২০২৬ সালের ২৭ মে, ঈদুল আজহার আগের দিন, সুনামগঞ্জের হাওরের কৃষকেরা উৎসবের মুখোমুখি হয়েছিলেন সেই বোরো ধান ছাড়াই, যা দিয়ে সাধারণত তাঁদের পরিবারের সারা বছরের খোরাকি চলে। প্রথমে অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতা, পরে টানা ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে জেলার হাওরগুলোর বিস্তীর্ণ ধান তলিয়ে গিয়েছিল। সেদিন সন্ধ্যায় জাগো নিউজের সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি লিপসন আহমেদের প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে আসে। জেলা প্রশাসন জানায়, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা চূড়ান্ত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে, কিন্তু প্রতিশ্রুত সরকারি সহায়তা কবে কৃষকের হাতে পৌঁছাবে, তা কেউ বলতে পারেননি।
'কাল ঈদ। অথচ ইচ্ছে আছিল (ছিল) হাওরের ধান ঘরে তুলে বছরের খোরাক রেখে বাকি ধান বেইচা দিমু (বিক্রি করে দেবো)। কিন্তু সেটা আর পূরণ হলো না। সব ধান ডুবে গেছে পানিতে। এখন বাচ্চা-কাচ্চাদের (ছেলেমেয়ে) ঈদে কী কইরা (করে) নতুন জামা (কাপড়) কিনে দিমু (দেবো)? সেই সামর্থ্য নেই।' কথাগুলো বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন সুনামগঞ্জের দেখার হাওরের কৃষক ইসলাম উদ্দিন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, শুধু তিনি নন, এই অঞ্চলের প্রতিটি কৃষকের ঘরে তখন হাহাকার। হাওরের প্রায় ১০ লাখ কৃষকের মধ্যে লক্ষাধিক কৃষকের কষ্টের ধান বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে। অথচ এই একটি ফসল দিয়েই তাঁদের সারা বছরের খোরাকি চলে।
পানির নিচে সারা বছরের খোরাকি
জেলার বিভিন্ন হাওরের কৃষকেরা একই ক্ষতির কথা বলেছেন। দেখার হাওরের কৃষক লতিফ মিয়া জাগো নিউজকে বলেন, 'অনেক আশা নিয়ে ধান করে কোনো লাভ হলো না। সব ধান বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে। এখন সরকারের সহায়তাটুকু পেলে ঈদে কেবল ছেলে-মেয়েকে খুশি রাখা যেতো।'
রহমত আলী নামের আরেক কৃষক বলেন, 'ধান তুলে পরিবার নিয়ে খুশি থাকার কথা। অথচ ধান হারিয়ে এখন কেবল হতাশা আর দুশ্চিন্তা। সারাটা বছর কীভাবে চলবো, সেই চিন্তায় রাতে ঘুম হয় না।'
করচার হাওরের কৃষক আব্দুল মিয়া বলেন, 'সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কী কষ্টই না করেছি। ধানও হয়েছিল ভালো। কিন্তু ঘরে তোলার আগেই সব পানিতে তলিয়ে গেল!' শনির হাওরের কৃষক মুফাচ্ছির রহমানের ভাষ্য, 'এই সময়ে হাওরে ঈদ উৎসব থাকার কথা। অথচ এখন পুরো হাওর এলাকায় সুনসান নীরবতা। সারা বছরের খোরাকি পানিতে ডুবে শেষ। এবার আমাদের ঈদ নেই।'
ঈদের আগের কয়েক সপ্তাহে জেলা থেকে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে দেখা যায়, ক্ষতি কীভাবে ধাপে ধাপে বেড়েছে। ৩০ এপ্রিল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম জানায়, টানা তিন-চার দিনের প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের পর সদর উপজেলার শিয়ালমারায় কৃষকেরা কোমর ও বুকসমান পানিতে নেমে পচা ধান কাটছিলেন। কৃষকেরা বলেন, তাঁদের অর্ধেক ফসল ডুবে নষ্ট হয়েছে, বাকি যা আছে শ্রমিকের অভাবে তারও অর্ধেক কাটা যাচ্ছে না, আর যে ধান কাটা হয়েছিল রোদের অভাবে তাতে অঙ্কুর গজিয়ে তা খাওয়ার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে, এখন তা কেবল হাঁসের খাবার। ধারদেনা করে চাষ করা ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন চাষিরা চরম অসহায় হয়ে পড়েছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।
