২০২৬ সালের ২২ এপ্রিল, বুধবার, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সুনামগঞ্জের হাওরে কৃষকেরা পুরোপুরি না পাকা বোরো ধান কেটে ঘরে তুলছিলেন। তাঁদের ভয়, ধান পাকার আগেই আগাম বন্যা ফসল কেড়ে নেবে। সেদিন জাগো নিউজের সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, স্থানীয় বৃষ্টি আর ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে জেলার নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়ছিল। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) স্থানীয় কার্যালয় সতর্ক করে, কয়েক দিনের মধ্যেই আগাম বন্যা দেখা দিতে পারে।
এই মৌসুমে সুনামগঞ্জের কৃষকদের একের পর এক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হয়েছে। ভারী বৃষ্টিতে আগেই হাওরের নিচু অংশে পানি জমে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। এর মধ্যে ১৮ এপ্রিল বজ্রপাতে জেলায় পাঁচজনের মৃত্যু হয়, যাঁদের চারজন হাওরে ধান কাটার সময় মারা যান; এতে ধান কাটা আরও ব্যাহত হয়। সেই ধাক্কা কাটতে না কাটতেই সুরমা, কুশিয়ারা ও বৌলাইসহ প্রধান নদ-নদীর পানি বাড়তে শুরু করে, হাওরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে বন্যার আতঙ্ক।
বিপৎসীমার মাত্র ২ সেন্টিমিটার নিচে সুরমা
পাউবোর সুনামগঞ্জ কার্যালয় জানায়, আগের ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ৩৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। ভারতের চেরাপুঞ্জিতে ভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় উজান থেকে নামা পাহাড়ি ঢলে সুরমা নদীর পানি ৫৪ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার মাত্র ২ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।
পাউবোর এক বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদ-নদীর পানি পরের কয়েক দিনে আরও দ্রুত বাড়তে পারে, যা হাওরে আগাম বন্যার কারণ হতে পারে।
এর আগের দিনও একটি বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের খবর অনুযায়ী, ২১ এপ্রিল মঙ্গলবার বিকেলে পাউবোর সুনামগঞ্জ কার্যালয় নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদারের সই করা বিজ্ঞপ্তিতে সম্ভাব্য বন্যা ও জলাবদ্ধতার ক্ষতি কমাতে হাওরের বোরো ধান প্রায় ৮০ ভাগ পাকলেই কেটে ফেলার পরামর্শ দেয়। আবহাওয়া অধিদপ্তর ও পাউবোর তথ্যের বরাতে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, উত্তর-পূর্বাঞ্চলে, বিশেষ করে সুনামগঞ্জের সুরমা, কুশিয়ারা ও বৌলাই নদীর উজানে বৃষ্টিপাত বেড়েছে এবং সামনের দিনগুলোতে নদীর পানি আরও বাড়তে পারে। মামুন হাওলাদার বিডিনিউজকে বলেন, আগাম সতর্কতা হিসেবে কৃষকদের দ্রুত পাকা ধান কাটার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, হাওরের কিছু নিচু এলাকায় এরই মধ্যে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে, তাতে ফসলহানির ঝুঁকি বাড়ছে।
