দেশে মানসম্মত ফল ও খাদ্যপণ্য উৎপাদিত হলেও যথাযথ প্রচারের অভাব, ভোক্তাদের সচেতনতার ঘাটতি এবং কৃষক ও বিজ্ঞানীদের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে খাতটির সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ২০২৬ সালের ২৭ জুন, শনিবার, রাজধানীর বাড্ডায় জাগো নিউজ কার্যালয়ে আয়োজিত ‘ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ: সমস্যা ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এ মন্তব্য করেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন। জাগো নিউজ ২৪ খবরটি প্রকাশ করে ২৯ জুন।
তিনি বলেন, দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ ও ফল প্রক্রিয়াজাত শিল্পের বিকাশে সরকার, বিজ্ঞানী, কৃষক ও ভোক্তাদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে। বৈঠকে সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনা করেন জাগো নিউজের সম্পাদক কে. এম. জিয়াউল হক। এতে সরকারি কর্মকর্তা, উদ্যোক্তা, কৃষক ও বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন।
মানের চেয়ে দামে ঝোঁক, মাঠে পৌঁছায় না গবেষণা
নাজের হোসাইনের মতে, বাংলাদেশের ভোক্তারা সাধারণত পণ্যের গুণগত মান বা উৎপত্তির চেয়ে কম দামের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হন। ফলে নিরাপদ ও মানসম্মত খাদ্য বেছে নেওয়ার প্রবণতা কম, যা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক।
তিনি জানান, বিজ্ঞানীরা নতুন নতুন উন্নত জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন করলেও মাঠপর্যায়ের কৃষকদের সঙ্গে তাদের কার্যকর যোগাযোগের ঘাটতি রয়েছে। এ কারণে অনেক ক্ষেত্রে গবেষণার সুফল কৃষকের কাছে পৌঁছায় না এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনও বাধাগ্রস্ত হয়।

প্রক্রিয়াজাত খাদ্যে আস্থার সংকট ও নীতিসহায়তার দাবি
ক্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেন, অধিক মুনাফার আশায় অনেক সময় কৃষক ও মধ্যস্বত্বভোগীরা প্রয়োজনীয় সময় না মেনে কৃষিপণ্য বাজারজাত করেন। একই সঙ্গে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও অনিয়মের কারণে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের প্রতি ভোক্তাদের আস্থা কমছে, যার নেতিবাচক প্রভাব দেশের রপ্তানি বাজারেও পড়ছে।
কৃষকদের টিকিয়ে রাখতে তিনি সরকারের কাছে কার্যকর নীতিসহায়তা চান। তাঁর তালিকায় ছিল:
- পরিবহন ও ফ্রেইট ব্যয় কমানো
- কোল্ড স্টোরেজ সুবিধার সম্প্রসারণ
- সরকারি উদ্ভাবনী প্রকল্পগুলোর যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা
- দেশি ভালো পণ্যের প্রচারে সরকারের আরও সক্রিয় ভূমিকা
নাজের হোসাইন বলেন, সরকারি বিভিন্ন সংস্থা কৃষক ও উদ্যোক্তাদের কাছে নানান বার্তা পৌঁছে দিলেও ভোক্তাদের জন্য সচেতনতামূলক কার্যক্রম তুলনামূলক কম। ফলে দেশি ভালো পণ্য সম্পর্কে সাধারণ মানুষ পর্যাপ্ত তথ্য পান না, আর মানসম্মত স্থানীয় পণ্য থাকলেও অনেকে বিদেশি পণ্যের দিকে ঝুঁকে পড়েন। তাঁর মতে, খাদ্য নিরাপত্তা ও ফল প্রক্রিয়াজাত শিল্পের টেকসই উন্নয়নে সরকার, বিজ্ঞানী, কৃষক, উদ্যোক্তা ও ভোক্তাদের সমন্বিত উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই।
ক্যাব ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি বেসরকারি, অলাভজনক ও স্বেচ্ছাসেবী ভোক্তা সংগঠন। ভোক্তা তথ্য ও শিক্ষা, নিত্যপণ্য ও সেবার দাম ও মান পর্যবেক্ষণ, ভোক্তার অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং নিরাপদ খাদ্যের পক্ষে প্রচারণা এর প্রধান কাজ। সংগঠনটি ১৯৮১ সালে ভোক্তা সংগঠনগুলোর আন্তর্জাতিক জোট কনজ্যুমারস ইন্টারন্যাশনালের সদস্য হয়।

সংগ্রহোত্তর অপচয়ের প্রেক্ষাপট
প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণের দুর্বলতা দেশের ফল খাতের পুরোনো সমস্যা। ২০২১ সালের আগস্টে হর্টেক্স ফাউন্ডেশনের এক কর্মশালায় উপস্থাপিত গবেষণায় বলা হয়, সংগ্রহোত্তর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় প্রতি মৌসুমে গড়ে ২৪ শতাংশ আম নষ্ট হয়, যার মূল্য প্রায় ৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। গবেষণা অনুযায়ী খিরসাপাত আমের অপচয় ছিল ৩৭ শতাংশ, ফজলির ২৮ দশমিক ৭ শতাংশ এবং কাঁঠালের ২৫ দশমিক ৩ শতাংশ। গাছ থেকে অদক্ষভাবে পাড়া, নিম্নমানের মোড়ক, সংরক্ষণে কোল্ড চেইন না থাকা এবং যথাযথ পরিবহনব্যবস্থার অভাবকে এর কারণ বলা হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) হিসাবে ২০১৯-২০ সালে দেশে ২৪ দশমিক ৬৮ লাখ টন আম উৎপাদিত হলেও রপ্তানি হয় মাত্র ২৮৩ টন।

বৈঠকে যাঁরা ছিলেন
গোলটেবিল বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজের সাবেক উপাচার্য, গবেষক ও কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান; বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী; বছরব্যাপী ফল উৎপাদন প্রকল্পের সাবেক প্রকল্প পরিচালক ও ফল বিশেষজ্ঞ ড. মো. মেহেদী মাসুদ; কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ আরিফুর রহমান; বিএসটিআইয়ের উপপরিচালক (খাদ্য ও কৃষি) এনামুল হক; প্রাণ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইলিয়াছ মৃধা; হাসেম ফুডস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবুল হাসেম; বাংলাদেশ অ্যাগ্রো-প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. ইকতাদুল হক; কাজু অ্যান্ড কফি অ্যাগ্রোর নির্বাহী পরিচালক মো. মাহাতাব আলী; চাঁপাইনবাবগঞ্জের কৃষি উদ্যোক্তা ইসমাইল খান শামীম এবং নওগাঁর কৃষি উদ্যোক্তা সোহেল রানা।
ছবি: Yahya / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (হর্টেক্স ফাউন্ডেশনের গবেষণা ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য), কনজ্যুমারস ইন্টারন্যাশনাল





মন্তব্য
(০)