১৩ মে প্রথম আলো জেলার সবচেয়ে বড় হাওর দেখার হাওরের এক কৃষকের কথা তুলে ধরে, যিনি স্বাভাবিক বছরে গোলায় ৩০০ মণের বেশি ধান তোলেন এবং সংসারের খাবারের জন্য বছরে তাঁর প্রায় ৪০ মণ ধান লাগে। জমির বড় অংশ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় তিনি জানান, এবার কোনোমতে ঘরের খোরাকির চিন্তা করছেন, মৌসুমের আবাদের জন্য ঋণ করতে হয়েছে, আর এমন বছরের পর হাওরের কৃষকের ঋণমুক্ত হতে চার থেকে পাঁচ বছর লাগে। বৈরী আবহাওয়ায় তাঁর কাটা ধান মাড়াইয়ের আগে চার দিন স্তূপ করে রাখতে হয়েছিল, তাতে কিছু ধানে চারা গজায়; মান খারাপ বলে পাইকার সেই ধান কেনেননি। ২৭ মে জাগো নিউজের প্রতিবেদনেও একই কথা আসে: পানির নিচ থেকে কৃষকেরা কিছু ধান তুলে আনলেও রোদ না থাকায় অনেক ধানে চারা গজিয়েছে।

মৌসুমের বৃষ্টিতে যেভাবে তলিয়ে গেল ধান
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চের শেষের দিকে সুনামগঞ্জে অতিবৃষ্টি শুরু হয় এবং জেলার ১৩৭টি হাওরের অনেকগুলোতে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। জেলা প্রশাসন, কৃষি বিভাগ ও পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সেই জলাবদ্ধতা নিরসনের চেষ্টা চালালেও পরে একটানা ভারী বৃষ্টিতে কৃষকের কষ্টের ধান ডুবে যায়।
সমস্যার আভাস মিলেছিল আগেই। ১৯ মার্চ প্রথম আলো জানায়, কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টি, ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে সদর উপজেলার জোয়ারভাঙা ও কানলার হাওর, বিশ্বম্ভরপুরের করচার হাওর, শান্তিগঞ্জের খাই ও পাখিমারা হাওর, শাল্লার ছায়ার হাওর, জামালগঞ্জের হালির হাওর এবং তাহিরপুরের শনির হাওরে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) জেলা উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক তখন বোরো আবাদের পরিমাণ জানান দুই লাখ ২৩ হাজার ৫০০ হেক্টর, আর শিলাবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত জমি ৩৭০ হেক্টর। পাউবোর তথ্যে, জেলার ১২টি উপজেলায় সে মৌসুমে ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭১০টি প্রকল্পে ৬০২ কিলোমিটার বাঁধ সংস্কার ও নির্মাণ চলছিল, আর তখনো কাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি। হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলন সুনামগঞ্জের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক বলেন, বাঁধের কাজের নির্ধারিত সময় শেষ হয়েছে ২৮ ফেব্রুয়ারি; কোনো কোনো হাওরের জলাবদ্ধতার জন্য তিনি অপরিকল্পিত বাঁধকে দায়ী করেন।
সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ৩০ এপ্রিল জানায়, পাউবো বন্যার পূর্বাভাস দিয়ে ২৮ এপ্রিলের মধ্যে হাওরের ৮০ শতাংশ পাকা ধান কাটার পরামর্শ দিয়েছিল, কিন্তু তার আগেই ২৫ এপ্রিল থেকে ভারী বর্ষণ শুরু হয়। ২৭ ও ২৮ এপ্রিলের ২৪ ঘণ্টায় লাউড়ের গড়ে ১৩৩ মিলিমিটার, ছাতকে ৭৬ মিলিমিটার, সুনামগঞ্জে ১৩৭ মিলিমিটার এবং দিরাইয়ে ২০৫ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করে পাউবো; আগের বছর একই তারিখে বৃষ্টি হয়েছিল মাত্র ২৭ মিলিমিটার। প্রথম আলো জানায়, সোমবার রাতে সুনামগঞ্জে রেকর্ড হওয়া ১৩৭ মিলিমিটার বৃষ্টি ছিল মৌসুমের সর্বোচ্চ, আর এর সঙ্গে উজান থেকে নেমেছিল ব্যাপক পাহাড়ি ঢল।