২০২৬ সালের ১০ মার্চ সন্ধ্যায়, রমজান মাসে, দেশের সংবাদমাধ্যম জাগো নিউজ ২৪-এর লাইফস্টাইল ডেস্ক ইফতারের টেবিলের জন্য তুলনামূলক হালকা ও পুষ্টিকর একটি পদ হিসেবে সবজি দিয়ে ওটস ওমলেটের রেসিপি প্রকাশ করে। রেসিপিতে দুটি ডিমের সঙ্গে এক কাপ ওটস এবং পেঁয়াজ, টমেটো, ধনেপাতা ও কাঁচা মরিচ কুচি মেশানো হয়, হলুদ গুঁড়া, শুকনা মরিচ গুঁড়া ও লবণ দিয়ে ব্যাটার তৈরি করা হয়, ওটস নরম হওয়ার জন্য কিছুক্ষণ রেখে দেওয়া হয় এবং পরে সয়াবিন তেলে দুই পাশ সোনালি করে ভেজে নেওয়া হয়।
পত্রিকাটি পদটির পক্ষে সহজ একটি যুক্তি দিয়েছিল। তাদের ভাষ্য, ইফতারে অনেকেই ভাজাপোড়া খাবার বেশি খেয়ে ফেলেন, ফলে পরে পেট ভারী লাগে বা অস্বস্তি হয়; তাই টেবিলে হালকা কিন্তু পুষ্টিকর খাবার রাখা দরকার, আর ডিম, ওটস ও সবজির এই ওমলেটে প্রোটিন ও ফাইবার একসঙ্গে পাওয়া যায়। এই প্রতিবেদনে রেসিপিটি যেমন প্রকাশিত হয়েছিল তেমনই দেওয়া হলো, ধাপগুলো তালিকা আকারে সাজানো হলো, এবং সেই তারিখ পর্যন্ত স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষগুলো ডিম, ওটস, সবজি, রান্নার তেল ও রোজার মাসে স্বাস্থ্যকর খাওয়া নিয়ে যা বলেছিল, তা যোগ করা হলো।
২০২৬ সালের রমজান ও বাংলাদেশের ইফতারের টেবিল
২০২৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি বুধবার সন্ধ্যায় ঢাকার বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সম্মেলন কক্ষে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সভা বসে। কমিটি জানায়, দেশের আকাশে নতুন চাঁদ দেখা গেছে, তাই বৃহস্পতিবার থেকে বাংলাদেশে হিজরি ১৪৪৭ সালের রমজান শুরু হবে। ঢাকা ট্রিবিউন সেদিন সন্ধ্যায় জানায়, নেত্রকোনা, সিরাজগঞ্জ ও কক্সবাজার জেলায় চাঁদ দেখা গিয়েছিল। এরপর থেকে দেশজুড়ে মুসলিমরা ভোর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোজা রাখেন এবং প্রতিদিন সন্ধ্যায় ইফতারের মাধ্যমে রোজা ভাঙেন। অনেক পরিবারে ইফতারই দিনের সবচেয়ে আয়োজনপূর্ণ খাবার।
বাংলাদেশের ইফতারের টেবিল ভাজাপোড়ার জন্য পরিচিত, আর জাগো নিউজের রেসিপিটি সেই অভ্যাসকেই কিছুটা হালকা করতে চেয়েছিল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বাংলাদেশ কার্যালয় ২০১৮ সালের মে মাসে রমজানে সুস্থ থাকার পরামর্শ প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, রোজা ভাঙতে মানুষ একসঙ্গে বসে উচ্চ ক্যালরির ভারী খাবার খান এবং এই মাসে কেউ কেউ কম শারীরিক পরিশ্রম করেন, তাই সুস্থ থাকতে ও ওজন বাড়া এড়াতে পুষ্টির দিকে নজর দেওয়া জরুরি। পরামর্শে দেশের পরিচিত খাবারগুলোর নামও সরাসরি এসেছিল: চর্বিযুক্ত ও বিশেষ করে ভাজা খাবার, যেমন শিঙাড়া, পেঁয়াজু, পাকোড়া, সমুচা ও ফ্রাই, সেইসঙ্গে চর্বিযুক্ত মাংস ও মার্জারিন দেওয়া পেস্ট্রি কম খেতে বলা হয়। লাল মাংসের বদলে সাদা মাংস, চর্বি কম এমন অংশ বেছে নেওয়া এবং খাওয়ার আগে দৃশ্যমান চর্বি ফেলে দেওয়ার কথাও বলা হয়।
