২০২৬ সালের মে মাসে পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে সীমান্তবর্তী জেলা শেরপুরে কোরবানির পশুর বেচাকেনা জমে উঠতে শুরু করে। ক্রেতারা হাট, খামার ও গৃহস্থের বাড়ি ঘুরে পছন্দের পশু কিনছিলেন। তবে সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় গরু প্রবেশ করলে লোকসানের আশঙ্কায় দুশ্চিন্তায় পড়েছিলেন স্থানীয় খামারিরা। ২৩ মে ২০২৬ তারিখে জেলা থেকে পাঠানো প্রতিবেদনে জাগো নিউজ ২৪ খামারিদের এই শঙ্কার কথা তুলে ধরে।
জেলা পুলিশ জানায়, ভারতীয় গরু ঠেকাতে সীমান্তে পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)সহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা যৌথভাবে কাজ করছেন। জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ জানায়, সে বছর শেরপুরে কোরবানির পশুর জোগান স্থানীয় চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি ছিল এবং প্রতিটি স্থায়ী হাটে তাদের একটি মেডিকেল টিম কাজ করছিল।
শেরপুরের হাটে খামারিদের খরচ ও দাম
জাগো নিউজ চারটি হাটে খামারিদের সঙ্গে কথা বলে: শেরপুর নৌহাটা পৌর গরু-মহিষের হাট, আব্দুস সামাদ গরুহাটি, নালিতাবাড়ী বাইপাস মোড় হাট এবং ঝিনাইগাতী সদর বাজার হাট। খামারিরা জানান, ভালো দামের আশায় তারা সারাবছর গরু লালন-পালন করেছেন, কিন্তু সে মৌসুমে বাজারদর অন্যান্যবারের চেয়ে কম ছিল। তাদের ভাষায়, ভারতীয় গরু ঢুকলে পুরোপুরি লোকসান গুনতে হবে।
খামারিরা জানান, ধানের কুড়া, খেসারি, ধান, ভুট্টা ও ভুসিমিশ্রিত দানাদার খাবার, সবকিছুর বাজারই চড়া। তাদের কথায়, শেরপুরে কাঁচা ঘাস সহজে পাওয়া যায় না, আর খড়ের দামও অনেক বেশি। এর সঙ্গে শ্রমিকের মজুরি, বিদ্যুৎ বিল, চিকিৎসা খরচসহ আনুষঙ্গিক সব খরচই বেড়েছে, তাই সে বছর লাভ মেলানো কঠিন ছিল।
খেসারি হলো লাথাইরাস স্যাটিভাস নামের একটি ডালজাতীয় ফসল, এশিয়া ও পূর্ব আফ্রিকায় যা মানুষের খাবার এবং গবাদিপশুর খাদ্য দুই কাজেই চাষ হয়; খরার বছরেও নির্ভরযোগ্য ফলন দেয় বলে একে টেকসই ফসল হিসেবে গণ্য করা হয়। আর ভুসি বা কুড়া হলো দানাশস্যের বাইরের আবরণ, যা ভাঙানোর সময় আলাদা হয়ে যায়; বাদামি চাল থেকে সাদা চাল বা গম থেকে আটা-ময়দা তৈরির সময় এটি উপজাত হিসেবে পাওয়া যায় এবং বাংলাদেশে গরুর খাবার হিসেবে বহুল ব্যবহৃত।
ঝিনাইগাতী উপজেলার সদর হাটে জাগো নিউজের সঙ্গে কথা হয় কাংশার খামারি আব্দুল কাদের মিয়ার। তিনি বলেন, এবার সবকিছুর দাম বেশি। তার হিসাবে ভুসির কেজি ৬৫ টাকা, কুড়ার বস্তা ১৫০০ টাকা, আর খড়ের আঁটি সাড়ে সাত থেকে আট টাকা পড়েছে; এর সঙ্গে আছে শ্রমিকের খরচ। তিনি বলেন, "আর হাটে ক্রেতারা একেবারেই বেমানান দাম বলছে।"
নালিতাবাড়ী বাইপাস মোড় হাটে আসা খামারি হোসাইন মিয়া বলেন, "খাবার থেকে পোশাক, সবকিছুর দাম বেড়েছে। কোথাও আপত্তি নেই, আপত্তি কেবল গরুর ন্যায্য দাম চাইলে। এবার আমাদের লাভ হবে না আর যদি ভারতীয় গরু আসে তাহলে সর্বনাশ। আমাদের খামারিদের বিরাট ক্ষতি হয়ে যাবে। তাই সরকারের কাছে অনুরোধ, কোনোভাবেই যেন সীমান্তের ওপারের গরু না আসে।"
বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, আব্দুল কাদের মিয়ার এলাকা কাংশা ঝিনাইগাতী উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের একটি; বাকিগুলো হলো গৌরীপুর, ঝিনাইগাতী, ধানশাইল, নলকুড়া, মালিঝিকান্দা ও হাতিবান্ধা। বাংলাপিডিয়া এই উপজেলার উল্লেখযোগ্য হাট হিসেবে ঝিনাইগাতী, ধানশাইল ও তিনানী হাটের নাম দিয়েছে।

