নেত্রকোনা জেলার আটপাড়া উপজেলার একটি কৃষক সংগঠন গড়ে তুলেছে 'ফসলের হাসপাতাল', যেখানে কৃষকেরা রোগাক্রান্ত শস্যের সমাধান পান বলে জানিয়েছেন এর উদ্যোক্তারা। ২০২৬ সালের ২ জুন প্রকাশিত বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্ষেতের ফসল পোকামাকড় বা রোগবালাইয়ে আক্রান্ত হলে কীটনাশক প্রয়োগ না করে প্রাকৃতিক উপায়ে পোকা দমন ও বালাই নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দেওয়াই এই হাসপাতালের কাজ।
"কৃষকরা রোগাক্রান্ত শস্যের স্যাম্পল নিয়ে আমাদের হাসপাতালে আসলে মূলত কোন রোগের জন্য কোন ঔষধ লাগবে এবং সেটা কীভাবে বানানো ও ব্যবহার করতে হবে সেই পরামর্শ দেওয়া হয়," বিবিসি বাংলাকে বলেন হাসপাতালটির ব্যবস্থাপনায় জড়িতদের একজন আবদুল ওয়াদুদ খান। তিনি জানান, পরামর্শ দেওয়ার কাজটি করেন তাদের কৃষক সংগঠনের প্রশিক্ষিত কয়েকজন সদস্য।
হাওরপাড়ের কৃষকদের দেড় দশকের উদ্যোগ
হাসপাতালটির মূল উদ্যোক্তা 'বাঘড়া হাওর কৃষক সমিতি'। প্রায় দেড় দশক আগে সংগঠনটি এর গোড়াপত্তন করে। আবদুল ওয়াদুদ খানের ভাষ্য, ২০১০-১১ সালের দিকে ফসলের পোকামাকড় সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে করতেই ধারণাটি তাদের মাথায় আসে। "আমরা তখন মুরুব্বিদের সাথেও কথা বলি। যাদের কৃষিকাজে অনেক অভিজ্ঞতা," বলেন তিনি। "এরপর আমরা ভাবলাম মানুষ কিংবা পশুর জন্য হাসপাতাল থাকলে ফসলের জন্যও হতে পারে।"
তার কথায়, হাসপাতাল গড়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল সার বা কীটনাশক ব্যবহার না করেও যে ক্ষেতের ফসলকে রোগমুক্ত ও নিরাপদ রাখা যায়, সে বিষয়ে কৃষকদের উৎসাহিত করা।
আটপাড়া ময়মনসিংহ বিভাগের নেত্রকোনা জেলার সবচেয়ে ছোট উপজেলা; ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী সেখানে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৮৫৫ জনের বাস। হাওর হলো দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বাটির মতো নিচু জলাভূমি, যা বর্ষায় ডুবে যায় আর শুকনো মৌসুমে জেগে ওঠা জমিতে সাধারণত বোরো ধানের চাষ হয়।

পাঁচ বিষয়ে প্রশিক্ষিত পরামর্শদাতা
হাসপাতালের সঙ্গে জড়িত আরেকজন কৃষক সায়েদ আহমেদ খান বাচ্চু জানান, কোনো শস্য বালাই আক্রান্ত হলে যথাযথ বালাইনাশক কোনটি হবে এবং সেটি কীভাবে তৈরি করতে হবে, হাসপাতাল থেকে সেই পরামর্শ দেওয়া হয়। "আমরা ৫/৭ জনকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দিয়েছি। তারা একেকজন একেক বিষয়ে প্রশিক্ষিত," বলেন তিনি। তার ভাষায়, কেউ শস্যের জাত, কেউ পোকামাকড় দমন, কেউ জাত সংরক্ষণ, এমন পাঁচটি বিষয়ে তারা পরামর্শ দেন, এবং কোন শস্যে কোন পোকা লেগেছে তা দেখে সেই অনুযায়ী বালাইনাশকের পরামর্শ দেওয়া হয়।
হাসপাতালের সঙ্গে কাজ করা স্থানীয় কৃষক মোহাম্মদ নইম মিয়া জানান, বালাইনাশক বা জৈব সার ব্যবহারের পাশাপাশি তারা বিভিন্ন ফসলের জাত সংরক্ষণ নিয়েও কাজ করছেন।
উদ্যোগটিকে সহায়তা দিচ্ছে বেসরকারি সংস্থা বারসিক। সংস্থাটির নেত্রকোনা অঞ্চলের সমন্বয়ক অহিদুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলেন, বীজ সংরক্ষণ, বালাইনাশক ও ফসলের রোগের মতো পাঁচটি বিষয়ে অভিজ্ঞ প্রশিক্ষিত ব্যক্তিরা সেখানে কাজ করছেন। কোন রোগের সমাধান কীভাবে হতে পারে, তার একটি চার্ট তৈরি করে সেটি অনুসরণ করেই তারা কৃষকদের পরামর্শ দেন। "পুরো ব্যাপারটিই আসলে প্রাকৃতিক ও পরিবেশ সম্মত। এটি জমির গুণাগুণ রক্ষায় সহায়ক হচ্ছে," বলেন তিনি। তিনি আরও জানান, হাসপাতাল পরিচালনায় জড়িতরা নিজেরাও কীটনাশক ছাড়া চাষ করছেন এবং অন্য কৃষকদের এ বিষয়ে সচেতন করছেন।