২২ এপ্রিল জাগো নিউজকেও তিনি একই কথা বলেন: হাওরের ধান ৮০ ভাগ পাকার সঙ্গে সঙ্গে কেটে ফেলতে কৃষকদের অনুরোধ করা হয়েছে, কারণ পাহাড়ি ঢল নেমে জেলায় বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।

মাঠে তখনও কতটা ধান
জেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, সেই মৌসুমে সুনামগঞ্জে ২ লাখ ২৩ হাজার ১০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছিল, কিন্তু ২২ এপ্রিল পর্যন্ত কৃষকেরা মাত্র ২৮ হাজার হেক্টর জমির ধান ঘরে তুলতে পেরেছিলেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) সুনামগঞ্জের উপপরিচালক ওমর ফারুক জাগো নিউজকে বলেন, হাওরের ২৮ হাজার হেক্টর জমির ধান কাটা শেষ হয়েছে এবং কৃষকদের সহায়তায় কৃষি বিভাগের সব কর্মকর্তা মাঠে কাজ করছেন।
একই সময়ের অন্য প্রতিবেদনে জমির হিসাব খানিকটা ভিন্ন। ১০ এপ্রিল এটিএন নিউজ ডিএইর বরাতে জানায়, জেলায় ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে, উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ১৪ লাখ টন ধান। তখন পর্যন্ত আগাম জাতের ব্রি ধান৯৬সহ প্রায় ১১৪ হেক্টরের ধান কাটা হয়েছিল; আগাম ধান কাটা চলছিল মূলত মধ্যনগর, জামালগঞ্জ, শান্তিগঞ্জ ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার হাওরে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ধান কাটায় ৫৭৭টি কম্বাইন হারভেস্টার ও ছয় হাজারের বেশি শ্রমিক কাজ করছেন এবং আরও ৫০টি হারভেস্টার আনার পরিকল্পনা আছে। ডিএই এটিএন নিউজকে জানায়, জ্বালানি ও হারভেস্টারের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা আছে, কৃষকদের সময়মতো ধান কাটার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে এবং জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রণোদনা চেয়ে কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ২১ এপ্রিল জানায়, জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের হিসাবে সেদিন পর্যন্ত হাওরে ২১ হাজার ৪৯৬ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, আগাম রোপণ করা কিছু জমিতে ধান কাটা চললেও বেশির ভাগ ধান তখনও পুরোপুরি পাকেনি, আর কৃষকেরা আশা করছিলেন বৈশাখের দ্বিতীয় সপ্তাহে পুরোদমে ধান কাটা শুরু হবে।
১০ এপ্রিল এটিএন নিউজের সঙ্গে কথা বলা কৃষকেরা মৌসুমের দুই দিকের কথাই বলেন। জামালগঞ্জের আব্দুল আহাদ জানান, ব্রি ধান৯৬ কৃষকদের ভালো লাভ দিয়েছে। বিশ্বম্ভরপুরের করচার হাওরের কৃষক গফুর মিয়া ১০ কেয়ার জমিতে ব্রি ধান৯৬ চাষ করে কেয়ারপ্রতি ১৮ মণ ফলনের আশা করছিলেন। জামালগঞ্জের সাইফুল ৮০ কেয়ার জমিতে বোরো লাগিয়েছিলেন, কিন্তু জলাবদ্ধতায় তাঁর ১৫ কেয়ার পানির নিচে চলে যায়; তবু যতটা পারছিলেন কাটছিলেন। এটিএন নিউজ জানায়, পাহাড়ি ঢল ও ভারী বৃষ্টির পর জলাবদ্ধতায় কিছু কৃষক তখনই আধা-পাকা ধান কাটতে শুরু করেছিলেন।