শেরপুরে চাহিদা, জোগান ও হাট
জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের প্রধান ডা. রেজুয়ানুল হক ভূঁইয়া জাগো নিউজকে বলেন, সে বছর জেলায় স্থায়ী ২০টি হাট বসেছে এবং প্রতিটি হাটেই বিভাগের মেডিকেল টিম কাজ করছে। তিনি জানান, জেলায় কোরবানির পশুর চাহিদা ছিল ৬২ হাজার, আর জোগান ছিল প্রায় ৯৩ হাজার পশু।
একই বিভাগের আগের বছরের হিসাব থেকে জেলার পশুপালনের পরিসর বোঝা যায়। জাতীয় বার্তা সংস্থা বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) ২০২৫ সালের ২৮ মে জানায়, শেরপুরের পাঁচটি উপজেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১৩ হাজার ৭৬২ জন খামারি পশু পালন করছিলেন, আর অনেক পরিবার ব্যক্তিগত উদ্যোগেও গরু, মহিষ ও ছাগল পালন করেছিল। ২০২৫ সালের ঈদুল আজহার জন্য বিভাগটি জেলায় কোরবানির উপযোগী ১ লাখ ১১ হাজার পশু গুনেছিল, যেখানে জেলার চাহিদা ছিল ৮৫ হাজার ৭৬৩টি; ফলে স্থানীয় চাহিদা মিটিয়েও ২৪ হাজার ৫২৩টি পশু উদ্বৃত্ত থাকার কথা জানানো হয়।
বাসসের সেই প্রতিবেদন অনুযায়ী, সে বছর শেরপুরের খামারিরা ব্রাহমা, শাহিওয়াল, হলস্টেইন, ফ্রিজিয়ান ও দেশিসহ বিভিন্ন জাতের গরু পালন করেন এবং কাঁচা সবুজ ঘাস, খড়, ভুসি ও খৈল খাইয়ে সেগুলো মোটাতাজা করেন। সীমান্তঘেঁষা তিন উপজেলায় ক্ষেতের ঘাস ও পাহাড়ি লতাপাতা খাইয়ে প্রাকৃতিক পরিবেশে দেশি গরু বড় করা হচ্ছিল। খামারিরা বাসসকে বলেন, পাহাড়ে পর্যাপ্ত ঘাস ও লতাপাতা থাকায় এসব গরুর পেছনে আলাদা খাবারের খরচ লাগে না, তাই পাহাড়ে গরু পালনে লাভ বেশি।
২০২৬ সালে খামারিরা যে উদ্বেগের কথা বলেছেন, ২০২৫ সালের প্রতিবেদনেও তা ছিল। খামারিরা তখন আশঙ্কা করেন, চোরাই পথে ভারতীয় গরুর প্রবেশ, ন্যায্য দাম না পাওয়া এবং গোখাদ্যের দাম বৃদ্ধির কারণে তাদের লাভ কমতে পারে। সদর উপজেলার এক খামারি শেরপুর সীমান্ত দিয়ে যেন ভারতীয় গরু প্রবেশ করতে না পারে সে জন্য কর্তৃপক্ষের নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানান, আরেকজন বলেন, শেষ পর্যন্ত ন্যায্য দাম না পেলে তার মতো অনেক ছোট-বড় খামারি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
বাসসের একই প্রতিবেদনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, শেরপুরের কোনো সীমান্ত দিয়ে যেন ভারতীয় গরু অবৈধভাবে প্রবেশ করতে না পারে সে জন্য সীমান্ত এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে, আর হাটে জাল টাকা ঠেকাতে সাদা পোশাকে পুলিশ বিশেষ নজরদারিতে থাকবে। অতিরিক্ত জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা জানান, ঈদের আগে ভেটেরিনারি সার্জনরা খামারিদের নানা পরামর্শ ও সহযোগিতা দিচ্ছেন, এবং কোনো খামারি যেন কৃত্রিম উপায়ে গরু মোটাতাজা করতে না পারেন সেদিকেও তারা সজাগ দৃষ্টি রাখছেন।
শেরপুর সীমান্তে নজরদারি
জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান ভূঁইয়া ২০২৬ সালের মে মাসে জাগো নিউজকে বলেন, সীমান্তে গরুসহ অন্যান্য চোরাচালান ঠেকাতে বিজিবির সঙ্গে জেলা পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সমন্বয় করে কাজ করছেন। তিনি বলেন, সীমান্তে গরুর চোরাচালান শূন্য রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বদ্ধপরিকর।
