২০২৬ সালের ঈদুল আজহার কয়েক দিন আগে পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলায় আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছিল ‘ভয়ংকর’ ও ‘বাদশা বাবু’ নামের বিশাল আকৃতির দুটি গরু। ২০২৬ সালের ২৪ মে রোববার সকালে প্রকাশিত জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, খামার থেকে গরু দুটির মোট দাম হাঁকা হয়েছিল ১৬ লাখ টাকা। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২১ মে জানিয়েছিল, বাংলাদেশে ঈদুল আজহা উদ্যাপিত হবে ২৮ মে; অর্থাৎ উৎসবের মাত্র কয়েক দিন আগে গরু দুটি বিক্রির জন্য তোলা হয়েছিল।
গরু দুটি বড় হয়েছে কলাপাড়ার মহিপুর থানা সদর ইউনিয়নের নিজ-শিববাড়িয়া গ্রামের গাববাড়িয়া স্লুইসগেট সংলগ্ন একটি খামারে। খামারটি মো. ইব্রাহিম হাওলাদারের; তিনি জানান, কোরবানির ঈদে বিক্রির জন্যই গরু দুটি প্রস্তুত করেছেন।
দুটি গরু, দুটি জাত
খামারের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘ভয়ংকর’ ফ্রিজিয়ান জাতের, ওজন প্রায় ১৮ মণ; এর দাম চাওয়া হচ্ছিল ৯ লাখ টাকা। ‘বাদশা বাবু’ শাহিওয়াল জাতের, ওজন প্রায় ১৭ মণ; এর দাম ধরা হয়েছিল ৭ লাখ টাকা। দুটি ওজনই আনুমানিক হিসেবে বলা হয়েছে, আর দামগুলো খামারের হাঁকা দাম, বিক্রয়মূল্য নয়।
গরু দুটি সংবাদে এটাই প্রথম আসেনি। দৈনিক সময়ের আলো ২০২৬ সালের ১৬ মে জানিয়েছিল, বিশাল আকার, চমৎকার গড়ন ও সৌন্দর্যের কারণে গরু দুটিকে একনজর দেখতে প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকার উৎসুক মানুষ খামারে ভিড় করছেন। সেই প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশাল দেহের কারণে প্রথমটির নাম রাখা হয়েছে ‘ভয়ংকর’, আর তার চেহারা রাজকীয়; অন্যদিকে ‘বাদশা বাবু’ শান্ত স্বভাবের। এক সপ্তাহ আগেও দাম একই ছিল: ৯ লাখ ও ৭ লাখ, অর্থাৎ জোড়া ১৬ লাখ টাকা।
ওজন যে এককে বলা হয়েছে, সেই মণ দক্ষিণ এশিয়ার একটি প্রচলিত ওজনের একক। উইকিপিডিয়া অনুযায়ী, মোগল আমলে ৪০ সেরে এক মণ ধরা হতো, আর ব্রিটিশ ভারতে ১৮৩৩ সালে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিতে প্রথম এককটি প্রমিত করা হয়; সময় ও অঞ্চলভেদে এর মান বদলেছে। এই গরু দুটি নিয়ে দুই প্রতিবেদনেই ওজন বলা হয়েছে মণের হিসাবে।
খামারের ভাষ্যে চার বছরের পরিচর্যা
খামার সূত্রে জানা যায়, প্রায় চার বছর ধরে যত্ন, পরিচর্যা ও প্রাকৃতিক খাবারের মাধ্যমে গরু দুটি বড় করা হয়েছে। খামারের দাবি, মোটাতাজাকরণে কোনো ধরনের ক্ষতিকর ইনজেকশন বা কৃত্রিম পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়নি; প্রতিদিন নিয়মিত গোসল, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
