বেলি ফুল (Jasminum sambac) দিয়ে ঘরে ফেসপ্যাক তৈরির কয়েকটি পরামর্শ নিয়ে ২০২৫ সালের ১ জুলাই একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল দ্য এগ্রো নিউজ। তাতে বলা হয়, অ্যালোভেরা, মধু, টক দই বা দুধের মালাইয়ের সঙ্গে বেলি ফুল মিশিয়ে ত্বকে লাগানো যায়। তবে বেলি ফুলের প্যাক ত্বক টান টান করে বা বলিরেখা দূর করে, মানুষের ওপর করা পরীক্ষায় এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি; বরং জুঁই-জাতীয় ফুলের নির্যাস থেকে ত্বকে অ্যালার্জি হওয়ার নথিভুক্ত ঝুঁকি আছে। তাই ব্যবহারের আগে প্যাচ টেস্ট জরুরি, আর ত্বকের কোনো সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
বেলি ফুল কী
বেলি জলপাই পরিবারের (Oleaceae) একটি গুল্ম বা লতানো গাছ, ইংরেজিতে যার নাম অ্যারাবিয়ান জেসমিন। ভারতে একে মোগরা আর ফিলিপাইনে সাম্পাগিতা বলা হয়। উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, গাছটি ভুটান ও ভারতের স্থানীয়, আর পশ্চিম, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নানা দেশে এর চাষ হয়। গাছ সাধারণত ০.৫ থেকে ৩ মিটার উঁচু হয়। সাদা ফুলের ব্যাস ২ থেকে ৩ সেন্টিমিটার; ফুল সাধারণত সন্ধ্যা ৬টা থেকে ৮টার মধ্যে ফোটে এবং সকালে বুজে যায়। বেলি ফিলিপাইনের জাতীয় ফুল (১৯৩৪ সালে গৃহীত) এবং ইন্দোনেশিয়ার তিনটি জাতীয় ফুলের একটি।
বাংলাদেশে গ্রীষ্ম ও বর্ষায় থোকায় থোকায় বেলি ফোটে। এটি মূলত শোভাবর্ধক ফুল; মালা ও তোড়া তৈরিতে এর ব্যাপক ব্যবহার আছে, আর সুগন্ধি ও জেসমিন চায়েও বেলি ফুল ব্যবহার হয়। চাষ করা বেলি গাছে সাধারণত বীজ হয় না, তাই কাটিং বা দাবা কলমের মতো অযৌন পদ্ধতিতে চারা তৈরি করা হয়।

প্রতিবেদনের প্যাক ও গবেষণার প্রমাণ
প্রতিবেদনে বেলি ফুল থেঁতো করে অ্যালোভেরার রস ও মধুর সঙ্গে মিশিয়ে, অথবা টক দইয়ের সঙ্গে ব্লেন্ড করে মুখে লাগানোর কথা বলা হয়েছিল। আরেকটি পদ্ধতিতে পাপড়ি ফুটন্ত পানিতে তিন থেকে পাঁচ মিনিট রেখে, পানি ছেঁকে দুধের মালাইয়ের সঙ্গে পেস্ট করার কথা ছিল। প্রতিবেদনের দাবি ছিল, এসব প্যাক ত্বক টান টান ও মসৃণ করে, শুষ্কতা কমায় এবং বলিরেখা দূর করে। প্রতিবেদনে ফুল ভালো করে ধুয়ে নেওয়া, ফুল একা সরাসরি ত্বকে না লাগানো এবং প্যাক বানিয়ে টাটকা অবস্থায় ব্যবহার করার পরামর্শও ছিল, কারণ রেখে দেওয়া প্যাকে জীবাণু জন্মাতে পারে।
ত্বক টান টান করা বা বলিরেখা দূর করার এই দাবির পক্ষে কোনো স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা বা মানুষের ওপর করা ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা পাওয়া যায়নি। ২০২২ সালে 'অ্যান্টিঅক্সিডেন্টস' সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় (চেক্কাচ্চি ও সহকর্মীরা) গবেষণাগারে চাষ করা বেলির কোষ থেকে তৈরি পানি ও অ্যালকোহলের নির্যাস পরীক্ষা করা হয়। ত্বকের কেরাটিনোসাইট কোষে নির্যাসটি ক্ষতিকর রিঅ্যাকটিভ অক্সিজেন স্পিসিসের উৎপাদন কমিয়েছে, অ্যাডভান্সড গ্লাইকেশন এন্ড প্রোডাক্টস (এজিই) তৈরি কমিয়েছে এবং টাইপ-১ কোলাজেন উৎপাদন বাড়িয়েছে। তবে এগুলো গবেষণাগার ও শরীরের বাইরে রাখা টিস্যুতে করা পরীক্ষা, মানুষের মুখে ফুলের প্যাকের পরীক্ষা নয়।
প্যাকের অন্য উপাদান নিয়েও সতর্কতা আছে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সেন্টার ফর কমপ্লিমেন্টারি অ্যান্ড ইন্টিগ্রেটিভ হেলথ (এনসিসিআইএইচ) জানায়, ত্বকে অ্যালোভেরা জেল সাধারণত সহনীয়, তবে মাঝে মাঝে জ্বালাপোড়া, চুলকানি, র্যাশ ও একজিমার খবর পাওয়া গেছে।

