২০২৬ সালের ২০ জুন জাগো নিউজ ২৪-এর লাইফস্টাইল ডেস্ক ঘরে রান্নার উপযোগী একটি রেসিপি প্রকাশ করে: চ্যাপা শুঁটকির সবজি ভুনা। বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের গাঁজানো ছোট মাছ চ্যাপা শুঁটকি বেটে পেঁয়াজ, আদা, রসুন ও হলুদের সঙ্গে কষিয়ে তাতে নানা সবজি দিয়ে মাখা মাখা করে রান্না করা হয় এই ঝাল পদটি। রেসিপিতে এক কড়াই মিষ্টিকুমড়া, বেগুন, গাজর, শিম, টমেটো ও আলুর জন্য চ্যাপা শুঁটকি লাগে মাত্র ৫০ গ্রাম, আর শেষে জিরা, শুকনা মরিচ ও সরিষার তেলের ফোড়ন দিয়ে নামানো হয়। জাগো নিউজ লিখেছে, পদটি ঝাল-ঝোল-ঘ্রাণে ভরপুর এবং গ্রামবাংলার আসল স্বাদ মনে করিয়ে দেয়; পরিবেশন করতে বলা হয়েছে গরম ভাতের সঙ্গে।
চ্যাপা শুঁটকি পরিচিত তার তীব্র ঘ্রাণ আর আলাদা স্বাদের জন্য। নিচে প্রথমে জাগো নিউজের প্রকাশিত রেসিপিটি দেওয়া হলো, তারপর চ্যাপা শুঁটকি কী, কোথায় ও কীভাবে তৈরি হয়, এর দাম কেমন, আর কোন কোন পদে খাওয়া হয়, এবং রেসিপি প্রকাশের আগে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ শুঁটকি নিয়ে কী জানিয়েছিল, তা তুলে ধরা হলো।
উপকরণ
জাগো নিউজ যে উপকরণ ও পরিমাণ দিয়েছে তা নিচে দেওয়া হলো। মৌসুম অনুযায়ী সবজি বদলানো যায়, তবে রেসিপিতে পরিমাণ ছিল এমন:
- চ্যাপা শুঁটকি: ৫০ গ্রাম
- ছাঁচি মিষ্টিকুমড়া: ১ কাপ
- বেগুন: ১ কাপ
- গাজর: আধা কাপ
- শিম: আধা কাপ
- টমেটো: আধা কাপ
- আলু: ২টি
- পেঁয়াজকুচি: ১ কাপ
- রসুনকুচি: ২ চা-চামচ
- আদাবাটা: ১ চা-চামচ
- তেজপাতা: ২টি
- শুকনা মরিচ: ২টি
- কাঁচামরিচ: ৪ থেকে ৫টি
- হলুদবাটা: ১ চা-চামচ
- আস্ত জিরা: ১ চা-চামচ
- নারকেলবাটা: ১ টেবিল চামচ
- লবণ: স্বাদমতো
- তেল: অল্প
তালিকায় এক টেবিল চামচ নারকেলবাটা থাকলেও রান্নার ধাপে তা কখন দিতে হবে, মূল রেসিপিতে বলা নেই। এক কাপ পেঁয়াজকুচির আধা কাপ যায় মসলা কষানোর শুরুতে, বাকিটার কিছু অংশ শেষের ফোড়নে; রসুন, শুকনা মরিচ ও জিরাও একইভাবে কষানো আর ফোড়নে ভাগ হয়ে যায়।
যেভাবে রান্না করবেন
রান্নার তিনটি পর্ব: মাছ ও সবজি প্রস্তুত করা, শুঁটকিবাটা দিয়ে মসলা কষানো, আর সবজি দিয়ে মাখা মাখা করে শেষে ফোড়ন দেওয়া। জাগো নিউজের ধাপগুলো এমন:
- চ্যাপা শুঁটকি আগে তাওয়ায় হালকা করে ভেজে নিন, তারপর ভালোভাবে পরিষ্কার করে ধুয়ে বেটে নিন।
- সব সবজি ভালো করে ধুয়ে ছোট ছোট টুকরো করে কেটে তেলে হালকা ভেজে সরিয়ে রাখুন।
- কড়াইয়ে তেল গরম করে আধা কাপ পেঁয়াজকুচি দিন। সঙ্গে আদা, রসুন, তেজপাতা, লবণ, হলুদ আর বাটা চ্যাপা শুঁটকি দিয়ে ভালোভাবে কষিয়ে নিন।
- মসলা ভালোভাবে কষে এলে ভেজে রাখা সবজি দিন এবং আধা কাপ পানি যোগ করুন।
- ঝাল বেশি পছন্দ হলে কাঁচামরিচ ফালি করে দিন; কম ঝাল চাইলে মরিচ আস্ত রেখে দিন।