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদনে বলা হয়, তখন পর্যন্ত জেলায় নদ-নদীর পানি উপচে বা বাঁধ ভেঙে কোথাও ফসল ডোবেনি; হাওর থেকে নামতে না পারা বৃষ্টির পানিতেই পাকা ধান ডুবে ছিল। হাওর রক্ষার দাবিতে সক্রিয় সংগঠন হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় বলেন, প্রতিবছর অপরিকল্পিত বাঁধ আর বাঁধের মাটিতে হাওর, নদী ও জলাশয় ভরাট হয়ে গেছে, পানি নিষ্কাশনের পথ না থাকায় পানি নামতে পারেনি। ধান কাটাও থমকে যায়: ডিএইর পরিসংখ্যানে ২০২৫ সালে ২৯ এপ্রিলের মধ্যে জেলার প্রায় ৮৩ ভাগ ধান কাটা হয়ে গিয়েছিল, অথচ ২০২৬ সালে ওই প্রতিবেদনের সময় পর্যন্ত কাটা হয়েছিল ৪৭.৬৬২ ভাগ।
সরকারি হিসাব আর কৃষকের হিসাব
মে মাসজুড়ে ক্ষতির হিসাব বেড়েছে, আর কৃষক ও আন্দোলনকর্মীরা শুরু থেকেই বলে আসছিলেন যে সরকারি হিসাবে প্রকৃত ক্ষতি কম দেখানো হচ্ছে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম জানায়, ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত কৃষি বিভাগের হিসাবে প্রায় ৯ হাজার ৫৪৮ হেক্টর জমির বোরো ধান তলিয়ে নষ্ট হয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ২০০ কোটি টাকা। হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায়ের দাবি, তাঁদের হিসাবে অন্তত ৬০ হাজার হেক্টর জমি ডুবে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার ধান নষ্ট হয়েছে। একই দিনে প্রথম আলো ডিএইর হিসাব প্রকাশ করে: পানিতে তলিয়েছে ১৩ হাজার ৭৯ হেক্টর, ক্ষতিগ্রস্ত ২ হাজার ৪৭ হেক্টর, আর কাটা হয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার ৮১১ হেক্টর, অর্থাৎ ৫১ শতাংশ।
প্রথম আলোর ১৩ মের প্রতিবেদনে ডিএইর হিসাবে অতিবৃষ্টি ও উজানের ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত জমি দাঁড়ায় ২০ হাজার ৫৫০ হেক্টরে, টাকার অঙ্কে ধানের ক্ষতি প্রায় ৫০০ কোটি টাকা; তখন পর্যন্ত কাটা হয়েছিল ৮৪ দশমিক ৯৩ শতাংশ ধান। জেলার ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর বোরো জমির মধ্যে হাওরের নিচু অংশে ১ লাখ ৬৫ হাজার ২৭৫ হেক্টর এবং উঁচু নন-হাওর এলাকায় ৫৮ হাজার ২৩৬ হেক্টর, উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন। উপপরিচালক জানান, চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতি তখনো নির্ধারিত হয়নি এবং ক্ষতি আরও বাড়বে। ২৭ মের প্রতিবেদনে জাগো নিউজ লেখে, সরকারি হিসাবে ২০ হাজার হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; তবে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও কৃষক সংগঠনের দাবি, জেলায় প্রায় ৪০ হাজার হেক্টর ধান পানিতে ডুবেছে।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা নিয়েও ভিন্ন ভিন্ন হিসাব পাওয়া যায়। জাগো নিউজ জানায়, জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী ২০২৬ সালে অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় সুনামগঞ্জের এক লাখ ২৯ হাজার ৫৫৯ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ১৬ মে প্রথম আলোর ইংরেজি সংস্করণ জানায়, জেলায় কৃষক পরিবার ৩ লাখ ৭৮ হাজার ৭০৫টি, নিবন্ধিত কৃষক ৩ লাখ ৬৫ হাজার ৭৭৭ জন, যাঁদের মধ্যে ২ লাখ ২৩ হাজার ৮০৭ জন ক্ষুদ্র ও মাঝারি এবং ৪৯ হাজার ১২৪ জন ভূমিহীন কৃষক; প্রায় ৯৮ হাজার কৃষকের ধানের জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৩০ এপ্রিল হাওর আন্দোলনের নেতারা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কাছে দাবি করেছিলেন, জেলার পৌনে চার লাখ কৃষকের সবাই এবার কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত।
