এক যুগ আগেও দেশের বাজারে ড্রাগন ফল, স্ট্রবেরি, রামবুটান বা অ্যাভোকাডো কালেভদ্রে দেখা যেত, আর দাম ছিল সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। ২০২৬ সালের জুনে জাগো নিউজের এক প্রতিবেদনে কৃষি কর্মকর্তা ও ফল বিশেষজ্ঞরা জানান, দেশেই চাষ হওয়ায় এসব ফল এখন রাজধানী থেকে উপজেলা পর্যায়ের দোকানেও মিলছে, দামও কমেছে। একই সঙ্গে জনপ্রিয় হচ্ছে বিদেশি জাতের আম ও বারোমাসি ভিয়েতনামি কাঁঠাল।
কেন জনপ্রিয় হলো বিদেশি ফল
ফল বিশেষজ্ঞ ড. মেহেদী মাসুদ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) 'বছরব্যাপী ফল উৎপাদনের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্প'-এর সাবেক পরিচালক। ডেইলি স্টারের ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত চলা এই প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল শুধু মৌসুমে নয়, সারা বছর ফলের জোগান নিশ্চিত করা। জাগো নিউজকে ড. মাসুদ বলেন, 'করোনা মহামারির পর থেকে দেশে বিদেশি ফলের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। করোনার সময় মানুষ আগের চেয়ে বেশি ফল খেয়েছেন। ফলে নতুন ও পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ ফলের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়েছে।'
কৃষি পরামর্শক ড. সুরজিৎ সরকার তিনটি কারণ দেখান: ফলগুলোর বাজারদর ভালো, বিদেশি জাতের আম ও কাঁঠাল সারা বছর ফল দেয়, আর এগুলো দেশের আবহাওয়ায় সহজে নষ্ট হয় না।
ডিএইর রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ আরিফুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, দেশের ফলের মৌসুম মূলত মে থেকে আগস্টে সীমাবদ্ধ থাকায় বছরের অন্য সময়ে বিদেশি ফল আমদানি করতে হয়। তাঁর মতে, গবেষণায় দেশীয় ফলের মৌসুম দীর্ঘ করা গেলে আমদানিনির্ভরতা কমবে, আর সংরক্ষণ ব্যবস্থা উন্নত হলে রপ্তানির সম্ভাবনা বাড়বে।
দেশে চাষ হওয়া বিদেশি ফলের মধ্যে ড্রাগন, স্ট্রবেরি, থাই পেয়ারা, রামবুটান, লংগান ও অ্যাভোকাডো অন্যতম। ডেইলি স্টারের উদ্ধৃত ডিএইর হিসাবে দেশের মোট ফল উৎপাদন ২০০৮-০৯ অর্থবছরের ১ কোটি ৩ লাখ টন থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১ কোটি ৫১ লাখ টনে পৌঁছায়, যদিও এ সময়ে ফল চাষের জমি কমেছে।
ড্রাগন ফলের দ্রুত বিস্তার
ডেইলি স্টারের তথ্যমতে, ২০১২ সালেও দেশে ড্রাগন ফল প্রায় ছিল না। পরে ডিএইর প্রকল্পের প্রদর্শনী বাগানের মাধ্যমে এর চাষ সারা দেশে ছড়ায়; ড. মাসুদের ভাষ্যমতে প্রায় আট হাজার প্রদর্শনী বাগান স্থাপন করা হয়েছিল। ডিএইর তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে ৬৯৫ হেক্টর জমিতে ৮ হাজার ৬৯৫ টন ড্রাগন উৎপাদন হয়। ২০২১-২২ অর্থবছরে ১ হাজার ১১৫ হেক্টরে ১৩ হাজার ৮৭২ টন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫১ হাজার ২৮৭ টন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৬৮ হাজার ৬১৩ টন এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৭৮ হাজার ৭৪৯ টন উৎপাদন হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উৎপাদন এক লাখ টনে পৌঁছাতে পারে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।
ড. মাসুদ বলেন, পুষ্টিগুণ ও দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্যতার কারণে ড্রাগন দ্রুত গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে, আর সরকারি পৃষ্ঠপোষকতাও ভূমিকা রেখেছে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের ড্রাগন সুইডেন ও ফিনল্যান্ডসহ ইউরোপে রপ্তানি হয়েছে। কুড়িগ্রামের চাষি খোরশেদ আলম জাগো নিউজকে জানান, শুরুতে খরচ হলেও পরে খরচ কম; ড্রাগন থেকে বছরে তিনি তিন লাখ টাকাও আয় করেছেন।