- সবজি নরম হয়ে মাখা মাখা হয়ে এলে ওপরে আবার সামান্য পেঁয়াজকুচি, রসুনকুচি, শুকনা মরিচ, আস্ত জিরা আর সরিষার তেল দিয়ে ফোড়ন দিন।
- চুলা থেকে নামিয়ে গরম গরম ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করুন।
পদের নামের দ্বিতীয় শব্দ ‘ভুনা’ কোনো উপকরণ নয়, রান্নার একটি ধরন। বিশ্বকোষের বর্ণনায় ভুনা হলো বাংলা অঞ্চলে উদ্ভূত, ধীরে ধীরে ভাজা শুকনো ধাঁচের তরকারি: ভারী গোল কড়াইয়ে তেলে পেঁয়াজ, রসুন ও আদা ভেজে ভিত তৈরি হয়, তারপর মূল উপাদান দিয়ে অনেকক্ষণ রান্না করে ঝোল কমিয়ে ঘন করা হয়, যাতে স্বাদ গাঢ় হয় এবং তরকারি অনেকটা শুকনো থাকে। এই রেসিপিতে শুঁটকিবাটা দিয়ে মসলা ভালোভাবে কষানোর ধাপটিই পদটিকে ভুনার রূপ দেয়।
শেষ ধাপটি ফোড়ন। এই পদ্ধতিতে আস্ত মসলা, কখনো কখনো শুকনা মরিচ বা রসুনকুচিও, গরম তেল বা ঘিতে অল্প সময় ভেজে তার সুগন্ধি তেল বের করে খাবারে মেশানো হয়। ফোড়ন রান্নার শুরুতে, অন্য উপকরণ দেওয়ার আগে, অথবা শেষে পরিবেশনের ঠিক আগে দেওয়া যায়; এই রেসিপিতে তা দেওয়া হয় শেষে, সরিষার তেলে।
চ্যাপা শুঁটকি কী
চ্যাপা শুঁটকি, কোথাও চেপা বা চ্যাপা নামে লেখা, সাধারণ রোদে শুকানো শুঁটকি নয়। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং নেদারল্যান্ডসের ভাগেনিঙেন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা কেন্দ্রের গবেষক জেসমিন আরা ফারহানা ও সহকর্মীদের ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ‘হেলিয়ন’ সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় একে বলা হয়েছে আঠালো, শক্ত, গাঁজানো ও লবণবিহীন একটি পণ্য, যা বাংলাদেশের স্থানীয় উৎপাদকেরা ছোট মাছ থেকে তৈরি করেন। এটি খাওয়া হয় চাটনি বা সসের মতো করে, অথবা সবজি দিয়ে শুঁটকির তরকারি হিসেবে ভাত বা রুটির সঙ্গে; জাগো নিউজের রেসিপিটি এই শেষ ধরনের।
বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া একে বলেছে ‘চাপা শুঁটকি’ বা চাপ দেওয়া শুঁটকি, যা তৈরি হয় ছোট আকারের পুঁটি মাছ গাঁজিয়ে। দেশের নানা অঞ্চলে এর ভিন্ন নামও আছে। দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ২০২২ সালের জানুয়ারিতে আঞ্চলিক খাবার নিয়ে এক ফিচারে লিখেছে, যাঁরা শুঁটকির সঙ্গে পরিচিত তাঁরা সিদল বা চাপা শুঁটকিও চেনেন; স্বাদে এটি রোদে শুকানো মাছের মতো হলেও দুটির সংরক্ষণপদ্ধতি একেবারে আলাদা। ২০২২ সালে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ময়মনসিংহের যে উৎপাদককে নিয়ে প্রতিবেদন করেছিল, তিনি তাঁর পণ্যকে বলেন ‘হিদল’।