সুনামগঞ্জের ক্ষতি ছিল আরও বড় এক দুর্যোগের অংশ। ৮ মে দ্য ডেইলি স্টার কৃষি মন্ত্রণালয়ের সম্প্রসারণ অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. সেলিম খানের বরাতে জানায়, বাঁধ ভাঙা আর এপ্রিলের অস্বাভাবিক ভারী বৃষ্টিতে হাওরাঞ্চলের মোট ফসলি জমির প্রায় ১১ শতাংশ, অর্থাৎ ৪৯ হাজার ৭৩ হেক্টর জমির বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং আরও সাড়ে ১৭ শতাংশ জমির ফসল ঝুঁকিতে আছে। মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে সিলেট, সুনামগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ, এই সাত হাওর জেলায় দুই লাখ ৩৬ হাজারের বেশি কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন, আর কর্মকর্তাদের হিসাবে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় এক হাজার ৪৭ কোটি টাকা। প্রথম আলো ১৬ মে জানায়, তখন পর্যন্ত মোট ফসলহানির প্রায় ৭১ শতাংশই হয়েছে সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনায়।
ঈদের আগে সহায়তার প্রতিশ্রুতি
প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৯ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতীয় সংসদে বলেন, হাওরাঞ্চলে ভারী বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের চিহ্নিত করে পরবর্তী তিন মাস সরকারি সহায়তা দেওয়া হবে। ৪ মে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু জানান, হাওরাঞ্চলে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় এক লাখ পরিবারকে তিন মাস আর্থিক ও খাদ্য সহায়তা দেওয়া হবে, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম এ খবর দেয়।
পরদিন ৫ মে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিনুর রশিদসহ অন্য কর্মকর্তাদের নিয়ে মন্ত্রী সুনামগঞ্জ সফর করেন। ঢাকা ট্রিবিউন জানায়, সুনামগঞ্জ সার্কিট হাউসে এক মতবিনিময় সভায় তিনি বলেন, সরকার ক্ষতিগ্রস্তদের দুর্নীতিমুক্ত ও নির্ভুল তালিকা তৈরি করবে; পরে তিনি বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার করচার হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে আর্থিক সহায়তা বিতরণ করে তিন মাসের সহায়তা কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। একই দিনে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক তালিকার ভিত্তিতে সুনামগঞ্জের দুর্যোগকবলিত ৫০০ জনের জন্য ১০ টন চাল ও আড়াই লাখ টাকা নগদ বরাদ্দ দেয় বলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম জানায়।
