২০২৫-২৬ সালের শীত মৌসুমে দিনাজপুরে পরিকল্পনার চেয়ে বেশি জমিতে সূর্যমুখীর চাষ হয়েছিল। ২০২৬ সালের ১৩ মার্চ জাগো নিউজের দিনাজপুর জেলা প্রতিনিধি জানান, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) জেলায় এই ফসলের জন্য ৫৪ হেক্টর জমির লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছিল, আর চাষ হয়েছে ৫৫ হেক্টরে, অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১ হেক্টর বেশি। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে বাম্পার ফলনের আশা করছিলেন কৃষক ও কৃষি বিভাগ। সদর ও বিরল উপজেলার সোনালি মাঠে তখন দর্শনার্থীরাও ভিড় করতে শুরু করেছিলেন; তারা ফুলের ভেতর দিয়ে হেঁটে বেড়াতেন আর ছবি তুলতেন।
লক্ষ্যমাত্রা ছাড়াল ১ হেক্টর
জেলার হিসাব দেন দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) মো. আনিছুজ্জামান। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘দিনাজপুরে এবার সূর্যমুখী চাষের জন্য ৫৪ হেক্টর জমি নির্ধারণ করা হয়। তবে অর্জন হয়েছে ৫৫ হেক্টর। প্রতি হেক্টরে উৎপাদন হবে ১.২৫ মেট্রিক টন বীজ। সে হিসেবে এবার জেলায় ৬৯ মেট্রিক টন সূর্যমুখীর বীজ উৎপাদন হবে।’
৬৯ মেট্রিক টন ছিল প্রত্যাশা, প্রকৃত ফলন নয়: মার্চের মাঝামাঝি মাঠে ফুল ফুটে ছিল, বীজ তখনো তোলা হয়নি। হেক্টরপ্রতি ১.২৫ মেট্রিক টন ফলনের হারটি ডিএই কর্মকর্তা নিজের হিসাবের জন্য ধরেছিলেন। দেশে সূর্যমুখীর ফলন নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে নানা রকম তথ্য পাওয়া যায়। জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া দেশে সূর্যমুখীর গড় ফলন হেক্টরে প্রায় ৭৬০ কেজি বলে উল্লেখ করেছে, অথচ সংকর বীজ ও উন্নত ব্যবস্থাপনা কাজে লাগানো খামারগুলোর প্রতিবেদনে এর চেয়ে অনেক বেশি ফলনের কথা আছে; নিচের অংশগুলোতে তা দেখানো হয়েছে।
দিনাজপুরের মতো বড় জেলার জন্য ৫৫ হেক্টর খুব বেশি জমি নয়। তবে দেশেই বেশি তেলবীজ উৎপাদনের সরকারি উদ্যোগের অংশ হিসেবে উত্তরাঞ্চলে এই ফসল ছড়িয়ে পড়ছিল, আর জাগো নিউজের প্রতিবেদনে একে কম খরচে বেশি লাভের সম্ভাবনাময় ফসল হিসেবেই তুলে ধরা হয়।
সদর ও বিরলের কৃষকের মাঠ
সদর উপজেলার খামার কান্তবাড়ী বিদ্যাশ্বরি গ্রামের সহরাফ আলী ১ একর জমিতে সূর্যমুখী চাষ করেছিলেন। তিনি পত্রিকাটিকে বলেন, ‘গত ৭ বছর ধরে সূর্যমুখী চাষ করছি। এবার পরিকল্পিতভাবে চাষ করেছি। ফুলও এসেছে। তাই দর্শনার্থীরা ৫০ টাকা টিকিট দিয়ে বাগানে ঢুকে ঘুরে বেড়ানোসহ ইচ্ছেমতো ছবি তুলতে পারবেন।’
বিরল উপজেলার মঙ্গলপুর ইউনিয়নের গরুল গ্রামের মাঠগুলোকে প্রতিবেদক বর্ণনা করেন সোনার সমুদ্র হিসেবে; হালকা হাওয়ায় দুলছিল হলুদ ফুলগুলো। কম খরচে বেশি লাভের সম্ভাবনা আর অপরূপ দৃশ্য মিলিয়ে উপজেলার কৃষকদের মুখে হাসি ফুটেছিল, আর মাঠ দেখতে ভিড় জমাচ্ছিলেন গ্রামের মানুষসহ দূর-দূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীরা।