সীমান্তের ওপারেও এই খাবার বহুল পরিচিত। ২০১২ সালে ‘ইন্ডিয়ান জার্নাল অব ট্র্যাডিশনাল নলেজ’-এ আরমান উল্লাহ মুজাদ্দাদি ও এস বসুর প্রবন্ধে শিদলকে বলা হয়েছে আধা-গাঁজানো, মণ্ডের মতো শক্ত মৎস্যপণ্য, যাতে পুঁটি মাছের আকার প্রায় অক্ষুণ্ণ থাকে। আসাম, ত্রিপুরা, মিজোরাম, অরুণাচল প্রদেশ ও নাগাল্যান্ডে এর নাম শিদল, সেপা বা হিদল, আর মণিপুরে নগারি; ভারতের উত্তর-পূর্বের সাতটি রাজ্যেই এটি খাওয়া হয়, বিশেষ করে আদিবাসী অঞ্চলে ও বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর মধ্যে। হেলিয়নের গবেষকেরাও বাংলাদেশ ও উত্তর-পূর্ব ভারতের গাঁজানো মাছের তালিকায় শিদল, সিদল, নগারি, হেনতাক ও তুংতাপের নাম দিয়েছেন।
কোথায় তৈরি হয়
বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নরসিংদী, সিলেট, কুমিল্লা ও নারায়ণগঞ্জ জেলায় চাপা শুঁটকি তৈরি হয়; বড় পরিসরে উৎপাদন হয় কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর ও নরসিংদীর মাধবদীতে।
হেলিয়নের গবেষণাটি ২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৩ সালের জানুয়ারির মধ্যে ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কিশোরগঞ্জ, এই চার জেলার এগারোটি উপজেলার ১২০ জন উৎপাদকের ওপর জরিপ চালিয়ে করা। গবেষকেরা লিখেছেন, মাছ এভাবে সংরক্ষণ করা হয় শুকনো মৌসুমে খাওয়ার জন্য, আর গাঁজন মৌসুমি মাছকে দীর্ঘদিন টিকে থাকা খাবারে পরিণত করে খাদ্য নিরাপত্তায় ভূমিকা রাখে।
উৎপাদনের পরিচিত কেন্দ্রগুলোর একটি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলায় মেঘনার পাড়ের লালপুর গ্রাম। প্রথম আলো ২০২৩ সালের মার্চে জানায়, গ্রামটি প্রায় ১০০ বছর ধরে শুঁটকির ব্যবসা করে আসছে; মেঘনার পাড়েই ২৬টি মাচা (স্থানীয় নাম ‘ডাঙ্গি’), পুরো গ্রামে ৫০টির বেশি, সেখানে কাজ করেন ৪০০ থেকে ৫০০ শ্রমিক, আর ব্যবসায়ী প্রায় ১৫০ জন ও আড়তদার ২০ জন। লালপুরে দুই ধরনের পণ্যই হয়: লবণযুক্ত ও লবণ ছাড়া শুকনা শুঁটকি, আর ভেজা শিঁদল, যাকে পত্রিকাটি চ্যাপা বলে উল্লেখ করেছে।
ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার সাভার গ্রামের এক উৎপাদককে নিয়ে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে প্রতিবেদন করে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড। তিনি জানান, ভালো মানের পুঁটি বেছে ভালোভাবে পরিষ্কার করে হালকা রোদে শুকান, তারপর আধা শুকনো মাছ মাটির নিচে রাখা মটকায় ভরে রাখেন; সেখানে মাছ পাকতে সাধারণত ছয় থেকে সাত মাস লাগে। পত্রিকাটিকে তিনি বলেন, তিনি লবণ ব্যবহার করেন না এবং নিজস্ব আরও কিছু পদ্ধতি প্রয়োগ করেন, যা তিনি প্রকাশ করতে চাননি।

মটকায় গাঁজন যেভাবে হয়