সবজিচাষিরা বেশি আসেন, ধানচাষিরা কম
অহিদুর রহমানের ভাষ্য, ব্যতিক্রমী এই হাসপাতালে সবজি চাষ করা কৃষকরাই বেশি আসেন এবং সমস্যা সমাধানে পরামর্শ ও সহায়তা পান। উদ্যোক্তারা জানান, ধানচাষিরা তুলনায় কম আসেন, কারণ তারা কীটনাশকের ওপরই বেশি নির্ভর করতে চান। তবে অন্য অনেক শস্যের ক্ষেত্রে কৃষকেরা নিয়মিতই এসে পরামর্শ নেন।
সরকারি কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগও উদ্যোগটির কথা জানে। নেত্রকোনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আমিরুল ইসলাম বলেন, কৃষি ও কৃষকের জন্য যেকোনো ভালো উদ্যোগকেই তারা ইতিবাচক মনে করেন। "আমাদের কাছে তারা এসেছিল। আমরা শুধু বলেছি যে যারা পরামর্শ দেবেন তারা যেন কৃষককে অথেনটিক (নির্ভরযোগ্য) পরামর্শ দেন," বলেন তিনি।

কীটনাশক কমানোর তাগিদ কেন
বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের কৃষকেরা চাষাবাদে সার ও কীটনাশকের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, বিশেষ করে ধানে সারের ব্যবহার বেশি। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, বেশি সার ব্যবহারে জমির উর্বরতা কমে যায়; আর ক্ষতিকর পোকা মারতে গিয়ে অনেক উপকারী পোকামাকড়ও ধ্বংস হয়। কীটনাশক দেওয়ার পর অপেক্ষার সময় শেষ হওয়ার আগে ফসল তোলা বিপজ্জনক বলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেন, আর কৃষি বিভাগ সহনীয় মাত্রায় ব্যবহারে জোর দেয়।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) একই লক্ষ্যে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা বা আইপিএম পদ্ধতির কথা বলে। এফএওর সংজ্ঞায়, আইপিএম জৈবিক, রাসায়নিক, ভৌত ও ফসলভিত্তিক চাষপদ্ধতি মিলিয়ে সুস্থ ফসল ফলানো এবং কীটনাশকের ব্যবহার ন্যূনতম রাখার পদ্ধতি, যাতে মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ঝুঁকি কমে। এফএও বলছে, কীটনাশক কম ব্যবহারে খাদ্যে অবশিষ্টাংশ ও উৎপাদন খরচ দুটোই কমে।
নেত্রকোনার 'ফসল হাসপাতালের' উদ্যোক্তারা বলছেন, স্বল্প পরিসরে হলেও তারা এই হাসপাতালের মাধ্যমে কৃষকদের দেখাতে চান যে জৈব সার ও প্রাকৃতিক বালাইনাশক দিয়েই ভালো ফলন সম্ভব।
ছবি: Redmin / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 4.0)
সূত্র: বিবিসি বাংলা, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)