ডব্লিউএইচওর এই নির্দেশনা ২০১২ সালে সংস্থার পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস বিষয়ক একটি নির্দেশিকা থেকে নেওয়া, এবং এতে মোট আটটি ব্যবহারিক পরামর্শ ছিল। খেজুর দিয়ে রোজা ভাঙাকে ইফতার শুরুর প্রচলিত ও স্বাস্থ্যকর উপায় বলা হয়, কারণ খেজুর ফাইবারের চমৎকার উৎস। সেহরি হালকা হওয়া উচিত এবং তাতে সবজি, লাল চাল বা আটার রুটির মতো গোটা শস্যের শর্করা এবং চামড়া ছাড়া মুরগির বুকের মাংসের মতো প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার রাখা উচিত; সেহরি বাদ দেওয়া যাবে না, কারণ এই খাবার ইফতার পর্যন্ত সারা দিনের শক্তি জোগায়। সেহরি ও ইফতারে পর্যাপ্ত পানি এবং পানিসমৃদ্ধ খাবার, যেমন ঘরে তৈরি স্যুপ, সবজি ও ফল, বিশেষ করে শসা, লেটুস, টমেটো ও তরমুজ খেয়ে শরীরে পানির ঘাটতি এড়ানোর পরামর্শও দেওয়া হয়।
বাকি পরামর্শগুলো ছিল চিনি, লবণ, খাওয়ার গতি ও শারীরিক সক্রিয়তা নিয়ে। ডব্লিউএইচও ইফতারে চিনি কম খেতে বলে, বিশেষ করে কেক, মিষ্টি বা দুধের তৈরি ডেজার্ট, কোমল পানীয় ও ফলের জুসের মতো মিষ্টি খাবার ও পানীয়। প্রক্রিয়াজাত মাংস, গরু বা মুরগির সালামি ও সসেজ, আচার, লবণাক্ত পনির ও সসের মতো বেশি লবণের খাবার এড়িয়ে চলতে বলা হয়। ধীরে খেতে বলা হয়, কারণ দ্রুত বেশি খাবার খেলে বুক জ্বালা ও অস্বস্তি হতে পারে। আর সন্ধ্যায় দ্রুত হাঁটার মতো কাজের মাধ্যমে সক্রিয় থাকার কথা বলা হয়। ভাজাপোড়া খাওয়ার পর পেট ভারী লাগা নিয়ে জাগো নিউজের কথাটি ভাজা খাবার ও তাড়াহুড়া করে খাওয়া নিয়ে ডব্লিউএইচওর সতর্কতার সঙ্গে মেলে। তবে ওমলেটটিও প্যানে ভাজা হয়, তাই এটি তেলমুক্ত নয়; এক প্লেট বড়া বা চপের তুলনায় এর বাড়তি দিক হলো, একটি পদেই ডিম, ওটস ও তাজা সবজি পাওয়া যায়।

জাগো নিউজে প্রকাশিত রেসিপি
নিচের উপকরণ ও প্রস্তুত প্রণালী মূল রেসিপি থেকেই নেওয়া, পরিমাণে কিছু যোগ করা হয়নি। রেসিপিতে কতজনের জন্য পদটি, বা ভাজতে কত সময় লাগবে, তা বলা নেই; সেসব এখানে অনুমান করে লেখা হয়নি।
উপকরণ
- ওটস: ১ কাপ
- পেঁয়াজ কুচি: ২ টেবিল চামচ
- টমেটো কুচি: ১ টেবিল চামচ
- ধনেপাতা কুচি: ২ টেবিল চামচ
- কাঁচা মরিচ কুচি: ১ চা চামচ
- ডিম: ২টি
- সয়াবিন তেল: ৫০ গ্রাম
- হলুদ গুঁড়া: ১ চিমটি
- শুকনা মরিচ গুঁড়া: আধা চা চামচ
- লবণ: স্বাদমতো
প্রস্তুত প্রণালী
- একটি পাত্রে পেঁয়াজ কুচি, টমেটো, ধনেপাতা ও কাঁচা মরিচ কুচির সঙ্গে হলুদ গুঁড়া, শুকনা মরিচ গুঁড়া ও লবণ একসঙ্গে নিন।
- এতে দুটি ডিম ভেঙে দিয়ে সব উপকরণ ভালোভাবে মিশিয়ে নিন।
- এবার ওটস যোগ করে আবার নেড়ে নিন এবং প্রায় ১০ মিনিট রেখে দিন, যাতে ওটস নরম হয়ে যায়।
- ফ্রাইপ্যানে তেল গরম করে প্রস্তুত ব্যাটার ঢেলে দিন এবং মাঝারি আঁচে ভাজুন।
- এক পাশ হয়ে গেলে সাবধানে উল্টে দিয়ে অন্য পাশটিও ভেজে নিন।