প্রতিবেদনটির এক সপ্তাহ আগে একই সীমান্তে একটি জব্দের কথা জানায় বিজিবি। দৈনিক সময়ের আলো ২০২৬ সালের ১৫ মে জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ১৪ মে দুপুরে শ্রীবরদী উপজেলার হারিয়াকোনা সীমান্তে অভিযান চালিয়ে বিজিবির কর্ণঝোড়া সীমান্ত ফাঁড়ির সদস্যরা ৪টি ভারতীয় গরু জব্দ করেন। বিজিবির ভাষ্য অনুযায়ী, গরুগুলোর আনুমানিক মূল্য প্রায় আড়াই লাখ টাকা, আর বিজিবির উপস্থিতি টের পেয়ে জড়িতরা পালিয়ে যায়। ১৫ মে ভোরে সিংগাবরুনা ইউনিয়নের মেজপাড়া এলাকায় বিজিবির একটি টহল দল একটি ব্যাটারিচালিত অটোভ্যানসহ প্রায় ১০ লাখ টাকার ভারতীয় প্রসাধনসামগ্রী জব্দ করে। কর্ণঝোড়া বিওপির ইনচার্জ নায়েক সুবেদার সাইদুর রহমান দুটি জব্দের সত্যতা নিশ্চিত করেন।
একই সময়ে সীমান্তের অন্য এলাকাতেও বিজিবি সতর্কতা বাড়ানোর কথা জানায়। দৈনিক যুগান্তর ২০২৬ সালের ৮ মে জানায়, পঞ্চগড় জেলার ১৮০ কিলোমিটার সীমান্তজুড়ে বিজিবি সতর্কতা জারি করেছে, নজরদারি বাড়িয়েছে এবং চেকপোস্টে সন্দেহভাজন ব্যক্তি ও যানবাহনে তল্লাশি চালাচ্ছে। পঞ্চগড়-১৮ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল আব্দুল্ল্যাহ মোহাম্মদ কায়েস বলেন, সদর দপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী পুশইন, অবৈধ অনুপ্রবেশ, মাদক চোরাচালান, গরু চোরাচালান, মানবপাচারসহ যেকোনো ধরনের সীমান্ত অপরাধ প্রতিরোধে বিজিবি সর্বদা সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
দৈনিক প্রতিদিনের বাংলাদেশ ২০২৬ সালের ২১ মে জানায়, অবৈধ গরু প্রবেশ রোধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে সীমান্তজুড়ে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বিজিবি। আটটি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত জেলায়, অর্থাৎ চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুষ্টিয়া, যশোর, সাতক্ষীরা, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, বান্দরবান ও কক্সবাজারে অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন ও চেকপোস্ট বসানো হয়। পত্রিকাটির তথ্যমতে, রাতের আঁধারে চোরাচালান ঠেকাতে ড্রোন, সার্চলাইট ও থার্মাল ডিভাইস ব্যবহারের পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয়ে যৌথ অভিযান চলছিল।

সীমান্ত হাট ও আমদানি নিয়ে সরকারের অবস্থান
ঈদের পশু বেচাকেনা নিয়ে সরকার তার অবস্থান তুলে ধরে ২০২৬ সালের ৩ মে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক ব্রিফিংয়ে; সেদিনই দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ও ঢাকা ট্রিবিউন তা প্রকাশ করে। মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানান, দেশীয় খামারিদের স্বার্থ রক্ষায় এবার সীমান্তবর্তী পশুর হাট বন্ধের বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, "অতীতে সীমান্তঘেঁষা কিছু হাটের মাধ্যমে বিদেশি পশু প্রবেশ করায় দেশীয় খামারিরা ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। এই পরিস্থিতি বন্ধে বর্ডার এলাকায় হাট না বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।"