পানির সঙ্গে কৃষকের পাল্লা
হাওরের কৃষক জুনাব আলী ও শুকুর আলী জাগো নিউজকে জানান, তাঁদের বেশির ভাগ ধান তখনও পুরোপুরি পাকেনি। কিন্তু নদীর পানি যেভাবে বাড়ছিল, তাতে ফসল তলিয়ে যাওয়ার ভয়ে আধা-পাকা ধানই কাটতে বাধ্য হচ্ছিলেন তাঁরা।
কৃষক সালমান মিয়া বলেন, "ধান আধা-কাঁচা রয়ে গেছে, কিন্তু বন্যার ভয়েই কাটছি। এখন যদি সব ডুবে যায়, তবে আমরা কৃষকেরা একদম শেষ হয়ে যাব।"
হাওরের অনেক পরিবারের কাছে বোরোই বছরের একমাত্র ফসল। ১১ এপ্রিল দৈনিক ইত্তেফাক জেলার বড় হাওরগুলোর একটি দেখার হাওরের বোরো ধানকে সেখানকার "একমাত্র ফসল" বলে উল্লেখ করে এবং জানায়, আগের পুরো সপ্তাহ সেখানকার কৃষকেরা এই ফসল নিয়ে দুশ্চিন্তায় কাটিয়েছেন। বাংলাপিডিয়া জানায়, হাওরের সমতল বছরে প্রায় সাত থেকে আট মাস পানির নিচে থাকে; বোরো চাষের জন্য থাকে শুকনো মাসগুলো।
বাঁধ ভাঙন আর প্রাণঘাতী বজ্রপাত
মাঠে আতঙ্ক জমছিল কয়েক সপ্তাহ ধরে। দৈনিক ইত্তেফাক জানায়, ১১ এপ্রিল শনিবার দেখার হাওরের গুজাউনি বেড়িবাঁধ হঠাৎ ভেঙে প্রবল বেগে হাওরে পানি ঢুকতে থাকে। আশপাশের গ্রামের হাজারো কৃষক বাঁশ, মাটির বস্তা ও অন্যান্য উপকরণ নিয়ে প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টায় ভাঙন বন্ধ করেন, তবে এর মধ্যে কিছু নিচু জমি ডুবে যায় এবং প্রায় ৯ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান নিয়ে শঙ্কায় পড়েন কৃষকেরা। পত্রিকাটির তথ্যমতে, দেখার হাওরের আয়তন ৪৫ হাজার হেক্টরের বেশি; সেই মৌসুমে এর ২৪ হাজার ২১৪ হেক্টরে চাষ হয়েছিল, আর সদরসহ তিন উপজেলার মানুষের জমি রয়েছে এই হাওরে।
কৃষকেরা ইত্তেফাককে বলেন, পাশের উতারিয়া বাঁধটি অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত হয়েছে এবং তাঁদের মতে এর কারণেই হাওরের দরিয়াবাজ অংশের ফসল ডুবেছে। জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া পত্রিকাটিকে বলেন, ভেঙে যাওয়া বাঁধটি পাউবোর ফসল রক্ষা বাঁধের আওতায় পড়ে না, আর কৃষকেরা আগে থেকে প্রশাসনকে কিছু জানাননি; জানালে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হতো।
এর এক সপ্তাহ পর আসে বজ্রপাত। দ্য ডেইলি স্টার ১৮ এপ্রিল জানায়, সেদিন বজ্রপাতে দেশে ১৩ জনের মৃত্যু হয়, যাঁদের পাঁচজন সুনামগঞ্জের। সুনামগঞ্জের চারজন হাওরে বোরো ধান কাটার সময় বজ্রপাতে মারা যান: ধর্মপাশা উপজেলার টগার হাওরে, জামালগঞ্জের পাগনার হাওরে, তাহিরপুরের মাটিয়ান হাওরে এবং দিরাইয়ের কালিয়াগোটা হাওরে। পঞ্চমজন ধর্মপাশায় বাড়ির পাশে ধান শুকানোর সময় মারা যান। আহতও হন কয়েকজন।
