পয়লা বৈশাখ, অর্থাৎ ২০২৬ সালের ১৪ এপ্রিল, টাঙ্গাইলের শহীদ মারুফ স্টেডিয়ামে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচির উদ্বোধন করার কথা ছিল। এর আগে ১২ এপ্রিল সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানান, এই কার্ডের মাধ্যমে কৃষকেরা ন্যায্যমূল্যে বীজ, সার ও কীটনাশক কেনা, ফসল বিক্রি, সহজ শর্তে কৃষিঋণ ও বিমাসহ বেশ কিছু সুবিধা পাবেন, আর দরিদ্র কৃষকেরা বছরে নির্দিষ্ট অঙ্কের আর্থিক সহায়তা পাবেন। কৃষক কার্ড ছিল বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম অঙ্গীকার; সরকার গঠনের প্রায় দুই মাসের মাথায় এটি চালু হতে যাচ্ছিল।
কারা পাবেন কার্ড
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে দেশে কৃষক পরিবার এক কোটি ৬৫ লাখ, আর আগামী চার বছরে সবার হাতে কার্ড পৌঁছানোর পরিকল্পনা জানানো হয়। জমির পরিমাণ অনুযায়ী কৃষকদের পাঁচ শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে: পাঁচ শতকের কম জমি যাঁদের, তাঁরা ভূমিহীন; পাঁচ থেকে ৪৯ শতক প্রান্তিক; ৫০ থেকে ২৪৯ শতক ক্ষুদ্র; ২৫০ থেকে ৭৪৯ শতক মাঝারি; আর ৭৫০ শতকের বেশি জমির মালিক বড় কৃষক।
১১ এপ্রিল পর্যন্ত প্রাক্-পাইলটিং ধাপের ২২ হাজার ৬৫ জন কৃষকের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। তাঁদের মধ্যে ভূমিহীন দুই হাজার ২৪৬ জন, প্রান্তিক নয় হাজার ৪৫৮ জন, ক্ষুদ্র আট হাজার ৯৬৭ জন, মাঝারি এক হাজার ৩০৩ জন এবং বড় কৃষক ৯১ জন। নামে ‘কৃষক’ থাকলেও কার্ড কেবল ফসল চাষিদের জন্য নয়: কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে তালিকায় ফসল উৎপাদনকারী ২১ হাজার ১৪১ জন, গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি ও দুগ্ধ খামারি প্রায় ৮৫৫ জন, মৎস্যজীবী ৬৬ জন এবং লবণচাষি তিন জন ছিলেন।

তিন ধাপে বাস্তবায়ন, প্রথম ধাপের ১১ ব্লক
কর্মসূচির তিনটি ধাপ: প্রাক্-পাইলটিং, পাইলটিং এবং দেশব্যাপী কার্যক্রম। প্রাক্-পাইলটিংয়ে দরিদ্র কৃষক বেশি এমন ১০টি জেলার ১১টি উপজেলার ১১টি কৃষি ব্লক রাখা হয়। তালিকা হালনাগাদ করেন স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তা ও কৃষক নেতারা। এই ধাপ শেষে আগস্টের মধ্যে ১৫টি উপজেলায় পাইলট কার্যক্রম শুরুর কথা জানানো হয়, যেখানে কার্ড উদ্দেশ্যমতো কাজ করছে কি না তা দেখা হবে। কৃষিমন্ত্রী বলেন, "পাইলাটিংয়ের অভিজ্ঞতার আলোকে (তৃতীয় ধাপে) আগামী চার বছরে সারা দেশে এই কার্ড বিতরণ ও ডাটাবেজ তৈরির কাজ পর্যায়ক্রমে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।"
প্রথম ধাপের ব্লকগুলো হলো টাঙ্গাইল সদরের সুরুজ, বগুড়ার শিবগঞ্জের উথলি, পঞ্চগড় সদরের কমলাপুর ও বোদার পাঁচপীর, ঝিনাইদহের শৈলকূপার কৃপালপুর, পিরোজপুরের নেছারাবাদের রাজাবাড়ি, কক্সবাজারের টেকনাফের রাজারছড়া, রাজবাড়ীর গোয়ালন্দের তেনাপচা, মৌলভীবাজারের জুড়ীর ফুলতলা এবং জামালপুরের ইসলামপুরের গাইবান্ধা ব্লক। এসব জায়গায় ১৪ এপ্রিল বিতরণ শুরুর কথা ছিল; কুমিল্লার আদর্শ সদরের অরণ্যপুর ব্লকে কার্ড দেওয়া শুরু হওয়ার কথা ছিল ১৭ এপ্রিল। উথলি ব্লকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তিন হাজার ৫১৬ জনের তথ্য যাচাই করা হয়, ব্যাংক হিসাব খোলেন তিন হাজার ১৪৭ জন।