চ্যাপা তৈরির প্রধান সরঞ্জাম মটকা: গোল পেটওয়ালা, সরু গলার বড় মাটির পাত্র। হেলিয়নের জরিপে পাওয়া মটকার গলা প্রায় ২০ সেন্টিমিটার, মাঝের চওড়া অংশ প্রায় ৬০ সেন্টিমিটার ও উচ্চতা প্রায় ৯০ সেন্টিমিটার; ভরা অবস্থায় একেকটির ওজন ৫০ থেকে ৬০ কেজি, আর একেকটি থেকে চ্যাপা শুঁটকি মেলে ৩৬ থেকে ৪২ কেজি। আসাম ও ত্রিপুরায় ২০১২ সালের জরিপে ৮ থেকে ৪০ কেজি ধারণক্ষমতার মটকা দেখা গিয়েছিল।
ব্যবহারের আগে মটকার ভেতরের দেয়াল তেল দিয়ে বায়ুরোধী করা হয়। হেলিয়নের জরিপে উৎপাদকেরা মাছের নাড়িভুঁড়ি থেকে বের করা মাছের তেল ব্যবহার করতেন: পুরোনো মটকায় ০.২ থেকে ০.৫ লিটার, নতুন মটকায় প্রায় ১.৫ লিটার। মুজাদ্দাদি ও বসু একই প্রক্রিয়ার বিস্তারিত দিয়েছেন: ভেতরে তেল মাখিয়ে মটকা রোদে শুকানো হয়, আর মাটি আর তেল শুষতে না পারা পর্যন্ত সাত থেকে দশ দিন ধরে বারবার তেল মাখানো ও শুকানো চলে। এই তেল মাটির সূক্ষ্ম ছিদ্র বন্ধ করে, পণ্য শুকিয়ে যাওয়া ও চুইয়ে পড়া কমায় এবং বাড়তি স্বাদ দেয়। মাছের তেল কম পড়লে সরিষার তেল ব্যবহার হয়, তবে মাছের তেলে প্রস্তুত মটকাতেই সবচেয়ে ভালো মানের শিদল হয়।
মাছকেও কয়েকটি ধাপ পার হতে হয়। হেলিয়নের গবেষণায় উৎপাদকেরা মাছ ধুয়ে ১২ থেকে ১৫ দিন রোদে শুকাতেন, তারপর অল্প সময় পানিতে ভিজিয়ে রাখতেন (পুঁটি প্রায় ১৫ মিনিট, ফাইশা ৫ মিনিট, পোমা ১০ মিনিট), এবং রাতভর ছায়ায় বাঁশের চাটাইয়ে ছড়িয়ে রাখতেন। এরপর তেলমাখা মটকায় মাছ শক্ত করে ঠেসে ভরা হতো, আর মুখ বন্ধ করা হতো মাছের গুঁড়ার মণ্ড, মাটি ও পলিথিন দিয়ে। প্রায় ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস স্বাভাবিক তাপমাত্রায়, বাতাস ছাড়া, তিন থেকে বারো মাস ধরে গাঁজন চলত। বাংলাপিডিয়ার সংক্ষিপ্ত বিবরণে আছে, আঁশ ও নাড়িভুঁড়ি ফেলে ১২ থেকে ১৪ দিন রোদে শুকিয়ে মাটির পাত্রে তিন থেকে চার মাস রাখা হয়, আর তৈরি পণ্য প্রায় এক বছর মান ধরে রাখে।
উত্তর-পূর্ব ভারতের গ্রামীণ প্রচলিত পদ্ধতিতে মাছ আধা শুকানো হয়, যাতে প্রায় অর্ধেক আর্দ্রতা থেকে যায়, তারপর স্তরে স্তরে ভরে হাত দিয়ে চেপে দেওয়া হয়। মটকার গলা পর্যন্ত ভরা হয় শুকনা মাছ গুঁড়া করে বানানো মণ্ড দিয়ে, মাছি ঠেকাতে কয়েক দিন মানকচু, কলা বা লাউপাতা দিয়ে ঢেকে রাখা হয়, শেষে পুরু কাদামাটির প্রলেপে মুখ বন্ধ করা হয়। প্রলেপে ফাটল দেখা দিলেই নতুন প্রলেপ দিতে হয়, কারণ ফাটা মুখ দিয়ে পোকা ঢুকে পণ্য নষ্ট করে। গাঁজনের সময় কোনো লবণ দেওয়া হয় না; লবণ দেওয়া হয় কেবল খুচরা বিক্রির সময়, মটকা থেকে বের করার পর। গবেষকদের ভাষায়, ভালো শিদলের গা আঠালো, মাছের আকার অক্ষুণ্ণ, রং গাঢ় বাদামি, মাঝারি নরম, আর ঘ্রাণ তাঁরা পাকা তালের গন্ধের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