ফসল তোলার মৌসুমে বজ্রপাত এক পরিচিত বিপদ। ২০২৪ সালের মার্চে মোঙ্গাবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের বরাতে জানায়, ২০১১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে বজ্রপাতে ২ হাজার ১৬৪ জনের মৃত্যু হয়েছে, আর বেশির ভাগ মৃত্যু ঘটে কালবৈশাখীর মৌসুম মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে। খোলা মাঠে কাজ করা কৃষক ও জেলেরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। সরকার ২০১৬ সালে বজ্রপাতকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘোষণা করে। সরকারের পদক্ষেপের মধ্যে ছিল সড়কের পাশে প্রায় ৫০ লাখ তালগাছ লাগানো এবং খোলা মাঠে বজ্রনিরোধক যন্ত্র ও আশ্রয়কেন্দ্র বসানোর পরিকল্পনা। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারা মোঙ্গাবেকে বলেন, হাওর অববাহিকায় বড় গাছের অভাবের সঙ্গে সেখানে বজ্রপাত বেড়ে যাওয়ার সম্পর্ক রয়েছে।
চেরাপুঞ্জির বৃষ্টিতে কেন বাড়ে সুরমার পানি
যে নদীগুলো ফসলের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছিল, সেগুলোর উৎস জেলার সীমানা ছাড়িয়ে বহু দূরে। জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া জানায়, সুরমা হলো বরাক নদীর উত্তরের শাখা; বরাকের উৎপত্তি ভারতের নাগা-মণিপুর জলবিভাজিকার দক্ষিণ ঢালে। বরাক যেখানে দুই ভাগ হয়েছে, সেখান থেকে সুরমা পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমে বয়ে সিলেট শহরে পৌঁছায়, তারপর উত্তর-পশ্চিম ও পশ্চিমে বাঁক নিয়ে সুনামগঞ্জ শহরে আসে। পথে মেঘালয় মালভূমি থেকে দক্ষিণে নেমে আসা লোভা, পিয়াইন, যাদুকাটা ও সোমেশ্বরীসহ একাধিক ছড়া ও নদী এতে মেশে। এই নদীব্যবস্থার পানির বড় অংশ গিয়ে পড়ে হাওর অববাহিকায়, যেখানে বর্ষার শুরুতেই নদী উপচে হাওর প্লাবিত হয়।
বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, কুশিয়ারা বরাকের দক্ষিণ-পশ্চিমের শাখা, দৈর্ঘ্য প্রায় ১৬১ কিলোমিটার; আজমিরীগঞ্জ উপজেলার মারকুলিতে এটি আবার সুরমার সঙ্গে মেশে এবং কালনী ও ধনু হয়ে মিলিত প্রবাহ মেঘনা নামে পরিচিত হয়। জ্ঞানকোষটি সুরমার সাধারণ বন্যার মৌসুম ধরে মোটামুটি মে মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত; ফলে এপ্রিলের শেষ দিকে পানি বাড়লে মূল বর্ষা শুরুর আগেই বোরো ফসল হুমকিতে পড়ে। বাংলাপিডিয়া আরও জানায়, উত্তর-পূর্বাঞ্চলে নেমে আসা পাহাড়ি অববাহিকার নদীগুলোতে আকস্মিক বন্যা হয়, যেখানে পানি হঠাৎ বাড়ে ও হঠাৎ কমে; এসব বন্যা সাধারণত স্বল্পস্থায়ী, তবে কখন কতটা তীব্র হবে তা আগে থেকে বলা কঠিন।
চেরাপুঞ্জি, যার আরেক নাম সোহরা, ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পূর্ব খাসি পাহাড় জেলার একটি শহর। প্রায় ১ হাজার ৪৩০ মিটার উঁচু একটি মালভূমিতে অবস্থিত শহরটির মুখ বাংলাদেশের সমভূমির দিকে। একে প্রায়ই পৃথিবীর সবচেয়ে বৃষ্টিবহুল স্থান বলা হতো, যদিও এই খেতাব এখন কাছের মৌসিনরামের। এক ক্যালেন্ডার মাসে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টির রেকর্ড, ১৮৬১ সালের জুলাইয়ে ৯ হাজার ৩০০ মিলিমিটার, এবং এক বছরে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টির রেকর্ড, ১৮৬০ সালের আগস্ট থেকে ১৮৬১ সালের জুলাই, এখনও চেরাপুঞ্জির। ২২ এপ্রিল সুরমার পানি ৫৪ সেন্টিমিটার বাড়ার জন্য পাউবো সেখানকার অব্যাহত বৃষ্টিকেই দায়ী করে।