গরুল গ্রামের কৃষক রবিউল ইসলাম ৪৮ শতাংশ জমিতে সূর্যমুখী চাষ করেছিলেন, আর তাকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে অন্য কৃষকেরাও এই ফসলের দিকে ঝুঁকছিলেন। বিরল উপজেলা কৃষি অফিসের হিসাবে সেই মৌসুমে উপজেলায় ৪ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখীর চাষ হয়। প্রতিদিন মানুষ ছবি ও সেলফি তুলতে আসছিলেন, আর সোনালি মাঠ হয়ে উঠেছিল ছোট একটি পর্যটনকেন্দ্র।
কৃষক রবিউল ইসলাম বলেন, ‘আমি গত বছর প্রাথমিকভাবে চাষ করেছিলাম। এবার একটু বেশি জমিতে লাগিয়েছি। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ভালো লাভ হবে। উপজেলা কৃষি অফিসের সব ধরনের সহায়তা ও নিয়মিত পরামর্শ আমাদের চাষে অনেক সাহায্য করছে।’
দর্শনার্থী আকতারা খাতুন বলেন, ‘আমি এ রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ চোখে পড়লো সূর্যমুখীর বাগান। সঙ্গে সঙ্গে থামলাম। সোনালি সূর্যমুখীর সমুদ্র যেন আমার চোখের সামনে ফুটে উঠলো। প্রতিটি কোণই ছবি তোলার জন্য বিশেষ। সত্যিই অসাধারণ এক অভিজ্ঞতা!’
বিরল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ রুম্মান আক্তার এই ফসলকে জেলার জন্য একটি সম্ভাবনা হিসেবে দেখেন। তিনি বলেন, ‘আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করলে সূর্যমুখী হতে পারে জেলার সম্ভাবনাময় অর্থকরী ফসল। ভোজ্যতেলের ওপর আমদানি নির্ভরতা কমানোর জন্য সরকার কৃষকদের প্রণোদনা দিচ্ছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে চলতি মৌসুমে কৃষকেরা ভালো দাম পাবেন। বিরল উপজেলায় এ মৌসুমে মোট ৪ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখী চাষ হয়েছে।’

দিনাজপুর ও বিরল: সীমান্তের কৃষিনির্ভর জনপদ
দিনাজপুর দেশের উত্তর-পশ্চিমে রংপুর বিভাগের একটি জেলা। বাংলাপিডিয়ার তথ্যে জেলার আয়তন ৩ হাজার ৪৪৪.৩০ বর্গকিলোমিটার, উপজেলা ১৩টি। এর উত্তরে ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়, পূর্বে রংপুর ও নীলফামারী এবং পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য। পুনর্ভবা, আত্রাই ও তুলসীগঙ্গা জেলার উল্লেখযোগ্য নদী। জেলার মানুষের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি: জ্ঞানকোষটির হিসাবে ৬৩.৯০ শতাংশ পরিবার কৃষির ওপর নির্ভরশীল, যেখানে ব্যবসা থেকে আয় করে ১২.৮৯ শতাংশ পরিবার।
গরুল গ্রামের মাঠ যে বিরল উপজেলায়, সেটি জেলার বড় উপজেলাগুলোর একটি; আয়তন ৩৫৩.৯৮ বর্গকিলোমিটার। এটি সীমান্তবর্তী উপজেলা: উত্তরে বোচাগঞ্জ ও কাহারোল উপজেলা, দক্ষিণে দিনাজপুর সদর ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য এবং পূর্বে পুনর্ভবা নদী। উপজেলার ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে পুনর্ভবা ও টাঙ্গন নদী, আর নল বিল ও করাই বিল এখানকার উল্লেখযোগ্য জলাভূমি। গরুল গ্রামের মঙ্গলপুর এই উপজেলারই একটি ইউনিয়ন। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে উপজেলার জনসংখ্যা ছিল ২ লাখ ৫৭ হাজার ৯২৫ জন। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী এখানকার ৭০.৪৫ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি; প্রধান ফসল ধান, গম, ভুট্টা, আখ, আলু, তিল, পেঁয়াজ, তেলবীজ ও শাকসবজি, আর প্রধান ফল আম, কলা, কাঁঠাল, লিচু ও জাম।