মুজাদ্দাদি ও বসু সংক্ষিপ্ত পথের বিষয়েও সতর্ক করেছেন। বাণিজ্যিক যেসব উৎপাদক কেনা পুরো শুকনো পুঁটি, মাছের তেলের বদলে সরিষার তেল এবং মাত্র দুই থেকে তিন মাসের গাঁজন ব্যবহার করেন, তাঁদের পণ্য রং, গঠন, স্বাদ ও ঘ্রাণে অনেক নিম্নমানের পেয়েছেন তাঁরা।
পুঁটি ও অন্য যেসব মাছ লাগে
হেলিয়নের গবেষণায় বাংলাদেশে তিন ধরনের চ্যাপা শুঁটকি পাওয়া গেছে, যে মাছ থেকে তৈরি সেই নামে: পুঁটি (মিঠাপানির পুনটিয়াস গণ), ফাইশা (মোহনার মাছ সেতিপিন্না) ও পোমা (সামুদ্রিক মাছ ওটোলিথয়েডিস)। উৎপাদনের ৫০ শতাংশ পুঁটি, ৪১ শতাংশ ফাইশা ও ৯ শতাংশ পোমা; পোমার চ্যাপা পাওয়া গেছে কেবল ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায়। ফাইশা ও পোমার উৎপাদকদের ৯০ শতাংশের বেশি অন্তত নয় মাস গাঁজন করেন, অথচ পুঁটির চ্যাপার ২৪ শতাংশ গাঁজানো হয় মাত্র তিন মাস।
পুঁটি মিঠাপানির ছোট মাছ। এর একটি বহুল বিস্তৃত প্রজাতি পুল বার্ব (Puntius sophore), যা ভারত, নেপাল, বাংলাদেশ, মিয়ানমার, ভুটান, আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও চীনের ইউনান প্রদেশের সমতল ও পাহাড়ের পাদদেশের নদী, খাল ও পুকুরে থাকে। দলবদ্ধভাবে চলা এই মাছ প্রচুর পাওয়া যায়, দৈর্ঘ্যে প্রায় ১৮ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়, আর আইইউসিএনের লাল তালিকায় এটি ‘ন্যূনতম উদ্বেগ’ শ্রেণিতে।
এমন মাছ গাঁজানোর কারণ লুকিয়ে আছে ঋতুর মধ্যে। মুজাদ্দাদি ও বসুর মতে, অঞ্চলটিতে মাছ ধরার ভরা মৌসুম মে থেকে সেপ্টেম্বর, যখন আর্দ্রতা বেশি আর ঘন ঘন বৃষ্টি হয়, ফলে শুধু রোদে শুকানো ধীর ও অনিশ্চিত। পুঁটির মতো কম দামের ছোট মাছের বড় চালান শুকনো মৌসুমে, নভেম্বর থেকে এপ্রিলে, যখন তাজা মাছের অভাব, খাওয়া ও বিক্রির জন্য রাখার উপায় দরকার ছিল জেলেদের। তাঁদের ধারণা, পদ্ধতিটি ব্রিটিশ আমলের আগেই চালু হয়েছিল, যখন উত্তর-পূর্ব ভারতে লবণ ছিল দুর্লভ ও দামি; এ কারণেই পণ্যটি লবণ ছাড়া তৈরি হয়। বাংলাদেশে হেলিয়নের জরিপে দেখা গেছে, চ্যাপা তৈরি হয় অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি, আর বিক্রি শুরু হয় জানুয়ারি থেকে, চলে সারা বছর।

দাম ও বেচাকেনা
জাগো নিউজের রেসিপিতে এক কড়াই সবজির জন্য চ্যাপা শুঁটকি লাগে মাত্র ৫০ গ্রাম; প্রকাশিত দামগুলো থেকেই বোঝা যায় এই অল্প পরিমাণের মূল্য কত। হেলিয়নের ২০২২ থেকে ২০২৩ সালের জরিপে পুঁটির চ্যাপা বিক্রি হয়েছে কেজিপ্রতি ১,৩০০ টাকায়, ফাইশার চ্যাপা ৭০০ টাকায় এবং পোমার চ্যাপা ১,০০০ টাকায়।
নান্দাইলের ওই উৎপাদক দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে জানান, তিনি সপ্তাহে তিন দিন, শনি, সোম ও বুধবার, নান্দাইল পৌরসভা বাজারে কেজিপ্রতি ১,২০০ টাকায় চ্যাপা বিক্রি করেন, আর দুজন সহকারীকে নিয়ে বছরে তাঁর ব্যবসা হয় ৩৫ থেকে ৪০ লাখ টাকার। তাঁর ক্রেতা বৃহত্তর ময়মনসিংহের নানা জেলায়, অনলাইন বিক্রেতাদের মাধ্যমে তাঁর পণ্য যায় দেশের অন্য অঞ্চলে, এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছেও।