- দুই পাশ সোনালি হলে নামিয়ে নিন এবং গরম গরম পরিবেশন করুন; চাইলে টমেটো সস বা সালাদের সঙ্গে দিতে পারেন।
ওটসের কারণে এটি পুরু ওমলেট হয়, তাই সবচেয়ে জরুরি পরীক্ষাটি হলো খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ সব ধরনের ডিমের পদের জন্য যা বলে, যা নিচে বিস্তারিত দেওয়া হয়েছে: ডিম পুরোপুরি, মাঝখান পর্যন্ত, শক্ত হয়ে না যাওয়া পর্যন্ত রান্না করতে হবে।
ওমলেট: বহু রান্নাঘরের পুরোনো এক পদ
উইকিপিডিয়ার ওমলেট বিষয়ক ভুক্তি অনুযায়ী, ওমলেট হলো ডিম, সাধারণত মুরগির ডিম, দিয়ে তৈরি একটি পদ, যা ফ্রাইপ্যানে মাখন বা তেলে ভাজা হয়। একই ভুক্তিতে বলা হয়েছে, ধারণা করা হয় ওমলেটের উৎপত্তি প্রাচীন পারস্যে। সেখানে প্রাতরাশের ইতিহাস নিয়ে লেখা একটি বইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, শুরুর দিকের ওমলেট ছিল প্রায় কুকু সবজির মতোই; কুকু সবজি হলো শাকপাতা ও ডিমের একটি পারস্য পদ, যাকে ভুক্তিটি ইতালির ফ্রিত্তাতার সঙ্গে তুলনা করেছে।
সেখানে উদ্ধৃত খাদ্য ইতিহাসবিদ অ্যালান ডেভিডসনের মতে, ফরাসি শব্দ ওমলেট চালু হয় ষোড়শ শতকের মাঝামাঝি। এর আগের রূপগুলো আরও পুরোনো: ১৩৯৩ সালে লেখা গৃহস্থালির বই মেনাজিয়ে দ্য পারিতে আলুমেল ও আলুমেত রূপ পাওয়া যায়, লেখক রাবলে লিখেছেন ওমলেক্ত দ্য য়ুফ, আর কৃষিবিদ অলিভিয়ে দ্য সের ব্যবহার করেছেন আমলেত রূপটি।
দক্ষিণ এশিয়ায় ওমলেট সাধারণত সাদামাটা নয়, মসলা দিয়ে তৈরি হয়। যেমন পারসি সম্প্রদায়ের পোরা, একই ভুক্তি অনুযায়ী, তৈরি হয় ডিম, পেঁয়াজ, টমেটো, কাঁচা মরিচ ও ধনেপাতা দিয়ে, যা জাগো নিউজের রেসিপির সবজির ভিত্তির খুব কাছাকাছি। বাংলা রেসিপিটি এর সঙ্গে যোগ করেছে ওটস, যা ফেটানো ডিমে ভিজিয়ে নরম করা হয় এবং ওমলেটটিকে অনেকটা পুরু ডিম ও শস্যের প্যানকেকের মতো করে তোলে, আর যোগ করেছে হলুদ ও শুকনা মরিচ গুঁড়া, যে দুটি মসলা বাংলাদেশের প্রায় সব রান্নাঘরেই থাকে।
ডিম থেকে কী পাওয়া যায়: ইউএসডিএর হিসাব
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) খাদ্য উপাদান তথ্যভান্ডার ফুডডেটা সেন্ট্রালের এসআর লিগ্যাসি সারণি, যা ২০১৯ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত, অনুযায়ী প্রতি ১০০ গ্রাম কাঁচা গোটা মুরগির ডিমে থাকে ১৪৩ কিলোক্যালরি শক্তি, ১২.৬ গ্রাম প্রোটিন, ৯.৫১ গ্রাম চর্বি, ০.৭২ গ্রাম শর্করা এবং ৭৬.২ গ্রাম পানি। ডিমে কোনো খাদ্যআঁশ বা ফাইবার নেই, আর সে কারণেই মূল রেসিপিতে ডিমের সঙ্গে ওটস জোড়া হয়েছে।
একই তথ্যভান্ডার দেখায়, কেন ডিমকে পুষ্টিঘন খাবার ধরা হয়। প্রতি ১০০ গ্রামে এতে আছে ২৯৪ মিলিগ্রাম কোলিন, ০.৮৯ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন বি১২, ২.০ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন ডি, রেটিনল সমতুল্য হিসেবে ১৬০ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন এ, ৪৭ মাইক্রোগ্রাম ফোলেট, ৩০.৭ মাইক্রোগ্রাম সেলেনিয়াম, ১.৭৫ মিলিগ্রাম আয়রন, ১.২৯ মিলিগ্রাম জিংক এবং লুটেইন ও জিয়াজ্যানথিন নামের হলুদ রঞ্জক ৫০৩ মাইক্রোগ্রাম। এতে ৩৭২ মিলিগ্রাম কোলেস্টেরল ও ১৪২ মিলিগ্রাম সোডিয়ামও আছে।