খামারি মো. ইব্রাহিম হাওলাদার জাগো নিউজকে বলেন, ‘গরু দুটি আমাদের পরিবারের সদস্যের মতো। শুরু থেকেই প্রাকৃতিক উপায়ে লালন-পালন করেছি। ভুট্টার সাইলেজ, কাঁচা ঘাস, খড়, ভুসি ও বিভিন্ন পুষ্টিকর খাবার দেওয়া হয়েছে।’ তাঁর হিসাবে চার বছরে গরু দুটির পেছনে প্রায় ১২ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। তিনি জানান, কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে গরু দুটি বিক্রির জন্য প্রস্তুত করেছেন; যাঁরা স্বাস্থ্যসম্মত ও আকর্ষণীয় গরু খুঁজছেন, তাঁরা সরাসরি খামারে এসে দেখতে পারবেন।
১৬ মে সময়ের আলোকেও তিনি প্রায় একই কথা বলেছিলেন: গরু দুটি পরিবারেরই অংশ হয়ে গেছে, ছোটবেলা থেকে অত্যন্ত যত্ন নিয়ে এদের বড় করা হয়েছে, কোনো কৃত্রিম মোটাতাজাকরণ প্রক্রিয়া বা ক্ষতিকর হরমোন ও ওষুধ ব্যবহার করা হয়নি, আর নিয়মিত কাঁচা ঘাস, ভুট্টার সাইলেজ, খড়, ভুসি ও পুষ্টিকর খাবারের পাশাপাশি স্বাস্থ্য পরিচর্যার দিকে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে। সেখানেও খরচের হিসাব ছিল চার বছরে প্রায় ১২ লাখ টাকা।
গরু দুটির পরিচর্যায় নিয়োজিত কর্মচারী সোলেমান খান জাগো নিউজকে জানান, দিন-রাত পরিশ্রম করে গরু দুটি বড় করা হয়েছে; নিয়মিত পরিচর্যা ও খাবারের প্রতি বিশেষ নজর রাখার কারণেই গরুগুলো সুস্থ ও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ঈদের বাজারে গরু দুটি ভালো দামেই বিক্রি হবে। সময়ের আলোকে তিনি দৈনিক রুটিনের কথা বলেছিলেন: প্রতিদিন নিয়ম করে গোসল, ঘর পরিষ্কার রাখা আর সময়মতো খাবার দেওয়া।
প্রতিবেশীরাও গরু দুটিকে ঘিরে ভিড়ের কথা বলেন। স্থানীয় বাসিন্দা হাবিব সরদার বলেন, ‘আমাদের এলাকায় এত বড় ও সুন্দর গরু সচরাচর দেখা যায় না। ইব্রাহিম অনেক কষ্ট করে গরু দুটি বড় করেছেন। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এগুলো দেখতে আসছে।’ স্থানীয় যুবক মো. মাইনুদ্দিন আতিক বলেন, ‘ভয়ংকর দেখতে সত্যিই রাজকীয়। গরু দুটির সৌন্দর্য ও স্বাস্থ্য দেখে সবাই মুগ্ধ হচ্ছে।’
পশু চিকিৎসক ও প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা যা বললেন
গরু দুটির নিয়মিত তদারকিতে থাকা স্থানীয় পশু চিকিৎসক আহসান হাবিব জাগো নিউজকে জানান, সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক খাবার ও সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে গরু দুটি বড় করা হয়েছে এবং সে সময় গরুগুলো শতভাগ সুস্থ ও স্বাস্থ্যবান। এর আগে সময়ের আলোর প্রতিবেদনে তিনি বলেছিলেন, গরু দুটিকে নিয়মিত চিকিৎসাসেবা ও পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং প্রাকৃতিক উপায়ে সুষম খাদ্য দেওয়ায় এগুলো অত্যন্ত সুস্থ রয়েছে।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মারুফ বিল্লাহ খান বলেন, সে বছর কলাপাড়ার কোরবানির পশুর বাজারে ‘ভয়ংকর’ আর ‘বাদশা বাবু’ অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, ‘গরু দুটির বৃদ্ধিতে কোনো ধরনের ক্ষতিকর হরমোন বা বিশেষ ওষুধ ব্যবহার করা হয়নি। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে লালন-পালন করা হয়েছে। এটি অন্য খামারিদের জন্যও একটি ইতিবাচক উদাহরণ।’
