গিনির রাজধানী কোনাক্রি থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরের গ্রামীণ জনপদ তানেনে বিএমআই ফার্মস নামের একটি কৃষিখামার ১ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে ফল চাষ করছে এবং আশপাশের ২৭টি গ্রামের প্রায় ৩০০ মানুষকে কাজ দিচ্ছে। অথচ খামারটির শুরু একটি বিয়ার কারখানার পরিকল্পনা থেকে। ২০২৬ সালের ১৩ জানুয়ারি প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে খামারটির গল্প তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গিনির শ্রমশক্তির ৫২ শতাংশ কৃষিতে কাজ করে, কিন্তু আনুষ্ঠানিক বাণিজ্যিক চাষ সেখানে প্রায় নেই।
বিএমআই ফার্মসের প্রধান নির্বাহী, স্থানীয় উদ্যোক্তা বাসাম মেরহি কখনো এই পথের কথা ভাবেননি। ‘কেউ যদি আমাকে বলত আমি কৃষিতে বিনিয়োগ করব, আমি বলতাম, তুমি পাগল,’ আধুনিক সেচে বেড়ে ওঠা সারি সারি ফলগাছের দিকে তাকিয়ে হেসে বলেন তিনি।

বিয়ার কারখানা থেকে ফলের খামার
প্রতিবেদন প্রকাশের পাঁচ বছর আগে মেরহির পরিকল্পনা ছিল একটি বিয়ার কারখানা গড়ার। অর্থায়নের জন্য তিনি বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বেসরকারি খাতের প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক অর্থ করপোরেশনের (আইএফসি) কাছে যান। সেখানে তিনি জানতে পারেন, প্রকল্পটি কৃষির সঙ্গে যুক্ত হলে তবেই অর্থায়নের যোগ্য হবে। এই শর্তেই তিনি পথ বদলে কৃষিতে আসেন।
শুরুটা সহজ ছিল না। ‘যাত্রাটা সহজ ছিল না। সঠিক সমাধান খুঁজতে আমরা দুই বছর হারিয়েছি,’ বলেন মেরহি। তাঁর কথায়, সেচের সমস্যা আর বারবার পানির ঘাটতিতে প্রথম দিকের ফসল নষ্ট হয়। প্রতিবেদনের সঙ্গে প্রকাশিত ভিডিওতে তিনি জানান, পানির অভাবে প্রথম প্যাশন ফলের চাষ ব্যর্থ হয়।
এরপর আইএফসির ‘লোকাল চ্যাম্পিয়নস ইনিশিয়েটিভ’ বিএমআই ফার্মসকে উচ্চসম্ভাবনার স্থানীয় ব্যবসা হিসেবে চিহ্নিত করে এবং গিনি বাণিজ্যিক কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের (পিডিএসিজি) সঙ্গে যুক্ত করে দেয়। প্রকল্পটিতে অর্থ দেয় দরিদ্র দেশগুলোর জন্য বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (আইডিএ)। ২০২০ সালের ২২ সেপ্টেম্বর অনুমোদিত ১০ কোটি ডলারের এই প্রকল্পের লক্ষ্য বাণিজ্যিক কৃষির মূল্যশৃঙ্খল থেকে উপকৃত কৃষক ও গ্রামীণ পরিবারের সংখ্যা বাড়ানো। প্রকল্পটি খামারকে ফলের জাত বাছাই, মাটি ব্যবস্থাপনা, সেচের নকশা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ যন্ত্রপাতিতে কারিগরি সহায়তা ও বিশেষজ্ঞ পরামর্শ দেয়।
দুটি বাঁধ, পিভট সেচ আর জুস কারখানা
খামারটি নির্ভুল কৃষির (প্রিসিশন অ্যাগ্রিকালচার) আধুনিক কৌশলে চাষ করে। পানির দক্ষ ব্যবহার ও সারা বছর চাষের জন্য দুটি বাঁধ তৈরি করা হয়েছে এবং বসানো হয়েছে বৃত্তাকার পিভট সেচ। ভিডিওতে মেরহি জানান, খামারে কমলা, অ্যাভোকাডো, কলা, পেঁপে ও প্যাশন ফল লাগানো হয়েছে, পেঁয়াজও সফল হয়েছে। ফলন স্থিতিশীল হওয়ার পর কোম্পানি জুস কনসেনট্রেট ও কোমল পানীয়ের একটি প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা যোগ করে।
বিএমআই ফার্মস গ্রামগুলোর জন্য বিশুদ্ধ পানির ৬০টির বেশি নলকূপ বসিয়েছে এবং স্কুল ও আশপাশের জনপদে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে খামারে প্রশাসনিক সহকারী হিসেবে প্রথম চাকরি পাওয়া লুসি মাওমি বলেন, ‘এখানে কাজ করতে পেরে সত্যিই গর্ব হয়।’ মেরহির ভাষায়, ‘গিনি জমি, পানি ও মেধায় সমৃদ্ধ। আমাদের লক্ষ্য খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা দূর করতে সাহায্য করা, কর্মসংস্থান তৈরি করা এবং তরুণ চাষিদের শক্তিশালী করা।’

