দক্ষিণ হন্ডুরাসের চোলুতেকা বিভাগে আখ, ঢেঁড়স ও কফিচাষিদের তিনটি সংগঠন নিজেদের ফসলকে গ্রামের মানুষের স্থায়ী কাজের উৎসে পরিণত করেছে। বিশ্বব্যাংক ২০২৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, তিনটি সংগঠনই হন্ডুরাস সরকারের বাস্তবায়িত ও বিশ্বব্যাংক-সমর্থিত কমরুরাল টু প্রকল্পের সহায়তা পেয়েছে। চোলুতেকা বিভাগের পশ্চিমে ফনসেকা উপসাগর, পূর্ব ও দক্ষিণে নিকারাগুয়া। বিভাগটির আয়তন প্রায় ৪ হাজার ৩৯৭ বর্গকিলোমিটার, ২০১৫ সালের শুমারিতে জনসংখ্যা ছিল ৪ লাখ ৪৭ হাজার ৮৫২। কৃষি, মাছ ধরা, চিনি উৎপাদন ও চিংড়ি চাষ এখানকার অর্থনীতির বড় অংশ।
দেশের প্রথম গুঁড়া আখের কারখানা
চোলুতেকার পাহাড়ি ঢালের আখখেত থেকে কাঁচামাল যায় হন্ডুরাসের প্রথম গুঁড়া আখের শিল্পকারখানায়। কারখানাটি গড়েছে ‘ইউনিয়ন অব সুগারকেন প্রডিউসারস অব দ্য সাউথ’ বা উপ্রোকাসুর। এখানে ২০০-র বেশি স্থায়ী কাজ আছে, আর ফসল তোলার মৌসুমে কাজ পান ১ হাজার পর্যন্ত মানুষ।
উদ্যোগটি এসেছিল সংগঠনের পর্ষদের ভাবনা থেকে। পর্ষদ সদস্য ও আখচাষি মাউরিসিও লারিওস বলেন, ‘আমরা শুধু ফসল তোলায় থেমে না থেকে চিনি প্রক্রিয়াজাত করে মূল্যশৃঙ্খলের আরও ধাপ নিজেদের হাতে নিতে চেয়েছিলাম।’ ভালো চর্চা শিখতে তাঁরা কলম্বিয়াও গিয়েছিলেন। সংগঠনের সভাপতি এভেনিলদা মোরান জানান, পরিবহন, ফসল তোলা, প্রশাসনিক, পরিচ্ছন্নতা ও কারিগরি সেবা ভাড়া করে কারখানাটি স্থানীয় অর্থনীতিকে চাঙা করছে। ২০২৩ সালে বড় পরিমাণ পণ্য কিনতে রাজি হওয়া এক আন্তর্জাতিক ক্রেতা হঠাৎ মারা গেলে সংগঠনটি ধাক্কা খায়; সহায়তা চেয়ে তারা কাজ চালিয়ে গেছে।

সংকট থেকে ঢেঁড়স রপ্তানির প্রতিষ্ঠান
হন্ডুরাসে কর্মশক্তির প্রায় ৮০ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে টিকে থাকে, বিশেষ করে গ্রামে। বিশ্বব্যাংকের মতে, বড় পরিমাণে রপ্তানি হওয়া ঢেঁড়স কাভেক্সার মতো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সেই ফাঁক কমাচ্ছে। ক্ষুদ্র উৎপাদকদের সমিতি হিসেবে শুরু হওয়া প্রতিষ্ঠানটি এখন ৬০০-র বেশি মানুষকে স্থায়ী কাজ দেয়। এটি ২০০ মানসানা জমিতে ঢেঁড়স চাষ করে, গড় ফলন ২ হাজার ৬২৫টি সাত কেজির বাক্স, যা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, ইতালি ও পর্তুগালে দিনে এক কনটেইনার রপ্তানি হয়। ঢেঁড়স (Abelmoschus esculentus) মালভেসি গোত্রের ফসল, আদি নিবাস পূর্ব আফ্রিকা; গরম ও খরা ভালো সইতে পারে।
কাভেক্সার জন্ম এক সংকট থেকে। এক কৃষিপণ্য রপ্তানিকারক চাষিদের ব্যাপকভাবে ফসল বদলাতে রাজি করিয়ে পরে ফসল কিনতে পারেনি। হুয়ান অর্দোনিয়েস বলেন, ‘আমরা ঢেঁড়সভর্তি কনটেইনার পাঠিয়ে প্রত্যাশার সামান্য অংশই পেয়েছিলাম। ১৮০-র বেশি উৎপাদক দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে ছিলেন।’ চাষিরা তখন উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রেখে কোম্পানি গড়েন এবং যন্ত্রপাতি ও স্থাপনার অর্থ পেয়ে একে টেকসই উৎপাদনের আঞ্চলিক দৃষ্টান্তে পরিণত করেন। উৎপাদক দেনিয়া কালদেরন বলেন, ‘ঢেঁড়সের বদৌলতে আমি অনেক ঋণ শোধ করেছি আর ঘর ভালো করেছি।’