হার্ভার্ড টি এইচ চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথের দ্য নিউট্রিশন সোর্স, ২০২০ সালের আগস্টে সর্বশেষ পর্যালোচিত একটি পাতায়, এই সংখ্যাগুলো কীভাবে বুঝতে হবে তা ব্যাখ্যা করেছে। একটি বড় ডিমের কুসুমে প্রায় ২০০ মিলিগ্রাম কোলেস্টেরল থাকে, তাই খাদ্যে কোলেস্টেরলের সবচেয়ে সমৃদ্ধ উৎসগুলোর একটি ডিম; আর একটি ডিমে প্রায় ৫ গ্রাম চর্বি থাকে, যার বেশির ভাগ মনোআনস্যাচুরেটেড ও পলিআনস্যাচুরেটেড। পাতাটি ডিমকে প্রোটিন, কোলিন, বায়োটিন, ভিটামিন এ, লুটেইন ও জিয়াজ্যানথিনের উৎস হিসেবে উল্লেখ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, বেশির ভাগ মানুষের ক্ষেত্রে রক্তের কোলেস্টেরলে খাবারের কোলেস্টেরলের প্রভাব খাদ্যের সামগ্রিক চর্বির ধরনের চেয়ে কম, এবং প্রায় ৪০ হাজার পুরুষ ও ৮০ হাজারের বেশি নারীর ওপর করা দুটি বড় দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় দেখা গেছে, সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে দিনে একটি পর্যন্ত ডিম খাওয়া হৃদরোগের বাড়তি ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত নয়।
একই পাতায় সতর্কতাও আছে। ওই গবেষণাগুলোয় দেখা গেছে, ডায়াবেটিস আছে এমন যাঁরা দিনে একটি বা তার বেশি ডিম খেতেন, তাঁদের হৃদরোগের ঝুঁকি বেশি ছিল; আর যাঁদের ডায়াবেটিস ও হৃদরোগ দুটোই আছে, তাঁদের সপ্তাহে তিনটির বেশি ডিমের কুসুম না খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যাঁদের কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখতে সমস্যা হয়, তাঁরা কুসুমের বদলে ডিমের সাদা অংশ বেছে নিতে পারেন। ডিম কীসের সঙ্গে খাওয়া হচ্ছে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ বলে পাতাটি জোর দিয়েছে: সালসা ও লাল আটার টোস্টের সঙ্গে ডিম আর সসেজ, ভাজা আলু ও সাদা পাউরুটির সঙ্গে ডিম একেবারে আলাদা খাবার। জাগো নিউজের রেসিপিতে দুটি গোটা ডিম ব্যবহার করা হয়েছে, আর পরিবেশনের দুটি বিকল্পের একটি হিসেবে সালাদের কথা বলা হয়েছে।

ব্যাটারে ওটস ও সবজি
এই ওমলেটকে আলাদা করেছে ওটস। ইউএসডিএর ফুডডেটা সেন্ট্রাল অনুযায়ী, শুকনা, ভিটামিন বা খনিজ যোগ না করা সাধারণ ও কুইক ওটসের প্রতি ১০০ গ্রামে থাকে ৩৭৯ কিলোক্যালরি শক্তি, ১৩.২ গ্রাম প্রোটিন, ৬.৫২ গ্রাম চর্বি, ৬৭.৭ গ্রাম শর্করা, ১০.১ গ্রাম খাদ্যআঁশ, ৪.২৫ মিলিগ্রাম আয়রন ও ১৩৮ মিলিগ্রাম ম্যাগনেশিয়াম। অর্থাৎ ডিমে যে ফাইবার নেই, তা আসে ওটস থেকে; মূল রেসিপি প্রোটিন ও ফাইবারের যে সমন্বয়ের কথা বলেছিল, সেটি এভাবেই তৈরি হয়।