তিনি জানান, সে বছর উপজেলায় ২০ হাজারের বেশি পশু কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে; এর মধ্যে ১২ হাজার গরু, সঙ্গে সামান্য কিছু মহিষ, এবং ৮ হাজার ছাগল ও ভেড়া। এর বিস্তারিত হিসাব মাসের শুরুতেই প্রকাশিত হয়েছিল। জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের তথ্য উদ্ধৃত করে রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) ৫ মে জানায়, কলাপাড়া উপজেলায় গরু ১১ হাজার ৮৮৫টি, মহিষ ২৬৬টি, ছাগল ৬ হাজার ১৩৬টি এবং ভেড়া ১ হাজার ৩০০টি মিলে মোট ২০ হাজার ৬টি পশু রয়েছে।
ঈদের আগের সপ্তাহগুলো উপজেলার সব গবাদিপশু পালনকারীর জন্য সহজ ছিল না। প্রথম আলো ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল জানায়, কলাপাড়ায় টানা দুই দিনের বজ্রবৃষ্টিতে অন্তত ২৯টি গরু মারা গেছে এবং উপজেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী ২৩ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মারুফ বিল্লাহ পত্রিকাটিকে বলেন, সেই সপ্তাহের মঙ্গল ও বুধবার বজ্রপাতে ২৯টি গরু মারা যাওয়ার খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে, তবে বাস্তবে মৃত গরুর সংখ্যা আরও বেশি হবে। ক্ষতিগ্রস্তরা জানান, গাভি, ছোট বাছুর এবং কোরবানি উপলক্ষে মোটাতাজা করা গরুও মারা গেছে। কৃষকদের দাবি, তাঁদের অন্তত ৬০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে; এ হিসাব তাঁদেরই। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাউছার হামিদ বলেন, বজ্রপাতে গবাদিপশু মারা যাওয়া কৃষকদের তালিকা করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে।
ফ্রিজিয়ান ও শাহিওয়াল: নামের পেছনের দুই জাত
বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া গরুর দুটি স্বতন্ত্র প্রজাতির কথা বলে: বস ইন্ডিকাস, অর্থাৎ ভারতীয় উপমহাদেশের কুঁজওয়ালা জেবু, এবং বস টরাস, অর্থাৎ শীতপ্রধান অঞ্চলের গরু, যা মাঝারি থেকে ভারী আকারের, তাড়াতাড়ি প্রজননক্ষম হয় এবং মাংস ও দুধ উৎপাদনে যার সম্ভাবনা বেশি। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, দেশের বেশির ভাগ গরু নির্দিষ্ট জাতবিহীন দেশি জেবু ধরনের, যেগুলো একসঙ্গে কয়েকটি কাজে লাগে।
বাংলাপিডিয়া জানায়, ১৯৬০-এর দশক থেকে বাংলাদেশের মানুষ তিন ধরনের গরু পালন করে আসছে: বিশুদ্ধ জাত, সংকর জাত ও দেশি গরু। দেশি গরুর উৎপাদনক্ষমতা বাড়াতে অতীতে কয়েকবার বিদেশি জাতের সঙ্গে সংকরায়ণের চেষ্টা হয়েছে; যেসব জাত আনা হয়েছে তার মধ্যে আছে হলস্টেইন-ফ্রিজিয়ান, জার্সি, শাহিওয়াল, হরিয়ানা, সিন্ধি ও শাহিওয়াল-ফ্রিজিয়ান। সরকারি ও বাণিজ্যিক দুগ্ধখামার, দুধ উৎপাদনের পকেট এলাকা এবং শহর ও শহরতলিতে বিশুদ্ধ বিদেশি জাত, সেগুলোর সংকর ও উন্নত গরু দেখা যায়। বাংলাপিডিয়ায় শাহিওয়াল-পাবনা সংকর, ফ্রিজিয়ান-পাবনা সংকর, শাহিওয়াল-দেশি সংকর ও ফ্রিজিয়ান সংকরের কথা আছে; প্রতি দুগ্ধকালে এগুলোর দুধ উৎপাদন যথাক্রমে ১,২৪০, ১,৪৬০, ৭২৮ ও ১,৮০০ লিটার।