একই ব্রিফিংয়ে মন্ত্রী জানান, সারাদেশে ৩ হাজার ৬০০টির বেশি পশুর হাট বসবে, এর মধ্যে রাজধানী ঢাকায় উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৬টি ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১১টিসহ মোট ২৭টি হাট। ঢাকার এসব হাটে ২০টি ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করবে। তিনি বলেন, কোরবানির পশুবাহী ট্রাকে চাঁদাবাজি বন্ধে সরকার কঠোর অবস্থানে থাকবে, হাট এবং ক্রেতা-বিক্রেতাদের নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সার্বক্ষণিক তৎপর থাকবে এবং প্রয়োজনে সাদা পোশাকেও দায়িত্ব পালন করবে। এ বছরও অনলাইনে পশু বিক্রির ব্যবস্থা থাকবে এবং অনলাইনে পশু কিনলে কোনো খাজনা বা হাসিল নেওয়া হবে না; চামড়া যেন নষ্ট না হয় সে জন্য পেশাদার ও অপেশাদার কসাইদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৪ মে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় মন্ত্রী জানান, এ বছর বিদেশ থেকে পশু আমদানির কোনো প্রয়োজন হবে না, এবং সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে পশু প্রবেশ ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সীমান্ত এলাকার মানুষকেও সতর্ক করা হয়েছে, যেন কোনো পশু চোরাই পথে দেশে না ঢোকে। একই দিনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি বলেন, ভারত থেকে বাংলাদেশে চোরাই পথে যেন গরু প্রবেশ করতে না পারে, সে বিষয়ে সরকার অত্যন্ত সজাগ রয়েছে এবং এ লক্ষ্যে বিজিবির সঙ্গে একাধিক বৈঠক হয়েছে, দৈনিক সময়ের আলো জানায়। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন মাংস উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ, প্রতি বছর কোরবানির ঈদে দেশে প্রায় এক কোটি গরু, মহিষ, ভেড়া ও ছাগল কোরবানি হয় এবং স্থানীয় খামারিরাই এই চাহিদা পূরণে সক্ষম।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু ২০২৬ সালের ১৫ মে প্রকাশিত দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসকে বলেন, অবৈধ আমদানি ঠেকাতে ও দেশীয় খামারিদের সুরক্ষায় সীমান্তের পশুর হাট বন্ধ রাখা হবে। তিনি জানান, সারাদেশে নির্বিঘ্নে পশু পরিবহন নিশ্চিত করতে বিজিবি ও বাংলাদেশ পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, জেলা প্রশাসন ও প্রাণিসম্পদ দপ্তরকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, আর সড়ক, রেল ও নৌপথে গরুবাহী ট্রাকে ডাকাতি ঠেকাতে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
২০২৬ সালের ঈদুল আজহায় দেশের পশুর হিসাব
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাবে ২০২৬ সালে কোরবানির পশুর সম্ভাব্য চাহিদা ছিল ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি, বিপরীতে প্রাপ্যতা ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি; মন্ত্রীর হিসাবে প্রায় ২২ লাখ ২৭ হাজার ৫০৬টি পশু উদ্বৃত্ত থাকার কথা। প্রস্তুত পশুর মধ্যে ছিল:
- গরু-মহিষ: ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি
- ছাগল-ভেড়া: ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি
- উট ও দুম্বাসহ অন্যান্য প্রজাতির পশু: ৫ হাজার ৬৫৫টি
তুলনার জন্য, ব্রিফিংয়ের প্রতিবেদনে ঢাকা ট্রিবিউন জানায়, ২০২৫ সালের ঈদুল আজহায় মন্ত্রণালয় ১ কোটি ২৪ লাখ ৪৭ হাজার ৩৩৭টি পশুর প্রাপ্যতা এবং ২০ লাখ ৬৮ হাজার পশুর সম্ভাব্য উদ্বৃত্ত ধরেছিল; শেষ পর্যন্ত কোরবানি হয়েছিল ৯১ লাখ ৩৬ হাজার ৭৩৪টি পশু এবং প্রকৃত উদ্বৃত্ত ছিল প্রায় ৩৩ লাখ ১০ হাজার।
বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা ২০২৬ সালের ২১ মে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে নিজ নিজ বিভাগের হিসাব দেন। শেরপুর যে বিভাগের অন্তর্ভুক্ত, সেই ময়মনসিংহ বিভাগে কোরবানির পশুর চাহিদা ছিল ৪ লাখ ৪৪ হাজার ৫৮৮টি, বিপরীতে কোরবানিযোগ্য পশু ৫ লাখ ৬১ হাজার ৬৩৯টি, উদ্বৃত্ত ১ লাখ ১৭ হাজার ৫১টি, জানান বিভাগীয় পরিচালক মনোরঞ্জন ধর। ভারতীয় পশু প্রবেশ ঠেকাতে প্রতিটি ওয়ার্ড পর্যায়ে বিভিন্ন পেশার মানুষদের নিয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানান তিনি, এবং চোরাচালান বন্ধ করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন। দেশে সবচেয়ে বেশি পশু উৎপাদনকারী রাজশাহী বিভাগে চাহিদা ছিল ২৪ লাখ ৫ হাজার ৮৯টি, আর প্রস্তুত ছিল ৪৩ লাখ ৫ হাজার ৬২৮টি পশু। আট বিভাগের মধ্যে ঢাকা ও চট্টগ্রাম ছাড়া বাকি সব বিভাগে পশু উদ্বৃত্ত থাকার কথা জানানো হয়।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাহজামান খান পত্রিকাটিকে বলেন, এবার কোরবানির চাহিদার তুলনায় ২২ লাখ ৩৩ হাজার গবাদিপশু বেশি আছে এবং কোনো ঘাটতি হবে না। তিনি জানান, সীমান্তে বিজিবি, পুলিশ, কোস্ট গার্ডসহ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও স্থানীয় লোকজনকে নিয়ে চোরাচালান বন্ধ করতে সরকার তৎপর রয়েছে, এবং "এখন পর্যন্ত কোনো চোরাচালানের সংবাদ আমরা পাইনি"। তিনি আরও বলেন, সারাদেশের পশুর হাটে ভেটেরিনারি দল কাজ করবে এবং কোনো পশু অসুস্থ হলে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দেওয়া হবে।
অন্য জেলার খামারিদের খরচ ও শঙ্কা
এ উদ্বেগ কেবল শেরপুরের খামারিদের ছিল না। দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ২০২৬ সালের ১৫ মে জানায়, গোখাদ্য ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় সারাদেশের খামারিরা মিশ্র প্রত্যাশা নিয়ে ঈদুল আজহার দিকে এগোচ্ছেন, আর চোরাই পথে ভারতীয় গরু ঢোকার আশঙ্কাও খাতটিকে চাপে রাখছে। রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার এক খামারি পত্রিকাটিকে বলেন, গোখাদ্যের দাম বাড়ায় তার উৎপাদন খরচ প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে, আর ডিজেলের দাম বৃদ্ধি ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে পরিবহন খরচ বেড়েছে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ।
মেহেরপুরের এক গরু পালনকারী একই পত্রিকাকে বলেন, গোখাদ্যের দাম বৃদ্ধিতেই খামারিরা সবচেয়ে বেশি কষ্টে পড়েছেন, আর উত্তর ভারত থেকে চোরাই গরুতে স্থানীয় হাট ভরে যাওয়ার ভয়ও আছে। তার মতে, অবৈধ প্রবেশ অনেকটাই বন্ধ হয়েছে, তবে ঈদের আগে ঝুঁকি থেকেই যায়। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পত্রিকাটিকে বলেন, সে বছর খাদ্য ও ওষুধের খরচ বেড়েছে, তবে কোরবানির পশুর চাহিদা জোরালো থাকবে এবং তাতে খামারিরা ভালো দাম পাবেন বলে তিনি আশা করেন।
প্রতিদিনের বাংলাদেশে জয়পুরহাট ডেইরি ফারমার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাদমান জয় রায়হান বলেন, সে বছর খামারে বিদ্যুৎ, খাবার ও ওষুধসহ অন্যান্য ব্যয় বেশি ছিল, এখন যদি চোরাচালানিরা সীমান্ত দিয়ে গরু প্রবেশ করায় তাহলে তাদের লোকসান হবে। ময়মনসিংহের ধোবাউড়ার এক খামারি পত্রিকাটিকে বলেন, তাদের সীমান্ত দিয়ে প্রায় প্রতিবছরই ভারতীয় গরু ঢোকে বলে তার অভিজ্ঞতা; সরকার যদি এ বছর কড়া নজরদারিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তারা বিপদে পড়বেন, কারণ এবার তাদের ব্যয় বেশি ছিল।