অর্থাৎ সূর্যমুখী এমন এক উপজেলায় জায়গা করে নিচ্ছিল, যেখানে তিলের মতো তেলবীজ আগে থেকেই চাষ হয় এবং ধান, গম, ভুট্টা ও আলু প্রধান ফসলের তালিকায় রয়েছে। এ কারণেই এ অঞ্চলের কর্মকর্তারা সূর্যমুখীকে এমন একটি নতুন সংযোজন হিসেবে দেখেন, যাকে প্রতিষ্ঠিত ফসলগুলোর পাশে মাঠে নিজের জায়গা করে নিতে হবে।
সূর্যমুখী কেমন ফসল
সূর্যমুখীর বৈজ্ঞানিক নাম Helianthus annuus; এটি অ্যাস্টারেসি গোত্রের উদ্ভিদ। বাংলাপিডিয়া একে বর্ষজীবী বা বহুবর্ষজীবী বীরুৎ হিসেবে বর্ণনা করেছে, যার হলুদ পাপড়িঘেরা পুষ্পমঞ্জরি প্রায় ৩০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত চওড়া হতে পারে। জ্ঞানকোষটি জানায়, চাষ করা সূর্যমুখীর উৎপত্তি সম্ভবত মেক্সিকোতে। এর তেলকে অনেক তেলের চেয়ে স্বাস্থ্যকর রান্নার মাধ্যম হিসেবে গণ্য করা হয় এবং এতে ভিটামিন এ, ডি ও ই রয়েছে বলেও উল্লেখ আছে।
বাংলাদেশে সূর্যমুখী প্রথমে বাগানের শোভাবর্ধক গাছ হিসেবে লাগানো হতো। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী আশির দশকে তেলবীজ ফসল হিসেবে খাটো জাতের সূর্যমুখী আনা হয়। দেশের মধ্য ও উত্তরাঞ্চলের কিছু জেলায় রবি (শীত) ও খরিফ দুই মৌসুমেই এর চাষ হয়, আর বীজ বোনা থেকে ফসল তুলতে মোটামুটি ৯০ থেকে ১১০ দিন লাগে। বীজ মাড়াই করে ভোজ্যতেল তৈরি হয়, বনস্পতি তৈরিতে এই তেল চীনাবাদামের তেলের বিকল্প হতে পারে, আর তেল বের করার পর যে খৈল থাকে তা গবাদিপশুর খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বীজ হাঁস-মুরগির খাদ্য হিসেবেও কাজে লাগে।
ফুলের ‘সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকা’র কাব্যিক ছবির পেছনে উদ্ভিদবিজ্ঞানের ভিত্তি আছে, তবে তা কেবল কচি গাছের ক্ষেত্রে। ২০১৬ সালের ৪ আগস্ট বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্সে প্রকাশিত এক গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, ডেভিস ও ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলের গবেষকেরা দেখান, কচি সূর্যমুখী গাছ দিনের বেলা পূর্ব থেকে পশ্চিমে সূর্যকে অনুসরণ করে এবং রাতে আবার পূর্বমুখী হয়; এই চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ করে গাছের ভেতরের দৈনিক জৈবঘড়ি (সার্কাডিয়ান ক্লক)। গাছ পরিণত হলে জৈবঘড়ি এই চলাচল থামিয়ে দেয়, ফলে ফুল পূর্বমুখী হয়েই থাকে। গবেষকেরা দেখেছেন, পূর্বমুখী ফুল সকালে দ্রুত উষ্ণ হয় এবং পশ্চিমমুখী ফুলের তুলনায় পাঁচ গুণ বেশি পরাগবাহী পতঙ্গ আকর্ষণ করে।

বাংলাদেশে মৌসুম, জাত ও ফলন
বাংলাদেশে সূর্যমুখী মূলত শীতের ফসল। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের বৈদেশিক কৃষি সেবা (ইউএসডিএ এফএএস) ২০২৫ সালের ১৮ মার্চের বাংলাদেশ তেলবীজ প্রতিবেদনে নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত রবি মৌসুমকে সরিষা, সয়াবিন ও সূর্যমুখীর প্রধান মৌসুম হিসেবে উল্লেখ করেছে। মাঠের প্রতিবেদনও এই সময়সূচির সঙ্গে মেলে। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে দ্য ডেইলি স্টার বাংলা ফরিদপুরে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ কেন্দ্রের সূর্যমুখী মাঠের খবর দেয়; সেখানে নভেম্বরের ৫ ও ৬ তারিখে বারি সূর্যমুখী-২ জাতের বীজ বোনা হয়েছিল। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে একই পত্রিকা জানায়, রংপুর অঞ্চলের নদীর চরে কৃষকেরা নভেম্বরের মাঝামাঝি বীজ বোনেন এবং ফসল তুলতে ১০০ থেকে ১১০ দিন লাগে।