অনুদান টেনেছে বেসরকারি পুঁজি
আইডিএ ও আইএফসির যৌথ উদ্যোগ ম্যাচিং গ্রান্ট বা সমপরিমাণ অনুদানের মাধ্যমে ক্ষুদ্র চাষিদের মূল্যশৃঙ্খলে যুক্ত করে। গিনিতে আইএফসি সম্ভাব্য বিনিয়োগের জন্য ২০টি কৃষিব্যবসা যাচাই করে, আর আইডিএ তাদের ব্যবসা পরিকল্পনায় ৬৫ লাখ ডলার অনুদান দিয়ে ৩ কোটি ৬০ লাখ ডলারের বাড়তি বেসরকারি পুঁজি টানে। ম্যাচিং গ্রান্ট ও বাজার অবকাঠামোর সহায়তায় কৃষি মূল্যশৃঙ্খলে ১৪ হাজার ৮০০-র বেশি কর্মসংস্থান হয়, যার ৫ হাজার নারীদের। ৪৯ হাজার ৫০০-র বেশি কৃষক ও গ্রামীণ পরিবার নতুন বাণিজ্যিক সুযোগ পায়।
আইএফসির পরামর্শসেবা ও ২০২৪ সালের তৃতীয় গিনি বিনিয়োগ ফোরামে আইডিএর সহায়তায় কৃষিব্যবসাগুলো ১ কোটি ৪১ লাখ ডলারের স্থানীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করে। বিনিয়োগ উন্নয়ন সংস্থা এপিআইপির মহাপরিচালক ওলিয়ানো দিয়ানা কুয়াতে জানান, এই সহায়তায় কাসাভা প্রক্রিয়াজাতকরণ, খাদ্য উৎপাদন ও তারপুলিন তৈরির তিনটি প্রকল্প ধারণা থেকে পূর্ণ অর্থায়িত, বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত ব্যবসায় পৌঁছেছে।
ফনিও রপ্তানি বেড়েছে কয়েক গুণ
রপ্তানি উন্নয়ন সংস্থা এজিইউআইপিইএক্সের পরিচালক আমাদু দাফ বালদে জানান, গিনির ফনিও রপ্তানি ২০২০ সালের ৫৭ টন থেকে ২০২৪ সালে ৬০০ টনে উঠেছে। প্রথম আন্তর্জাতিক ফনিও ফোরাম ও একটি আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক গঠন এতে সাহায্য করেছে। ফনিও পশ্চিম আফ্রিকার ছোট দানার একটি শস্য, যা বিশেষ করে গিনির ফুতা জালোন পার্বত্য অঞ্চলের গ্রামে গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য। ২০১৯ সালে বিশ্বের মোট ফনিও উৎপাদনের ৭৫ শতাংশের বেশি এসেছে গিনি থেকে।

বিশ্বব্যাংক গ্রুপ এপিআইপি ও এজিইউআইপিইএক্সের ডিজিটাল হাতিয়ার হালনাগাদ করেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, অ্যাগ্রিকানেক্ট কম্প্যাক্টে যুক্ত ২৩টি দেশের একটি গিনি; সিমান্দু ২০৪০ কর্মসূচির কৃষি লক্ষ্যের জোরে দেশটি কৃষিতে মূল্য সংযোজনের ভালো অবস্থানে আছে।
ছবি: Abdoulrahamane 99MDS Barry / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: বিশ্বব্যাংক, বিশ্বব্যাংক প্রকল্প তথ্য (গিনি বাণিজ্যিক কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প, P164184), উইকিপিডিয়া (ফনিও)





মন্তব্য
(০)