বাংলাদেশে নদীর পানির স্তর ও বন্যার সতর্কবার্তা দেওয়ার কাজ করে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। ১৯৭২ সালে পাউবোর অধীনে প্রতিষ্ঠিত এই কেন্দ্র পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতায় কাজ করে।

হাওরের জেলা সুনামগঞ্জ
বাংলাপিডিয়ার ব্যাখ্যায়, হাওর হলো ভূগঠনজনিত কারণে সৃষ্ট বড় বাটির মতো নিচু ভূমি, যেখানে নদী ও খাল থেকে পানি এসে জমে; বর্ষায় এটি বিশাল জলরাশিতে পরিণত হয় এবং বর্ষা শেষে বেশির ভাগ অংশ শুকিয়ে যায়। হাওর অববাহিকায় প্রায় ৪৭টি বড় হাওর এবং প্রায় ৬ হাজার ৩০০ বিল রয়েছে, যার প্রায় ৩ হাজার ৫০০টি স্থায়ী। এই অববাহিকায় পড়েছে পুরো সুনামগঞ্জ জেলা, হবিগঞ্জের বড় অংশ, সিলেট সদর উপজেলার কিছু অংশ এবং মৌলভীবাজার। বৃহত্তর সিলেটের হাওরগুলোর মধ্যে বাংলাপিডিয়া দেখার, শনির, হাইল, হাকালুকি, মাকার, ছায়ার, টাঙ্গুয়ার ও কাওয়াদিঘির নাম উল্লেখ করেছে। জ্ঞানকোষটি বলছে, জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাওরের প্রান্তিক উঁচু জমিতে বোরো চাষ ছড়িয়েছে এবং বিস্তীর্ণ এলাকা নিষ্কাশিত হয়েছে, যা এখন জলাভূমিগুলোর অস্তিত্বের জন্যই হুমকি। হাওর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাছের ক্ষেত্রও।
সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ জেলার আয়তন প্রায় ৩ হাজার ৭৪৭ বর্গকিলোমিটার, আর ২০২২ সালের জনশুমারিতে জনসংখ্যা ছিল ২৬ লাখ ৯৫ হাজার ৪৯৬। জেলার প্রধান নদীর মধ্যে রয়েছে সুরমা, কুশিয়ারা, যাদুকাটা ও ধামালিয়া। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে জেলার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ, ৬৬ দশমিক ৯৯ শতাংশ, আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল।
জেলার সবচেয়ে পরিচিত জলাভূমি টাঙ্গুয়ার হাওর, ধর্মপাশা ও তাহিরপুর উপজেলায় অবস্থিত। ২০০০ সালের ১০ জুন এটি আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ রামসার জলাভূমি ঘোষিত হয়। এর ভেতরে প্রায় ৪৬টি গ্রাম রয়েছে এবং ৪০ হাজারের বেশি মানুষের জীবিকা এই হাওরের ওপর নির্ভর করে; এখানে ১৪০টির বেশি প্রজাতির মিঠাপানির মাছ পাওয়া যায় এবং প্রতি শীতে প্রায় ২০০ ধরনের পরিযায়ী পাখি আসে। ঢাকা ট্রিবিউনের খবর অনুযায়ী, ২০২৫ সালের আগস্টে জাতীয় পানিসম্পদ পরিষদের নির্বাহী কমিটির এক সভায় পানি আইন ২০১৩-এর ২২ ও ২৭ ধারায় জারি করা প্রথম হাওর পরিবেশ সুরক্ষা আদেশ নিয়ে আলোচনা হয়, যার লক্ষ্য টাঙ্গুয়ার ও হাকালুকি হাওর রক্ষা। একই মাসে বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের তৈরি হাওর মহাপরিকল্পনার মূল্যায়ন ও হালনাগাদের খসড়া নিয়ে সরকার জনসাধারণের মতামত আহ্বান করে।
বোরো, দেশের সবচেয়ে বড় ধানের মৌসুম