অ্যালার্জির ঝুঁকি ও প্যাচ টেস্ট
ইউরোপীয় কমিশনের সায়েন্টিফিক কমিটি অন কনজিউমার সেফটি (এসসিসিএস) ২০১২ সালের জুনে প্রসাধনীর সুগন্ধি অ্যালার্জেন নিয়ে যে মতামত গ্রহণ করে, তাতে জুঁইয়ের দুই প্রজাতি জেসমিনাম গ্র্যান্ডিফ্লোরাম ও জেসমিনাম অফিসিনালের নির্যাসকে মানুষের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত কন্টাক্ট অ্যালার্জেন বলা হয়। বেলি ফুলের নির্যাস রাখা হয় প্রাণীর ওপর পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠিত কন্টাক্ট অ্যালার্জেনের তালিকায়। ওই মতামতে উদ্ধৃত ২০০৯ সালের এক সমীক্ষায় 'জেসমিন অ্যাবসোলিউট' দিয়ে প্যাচ টেস্ট করা ৪,৪৪৭ জন রোগীর ১.১ শতাংশের প্রতিক্রিয়া পজিটিভ এসেছিল।
আমেরিকান একাডেমি অব ডার্মাটোলজি (এএডি) নতুন কোনো ত্বকের পণ্য ব্যবহারের আগে এভাবে পরীক্ষা করে নিতে বলে:
- হাতের নিচের দিক বা কনুইয়ের ভাঁজে একটি বড় মুদ্রার সমান জায়গা বেছে নিন, যেখানে জিনিসটি ঘষা বা ধোয়া লেগে উঠে যাবে না।
- স্বাভাবিকভাবে যতটুকু লাগাতেন ততটুকু, দিনে দুবার, সাত থেকে ১০ দিন ওই জায়গায় লাগান, আর যতক্ষণ সাধারণত রেখে দিতেন ততক্ষণ রাখুন।
- সাত থেকে ১০ দিনে ত্বক লাল হওয়া, চুলকানি বা ফোলা দেখা না দিলে তবেই ব্যবহার করুন।
- প্রতিক্রিয়া দেখা দিলে যত দ্রুত সম্ভব আলতো করে ধুয়ে ফেলুন, আর ব্যবহার করবেন না; প্রয়োজনে ঠান্ডা সেঁক বা পেট্রোলিয়াম জেলি দিন।
প্রতিক্রিয়া তীব্র হলে বা ঠান্ডা সেঁক ও পেট্রোলিয়াম জেলিতে না কমলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেয় এএডি। চর্মরোগ থাকলে বা ত্বক সংবেদনশীল হলে ফুলের প্যাক ব্যবহারের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। বেলির মূল, পাতা বা ফুলের রস খেয়ে সর্দি, কৃমি, বমিভাব বা অনিদ্রা সারানোর প্রচলিত ধারণার পক্ষে কোনো স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা পাওয়া যায়নি; কোনো গাছের অংশ ওষুধ হিসেবে খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

ছবি: তানভীর আঞ্জুম আদিব / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: দ্য এগ্রো নিউজ, ইউরোপীয় কমিশনের সায়েন্টিফিক কমিটি অন কনজিউমার সেফটি (এসসিসিএস), আমেরিকান একাডেমি অব ডার্মাটোলজি, যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সেন্টার ফর কমপ্লিমেন্টারি অ্যান্ড ইন্টিগ্রেটিভ হেলথ, অ্যান্টিঅক্সিডেন্টস সাময়িকী, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)