২০২৬ সালের জুলাইয়ের টানা বৃষ্টিতে বগুড়া জেলার ৪১৭ হেক্টর ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে যায়। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ১৫ জুলাই পর্যন্ত প্রস্তুত করা প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এতে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হন ৪ হাজার ৯৬১ জন কৃষক। করলা, লাউ, কুমড়া, পাট ও আমনের বীজতলা পানিতে পচে যাওয়ার মধ্যেই শহরের কাঁচাবাজারে এক সপ্তাহের ব্যবধানে বেশির ভাগ সবজির দাম বেড়ে যায়। ১৭ জুলাই জাগো নিউজের বগুড়া প্রতিবেদনে মাঠ ও বাজারের এই চিত্র উঠে আসে।
বগুড়া আবহাওয়া অফিসের তথ্যে, ১ থেকে ১৪ জুলাই জেলায় ৩০৯ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। এর মধ্যে শুধু ৯ জুলাই ১০৯ দশমিক ৮ মিলিমিটার এবং ১৩ ও ১৪ জুলাই ১০৮ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়। ঢাকা ট্রিবিউন ১৫ জুলাই জানায়, আগের বছরের পুরো জুলাই মাসে জেলায় বৃষ্টি হয়েছিল ৩৯৫ দশমিক ৩ মিলিমিটার। আবহাওয়া অফিস ১৭ জুলাই থেকে আবার ভারী বর্ষণের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছিল।
কোন উপজেলায় কত জমি ডুবেছে
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় যমুনা তীরের উপজেলা সারিয়াকান্দি; সেখানে ১৮৮ হেক্টর জমি পানির নিচে চলে যায় এবং ক্ষতির মুখে পড়েন ৭৫০ জন কৃষক। কাহালুতে ৭৫ হেক্টর (৪৯১ জন কৃষক), দুপচাঁচিয়ায় ৫৫ হেক্টর (৪৭০ জন), আদমদীঘিতে ৪৫ হেক্টর (৩৮৫ জন), সোনাতলায় ৩৮ হেক্টর (৩২৪ জন), শিবগঞ্জে ১৭ হেক্টর (১০০ জন) এবং শাজাহানপুরে ১৪ হেক্টর (৯১ জন) জমি নিমজ্জিত হয়।
ফসলভিত্তিক হিসাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ১২৬ হেক্টর আমনের বীজতলা, ১১৫ হেক্টর পাট, ১০৬ হেক্টর সবজি, ৩৪ হেক্টর আউশ, ২৩ হেক্টর মরিচ এবং ১৩ হেক্টর অন্যান্য ফসল। বাংলাদেশে ধান আবাদ হয় তিন মৌসুমে: আমন, আউশ ও বোরো। বীজতলা নষ্ট হলে আমনের চারা রোপণেই টান পড়ে, তাই কৃষি সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করেন, এ ক্ষতির প্রভাব সামনের মাসগুলোর উৎপাদন ও বাজারেও থাকতে পারে। মৌসুমে জেলায় ৬ হাজার ৭৫১ হেক্টরে সবজির আবাদ হয়েছিল; এর মধ্যে ১০৬ হেক্টর খেত ডুবে যায়, ক্ষতিগ্রস্ত হন ১ হাজার ৩৭৭ জন সবজিচাষি।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা যা বলেছেন
বগুড়া সদর উপজেলার শাখারিয়া দক্ষিণপাড়া গ্রামের করলাচাষি আমিরুল হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, করলা চাষে তিনি প্রায় ১৫ হাজার টাকা খরচ করেছিলেন; বিক্রি শুরুর আগেই বৃষ্টিতে পুরো খেত পানির নিচে চলে যায় এবং সব গাছ পচে যায়। একই গ্রামের কৃষক মাহফুজ ১৪ শতক জমিতে লাউ ও কুমড়া চাষ করেছিলেন; তিনি জানান, বৃষ্টিতে মাচা ভেঙে গেছে, লাউ ও কুমড়ায় পচন ধরেছে। কালিবালা এলাকার কচুচাষি শামছুর রহমানের হিসাবে তাঁর ক্ষতি প্রায় ৩০ হাজার টাকা।
অনেক কৃষক জানান, ভালো ফলনের আশায় তাঁরা ধারদেনা করে বীজ, সার ও কীটনাশক কিনেছিলেন, তাই ঋণ শোধ নিয়েও তাঁরা অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। কৃষকদের দাবি, অনেক জমিতে তখনো পানি জমে থাকায় প্রাথমিক তালিকায় ক্ষতির পুরো চিত্র আসেনি।