উইকিপিডিয়া অনুযায়ী, হলস্টেইন ফ্রিজিয়ান দুগ্ধজাত গরুর একটি আন্তর্জাতিক জাত বা জাতগোষ্ঠী, যার উৎপত্তি ফ্রিসল্যান্ডে, অর্থাৎ নেদারল্যান্ডসের নর্থ হল্যান্ড প্রদেশ থেকে জার্মানির শ্লেসভিগ-হলস্টেইন রাজ্য পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলে। বিশ্বজুড়ে শিল্পভিত্তিক দুগ্ধখামারে এটিই প্রধান জাত, এবং ১৬০টির বেশি দেশে এর দেখা মেলে। এর গায়ের দাগ সাধারণত সাদা-কালো বা লাল-সাদা ছোপের। ঐতিহ্যবাহী ইউরোপীয় বংশধারার যে গরু দুধ ও মাংস দুটোর জন্যই পালন করা হয়, সেগুলোকে ‘ফ্রিজিয়ান’ বলা হয়। জাগো নিউজের প্রতিবেদনে ‘ভয়ংকর’-কে ফ্রিজিয়ান বলা হলেও এটি বিশুদ্ধ জাত না সংকর, তা বলা হয়নি।

শাহিওয়াল ভারতীয় উপমহাদেশের নিজস্ব একটি জেবু জাত। উইকিপিডিয়া জানায়, পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের সাহিওয়াল জেলার নামে এর নাম, আর এটি প্রধানত পাওয়া যায় ওই প্রদেশে এবং ভারতের পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও রাজস্থানে। বাংলাদেশসহ বহু দেশে জাতটি রপ্তানি হয়েছে। পাকিস্তানে এর গড় দৈহিক ওজন ষাঁড়ের ৫৪৪ কেজি ও গাভির ৪০৮ কেজি বলে উল্লেখ আছে। গায়ের রং লালচে বাদামি, কখনো সাদা ছোপসহ; ষাঁড়ের কুঁজ বড় এবং একপাশে হেলে থাকতে পারে। এটি তাপসহিষ্ণু জাত, পালন করা হয় দুধ, মাংস ও হালচাষের জন্য, আর সংকরায়ণে, বিশেষ করে ফ্রিজিয়ান ও জার্সির মতো ইউরোপীয় দুগ্ধজাতের সঙ্গে, এর ব্যাপক ব্যবহার হয়েছে।

সাইলেজ, ঘাস, খড় ও ভুসি: খামারের বলা খাবার
খামারের খাবারের তালিকায় প্রথমেই ছিল ভুট্টার সাইলেজ। সাইলেজ হলো গাঁজন প্রক্রিয়ায় সংরক্ষিত সবুজ পশুখাদ্য। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ২০০০ সালের ‘গ্রীষ্মমণ্ডলে সাইলেজ তৈরি’ বিষয়ক প্রকাশনার একটি প্রবন্ধে বলা হয়েছে, ভুট্টা, ঘাস, শিম জাতীয় ফসল, গম ও লুসার্নের মতো তাজা পশুখাদ্য ফসল সাইলেজ পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা যায়; পদ্ধতিটি বাতাসের অনুপস্থিতিতে স্বাভাবিক ল্যাকটিক অ্যাসিড গাঁজনের ওপর নির্ভরশীল। ফসলের গায়ে থাকা ব্যাকটেরিয়া এর শর্করাকে প্রধানত ল্যাকটিক অ্যাসিডে পরিণত করে; অ্যাসিড জমার সঙ্গে সঙ্গে উপাদানটি অম্লীয় হয়ে ওঠে এবং পচন ঘটানো জীবাণু দমে যায়। বাতাস ঢুকতে না দেওয়ার জন্য ফসল স্তূপ করে ঢেকে রাখা হয়।
বাংলাদেশে গরুকে সাধারণত কী খাওয়ানো হয়, বাংলাপিডিয়ায় তার বিবরণ আছে। রোমন্থক প্রাণীর খাদ্যের উৎস প্রধানত ফসলের অবশিষ্টাংশ, দানাশস্যের উপজাত, গুল্ম, পশুখাদ্য গাছ এবং রাস্তার পাশে, আইলে ও বাঁধে জন্মানো ঘাস। কৃষিশিল্পের উপজাতের মধ্যে আছে খড়, আখের আগা, চিটাগুড় ও খৈল; আর মিলিংয়ের উপজাতের মধ্যে ভুসি। চাষ করা পশুখাদ্যের মধ্যে আছে নেপিয়ার ও পারার মতো বহুবর্ষজীবী ঘাস এবং ভুট্টা, কাউপি, খেসারি ও ওটের মতো মৌসুমি ফসল। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, গরুকে দেওয়া আঁশজাতীয় খাদ্যের বড় অংশ আসে ধান, গম ও ডাল ফসলের অবশিষ্টাংশ থেকে।