ওটসের ফাইবারের একটি অংশ বিটা-গ্লুকান, যা পানিতে দ্রবণীয় ফাইবার। যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) তাদের খাদ্য বিধিমালার ২১ সিএফআর ১০১.৮১ ধারায় এ নিয়ে একটি স্বাস্থ্য দাবির অনুমতি দেয়: স্যাচুরেটেড চর্বি ও কোলেস্টেরল কম এমন খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে ওট ব্র্যান, রোলড ওটস ও গোটা ওটের আটার মতো উৎস থেকে পাওয়া দ্রবণীয় ফাইবার হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে পারে। বিধিমালায় এই দাবিকে দিনে অন্তত ৩ গ্রাম বিটা-গ্লুকান দ্রবণীয় ফাইবারের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে, এবং দাবিটি বহনকারী খাবারের প্রতি স্বাভাবিক পরিবেশনে অন্তত ০.৭৫ গ্রাম দ্রবণীয় ফাইবার থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। দাবিটি দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাস নিয়ে, কোনো একটি পদের প্রভাব নিয়ে নয়।

সবজিগুলো অল্প পরিমাণে দেওয়া হয়, তবে প্রতিটিই বাংলাদেশের পরিচিত ফসল। জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া পেঁয়াজকে (Allium cepa) কন্দজাতীয় একটি বীরুৎ হিসেবে বর্ণনা করেছে, যার উৎপত্তি সম্ভবত পশ্চিম এশিয়ায়। দেশের সব জেলায় পেঁয়াজ চাষ হয়, সবচেয়ে বেশি উৎপাদন হয় ফরিদপুরে; এর ঝাঁঝ আসে অ্যালাইল-প্রোপাইল ডাইসালফাইড নামের একটি উদ্বায়ী তেল থেকে, আর বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) বারি পেঁয়াজ-১ নামের একটি জাত অবমুক্ত করেছে। টমেটোর আদি নিবাস গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আমেরিকা; এটি কাঁচা বা রান্না করে সালাদ, স্যুপ, চাটনি ও সসে খাওয়া হয়, এবং বারি কয়েকটি জাত উদ্ভাবন করেছে, যার মধ্যে বারি টমেটো-৪ ও বারি টমেটো-৫ গরম মৌসুমেও চাষ করা যায়।
ধনিয়ার (Coriandrum sativum) আদি নিবাস ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল; বাংলাদেশে এটি শীতকালীন ফসল হিসেবে ব্যাপকভাবে চাষ হয় এবং অক্টোবর-নভেম্বরে বোনা হয়। বাংলাপিডিয়া জানায়, কচি গাছ চাটনি, সস, তরকারি ও স্যুপে ব্যবহার করা হয়। গাছের কন্দ বা রাইজোম থেকে পাওয়া হলুদ এবং ফল হিসেবে পাওয়া মরিচ বাংলাপিডিয়ার তালিকায় বাংলাদেশে সাধারণভাবে চাষ হওয়া মসলার মধ্যে আছে, সঙ্গে আছে আদা, রসুন, পেঁয়াজ ও ধনিয়া।
ইউএসডিএর প্রতি ১০০ গ্রামের হিসাব দেখায়, তাজা সবজিগুলো কী যোগ করে। কাঁচা পাকা টমেটোয় থাকে ৯৪.৫ গ্রাম পানি, ১৩.৭ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি এবং লাইকোপিন নামের লাল রঞ্জক ২,৫৭০ মাইক্রোগ্রাম; কাঁচা পেঁয়াজে থাকে ৮৯.১ গ্রাম পানি ও ১.