এক সপ্তাহে সবজির দাম
জাগো নিউজের প্রতিবেদক বগুড়া শহরের রাজাবাজার ও ফতেহ আলী বাজারে দেখেন, কয়েক দিন আগের ৬০ টাকা কেজির কাঁচা মরিচ বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকায়। মানভেদে বেগুন ৬০ থেকে ৮০ টাকা থেকে বেড়ে ৮০ থেকে ১০০ টাকা, ঝিঙ্গা ও বরবটি ৩০ টাকা থেকে বেড়ে ৭০ টাকা কেজি হয়। ঢেঁড়স বিক্রি হয় ৪০ টাকায়, কচুর লতি ৫০ থেকে বেড়ে ৭০ টাকায়, পটল ২০ থেকে ৩০ টাকায়, আর প্রতি পিস লাউ ৩০ থেকে বেড়ে ৫০ টাকায়। শসা মানভেদে বিক্রি হয় ৮০ থেকে ১২০ টাকা কেজি।
পাকরি আলু ২৫ থেকে ৪০ টাকা কেজি, আদা ১০০ থেকে ১৬০ টাকা এবং লেবু প্রতি হালি ১০ থেকে ১৬ টাকায় ওঠে। রসুন ১২০ টাকা ও গাজর ১৬০ টাকায় অপরিবর্তিত থাকে; টমেটো আগের সপ্তাহের ৩০০ টাকা কেজি থেকে নেমে আসে ১৬০ টাকায়।
ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ার কারণ হিসেবে সরবরাহ সংকটের কথা বলেন। রাজাবাজারের সবজি বিক্রেতা শামিম হোসেন জানান, কৃষকেরা খেতে ঢুকতে না পারায় মোকাম থেকে আগের মতো সবজি আসছে না, কম মাল আসায় বেশি দামে কিনে বেশি দামে বেচতে হচ্ছে। ফতেহ আলী বাজার বহুমুখী সমবায় সমিতির নেতা লেলিন হোসেন বলেন, অধিকাংশ সবজির দাম কেজিতে ২০ থেকে ৪০ টাকা, কোথাও তারও বেশি বেড়েছে, তবে মাছ ও মুরগির বাজার স্থিতিশীল।

কৃষি বিভাগ যা বলেছে
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সোহেল মো. শামসুদ্দীন ফিরোজ জাগো নিউজকে বলেন, বৃষ্টি থেমে গেলে অনেক খেতেই নতুন করে উৎপাদনের সুযোগ থাকবে, কিন্তু আবার ভারী বর্ষণ হলে ক্ষতি বাড়বে এবং বাজারেও এর নেতিবাচক প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক মাহফুজ আলম ঢাকা ট্রিবিউনকে জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করা হয়েছে; সহায়তার সরকারি নির্দেশনা তখনো আসেনি, তবে সহায়তা ঘোষণা হলে কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচিতে তাঁরা অগ্রাধিকার পাবেন।
ছবি: Masum-al-hasan / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, ঢাকা ট্রিবিউন, উইকিপিডিয়া (সারিয়াকান্দি উপজেলা, বাংলাদেশে ধান উৎপাদন)





মন্তব্য
(০)