দেশে সাধারণত দুই ধরনের বীজ চাষ হয়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) বারি সূর্যমুখী-২-এর মতো মুক্ত পরাগায়িত জাত উদ্ভাবন করেছে, আর আমদানি করা সংকর জাতেরও ব্যাপক চাষ হয়: ২০২১ সালের মে মাসে দ্য ডেইলি স্টার হাইসান-৩৩ ও আরডিএস-২৬৫-কে জনপ্রিয় দুই জাত হিসেবে উল্লেখ করে। ২০২৩ সালের নভেম্বরে চেক প্রজাতন্ত্রের মেন্ডেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাময়িকী আক্তা উনিভেরসিতাতিস আগ্রিকুলতুরে এত সিলভিকুলতুরে মেন্ডেলিয়ানে ব্রুনেনসিসে প্রকাশিত এক পিয়ার-রিভিউড গবেষণায় বারির বিজ্ঞানীরা সাতক্ষীরার বেনারপোতায় লবণাক্ত জমিতে ২০১৪-১৫ ও ২০১৫-১৬ সালের রবি মৌসুমে বারি সূর্যমুখী-২ ও এসভিএস ০০৯০১ জাতের তুলনা করেন। বারি সূর্যমুখী-২ প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেশি ফলন দেয়, আর বারির সুপারিশভিত্তিক সর্বোত্তম ব্যবস্থাপনায় কৃষকদের প্রচলিত মাঝারি ব্যবস্থাপনার চেয়ে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি বীজ পাওয়া যায়। উপকূলে এই ফসলের পথে বাধা হিসেবে গবেষকেরা উল্লেখ করেন বীজ বোনার সময় মাটির লবণাক্ততা, সেচের জন্য মিঠা পানির অভাব, উচ্চফলনশীল জাতের মানসম্পন্ন বীজের ঘাটতি এবং সর্বোত্তম চাষপদ্ধতি সম্পর্কে কৃষকের সীমিত জ্ঞান।
মাঠপর্যায়ে ফলনের তথ্যে বড় ফারাক দেখা যায়। ২০২৩ সালে ফরিদপুরের বিএডিসি খামারে একরে প্রায় ৮০০ কেজি বীজ পাওয়ার কথা জানানো হয়। ২০২৪ সালে রংপুরের চরের কৃষকেরা হেক্টরে ২ হাজার ১০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ কেজি ফলনের কথা বলেন, খরচ হেক্টরে ৬৫ থেকে ৭০ হাজার টাকা। ২০২৫ সালের মে মাসে পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার একজন কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা দ্য ডেইলি স্টার বাংলাকে বলেন, সেখানে হেক্টরে অন্তত ২ টন ফলন হয় এবং ১ কেজি সূর্যমুখী বীজ থেকে প্রায় ৪০০ গ্রাম তেল পাওয়া যায়, যা তেলবীজগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি। এসবের তুলনায় দিনাজপুরের জন্য ডিএইর হেক্টরপ্রতি ১.২৫ মেট্রিক টনের হিসাবটি সতর্ক অনুমান।
ফুলের ছোট ছোট পুষ্পিকায় পরাগ না পৌঁছালে বীজ হয় না, তাই পরাগায়ন গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের তামিলনাড়ু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় বীজ ভালোভাবে পুষ্ট করতে হেক্টরে প্রায় পাঁচটি মৌমাছির বাক্স রাখার পরামর্শ দেয়; পতঙ্গ কম থাকলে পূর্ণ ফুল ফোটার সময় সকাল ৯টা থেকে ১১টার মধ্যে নরম কাপড় জড়ানো হাতে ফুলের মাথা আলতো করে ঘষে দেওয়া, অথবা দুটি ফুল মুখোমুখি ঘষে দেওয়ার কথাও বলে। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরামর্শ, ফুলের মাথার পেছনের মঞ্জরিপত্র লেবু-হলুদ হয়ে এলে এবং মাথা শক্ত হলে ফসল কাটতে হয়, তারপর মাড়াইয়ের আগে মাথাগুলো রোদে শুকাতে হয়। সার, সেচ ও রোগবালাই দমন মাটি ও মৌসুমভেদে আলাদা হয়, তাই দিনাজপুরের কৃষকদের এসব বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়াই ভালো।