মোটাতাজাকরণ প্রসঙ্গে বাংলাপিডিয়া বলে, বাংলাদেশে পরিকল্পিত গরু মোটাতাজাকরণ কর্মসূচি সাধারণত চালু ছিল না, যদিও ঈদুল আজহার সময় দেশে মাংসের গরুর মৌসুমি চাহিদা তৈরি হয় এবং মানুষ সাধারণত সুস্থ-সবল পশু কোরবানি দিতে পছন্দ করেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেক খামারি উন্নত জাতের, অর্থাৎ দেশি গরুর সঙ্গে বিদেশি জাতের সংকর, গরু দিয়ে ছোট দুগ্ধখামার গড়েছেন, আর কেউ কেউ উন্নত জাতের এঁড়ে বাছুরের পরিকল্পিত মোটাতাজাকরণ শুরু করেছেন।
হরমোন ও ক্ষতিকর দ্রব্য নিয়ে আইন যা বলে
খামার, স্থানীয় পশু চিকিৎসক ও উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা সবাই বলেছেন, গরু দুটির ক্ষেত্রে কোনো ক্ষতিকর হরমোন, ইনজেকশন বা ওষুধ ব্যবহার করা হয়নি। এ বক্তব্যের গুরুত্ব আছে, কারণ বাংলাদেশে পশুখাদ্যে এমন দ্রব্য ব্যবহার আইনত নিষিদ্ধ। মৎস্যখাদ্য ও পশুখাদ্য আইন, ২০১০ (২০১০ সনের ২ নং আইন, তারিখ ২৮ জানুয়ারি ২০১০)-এর ১৪(১) ধারায় বলা হয়েছে, মৎস্যখাদ্য ও পশুখাদ্যে এন্টিবায়োটিক, গ্রোথ হরমোন, স্টেরয়েড ও কীটনাশকসহ অন্যান্য ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করা যাবে না; ১৪(২) ধারা অনুযায়ী এ বিধান লঙ্ঘন আইনের অধীন অপরাধ। সরকারের আইনবিষয়ক দাপ্তরিক ওয়েবসাইটে প্রকাশিত পাঠ অনুযায়ী, আইনের ২০ ধারায় এর অধীন অপরাধের জন্য অনূর্ধ্ব এক বছরের কারাদণ্ড, অনূর্ধ্ব ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান আছে। পশুখাদ্য সম্পর্কিত বিষয়ে আইনটি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরকে দায়িত্বপ্রাপ্ত অধিদপ্তর হিসেবে নির্ধারণ করেছে।
২০২৬ সালের ঈদের আগে অঞ্চলটির কর্মকর্তারা এ বিষয়ে নজরদারির কথা জানিয়েছিলেন। সময়ের আলো ১৭ মে জানায়, ক্ষতিকর উপায়ে কৃত্রিমভাবে পশু মোটাতাজাকরণ বন্ধে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে, আর প্রাণিসম্পদ বিভাগ জানিয়েছে কোরবানির পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও হাট তদারকিতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম মাঠে সক্রিয় থাকবে। ঢাকায় রাজধানীর হাটগুলোতে ২০টি ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম দায়িত্ব পালন করবে বলে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, বাংলা ট্রিবিউন ২২ মে এ খবর দেয়।
জাগো নিউজের প্রতিবেদনে গরু দুটি নিয়ে খামার, পশু চিকিৎসক ও উপজেলা কর্মকর্তার বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে; কোনো পরীক্ষাগার পরীক্ষার কথা সেখানে উল্লেখ নেই।
পটুয়াখালী ও বরিশাল: চাহিদার চেয়ে বেশি পশু