৭ গ্রাম ফাইবার; কাঁচা ধনেপাতায় থাকে ২৭ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি, ৩৩৭ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন এ ও ৩১০ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন কে; আর কাঁচা মরিচে ভিটামিন সি ২৪২ মিলিগ্রাম। রেসিপিতে প্রতিটির এক-দুই চামচ ব্যবহার হয়, তাই এসব পুষ্টি উপাদান অল্প পরিমাণেই আসে, তবে সবজিগুলো পদে স্বাদ, রং ও কিছুটা পানি যোগ করে। ২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি হালনাগাদ করা ডব্লিউএইচওর স্বাস্থ্যকর খাদ্য বিষয়ক তথ্যপত্রে ১০ বছরের বেশি বয়সী সবাইকে দিনে অন্তত ৪০০ গ্রাম ফল ও সবজি খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে; রেসিপিতে পাশে যে সালাদ রাখার কথা বলা হয়েছে, তা এই পরিমাণ পূরণের একটি সহজ উপায়।
তেল, লবণ ও ভাজার পদ্ধতি
রেসিপিতে প্যানে ভাজার জন্য ৫০ গ্রাম সয়াবিন তেল ধরা হয়েছে। ইউএসডিএর ফুডডেটা সেন্ট্রাল অনুযায়ী, প্রতি ১০০ গ্রাম সয়াবিন তেলে ৮৮৪ কিলোক্যালরি শক্তি থাকে এবং পুরোটাই চর্বি: ১৫.৬ গ্রাম স্যাচুরেটেড, ২২.৮ গ্রাম মনোআনস্যাচুরেটেড ও ৫৭.৭ গ্রাম পলিআনস্যাচুরেটেড। বাংলাপিডিয়া সয়াবিনকে (Glycine max) ঝোপালো শিমজাতীয় উদ্ভিদ হিসেবে বর্ণনা করেছে, যার উৎপত্তি সম্ভবত চীনে এবং যার বীজ থেকে ভোজ্যতেল পাওয়া যায়; বাংলাদেশে প্রধানত নোয়াখালী ও ফেনীতে এর চাষ শুরু হয় ১৯৭৮ সালে।
ডব্লিউএইচওর স্বাস্থ্যকর খাদ্য বিষয়ক তথ্যপত্রে প্রাপ্তবয়স্কদের দৈনিক শক্তির ৩০ শতাংশ বা তার কম মোট চর্বি থেকে নিতে বলা হয়েছে, যার মধ্যে স্যাচুরেটেড চর্বি থেকে ১০ শতাংশের বেশি এবং ট্রান্স চর্বি থেকে ১ শতাংশের বেশি নয়। সেখানে মাছ, অ্যাভোকাডো ও বাদাম এবং সূর্যমুখী, সয়াবিন, ক্যানোলা ও জলপাই তেলে থাকা আনস্যাচুরেটেড চর্বিকে স্যাচুরেটেড চর্বির চেয়ে ভালো বলা হয়েছে, এবং চর্বি কমানোর উপায় হিসেবে রান্নায় ভাজার বদলে ভাপে বা সেদ্ধ করে রান্নার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। রেসিপিতে সয়াবিন তেল বেছে নেওয়া প্রথম পরামর্শের সঙ্গে মেলে। তবে ৫০ গ্রামের কতটা ওমলেটে শোষিত হবে, তা প্যান ও রাঁধুনির ওপর নির্ভর করে, কারণ রেসিপিতে ভাজার জন্য তেলের পরিমাণ দেওয়া হয়েছে, শোষিত পরিমাণ নয়।
রেসিপিতে লবণ স্বাদমতো দিতে বলা হয়েছে। ডব্লিউএইচও প্রাপ্তবয়স্কদের দিনে ৫ গ্রামের কম লবণ খাওয়ার পরামর্শ দেয়, যাকে সংস্থাটি ২ গ্রাম সোডিয়ামের সঙ্গে যুক্ত করে; আর ২০১৮ সালে সংস্থার বাংলাদেশ কার্যালয়ের রমজান বিষয়ক পরামর্শে এই মাসে বিশেষভাবে লবণাক্ত খাবার, যেমন প্রক্রিয়াজাত মাংস, আচার, লবণাক্ত পনির ও সস এড়িয়ে চলতে বলা হয়েছিল। মূল রেসিপিতে ওমলেট টমেটো সস বা সালাদের সঙ্গে পরিবেশনের কথা বলা হয়েছে। ডব্লিউএইচওর তথ্যপত্রে মুক্ত চিনি মোট শক্তির ১০ শতাংশের কমে সীমিত রাখার পরামর্শও আছে, যা একই বেলায় পরিবেশিত মিষ্টি পানীয় ও ডেজার্টের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক।
ডিম নিরাপদে রাখা ও রান্না করা