লালপুর নিয়ে প্রথম আলো ২০২৩ সালের মার্চে জানায়, গ্রামটিতে সাধারণত বছরে ১৫০ থেকে ২০০ কোটি টাকার শুঁটকি বিক্রি হয়, তবে সে বছর ব্যবসায়ীরা ১০০ কোটি টাকার বিক্রি আশা করছিলেন। পাইকারিতে লবণ ছাড়া পুঁটি কেজিপ্রতি ৮০০ টাকা আর লবণযুক্ত পুঁটি ৬০০ টাকা, খুচরায় পুঁটির শুঁটকি ১,২০০ টাকা। এক কেজি লবণ ছাড়া শুঁটকিতে লাগে প্রায় সাড়ে তিন কেজি মাছ, লবণযুক্ত শুঁটকিতে তিন কেজি। ব্যবসায়ীরা পত্রিকাটিকে বলেন, আধুনিক সংরক্ষণাগার ও সরকারি সহায়তার অভাব এই ব্যবসাকে পিছিয়ে রেখেছে।
চ্যাপা দিয়ে আরও যেসব পদ
জাগো নিউজের সবজি ভুনা চ্যাপার নানা পদের একটি মাত্র। সবচেয়ে পরিচিত পদ ভর্তা, যা ভাতের সঙ্গে খাওয়া হয়। দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ২০২২ সালে এর পদ্ধতি লিখেছে: সিদল ভালো করে ধুয়ে গরম তেলে কাঁচামরিচ, রসুন ও পেঁয়াজের সঙ্গে ভেজে নিয়ে সব একসঙ্গে লবণ দিয়ে বেটে নিতে হয়। একই ফিচারে বলা হয়, রাস্তার পাশের দোকানে চিতই পিঠা সাধারণত সিদলের ভর্তার সঙ্গে পরিবেশন করা হয়।
সিলেট বিভাগে গাঁজানো মাছ দিয়ে রান্না হয় হুটকি শিরা, ঝোলজাতীয় একটি তরকারি, যাতে থাকে মৌসুমি সবজি, শাক আর মাছ বা চিংড়ি, এবং ব্যতিক্রমীভাবে এটি রান্না হয় তেল বা চর্বি ছাড়া। বিশ্বকোষে এর উপকরণের তালিকায় আছে হিদল মাছ, রসুন, পেঁয়াজ, আলু, পালংশাক, বেগুন, মরিচ, হলুদ ও লবণ; মৌসুম অনুযায়ী লাউপাতা, মুলা বা কচু যোগ হয়, আর রান্নার আগে গাঁজানো মাছ ঠান্ডা পানিতে ভিজিয়ে নেওয়া হয়।
ত্রিপুরায় মুজাদ্দাদি ও বসু দেখেছেন, শিদলের চাটনি সবচেয়ে প্রচলিত পদ, যা প্রতিদিনের ভাতের সঙ্গে খাওয়া হয়; এর পাশাপাশি আছে শিদল-গোদক, শিদল-সবজির ঝোল ও শিদলের তরকারি। পণ্যটির একটি অসুবিধার কথাও তাঁরা লিখেছেন: এর গন্ধ, যা রান্নার সময় ছড়িয়ে পড়ে এবং যাঁরা খান না সেই প্রতিবেশীদের বিরক্ত করতে পারে। তাঁদের ভাষায়, অঞ্চলের রাঁধুনিরা গন্ধ কমাতে ঝাল মসলা ও তেল যোগ করেন এবং মাছ ভেজে বা সেদ্ধ করে নেন; জাগো নিউজের রেসিপিতে শুঁটকি আগে তাওয়ায় ভাজা ও দীর্ঘক্ষণ কষানোর উদ্দেশ্যও সেটিই।
খাদ্য নিরাপত্তা: গবেষক ও কর্তৃপক্ষ যা জানিয়েছিল
চ্যাপা খোলা মাচায় নয়, বন্ধ মটকায় তৈরি হয়, তবু শুঁটকির সাধারণ কিছু ঝুঁকি এর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বাংলাপিডিয়া জানায়, শুঁটকি প্রতি বছর ওজন হারায় শুকানোর সময় ব্লো-ফ্লাই মাছি ও তার লার্ভার কারণে, বিশেষ করে মেঘলা ও বৃষ্টির দিনে, আর গুদামে বিটল ও মাইটের কারণে। হেলিয়নের গবেষকেরা লিখেছেন, অবাঞ্ছিত অণুজীব কখনো কখনো গাঁজনে বাধা দিয়ে এই মূল্যবান খাবার নষ্ট করে, আর উৎপাদনপদ্ধতি ও স্বাস্থ্যবিধি এখনো মানসম্মত করা হয়নি; তাঁদের গবেষণাটি ছিল সেই মান নির্ধারণের কাজের অংশ।