ভোজ্যতেলের আমদানিনির্ভরতা ও তেলবীজে সরকারের উদ্যোগ
আমদানি করা ভোজ্যতেল নিয়ে রুম্মান আক্তারের মন্তব্যেই এই ফসলে সরকারি সহায়তার কারণটি বোঝা যায়। বাংলাদেশ তার রান্নার তেলের বেশির ভাগই বিদেশ থেকে কেনে। ইউএসডিএ এফএএসের ২০২৫ সালের মার্চের প্রতিবেদনের হিসাবে দেশে বছরে প্রায় ৩৪ লাখ মেট্রিক টন ভোজ্যতেল লাগে; এর ৫০ শতাংশ পাম তেল, ২৮ শতাংশ সয়াবিন তেল, ১৯ শতাংশ সরিষার তেল এবং ৩ শতাংশ অন্যান্য তেল। দেশে উৎপাদিত তেলবীজ চাহিদার মাত্র প্রায় ১৫ শতাংশ মেটায়, বাকিটা অপরিশোধিত তেল বা তেলবীজ হিসেবে আমদানি হয়। প্রতিবেদনটি জানায়, দেশে উৎপাদিত তেলবীজের মধ্যে কেবল সরিষা ও সূর্যমুখী মাড়াই করে ভোজ্যতেল তৈরি হয়।
একই প্রতিবেদন অনুযায়ী ডিএইর হিসাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ১৩ লাখ হেক্টর জমিতে তেলবীজের চাষ হয় এবং আনুমানিক উৎপাদন ছিল ১৭ লাখ মেট্রিক টন; আগের বছরের তুলনায় আবাদ ৪.১ শতাংশ ও উৎপাদন ৪.৭ শতাংশ কম, মূলত কৃষকেরা সরিষা ছেড়ে আলুর দিকে ঝুঁকেছিলেন বলে। প্রতিবেদনটি আরও মনে করিয়ে দেয়, ২০২২ সালে কৃষি মন্ত্রণালয় তিন বছরের একটি কর্মপরিকল্পনা নেয়, যার লক্ষ্য ছিল ২০২৫ সালের মধ্যে দেশের ভোজ্যতেলের চাহিদার ৪০ শতাংশ দেশেই উৎপাদন করা।
২০২৩ সালের মে মাসে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ডিএইর ‘তেলজাতীয় ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্প’ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেই প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশে বছরে ভোজ্যতেলের চাহিদা ছিল ২৪ লাখ টন, যার ৮৮ শতাংশ আমদানি করতে হতো, আর ২০২১-২২ অর্থবছরে ভোজ্যতেল আমদানিতে খরচ হয় ২৫৩ কোটি ডলার। সে বছর ১৪ হাজার ৭০০ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখীর চাষ হয়েছিল, আর প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মধ্যে উপকূলের জমিসহ ৩৪ হাজার ৬০০ হেক্টর জমি সূর্যমুখী চাষের আওতায় আনা। প্রতিবেদনটি আরও জানায়, তেল কতটা পাওয়া যাবে তা বীজের ওপর নির্ভর করে: আমদানি করা সংকর বীজে ৪২ থেকে ৪৩ শতাংশ, আর অযত্নে চাষ করা দেশি বীজে ৩২ থেকে ৩৫ শতাংশ।
সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে সূর্যমুখী
আগের বছরগুলোতে দেশে সূর্যমুখীর আবাদ দ্রুত বেড়েছিল। ২০২১ সালের মে মাসে ডিএইর তৎকালীন মহাপরিচালক মো. আসাদুল্লাহ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, সে বছর সারা দেশে ১৫ হাজার ৪০৩ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখীর চাষ হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার তিন গুণ; এর কৃতিত্ব তিনি দেন প্রচার এবং বিনা মূল্যে বীজ ও প্রশিক্ষণের মতো প্রণোদনাকে। সবচেয়ে বেশি জমিতে চাষ হয়েছিল পটুয়াখালীতে, ৩ হাজার ২৬৩ হেক্টর। পত্রিকাটি তখন জানায়, দেশের ভোজ্যতেলের চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশ আমদানিতে মেটে, আর ১০ কেজি সূর্যমুখী বীজ থেকে প্রায় ৪ লিটার তেল পাওয়া যায়।