৮ মে দ্য ডেইলি স্টার জানায়, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে, কয়েক দিনের মধ্যেই জরুরি সহায়তা শুরু হবে এবং তা চলবে পরবর্তী তিন মাস; মন্ত্রী আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন, একটি বিশেষ কার্ডের মাধ্যমে তিন মাস খাদ্য সহায়তা দেওয়া হবে। ১৬ মে পর্যন্তও খুঁটিনাটি চূড়ান্ত হয়নি। স্থানীয় প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা প্রথম আলোকে জানান, বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক মাসে সাড়ে সাত হাজার, মাঝারি ক্ষতিগ্রস্ত পাঁচ হাজার এবং কম ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক আড়াই হাজার টাকা পেতে পারেন, সঙ্গে প্রত্যেককে ২০ থেকে ৩০ কেজি চাল দেওয়ার প্রস্তাবও আছে, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণসচিব মো. সাইদুর রহমান খান পত্রিকাটিকে বলেন, তখন পর্যন্ত দুই জেলা থেকে তালিকা এসেছে; প্রতিটি পরিবার তিন মাস প্রতি মাসে ১৫ কেজি চাল পাবে, সঙ্গে একটি কার্ডের মাধ্যমে নির্দিষ্ট অঙ্কের নগদ সহায়তা, আর ঈদুল আজহার আগেই সহায়তা দেওয়া হবে।
স্থানীয় কৃষক ও বিভিন্ন সংগঠন প্রথম আলোকে জানান, উপকারভোগীর তালিকা তৈরি নিয়ে এরই মধ্যে নানা অভিযোগ উঠেছে এবং স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিরাও এতে যুক্ত হয়েছেন; প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা যেন সহায়তা পান, তা নিশ্চিত করার দাবি জানান তাঁরা। দেখার হাওরপারের এক কৃষক বলেন, তিনি শুনেছেন স্থানীয় ইউপি সদস্য ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করছেন, কিন্তু তাঁর নাম ওঠেনি। সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. মতিউর রহমান খান তখন জানান, মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানের মাধ্যমে একটি প্রাথমিক তালিকা তৈরি হয়েছে, যা যাচাই করা হচ্ছে।
২৭ মের মধ্যে তালিকা চূড়ান্ত হয়। সুনামগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ওমর ফারুক জাগো নিউজকে বলেন, 'চলতি বছর সুনামগঞ্জে দুই লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষাবাদ হয়েছে। তবে বৃষ্টির পানিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে অনেক কৃষকের ধান তলিয়েছে। আমরা তাদের তালিকা তৈরি করে জেলা প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করেছি।' অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. মতিউর রহমান খান জানান, তালিকা সংশ্লিষ্ট সব ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, 'যারা জমি চাষাবাদ করেছিলেন, ক্ষতিগ্রস্ত তালিকায় তাদের নামই যুক্ত হয়েছে। তবে কবে তারা সহায়তা পাবেন সেটা কনফার্ম বলতে পারবো না।' কৃষকেরা প্রতিবেদককে বলেন, সরকারি এই সহায়তা ঈদের আগে পেলে হয়তো পরিবারের ছেলেমেয়েদের মুখে হাসি ফোটানো যেত।

ঋণ, খড় আর ঈদের হাট
হাওরের পরিবারের জন্য বোরো ফসল হারানোর প্রভাব খাবারের থালা ছাড়িয়ে আরও দূরে যায়। ৮ মে দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে নেত্রকোনার এক কৃষক বলেন, হাওরে বছরে একটিই ফসল হয়, আর সেই ধান বিক্রির টাকাতেই ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা, চিকিৎসাসহ সংসারের সারা বছরের খরচ চলে। সাত হাওর জেলার যে ৪০ জনের বেশি কৃষকের সঙ্গে পত্রিকাটি কথা বলেছে, তাঁদের ২৫ জনের বেশি জানান, পরিস্থিতি তাঁদের ঋণের অন্তহীন জালে আটকে ফেলেছে। দেখার হাওরের এক কৃষক, যিনি ১ দশমিক ২ হেক্টর জমিতে চাষ করেছিলেন এবং তার অর্ধেক ছিল ইজারা নেওয়া জমি, যার ফসলের অর্ধেক মালিককে দিতে হয়, পত্রিকাটিকে বলেন, তিনি ১০০ মণের বেশি ধান আশা করেছিলেন কিন্তু রক্ষা করতে পেরেছেন ৫০ মণ; পরিবারের জন্য অন্তত ৭০ মণ দরকার, আর প্রতি মণ ৭০০ টাকা দরে ধান বেচে তিনি ঋণ ও সুদ শোধ করতে পারছেন না। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও অর্থনীতিবিদ আবদুল বায়েস পত্রিকাটিকে বলেন, কেবল খাদ্য সহায়তা এই সংকটের সমাধান করবে না; তিনি ঋণ পুনঃতফসিল, কিস্তিতে পরিশোধ বা সুদ মওকুফের মতো পদক্ষেপের পরামর্শ দেন।