সঠিকভাবে রাখা ও রান্না করা হলে ডিম নিরাপদ খাবার। যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) সতর্ক করে, পরিষ্কার ও না-ফাটা খোসার তাজা ডিমেও সালমোনেলা ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে, যা খাদ্যবাহিত অসুস্থতার কারণ হয়; ডিমের কার্টনে সংস্থাটির বাধ্যতামূলক লেবেলে ডিম ফ্রিজে রাখতে, কুসুম শক্ত না হওয়া পর্যন্ত ডিম রান্না করতে এবং ডিমযুক্ত খাবার ভালোভাবে রান্না করতে বলা হয়। ২০২৪ সালের ৫ মার্চ পর্যন্ত হালনাগাদ করা সংস্থাটির ভোক্তা পরামর্শে এই ধাপগুলো দেওয়া হয়েছে:
- শুধু ফ্রিজ বা শীতল তাক থেকে বিক্রি হওয়া ডিম কিনুন, এবং কার্টন খুলে দেখে নিন ডিমগুলো পরিষ্কার ও খোসা ফাটা নয়।
- কেনার পর দ্রুত পরিষ্কার ফ্রিজে ৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তার কম তাপমাত্রায় ডিম রাখুন, এবং ফ্রিজের থার্মোমিটারে তাপমাত্রা যাচাই করুন।
- কাঁচা ডিমের সংস্পর্শে আসার আগে ও পরে হাত, বাসনপত্র, সরঞ্জাম ও কাজের জায়গা গরম সাবান পানি দিয়ে ধুয়ে নিন।
- কুসুম ও সাদা অংশ দুটোই শক্ত না হওয়া পর্যন্ত ডিম রান্না করুন; ক্যাসারোলের মতো ডিমযুক্ত পদ ১৬০ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত রান্না করুন এবং ফুড থার্মোমিটারে যাচাই করুন।
এফডিএ জানায়, কিছু মানুষের সালমোনেলায় গুরুতর অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি বেশি: শিশু, বয়স্ক মানুষ, অন্তঃসত্ত্বা নারী এবং যাঁদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল। ২০০৬ সালে প্রকাশিত ডব্লিউএইচওর নিরাপদ খাদ্যের পাঁচটি চাবিকাঠি সব রান্নাঘরের জন্য একই কথা সাধারণভাবে বলে: পরিচ্ছন্ন থাকুন, কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখুন, ভালোভাবে রান্না করুন, খাবার নিরাপদ তাপমাত্রায় রাখুন, এবং নিরাপদ পানি ও কাঁচামাল ব্যবহার করুন। ভেজানো ওটস দিয়ে তৈরি পুরু ওমলেটের ক্ষেত্রে ভালোভাবে রান্না করার অর্থ হলো, কাটলে মাঝখানে কোনো তরল ডিম থাকবে না।
বাংলাদেশে ডিম: সরকারি হিসাব কী বলে
রমজানের বাইরেও বাংলাদেশে ডিম প্রতিদিনের খাবারের অংশ। দেশের সরকারি হিসাব দেয় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (ডিএলএস), যা প্রতি বছর লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্লান্স নামে একটি সারসংক্ষেপে প্রকাশ করা হয়। এর ২০২৩-২৪ সংস্করণে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ডিম উৎপাদন ধরা হয়েছে ২,৩৭৪.৯৭ কোটি, যা ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ছিল ১,০৯৯.৫২ কোটি এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২,৩৩৭.৬৩ কোটি।
একই সারণিতে উৎপাদনকে চাহিদার সঙ্গে মেলানো হয়েছে। অধিদপ্তর চাহিদা ধরেছে ১,৮০৯.৬০ কোটি ডিম, অর্থাৎ জনপ্রতি বছরে ১০৪টি, আর প্রাপ্যতা জানিয়েছে জনপ্রতি বছরে ১৩৫.০৯টি; এই হিসাবের ভিত্তি ২০২৩ সালের জুলাইয়ে দেশের আনুমানিক জনসংখ্যা ১৭ কোটি ৫৮ লাখ। ২০২৩-২৪ সালে দেশে মুরগি ছিল ৩,২৭৭.৭৭ লাখ ও হাঁস ৬৮২.৬১ লাখ, এবং ওই বছর কৃষি জিডিপিতে প্রাণিসম্পদের অংশ সাময়িক হিসাবে ১৬.৩৩ শতাংশ।