সব অঞ্চলে অবশ্য খাবারের খরচ সমান ছিল না। বরিশাল বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ পরিচালক মো. মাহফুজুল হক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, সেখানে মানুষ নদীর পাড়ে ও খোলা প্রান্তরে গরুকে কাঁচা ঘাস খাওয়ান বলে উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কম। শেরপুরের খামারিরা ঠিক এর উল্টো কথাই বলেছেন: সেখানে কাঁচা ঘাস সহজে মেলে না।
ভারতীয় গরু কীভাবে দেশের খামারিদের উদ্বেগ হয়ে উঠল
২০১৪ সালের আগে বাংলাদেশ ভারতের গরুর ওপর অনেকখানি নির্ভরশীল ছিল, যার বড় অংশ সীমান্ত দিয়ে অনানুষ্ঠানিক পথে আসত। ঢাকা ট্রিবিউন ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে জানায়, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে প্রায় ২১ লাখ গরু অনানুষ্ঠানিকভাবে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছিল। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) প্রকাশিত গ্লোবাল মিট নিউজের ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বরের এক প্রতিবেদনে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বরাতে বলা হয়, ২০১৪ সালে ২২ লাখ ভারতীয় গরু দেশে প্রবেশ করে। যশোরের এক ব্যবসায়ী সেই প্রতিবেদনে বলেন, আগে প্রতিটি সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার গরু আসত, যা তখন বন্ধ হয়ে যায়।
একই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারত ২০১৫ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশে গরু সরবরাহ সীমিত করে, এরপর বাংলাদেশে গরুর মাংসের দাম ৪০ শতাংশের বেশি বেড়ে যায়। তখনকার মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ বলেছিলেন, দেশে আড়াই কোটি গরু উৎপাদিত হয়, উৎসবের জন্য ৬০ লাখ ষাঁড় প্রস্তুত আছে এবং ছাগল-ভেড়াসহ চাহিদা মোটামুটি ৯০ লাখ; তিনি সে বছর কোরবানির পশুর ১০ থেকে ১৫ শতাংশ ঘাটতির আশঙ্কা করেছিলেন। সিপিডির ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম তখন আনুষ্ঠানিক আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্যের পথ তৈরি এবং দেশীয় পশুসম্পদে বিনিয়োগ বাড়ানোর পক্ষে মত দেন।
ঢাকা ট্রিবিউনের ২০২১ সালের প্রতিবেদনে ভারতের বিধিনিষেধের পর দেশীয় খাত কীভাবে বেড়েছে তার বিবরণ আছে। গরুর খামারির সংখ্যা ২০১৫ সালের ৩ লাখ থেকে ২০২১ সালে ৬ লাখ ৯৮ হাজারে পৌঁছায়, মোটাতাজা করা ষাঁড়ের সংখ্যা ২০১৭ সালের ৩৩ লাখ ৪০ হাজার থেকে ২০২১ সালে ৩৮ লাখ ৬০ হাজারে ওঠে, আর সে বছরের ঈদুল আজহায় ৪৫ লাখ ৪০ হাজার গরু-মহিষসহ প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ পশু প্রস্তুত ছিল। গোখাদ্যের খরচ তখনও চাপ তৈরি করছিল: প্রতিবেদন অনুযায়ী খামারিরা ৩৭ কেজির এক বস্তা খাবারের জন্য ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা দিচ্ছিলেন।
২০২৬ সালের মে মাসে মন্ত্রী বাংলাদেশকে মাংস উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং দেশি পশু দিয়েই ঈদের চাহিদা মেটাতে সক্ষম বলে বর্ণনা করেন। শেরপুরের মতো সীমান্ত জেলার খামারিরা সাংবাদিকদের যে ভয়ের কথা বলেছেন, তা পশুর ঘাটতি নয়, বরং সীমান্তের ওপার থেকে আসা গরুতে তাদের দাম পড়ে যাওয়া।