২০২৬ সালের মৌসুমে পটুয়াখালীতে কোরবানির পশু ছিল চাহিদার চেয়ে বেশি। জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের তথ্য উদ্ধৃত করে বাসস ৫ মে জানায়, জেলায় কোরবানিযোগ্য পশু ১ লাখ ৩৭ হাজার ৯১৮টি, বিপরীতে চাহিদা ১ লাখ ২২ হাজার ৬৩৩টি; ফলে ১৫ হাজার ২৮০টি পশু উদ্বৃত্ত থাকবে। জেলায় খামারের সংখ্যা ৬ হাজার ৪২১টি, আর ৭৫৮ জন খামারিকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে; প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অনেক তরুণ ও যুবক নিজ উদ্যোগে স্বল্প পরিসরে গরু মোটাতাজাকরণ শুরু করেছেন এবং প্রাণিসম্পদ বিভাগ তাঁদের নিয়মিত পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে।
একই প্রতিবেদনে উপজেলাভিত্তিক হিসাবও ছিল: সদর উপজেলায় ২১ হাজার ২৮৯টি, বাউফলে ২৫ হাজার ৭৯৬টি, কলাপাড়ায় ২০ হাজার ৬টি, গলাচিপায় ২১ হাজার ৮৫১টি, দশমিনায় ১৪ হাজার ৩০৪টি, মির্জাগঞ্জে ১৯ হাজার ৬৬১টি, দুমকিতে ১০ হাজার ১৫৬টি এবং রাঙ্গাবালীতে ৪ হাজার ৮০৫টি পশু। পটুয়াখালী জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. হাবিবুর রহমান বাসসকে বলেন, ‘জেলায় কোরবানির পশুর কোনো সংকট নেই। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পশু দিয়েই জেলার চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। আমরা খামারিদের প্রশিক্ষণ ও সার্বিক সহযোগিতা দিয়ে আসছি। আশা করছি, খামারিরা ন্যায্য মূল্য পাবেন এবং ক্রেতারাও স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ পশু কিনতে পারবেন।’
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়ের হিসাবে জেলার সংখ্যা কিছুটা ভিন্ন। সময়ের আলো ১৭ মে জানায়, বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী পটুয়াখালীতে ১ লাখ ১১ হাজার ৮৭৪টি চাহিদার বিপরীতে পশু রয়েছে ১ লাখ ৩৩ হাজার ৭১৮টি। বিভাগের ছয় জেলায় ৩ হাজার ৯১৫ জন ছোট-বড় খামারির কাছে কোরবানিযোগ্য পশু প্রস্তুত ৪ লাখ ৬৮ হাজার ৪৪৫টি, বিপরীতে সম্ভাব্য চাহিদা ৪ লাখ ৭৮৩টি; উদ্বৃত্ত থাকবে ৬৭ হাজার ৬৬২টি। এর মধ্যে ষাঁড় গরু ২ লাখ ৮৩টি, বলদ ৬৮ হাজার ২৭৮টি, মহিষ ৯৮ হাজার ৫টি, ছাগল ১ লাখ ১৯ হাজার ৮৯০টি এবং অন্যান্য পশু ১৫০টি। বরিশাল বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মাহফুজুল হক বলেন, গ্রামাঞ্চলে অনেক সাধারণ পরিবার ব্যক্তিগতভাবে ও ছোট পরিসরে গরু-ছাগল পালন করায় স্থানীয় উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, ফলে কোরবানির জন্য বিদেশি পশুর ওপর নির্ভরতার প্রয়োজন হবে না।