সুনামগঞ্জে যে ফসল ঝুঁকিতে ছিল, তা দেশের প্রধান ধান মৌসুমেরই অংশ। মার্কিন কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) ঢাকা কার্যালয় ২০২৬ সালের ৭ এপ্রিল প্রকাশিত ‘গ্রেইন অ্যান্ড ফিড অ্যানুয়াল’ প্রতিবেদনে জানায়, বোরো ধান ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে রোপণ করা হয় এবং এপ্রিল ও মে মাসে কাটা হয়; এটি সেচনির্ভর এবং বাংলাদেশের বার্ষিক চাল উৎপাদনের অর্ধেকের বেশি আসে এই মৌসুম থেকে। ডিএইর তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি ২০২৫/২৬ বিপণন বছরে বোরোর আবাদ ৪৯ লাখ হেক্টর ও উৎপাদন ২ কোটি ৫ লাখ টন চাল বলে প্রাক্কলন করে, আর তখন কাটা চলা ফসলের জন্য পূর্বাভাস দেয় ২ কোটি ২ লাখ টন; কারণ হিসেবে জ্বালানি ও সারের ঘাটতিতে সেচ ও সার প্রয়োগে বিঘ্নের কথা বলা হয়।
একই প্রতিবেদনে বলা হয়, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের হাওর এলাকায় ডিএই স্বল্পমেয়াদি জাত চাষে উৎসাহ দিচ্ছে, কারণ সেখানে বোরো ধান আকস্মিক বন্যার বিশেষ ঝুঁকিতে থাকে; সীমান্তঘেঁষা ভারতের পাহাড়ি অঞ্চলে ভারী বৃষ্টি হলে ভাটিতে আকস্মিক বন্যা হয়, যা কখনো কখনো পুরো ধানের ফসল নষ্ট করে দেয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ থেকে ১৫ দিন আগে পাকে এমন জাত এই ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে; উদাহরণ হিসেবে ব্রি ধান৮৪, ব্রি ধান৮৬, ব্রি ধান১০১ ও ব্রি হাইব্রিড ধান৫-এর নাম দেওয়া হয়। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, শ্রমিকসংকটের কারণে কৃষকেরা বোরো কাটার সময় বেশি মজুরির আশঙ্কা করছিলেন, আর ২০২৬ সালের মার্চে সরকারি গুদামে চালের মজুত ছিল ১৫ লাখ ৬০ হাজার টন।
শ্রমিকসংকট টের পাওয়া যাচ্ছিল পুরো হাওরাঞ্চলে। পাশের জেলা নেত্রকোনা থেকে দেশ রূপান্তর ১৮ এপ্রিল জানায়, একসময় ধান কাটার মৌসুমে দিনাজপুর, যশোর, বগুড়াসহ উত্তরাঞ্চলের নানা জেলা থেকে দলে দলে শ্রমিক হাওরে আসতেন, কিন্তু যাতায়াতের খরচ বাড়া ও বিকল্প কাজের কারণে তাঁদের সংখ্যা অনেক কমে গেছে; ডিজেলের অভাবে দুর্গম হাওরে কিছু কম্বাইন হারভেস্টার মাঠেই থেমে ছিল।
২০১৭ ও পরের বছরগুলোর স্মৃতি
আগাম বন্যা নিয়ে হাওরের কৃষকের ভয় অভিজ্ঞতা থেকেই। ২০১৭ সালে ২৮ মার্চ থেকে সুনামগঞ্জের হাওরে বন্যার পানি ঢুকতে শুরু করে এবং ৮ এপ্রিলের মধ্যে জেলায় অন্তত ২৭ হাজার হেক্টর জমি পানির নিচে চলে যায়, তখন ঢাকা ট্রিবিউন জানায়। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে জেলার ৪৮টি হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধ মেরামত ও নির্মাণে পাউবো ৫৫ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছিল, কিন্তু ডিসেম্বরে শুরু হওয়ার কথা থাকলেও কাজ শুরু হয় ফেব্রুয়ারিতে, আর পানি আসার সময় বেশির ভাগ বাঁধ অসম্পূর্ণ ছিল। কৃষকেরা বোর্ডের কাজে অনিয়ম ও দেরির অভিযোগ তোলেন এবং ফসলহানির জন্য তাকেই দায়ী করেন।