ধান হারানো মানে খড় হারানোও, যা হাওরের গবাদিপশুর প্রধান খাদ্য। ১৩ মে প্রথম আলোতে দেখার হাওরের সেই কৃষক জানান, ধান তলিয়ে যাওয়ায় পর্যাপ্ত খড় তোলা যাচ্ছে না, এবার গোখাদ্যের সংকট দেখা দেবে, আর এ সংকট হাওর এলাকার কমবেশি সব কৃষকের। কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চল থেকে ১০ মে জাগো নিউজ জানায়, টানা বৃষ্টিতে খড় পচে গেছে, মাঠে পানি জমে আছে, ফলে গবাদিপশুকে খাওয়াতে না পেরে অনেকে ঈদের আগেই গরু-ছাগল বিক্রি করে দিচ্ছেন; এর প্রভাব আসন্ন ঈদে কোরবানির পশুর হাটে পড়তে পারে বলে অনেকে মনে করছেন।
ঈদের তারিখ নির্ধারিত হয় ১৮ মে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম জানায়, বায়তুল মোকাররমে ইসলামিক ফাউন্ডেশনে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সভা শেষে ঘোষণা দেওয়া হয়, দেশের আকাশে জিলহজ মাসের চাঁদ দেখা গেছে এবং ২৮ মে সারা দেশে ঈদুল আজহা উদযাপিত হবে। সরকার ২৫ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত সাত দিনের ছুটি ঘোষণা করেছিল। সেই ঈদের আগের সন্ধ্যাতেই জাগো নিউজের প্রতিবেদনে সুনামগঞ্জের হাওরের নীরবতার ছবি উঠে আসে।
সুনামগঞ্জ ও তার হাওর
বাংলাপিডিয়ার ব্যাখ্যায়, হাওর হলো গামলা আকৃতির বিশাল নিচু ভূমি, যা বর্ষায় নদী ও বৃষ্টির পানিতে ভরে বিস্তীর্ণ জলাশয়ে পরিণত হয় এবং বর্ষা-পরবর্তী মাসগুলোতে বেশির ভাগ শুকিয়ে যায়। দেশের উত্তর-পূর্বের হাওর অববাহিকার উত্তরে ভারতের মেঘালয়ের পাহাড়; অববাহিকায় প্রায় ৪৭টি বড় হাওর এবং প্রায় ৬ হাজার ৩০০ বিল রয়েছে। ভারতের পাহাড়ে উৎপন্ন নদীগুলো বর্ষায় সমভূমিকে ছয় মিটার পর্যন্ত গভীরে প্লাবিত করে, আর এই সমভূমি সাত থেকে আট মাস পানির নিচে থাকে; শুকনো মৌসুমে পানি নেমে গেলে উর্বর পলিমাটি বেরিয়ে আসে, যেখানে ব্যাপকভাবে ধান চাষ হয়। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, পুরো সুনামগঞ্জ জেলাই অসংখ্য হাওরে ঢাকা, আর বৃহত্তর সিলেটের উল্লেখযোগ্য হাওরগুলোর মধ্যে রয়েছে শনির হাওর ও দেখার হাওর।
বাংলাপিডিয়ার তথ্যে, সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ জেলার আয়তন ৩ হাজার ৫২৬ দশমিক ১২ বর্গকিলোমিটার। জেলার উত্তরে ভারতের মেঘালয়, দক্ষিণে হবিগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জ, পূর্বে সিলেট এবং পশ্চিমে নেত্রকোনা জেলা; প্রধান নদী সুরমা, কুশিয়ারা, ধামালিয়া ও যাদুকাটা। ২০২২ সালের জনশুমারিতে জেলার জনসংখ্যা ছিল ২৬ লাখ ৯৫ হাজার ৪৯৬ জন। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জেলার ৬৬ দশমিক ৯৯ শতাংশ পরিবার কৃষিকে প্রধান আয়ের উৎস হিসেবে উল্লেখ করেছিল। জেলায় উপজেলা ১২টি, আর ২০২৬ সালে এখানকার ছোট-বড় ১৩৭টি হাওরে বোরো আবাদ হয়।

একমাত্র ফসল বোরো আর আগাম বন্যার সঙ্গে দৌড়