স্ট্রবেরির উৎপাদন ওঠানামা করছে
জনপ্রিয় হলেও স্ট্রবেরির উৎপাদন স্থির নয়। ডিএইর তথ্যমতে, ২০২০-২১ অর্থবছরে ৮৪ হেক্টরে ৩৮৯ টন, ২০২১-২২ অর্থবছরে ১০১ হেক্টরে ৭৮৯ টন এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১৭৯ হেক্টরে ১ হাজার ৬৩৫ টন স্ট্রবেরি উৎপাদন হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জমি কমে ১৫৪ হেক্টর ও উৎপাদন ১ হাজার ৩১৬ টন হয়, আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জমি ৮২ হেক্টরে ও উৎপাদন ৭০০ টনে নামে।
জয়পুরহাটের চাষি আলী আকবর প্রায় আট বছর ধরে স্ট্রবেরি চাষ করছেন। তিনি জানান, এক বিঘায় সর্বোচ্চ ১ লাখ ২০ হাজার টাকা খরচ হয়, ভালো ফলন হলে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকার ফল বিক্রি হয়। ড. মাসুদের মতে, স্ট্রবেরি চার থেকে পাঁচ ঘণ্টার মধ্যে বাজারে না নিলে নষ্ট হয়ে যায়, তাই প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানো দরকার।

কাটিমন আম ও বারোমাসি কাঁঠাল
কৃষি কর্মকর্তারা জানান, গত এক দশকে আমে কাটিমন, ব্যানানা ম্যাংগো, মিয়াজাকি, তাইওয়ান গ্রিন ও নামডকমাইয়ের মতো নতুন জাত যুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি জমি দখল করেছে বারোমাসি স্বভাবের কাটিমন। অন্য আমগাছের নতুন ডালে সাত-আট মাস বয়সের আগে ফুল আসে না, কিন্তু কাটিমনের তিন-চার মাসের ডালেই ফুল আসে, তাই এটি বছরে তিনবার ফল দেয়। ডেইলি স্টার রাজশাহী অঞ্চলের ডিএইর তথ্য উদ্ধৃত করে জানায়, কাটিমনের আবাদ ২০২০-২১ অর্থবছরের এক হেক্টর থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪ হাজার ৭৫৭ হেক্টরে পৌঁছায়।
কর্মকর্তাদের মতে, ল্যাংড়া, গোপালভোগ ও ফজলির মতো দেশীয় জাত এক বছর ভালো ফল দিয়ে পরের বছর কম দেয় বলে এগুলোর সম্প্রসারণ কমছে।

কাঁঠালে বিশেষ জনপ্রিয়তা পাচ্ছে বারোমাসি ভিয়েতনামি আঠামুক্ত কাঁঠাল। কর্মকর্তারা জানান, বছরব্যাপী ফল উৎপাদন প্রকল্পে ১ লাখ ৫৬ হাজার বারোমাসি কাঁঠালের কলম বিতরণ করা হয়, যেগুলো এখন হর্টিকালচার সেন্টার ও নার্সারিতে মাতৃগাছ হিসেবে কলম তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছে। ড. মাসুদ বলেন, 'দেশে ৩৬৫ দিন কাঁঠাল উৎপাদন সম্ভব হলে এটি একটি শক্তিশালী রপ্তানিযোগ্য ফল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।'

ছবি: Abu Sayeed / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ, দ্য ডেইলি স্টার, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর





মন্তব্য
(০)