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) জিআইইডব্লিউএস কান্ট্রি ব্রিফে ২০১৭ সালের ১০ মে লেখা হয়, সে বছর মার্চের শেষ ও এপ্রিলের শুরুর অতিবৃষ্টিতে ফসল তোলার ঠিক আগে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের উৎপাদন এলাকা প্লাবিত হয়, বিশেষ করে সিলেট, ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগে। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারির ব্রিফে এফএও জানায়, ২০১৭ সালের এপ্রিল থেকে আগস্টের মধ্যে তিন দফা তীব্র আকস্মিক বন্যার কারণে সে বছর দেশের ধান উৎপাদন ৫ কোটি ৮ লাখ টনে দাঁড়ায়, যা পাঁচ বছরের গড়ের সামান্য নিচে; এসব ক্ষতির ফলে ঢাকায় চালের দাম আগের বছরের চেয়ে ২০ শতাংশের বেশি বেড়েছিল।
আধা-পাকা ধান কাটার ঘটনাও আগে দেখা গেছে। ঢাকা ট্রিবিউন ২০২০ সালের ২৫ এপ্রিল জানায়, টানা বৃষ্টি ও উজানের পানিতে হাওর জলাবদ্ধ হওয়ায় সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার কৃষকেরা আধা-পাকা ধান কাটছিলেন; উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জানান, ১ হাজার ৮২০ হেক্টরের মধ্যে ১ হাজার ৬২০ হেক্টরের ধান কাটা হয়েছে, আর কৃষকেরা বলেন, সারা দিন কোমরপানিতে দাঁড়িয়ে কাজ করতে খুব কম শ্রমিকই রাজি হন। নেত্রকোনায় দেশ রূপান্তর ২০২৬ সালের ১৮ এপ্রিল লেখে, ২০১৭, ২০২০ ও ২০২২ সালের আগাম পাহাড়ি ঢলের স্মৃতি তখনও কৃষকের মনে তাজা।
হাওরের ফসলের বড় অংশ রক্ষা করে মাটির ডুবন্ত বাঁধ, যা প্রতি শুকনো মৌসুমে স্থানীয় প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) মাধ্যমে নির্মাণ ও মেরামত করা হয়। যেমন, ২০২১ সালের মার্চে ঢাকা ট্রিবিউন জানায়, সুনামগঞ্জে ৮০৯টি পিআইসির মাধ্যমে ১২৫ কোটি ৭৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ৬২০ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ চলছে, আর হাওর বাঁচাও আন্দোলন দাবি করে, সময়সীমা পেরোলেও জেলার প্রায় অর্ধেক কাজ অসম্পূর্ণ। ২০২৬ মৌসুমের জন্য দেশ রূপান্তর জানায়, নেত্রকোনায় পাউবো ১৯১টি পিআইসির মাধ্যমে প্রায় সাড়ে ৩১ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৪৬ কিলোমিটার ডুবন্ত বাঁধ মেরামত ও নির্মাণ করেছে, আর কর্মকর্তারা আশা করছিলেন অন্তত এপ্রিলের শেষ পর্যন্ত বাঁধগুলো পাহাড়ি ঢল ঠেকাতে পারবে। একই প্রতিবেদনে পরিবেশকর্মীরা বলেন, প্রতিবছর নদী ও খালের পাড় থেকে মাটি কেটে বাঁধ বানানোয় নদীর তলদেশ ভরাট হচ্ছে, ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই বন্যা দেখা দিতে পারে।
ছবি: Balaram Mahalder / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, এটিএন নিউজ, দৈনিক ইত্তেফাক, দ্য ডেইলি স্টার, দেশ রূপান্তর, ঢাকা ট্রিবিউন, মোঙ্গাবে, মার্কিন কৃষি বিভাগ (ফরেন অ্যাগ্রিকালচারাল সার্ভিস), এফএও জিআইইডব্লিউএস, বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)