বোরো বাংলাদেশের শুষ্ক মৌসুমের ধান। এটি মূলত সেচনির্ভর; ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে চারা রোপণ করা হয় এবং এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে ধান কাটা হয়। ৮ মে দ্য ডেইলি স্টার লেখে, দেশের মোট চাল উৎপাদনের প্রায় ৫৫ শতাংশ আসে বোরো থেকে। পত্রিকাটির তথ্যে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জাতীয় পর্যায়ে বোরো আবাদ আগের বছরের তুলনায় ৩ দশমিক ২৯ শতাংশ বেড়ে ৫০ দশমিক ৫০ লাখ হেক্টরে দাঁড়ায়, উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ২ দশমিক ২৪ কোটি টন; ২০২২ অর্থবছরের ২ দশমিক ০১ কোটি টন থেকে উৎপাদন ২০২৪-২৫ মৌসুমে ২ দশমিক ১৩ কোটি টনে উঠেছিল।
হাওরে বোরো চাষ মানে আগাম বন্যার সঙ্গে দৌড়। ৪ মে ময়মনসিংহে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বাকৃবি) এক সংবাদ সম্মেলনে, যার খবর জাগো নিউজ ৬ মে প্রকাশ করে, হাওরে স্বল্পমেয়াদি বোরো ধান নিয়ে গবেষণার প্রধান গবেষক অধ্যাপক ড. হাবিবুর রহমান প্রামাণিক জানান, দেশের মোট ধান উৎপাদনের ৬০ শতাংশ হয় বোরো মৌসুমে, আর মোট বোরো উৎপাদনের ১৮ শতাংশ আসে হাওরাঞ্চল থেকে। তাঁর ভাষ্য, প্রায় প্রতিবছর আগাম বন্যায় হাওরের ধানের ১০ শতাংশ, কখনো কখনো শতভাগই ক্ষতির মুখে পড়ে। গত ৩৬ বছরের তথ্য বিশ্লেষণে তাঁরা দেখেছেন, হাওরে আকস্মিক বন্যার প্রায় ৫০ শতাংশ হয় মে মাসে এবং প্রায় ৪২ শতাংশ এপ্রিলের শেষার্ধে, মার্চের শেষভাগ ও এপ্রিলের প্রথমার্ধে প্রকোপ তুলনামূলক কম; তাই এপ্রিলের মাঝামাঝির আগে ধান কাটতে পারলে ঝুঁকি অনেকটাই কমে।
তিনি জানান, হাওরে বহুল চাষ হওয়া ব্রি ধান ৯২ জাতের জীবনকাল ১৬০ দিন, ফলে এটি পাকতে বৈশাখের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময় লাগে, যখন আগাম বন্যা নেমে আসে। এর বদলে ব্রি ধান ৮৮, ব্রি ধান ১০১, ব্রি ধান ১১৩, ব্রি ধান ১০৫ ও ব্রি ধান ২৫-এর মতো স্বল্পমেয়াদি জাতের জীবনকাল প্রায় ১৪৫ দিন, একই সময়ে রোপণ করে প্রায় ১৫ দিন আগে কাটা যায়। এপ্রিলের প্রথমার্ধে ধান কাটতে হলে ১০ জানুয়ারির মধ্যে চারা রোপণ করতে হবে; গবেষণায় ২৬ ডিসেম্বর রোপণ করা ব্রি ধান ৮৮ কাটা গেছে ৮ এপ্রিল। তিনি বলেন, স্বল্পমেয়াদি জাতে ফলন এক থেকে দেড় টন কম হওয়ায় কৃষকেরা আগ্রহ হারান, আর হাওরে একই সময়ে সব ধান পাকে বলে রাইস ট্রান্সপ্লান্টার ও হারভেস্টারসহ কৃষি যান্ত্রিকীকরণের বিকল্প নেই।
২০১৭ সালের অভিজ্ঞতা
আগাম বন্যা নিয়ে হাওরের কৃষকের ভয়ের পেছনে আছে কঠিন অভিজ্ঞতা। ২০১৭ সালের এপ্রিলে ভারী বৃষ্টি ও উজানের পাহাড়ি ঢলে উত্তর-পূর্বের হাওরগুলোর বিস্তীর্ণ ফসলি জমি তলিয়ে যায়। ঢাকা ট্রিবিউন ২০১৭ সালের ৮ এপ্রিল জানায়, ২৮ মার্চ থেকে সুনামগঞ্জে বন্যার পানি ঢুকতে শুরু করে এবং ক্রমেই বাড়তে থাকে; কর্মকর্তারা জানান, জেলায় অন্তত ২৭ হাজার হেক্টর জমি তখনই পানির নিচে। সেখানকার কৃষকেরা অভিযোগ করেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম ও দেরির কারণেই তাঁদের ক্ষতি হয়েছে। তাঁদের ভাষ্য, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে জেলার ৪৮টি হাওরে বোরো ফসল রক্ষা বাঁধ সংস্কার ও নির্মাণের জন্য বোর্ড ৫৫ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছিল; ডিসেম্বরে কাজ শুরুর কথা থাকলেও শুরু হয় ফেব্রুয়ারিতে, ফলে বন্যা আসার সময় বেশির ভাগ বাঁধ অসমাপ্ত ছিল।
ছবি: Balaram Mahalder / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রথম আলো, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, দ্য ডেইলি স্টার, ঢাকা ট্রিবিউন, বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)