সারা দেশে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাবে ২০২৬ সালে কোরবানির জন্য পশু প্রস্তুত ছিল ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি, বিপরীতে সম্ভাব্য চাহিদা ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি; দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২১ মে ও বাংলা ট্রিবিউন ২২ মে জানায়, উদ্বৃত্ত থাকবে প্রায় ২২ লাখ পশু। বাংলা ট্রিবিউনের হিসাবে এর মধ্যে গরু-মহিষ ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি, ছাগল-ভেড়া ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি এবং অন্যান্য প্রজাতির পশু ৫ হাজার ৬৫৫টি। একই প্রতিবেদনে আগের বছরগুলোর চিত্রও ছিল: ২০২৩ সালে প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ পশু উৎপাদিত হলেও কোরবানি হয়েছিল প্রায় ১ কোটি; ২০২৪ সালে উৎপাদন ১ কোটি ২১ লাখ, কোরবানি প্রায় ৯৫ লাখ; আর ২০২৫ সালে ১ কোটি ২৪ লাখ পশুর বিপরীতে কোরবানি প্রায় ৯০ লাখ। দেশজুড়ে সরবরাহ সমান ছিল না: ঢাকায় সম্ভাব্য চাহিদা ২১ লাখ ৫৮ হাজার ৮৬৯টি হলেও প্রাপ্যতা ১৪ লাখ ৪৩ হাজার ৯৪২টি, চট্টগ্রামেও প্রায় ৫০ হাজার পশুর ঘাটতি; অন্যদিকে রাজশাহী, রংপুর, খুলনা ও ময়মনসিংহ বিভাগে বড় উদ্বৃত্ত।
বাড়তি খরচ, বড় গরুর চাহিদায় ভাটা
কলাপাড়ার গরু দুটির দাম হাঁকা হয়েছিল এমন এক মৌসুমে, যখন ব্যবসাসংশ্লিষ্টরা বাড়তি খরচের কথা বলছিলেন। বাংলা ট্রিবিউন ২২ মে জানায়, সরবরাহ পর্যাপ্ত হলেও খামারিদের স্বস্তি কম, কারণ পশুখাদ্য, শ্রমিক, বিদ্যুৎ ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় লাভ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে এবং মাঝারি ও বড় খামারিরা চাপে আছেন। বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহসভাপতি নিলয় হোসেন কয়েক দিন আগে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, সে বছর বড় গরুর চাহিদা কমে গেছে; খাদ্য ও পরিবহন ব্যয় বাড়ায় বড় খামারিরা বেশি ঝুঁকিতে, এবং অনেকে লোকসানের আশঙ্কায় খামার গুটিয়ে নেওয়ার কথাও ভাবছেন। ঢাকার উত্তরখানের এক খামারি পত্রিকাটিকে বলেন, ছোট গরুর চাহিদা বেশি থাকায় সেগুলোর দাম তুলনামূলক বেশি, তবে বড় গরুর দাম তুলনামূলক কম।
পটুয়াখালীর খামারিরাও একই চাপের কথা বলেন। ৫ মে বাসসের প্রতিবেদনে বাউফল উপজেলার ১২ থেকে ১৪টি গরুর এক খামারি বলেন, বাজার ভালো থাকলে ভালো লাভের আশা করছেন, তবে পশুখাদ্যের দাম কিছুটা বেশি হওয়ায় খরচও বেড়েছে। বরিশালে খামারিরা সময়ের আলোকে জানান, পশু লালন-পালনের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আগের বছরের চেয়ে কোরবানির পশুর দাম কিছুটা বেশি হতে পারে; একটি অ্যাগ্রো ফার্মের তত্ত্বাবধায়ক জানান, অনেক খামারি আগেভাগেই সরাসরি খামার থেকে পশু বিক্রি শুরু করেছেন।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বরাতে বাংলা ট্রিবিউন জানায়, ২০২৬ সালের ঈদে সারা দেশে ৩ হাজার ৬০০টির বেশি পশুর হাট বসবে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২১ মে জানায়, সীমান্ত এলাকায় পশুর হাট বসানোর ওপর সরকার নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। কলাপাড়ার গরু দুটি হাটে তোলা হবে কি না, জাগো নিউজের প্রতিবেদনে তা বলা হয়নি; খামারি ক্রেতাদের সরাসরি খামারে আসার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