কার্ডে কী সুবিধা, নগদ সহায়তা কারা পাবেন
কৃষিমন্ত্রী কার্ডধারীদের জন্য ১০ ধরনের সুবিধার কথা জানান:
- ন্যায্যমূল্যে কৃষি উপকরণ
- ন্যায্যমূল্যে সেচ সুবিধা
- সহজ শর্তে কৃষিঋণ
- স্বল্পমূল্যে কৃষি যন্ত্রপাতি
- সরকারি ভর্তুকি ও প্রণোদনা
- মোবাইল ফোনে আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও বাজারের তথ্য
- কৃষিবিষয়ক প্রশিক্ষণ
- ফসলের রোগবালাই দমনের পরামর্শ
- কৃষি বিমা সুবিধা
- ন্যায্যমূল্যে কৃষিপণ্য বিক্রির সুবিধা
এলাকার বীজ ও সারের ডিলারের কাছে সরকার ডিজিটাল পয়েন্ট অব সেল (পিওএস) মেশিন রাখার ব্যবস্থা করবে, যাতে কার্ড দিয়ে সার, বীজ, মৎস্য বা প্রাণিখাদ্য কেনা যায়। বছরে আড়াই হাজার টাকার নগদ সহায়তা পাবেন কেবল ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকেরা; প্রথম ধাপের ২০ হাজার ৬৭১ জন এই তিন শ্রেণিতে পড়েন। সোনালী ব্যাংকের স্থানীয় শাখায় প্রত্যেকের নামে হিসাব খোলা হয়েছে, তাই কার্ডটি কার্যত একটি ব্যাংকিং ডেবিট কার্ড। প্রাক্-পাইলটিং পর্যায়ের বাজেট ধরা হয় প্রায় আট কোটি ৩৪ লাখ টাকা।

অতীতের অভিজ্ঞতা ও কৃষকের সংশয়
কৃষকেরা উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও সংশয়ও ছিল। কুমিল্লার কৃষক রহমত উল্লাহ বিবিসি বাংলাকে বলেন, কার্ডে সময়মতো ন্যায্যমূল্যে সার-বীজ মিললে বা সরকারের কাছে ধান বিক্রি করা গেলে তা ভালো খবর; মুন্সিগঞ্জের কৃষক নাহিদ খানের প্রশ্ন ছিল, বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব হবে। এর আগে ২০০৭ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ‘কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ড’ চালু করেছিল, পরে আওয়ামী লীগ সরকার দশ টাকায় কৃষকের ব্যাংক হিসাব ও জেলেদের আলাদা কার্ড চালুর উদ্যোগ নেয়। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী সংসদে জানান, কৃষি উপকরণ কার্ডধারী কৃষক দুই কোটি পাঁচ লাখ ৯৯ হাজার ৮৬৯ জন। বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, আগের উদ্যোগগুলো সেভাবে কাজে আসেনি, যার বড় কারণ অনিয়ম-দুর্নীতি এবং ‘রাজনৈতিক বিবেচনায়’ তালিকা তৈরির অভিযোগ।
গবেষক গওহার নঈম ওয়ারা বলেন, যাঁদের জন্য উদ্যোগ, তাঁদের সঙ্গে আলোচনা না হলে এবং তাঁরা সুফল না পেলে এটি কাজ করবে না। সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান মার্চে প্রথম আলোকে বলেছিলেন, প্রকৃত কৃষক শনাক্ত করা বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে, তাই নির্ভুল ডিজিটাল ডেটাবেজ ও স্বচ্ছ যাচাই-বাছাই দরকার। কৃষিমন্ত্রীর আশ্বাস ছিল, "এই কৃষক কার্ড শতভাগ রাজনৈতিক মুক্ত। অতীতে যা হয়েছে, তা থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে চাই।"
ছবি: Balaram Mahalder / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: বিবিসি বাংলা, প্রথম আলো, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)