মেঘালয়ের পাহাড়ের পাদদেশে সীমান্ত জেলা শেরপুর
শেরপুর বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের একটি জেলা, যা ময়মনসিংহ বিভাগের অন্তর্ভুক্ত। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী জেলার আয়তন ১৩৬৪.৬৭ বর্গকিলোমিটার; এর উত্তরে ভারতের মেঘালয় রাজ্য, পশ্চিম ও দক্ষিণে জামালপুর এবং পূর্বে ময়মনসিংহ জেলা। প্রধান নদীর মধ্যে আছে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, সোমেশ্বরী, চেল্লাখালী, ভোগাই ও কংস। শেরপুর আগে জামালপুর জেলার একটি মহকুমা ছিল; ১৯৮৪ সালে এটি জেলায় উন্নীত হয়।
জেলায় পাঁচটি উপজেলা: শেরপুর সদর, নালিতাবাড়ী, শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী ও নকলা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ অনুযায়ী জেলায় ৩ লাখ ৯৬ হাজার ১৪৯টি খানা এবং ১৫ লাখ ১ হাজার ৮৫৩ জন মানুষ ছিল; এর মধ্যে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ ১১ হাজার ৮২ জন, যাদের বেশির ভাগ গারো, কোচ ও হাজং।
প্রতিবেদনে যে দুটি উপজেলার নাম এসেছে, দুটিই একেবারে সীমান্তে। বাংলাপিডিয়া ঝিনাইগাতীকে ২৪২.০৭ বর্গকিলোমিটার আয়তনের একটি উপজেলা হিসেবে বর্ণনা করেছে, যার উত্তরে মেঘালয়; সোমেশ্বরী ও চেল্লাখালী এর নদীগুলোর মধ্যে অন্যতম, আর প্রধান ফসল ধান, গম, আলু ও সবজি। ৩২৭.৬০ বর্গকিলোমিটারের নালিতাবাড়ীর উত্তরেও মেঘালয়, পূর্বে হালুয়াঘাট উপজেলা; এর নদীর মধ্যে আছে ভোগাই, কংস, মালিঝি ও থলং। বাংলাপিডিয়া সেখানে ২১টি দুগ্ধ খামার এবং ৪১টি হাটবাজারের কথা উল্লেখ করেছে, সঙ্গে মধুটিলা ইকোপার্ক ও ভোগাই নদীর ওপর একটি রাবার ড্যামের কথা।

ঈদুল আজহা ও কোরবানি
ঈদুল ফিতরের পাশাপাশি ঈদুল আজহা ইসলামের দুটি প্রধান উৎসবের দ্বিতীয়টি। এটি হিজরি বর্ষপঞ্জির দ্বাদশ ও শেষ মাস জিলহজের ১০ তারিখে পালিত হয় এবং আল্লাহর আদেশ পালনে নবী ইবরাহিম (আ.)-এর নিজের ছেলেকে কোরবানি দিতে প্রস্তুত থাকার স্মরণে উদ্যাপিত হয়। ঈদের দিন সকালে ঈদের নামাজের পর গবাদিপশু কোরবানি করা হয়; এই ধর্মীয় রীতিকে কোরবানি বা উদহিয়া বলা হয়। প্রথা অনুযায়ী মাংসের এক-তৃতীয়াংশ কোরবানিদাতা পরিবার খায়, বাকিটা গরিব ও অভাবী মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হয়।
দৈনিক যুগান্তরের খবর অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৮ মে সন্ধ্যায় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সভায় জানানো হয়, দেশের আকাশে জিলহজ মাসের চাঁদ দেখা গেছে, তাই ২৮ মে বাংলাদেশে ঈদুল আজহা উদ্যাপিত হবে। সৌদি আরব আগেই ২৭ মে ঈদ পালনের ঘোষণা দিয়েছিল। ফলে শেরপুরের প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয় ঈদের আগের শেষ সপ্তাহে, যখন পশুর হাটের সবচেয়ে ব্যস্ত দিনগুলো তখনও সামনে।
ছবি: Wasiul Bahar / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ঢাকা ট্রিবিউন, দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, প্রতিদিনের বাংলাদেশ, দৈনিক সময়ের আলো, দৈনিক যুগান্তর, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (গ্লোবাল মিট নিউজ), বাংলাপিডিয়া, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (উইকিপিডিয়ার মাধ্যমে), উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)