উপকূলের পথ ধরে উত্তরাঞ্চলেও এর চাষ বাড়ছিল। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে দ্য ডেইলি স্টার বাংলা জানায়, রংপুর অঞ্চলের পাঁচ জেলা লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, রংপুর, নীলফামারী ও গাইবান্ধায় ৬২০ জন কৃষক ২২৯ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখী চাষ করেছেন, আগের বছর যা ছিল ১৯৫ হেক্টর; এর প্রায় ৭০ শতাংশ ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও ধরলার মতো নদীর চরে। ডিএইর রংপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক ওবায়দুর রহমান জানান, কৃষকদের প্রণোদনা হিসেবে বীজ ও সার দেওয়া হচ্ছে। কৃষকেরা ফসলটিকে লাভজনক বললেও জানান, অন্য ফসলের মতো সহজে বীজ বিক্রি করা যায় না; রাজিবপুরের উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জানান, কৃষি বিভাগ তেলবীজের ক্রেতাদের সঙ্গে কৃষকদের যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছে।
২০২৫-২৬ মৌসুমে দিনাজপুরের ৫৫ হেক্টরকে এই প্রেক্ষাপটেই দেখতে হয়: উপকূলের জেলাগুলোর তুলনায় এটি এখনো ছোট আবাদ, এমন এক জেলায় যেখানে ডিএই দানাশস্য ও আলুর পাশাপাশি একটি তেলবীজ যোগ করার চেষ্টা করছিল, আর রুম্মান আক্তারের মতো কর্মকর্তারা সূর্যমুখীকে প্রতিষ্ঠিত নয়, বরং সম্ভাবনাময় অর্থকরী ফসল হিসেবে বর্ণনা করছিলেন।
দর্শনার্থী টানে সূর্যমুখীর মাঠ
সদরে সহরাফ আলীর মাঠে ৫০ টাকার টিকিট অন্য জেলাতেও দেখা একটি ধারারই অংশ। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে দ্য ডেইলি স্টার বাংলা জানায়, ফরিদপুরে বিএডিসির যে সূর্যমুখী মাঠে ১৫ বছর ধরে চাষ হচ্ছে, সেখানে প্রতিদিন কয়েক হাজার দর্শনার্থী আসেন, শুক্র ও শনিবার এই সংখ্যা ১৮ থেকে ২০ হাজারে পৌঁছায়, আর গত পাঁচ-ছয় বছরে দর্শনার্থী বেড়েছে।
সহরাফ আলীর মতো কৃষকের কাছে ফুল ফোটার কয়েক সপ্তাহের প্রবেশমূল্য বীজ তোলার আগেই একই জমি থেকে বাড়তি কিছু আয়ের সুযোগ। তবে ফসলটি মূলত তেলবীজ: সেই মৌসুমে দিনাজপুরের ৫৫ হেক্টর থেকে ডিএইর প্রত্যাশা ছিল ৬৯ মেট্রিক টন বীজ, আর বিরলের উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার আশা ছিল, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে কৃষকেরা ভালো দাম পাবেন।
ছবি: Yahya / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাপিডিয়া, ইউএসডিএ ফরেন অ্যাগ্রিকালচারাল সার্ভিস, দ্য ডেইলি স্টার, দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, আক্তা উনিভেরসিতাতিস আগ্রিকুলতুরে এত সিলভিকুলতুরে মেন্ডেলিয়ানে ব্রুনেনসিস, ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলে, তামিলনাড়ু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়




মন্তব্য
(০)