কীটনাশক নিয়ে রেসিপি প্রকাশের আগে সর্বশেষ সরকারি তথ্য আসে ২০২৫ সালের ১৪ মে, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষে (বিএফএসএ) একটি গবেষণা উপস্থাপনের সময়। ঢাকা ট্রিবিউন ও ইউএনবির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) চিংড়ি গবেষণা কেন্দ্র ২০২২-২৩ অর্থবছরের সাতটি গবেষণার একটি হিসেবে কাজটি করে। এতে দেশের পাঁচটি প্রধান শুঁটকি উৎপাদন এলাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, দুবলার চর, নাটোরের চলনবিল ও সুনামগঞ্জ থেকে ৪০৫টি নমুনা বিশ্লেষণ করা হয়। মূল ২৬০টি নমুনার ১৩ শতাংশে শনাক্তযোগ্য মাত্রায় কীটনাশকের অবশেষ পাওয়া যায়, বাকি ৮৭ শতাংশ খাওয়ার জন্য নিরাপদ বিবেচিত হয়। সব অঞ্চলেই এন্ডোসালফান সালফেট বেশি মাত্রায় পাওয়া গেছে, অল্প পরিমাণে মিলেছে ডিলড্রিন, হেপ্টাক্লোর ইপক্সাইড ও বিটা-এন্ডোসালফান।
গবেষণায় দেখা যায়, রান্নার পর অবশেষের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়, আর কীটনাশকের ব্যবহার মূলত সেই মাসগুলোতে রোদে শুকানোর সঙ্গে যুক্ত, যখন রোদ যথেষ্ট থাকে না, অক্টোবর থেকে মার্চ। উপস্থাপনায় বক্তারা বলেন, শুঁটকি কয়েক ঘণ্টা পানি বা লবণপানিতে ভিজিয়ে রাখলে ক্ষতিকর প্রভাব কমতে পারে; আর বিএফএসএর চেয়ারম্যান বলেন, প্রাথমিক গবেষণায় উদ্বেগজনক মাত্রা পাওয়া গেলে কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্টদের কাছে বড় পরিসরের গবেষণার প্রস্তাব দেবে। গবেষণাটি ওই পাঁচ এলাকার শুঁটকি নিয়ে; আলাদা করে চ্যাপা নিয়ে নয়।
জাগো নিউজের রেসিপিতেও পরিষ্কারের ধাপ আছে: চ্যাপা আগে তাওয়ায় ভেজে ভালোভাবে পরিষ্কার করে ধুয়ে তারপর বাটতে হয়। কোনো পণ্যের মান নিয়ে সন্দেহ থাকলে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা বা স্থানীয় নিরাপদ খাদ্য কার্যালয়ের পরামর্শ নেওয়া যায়।

ছবি: Nawshin Saiyara / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪ (২০ জুন ২০২৬), হেলিয়ন (ফারহানা ও অন্যান্য, জানুয়ারি ২০২৫), ইন্ডিয়ান জার্নাল অব ট্র্যাডিশনাল নলেজ (মুজাদ্দাদি ও বসু, এপ্রিল ২০১২), বাংলাপিডিয়া, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (১০ সেপ্টেম্বর ২০২২), প্রথম আলো (১৮ মার্চ ২০২৩), ঢাকা ট্রিবিউন ও ইউএনবি (১৪ মে ২০২৫), দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস (২৪ জানুয়ারি ২০২২), উইকিপিডিয়া (ভুনা, ফোড়ন, পুঁটি, হুটকি শিরা)





মন্তব্য
(০)