ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, চিপস, কড়াইশুঁটি দিয়ে আলুর দম কিংবা আলুর পুর দেওয়া পরোটা, আলু খেতে ভালোবাসেন অনেকেই। কিন্তু বেশি আলু খাওয়ার পর পেটে অস্বস্তি, পেট ফাঁপা ভাব বা গ্যাসের কথাও বলেন অনেকে। ২০২৬ সালের ২২ জুন প্রকাশিত বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন বিবিসি সংবাদদাতা সুবাগুণম কান্নান। প্রবীণ গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্ট অরুল প্রকাশ সেখানে বলেন, এর কোনো নির্দিষ্ট উত্তর নেই, শুধু হ্যাঁ বা না বলা সম্ভব নয়।
আন্তর্জাতিক আলু কেন্দ্রের (সিআইপি) তথ্য অনুযায়ী, মানুষের খাদ্য হিসেবে ধান ও গমের পরেই আলু বিশ্বের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যফসল, আর বিশ্বে শত কোটির বেশি মানুষ আলু খান। সংস্থাটি আলুকে কম চর্বির ভালো কার্বোহাইড্রেটের উৎস বলেও উল্লেখ করেছে।
চিকিৎসক যা বলেছেন
ডা. প্রকাশ বিবিসিকে বলেন, "বেশিরভাগ মানুষের যে সমস্ত খাবার খেলে সবচেয়ে বেশি গ্যাসের সমস্যা হয় বলে লক্ষ্য করা গিয়েছে, আলু তার মধ্যে নেই। তবে অতিরিক্ত আলু খেলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে, কারো কারো পেটে ফাঁপা ভাব অনুভূত হতে পারে।" তিনি মনে করিয়ে দেন, ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তির ক্ষেত্রে এর প্রভাব আলাদা হতে পারে।
প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞদের বরাতে বলা হয়, এমন সমস্যার একমাত্র কারণ আলু নয়। পদটি কীভাবে রান্না হয়েছে, কতটা খাওয়া হয়েছে এবং ওই ব্যক্তির স্বাস্থ্য কেমন, এসবও ভূমিকা রাখে। ভাজা আলুতে চর্বি বেশি থাকায় খাওয়ার পর দীর্ঘ সময় পেট ভরা ভরা লাগতে পারে। ডা. প্রকাশের মতে, আলু কিছু মানুষের সমস্যা করলেও এর মানে এই নয় যে আলু স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়; আসলে একেকজনের হজম ক্ষমতা একেক রকম।

স্টার্চ, গাঁজন ও গ্যাস
আলুর মূল উপাদান স্টার্চ বা শ্বেতসার। বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর বেশিরভাগ ক্ষুদ্রান্ত্রে হজম ও শোষিত হয়, তবে কিছুটা ক্ষুদ্রান্ত্র এড়িয়ে বৃহদান্ত্রে পৌঁছায়। সেখানে অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া একে গাঁজন করে। একে বলা হয় রেজিস্ট্যান্ট বা প্রতিরোধী স্টার্চ, যা অন্ত্রের উপকারী অণুজীবের খাবার হিসেবে কাজ করে। দীর্ঘমেয়াদে এটি অন্ত্রের জন্য ভালো হলেও এই গাঁজনে কারো কারো সাময়িকভাবে বেশি গ্যাস হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ডায়াবেটিস অ্যান্ড ডাইজেস্টিভ অ্যান্ড কিডনি ডিজিজেস (এনআইডিডিকে) জানায়, পাকস্থলী ও ক্ষুদ্রান্ত্র যে শর্করা, স্টার্চ ও আঁশ পুরোপুরি হজম করতে পারে না, বৃহদান্ত্রের ব্যাকটেরিয়া তা ভাঙার সময় গ্যাস তৈরি হয়। খাওয়া ও পান করার সময় গিলে ফেলা বাতাসও গ্যাসের আরেকটি উৎস।
অন্য যেসব খাবারেও গ্যাস হয়
ডা. প্রকাশ বলেন, শুধু আলু নয়; বিনস, ছোলা, মটরশুঁটি ও মসুর ডালেও পেট ফাঁপতে পারে। এসবে থাকা অলিগোস্যাকারাইড নামের জটিল শর্করা ক্ষুদ্রান্ত্রে পুরো হজম হয় না। যাদের ল্যাকটোজ হজমে সমস্যা, দুধ, আইসক্রিম, পনির ও দই খেলে তাদের গ্যাস, পেট ফাঁপা ও পেটব্যথা হতে পারে। এনআইডিডিকের তালিকায় আরও আছে:
- আপেল, পিচ, নাশপাতির মতো কিছু ফল ও ফলের রস
- ব্রকলি, ফুলকপির মতো সবজি এবং ডালজাতীয় শস্য
- দুধ, আইসক্রিম ও দইয়ের মতো দুগ্ধজাত খাবার
- গোটা গমের মতো গোটা শস্য
- সর্বিটল, ম্যানিটল, জাইলিটলের মতো মিষ্টিকারক দেওয়া চুইংগাম ও ক্যান্ডি


অস্বস্তি কমাতে যা করা যায়
ডা. প্রকাশের পরামর্শ, তাড়াহুড়ো করে না খেয়ে খাবার ভালোভাবে চিবিয়ে ধীরে ধীরে খেলে পেট ফাঁপা ও ঢেকুর অনেকটা কমতে পারে। কোনো খাবারে সমস্যা হলে তার পরিমাণ কমানো বা রান্নার পদ্ধতি বদলানো যায়; ডাল ও আলু একসঙ্গে খেয়ে সমস্যা হলে আলাদা করে খেয়ে দেখলে বোঝা যায় কোনটিতে সমস্যা। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসও (এনএইচএস) অল্প অল্প করে বারবার খাওয়া, ধীরে খাওয়া ও নিয়মিত ব্যায়ামের পরামর্শ দেয়।
চিকিৎসকদের মতে, পেটে গ্যাস সাধারণত বড় সমস্যা নয়। তবে ডা. প্রকাশ বলেন, সমস্যা দুই সপ্তাহের বেশি থাকলে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া দরকার। গ্যাসের সঙ্গে ওজন কমা, টানা পেটব্যথা, ডায়রিয়া, মলে রক্ত, তীব্র কোষ্ঠকাঠিন্য বা ঘন ঘন বমি হলে দেরি না করে ডাক্তার দেখানো উচিত।
ছবি: Mowglee / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)
সূত্র: বিবিসি বাংলা, যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ডায়াবেটিস অ্যান্ড ডাইজেস্টিভ অ্যান্ড কিডনি ডিজিজেস (এনআইডিডিকে), যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস), আন্তর্জাতিক আলু কেন্দ্র (সিআইপি)





মন্তব্য
(০)