যমে), উইকিপিডিয়া (পিঠা, ক্ষীর, খোয়া, কনডেন্সড মিল্ক)





মন্তব্য
(০)