স্পেশালটি কফির সমবায়
হন্ডুরাসের অর্থনীতিতে কফির বড় ভূমিকা আছে; ২০১১ সালে দেশটি মধ্য আমেরিকার শীর্ষ কফি উৎপাদক হয়। চোলুতেকায় সান মার্কেনিয়া কফি সমবায় (কোকাসাম) ১১ কুইন্তাল কফি উৎপাদন করে এবং পুরোটাই স্পেশালটি কফি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সে রপ্তানি করে। সমবায়ের কর্মী আনা হুলিয়া রিওস বলেন, ‘স্বামী মারা যাওয়ার পর তাঁরা আমাকে কাজের সুযোগ দেন, তাতে পাঁচ সন্তানের ভরণপোষণ করতে পেরেছি, আর আজ এই কাজেই আমার দরকারি ইনসুলিনের খরচ চলে।’ কফিখামারে জন্ম নেওয়া এরিক পাস্ত্রানা মান-নিয়ন্ত্রণ বিভাগে প্রশিক্ষণ নিয়ে এখন সমবায়ের রপ্তানি করা কফিগুলো আলাদা করে চিনতে পারেন।

কমরুরাল টু প্রকল্পের সহায়তা
বিশ্বব্যাংকের প্রকল্প তালিকা অনুযায়ী, ‘ইন্টিগ্রেটিং ইনোভেশন ফর রুরাল কম্পিটিটিভনেস ইন হন্ডুরাস’ বা কমরুরাল টু প্রকল্পটি ২০১৯ সালের ২৭ জুন অনুমোদন পায়; অঙ্গীকার ৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার, বাস্তবায়নকারী হন্ডুরাসের কৃষি ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়।
বিশ্বব্যাংক জানায়, প্রকল্পটি সারা দেশে ১৯টি ব্যবসা পরিকল্পনায় সহায়তা দিয়েছে, উপকৃত হয়েছেন ১০ হাজারের বেশি মানুষ। অর্থায়নের পাশাপাশি এটি কারিগরি সহায়তা, অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ দেয়। এর ‘প্রাইভেট ফাইন্যান্সিয়াল অ্যালাই’ ব্যবস্থা উপ্রোকাসুর, কাভেক্সা ও কোকাসামের মতো উদ্যোগে ১ কোটি ৪০ লাখ ডলারের বেশি বেসরকারি পুঁজি এনেছে, আর প্রকল্প-সমর্থিত ব্যবসা পরিকল্পনায় ৩ হাজার ২০০-র বেশি হন্ডুরাসবাসী কাজ পেয়েছেন। প্রকল্পটি কর্মসংস্থান, প্রবৃদ্ধি ও খাদ্য নিরাপত্তায় সক্ষম ক্ষুদ্র কৃষির জন্য বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বৈশ্বিক উদ্যোগ ‘অ্যাগ্রিকানেক্ট’-এর সঙ্গে সংগতিপূর্ণ।
ছবি: Intimaralem85 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: বিশ্বব্যাংক, বিশ্বব্যাংক প্রকল্প তালিকা (কমরুরাল টু, P168385), উইকিপিডিয়া (চোলুতেকা বিভাগ, ঢেঁড়স, হন্ডুরাসের কফি উৎপাদন)





মন্তব্য
(০)