কলাপাড়া, মহিপুর ও উপকূল
কলাপাড়া পটুয়াখালী জেলার বঙ্গোপসাগর তীরের একটি উপকূলীয় উপজেলা। বাংলাপিডিয়ার তথ্যে এর আয়তন ৪৯১.৮৯ বর্গকিলোমিটার এবং ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জনসংখ্যা ২ লাখ ৩৭ হাজার ৮৩১। এর উত্তরে ও পশ্চিমে আমতলী উপজেলা, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে রাবনাবাদ চ্যানেল ও গলাচিপা উপজেলা। প্রধান নদী আন্ধারমানিক, নীলগঞ্জ ও ধানখালী। কলাপাড়া থানা গঠিত হয় ১৯২১ সালে, উপজেলা হয় ১৯৮৩ সালে। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী উপজেলার আয়ের প্রধান উৎসের মধ্যে কৃষির অংশ ৫৭.২৩ শতাংশ; প্রধান ফসল ধান, ডাল, আলু ও সবজি, আর উপজেলায় বেশ কিছু চিংড়ি খামার, দুগ্ধখামার, পোলট্রি ও হ্যাচারি আছে। প্রধান রপ্তানিপণ্য ধান, ইলিশ ও সামুদ্রিক শুঁটকি; প্রায় ৫০টি হাট-বাজারের মধ্যে কলাপাড়া হাট ও মহিপুর হাট উল্লেখযোগ্য। ১৮২২, ১৯৬০ ও ১৯৭৯ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় এবং ১৮৭৬ সালের বন্যায় সেখানে জনবসতি ও গবাদিপশুর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল।
গরু দুটি যেখানে বড় হয়েছে, সেই মহিপুর কলাপাড়ার ভেতরের একটি থানা এলাকা। বাংলা উইকিপিডিয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের বরাতে জানায়, ২০১৬ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি মহিপুর থানার অনুমোদন দেওয়া হয়; এর আগে এটি ছিল পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র। কুয়াকাটা পৌরসভা এবং মহিপুর, লতাচাপলী, ধুলাসার ও ডালবুগঞ্জ, এই চার ইউনিয়ন মহিপুর থানার আওতায়।
উপজেলার দক্ষিণ প্রান্তের কুয়াকাটাকে বাংলাপিডিয়া দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম পর্যটনকেন্দ্র বলে উল্লেখ করেছে, যেখানে ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সৈকত থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দুটোই দেখা যায়। ঢাকা থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৩২০ কিলোমিটার, পটুয়াখালী শহর থেকে ৭০ কিলোমিটার। পটুয়াখালী জেলার আয়তন ৩,২২১.৩১ বর্গকিলোমিটার; দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, আর বাকেরগঞ্জ জেলার একটি মহকুমা থেকে এটি ১৯৬৯ সালে জেলায় উন্নীত হয়।

ছবি: Wasiul Bahar / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দৈনিক সময়ের আলো, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), প্রথম আলো, বাংলা ট্রিবিউন, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (বাংলা), বাংলাপিডিয়া, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), বাংলাদেশ আইন (bdlaws), উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)