অসুস্থতা নিয়ে রোজা: কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন
সবার পক্ষে রোজা রাখা সম্ভব নয়, আর এই মাসের খাদ্য পরামর্শে সে কথা মাথায় রাখতে হয়। ইন্টারন্যাশনাল ডায়াবেটিস ফেডারেশন (আইডিএফ) ও ডায়াবেটিস অ্যান্ড রমাদান (ড্যার) ইন্টারন্যাশনাল অ্যালায়েন্স তাদের ডায়াবেটিস অ্যান্ড রমাদান: প্র্যাকটিক্যাল গাইডলাইনস ২০২১-এ, যা ডায়াবেটিস রিসার্চ অ্যান্ড ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিস সাময়িকীতে প্রকাশিত, উল্লেখ করেছে যে কিছু অসুস্থতা ও গুরুতর শারীরিক অবস্থার মানুষ, যার মধ্যে ডায়াবেটিস আছে এমন কিছু মানুষও আছেন, রোজা থেকে অব্যাহতি পেতে পারেন, তবু অনেকেই রোজা রাখেন। নির্দেশিকায় জোর দিয়ে বলা হয়েছে, ডায়াবেটিস নিয়ে যাঁরা রোজা রাখেন তাঁদের যথাযথ পরামর্শ ও সঠিক চিকিৎসা পাওয়া অত্যন্ত জরুরি। এই হালনাগাদে টাইপ ১ ডায়াবেটিস নিয়ে রোজা, বয়স্ক মানুষ ও অন্তঃসত্ত্বা নারীদের ডায়াবেটিস ব্যবস্থাপনা, মানসিক সুস্থতায় রমজানের প্রভাব এবং জটিলতার ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা রয়েছে।
ওপরের উৎসগুলোয় নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীর জন্য আলাদা কথা আছে: ডায়াবেটিস ও হৃদরোগ আছে এমন মানুষের জন্য ডিমের কুসুম নিয়ে হার্ভার্ডের পরামর্শ, সালমোনেলায় বেশি ঝুঁকিতে থাকা মানুষের এফডিএর তালিকা, এবং সবার জন্য চর্বি, লবণ ও চিনি নিয়ে ডব্লিউএইচওর সীমা। ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ বা খাবারে অ্যালার্জি থাকলে, কিংবা অন্তঃসত্ত্বা হলে, রোজা রাখার আগে বা এ ধরনের পদ নিয়মিত ইফতার বা সেহরির অংশ করার আগে চিকিৎসক বা নিবন্ধিত পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিন।
ছবি: Saileshpat / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, ঢাকা ট্রিবিউন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (বাংলাদেশ কার্যালয়, রমজানে সুস্থ থাকা, ২০১৮; স্বাস্থ্যকর খাদ্য তথ্যপত্র; নিরাপদ খাদ্যের পাঁচটি চাবিকাঠি), যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ (ফুডডেটা সেন্ট্রাল), যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (ডিমের নিরাপত্তা; ২১ সিএফআর ১০১.৮১), হার্ভার্ড টি এইচ চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথ (দ্য নিউট্রিশন সোর্স), প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্লান্স ২০২৩-২৪), ইন্টারন্যাশনাল ডায়াবেটিস ফেডারেশন ও ড্যার ইন্টারন্যাশনাল অ্যালায়েন্স (ডায়াবেটিস অ্যান্ড রমাদান: প্র্যাকটিক্যাল গাইডলাইনস ২০২১), বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)