২০২৪ সালের জানুয়ারির শেষে উত্তরের জেলা লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামে তখন কনকনে ঠান্ডা আর ঘন কুয়াশা। দ্য ডেইলি স্টার বাংলাকে এক কৃষক জানিয়েছিলেন, তার তিনটি দুধেল গাভি আগে দিনে নয় লিটার দুধ দিত, ঠান্ডায় তা নেমে এসেছে সাড়ে পাঁচ থেকে ছয় লিটারে। এলাকার গরুগুলো শীতজনিত জ্বর ও সর্দিতে আক্রান্ত হচ্ছিল, পর্যাপ্ত খাবার না পেয়ে অনেক পশু পুষ্টিহীনতায় ভুগতে শুরু করেছিল, আর কৃষকেরা ক্ষুরারোগ দেখা দেওয়ার আশঙ্কা করছিলেন। পত্রিকাটি জানায়, দুই জেলায় প্রায় ২৭ লাখ গরু-ছাগল ও মহিষ আছে এবং প্রায় তিন লাখ পরিবার এসব পশু পালন থেকে আয় করে।
শীতের মাসগুলোতে গরুর যত্ন কীভাবে নিতে হয়, তা নিয়ে দ্য এগ্রো নিউজ ২০২৫ সালের এপ্রিলে এই নির্দেশিকা প্রকাশ করে। এর পরামর্শ নেওয়া হয়েছিল বাংলাদেশ গবাদি পশু ও পাখি খামারি উন্নয়ন সংগঠন নামের একটি কমিউনিটি সংস্থা থেকে। এখানে সেই পরামর্শ মিলিয়ে দেখা হয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) কৃষি আবহাওয়া পরামর্শ, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের (ডিএলএস) পরিসংখ্যান, বাংলাপিডিয়া এবং প্রাণিসম্পদ ও ভেটেরিনারি প্রতিষ্ঠানের গবেষণার সঙ্গে। জানা যাবে ঠান্ডায় গরুর শরীরে কী ঘটে, কোন গরুর ঝুঁকি বেশি, খাবার ও পানি, গোয়ালঘর, শুকনো মেঝে, শীতের রোগ এবং নবজাতক বাছুরের যত্ন। এটি সাধারণ নির্দেশিকা; অসুস্থ পশুর জন্য অবশ্যই নিবন্ধিত ভেটেরিনারি চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
ঠান্ডায় গরুর শরীরে কী ঘটে
মূল প্রতিবেদনটি শুরু হয়েছিল একটি সহজ কথায়: আবহাওয়া বদলালে প্রাণীর ভেতরের বিপাক ক্রিয়া ও অভ্যাসও বদলে যায়। প্রাণিবিজ্ঞানীরা বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন 'নিম্ন সংকট তাপমাত্রা' (লোয়ার ক্রিটিক্যাল টেম্পারেচার বা এলসিটি) দিয়ে। কানাডার বিফ ক্যাটল রিসার্চ কাউন্সিল (বিসিআরসি) জানায়, গরু যে তাপমাত্রা অনুভব করে তা বাতাসের তাপমাত্রা ও ঠান্ডা হাওয়ার মিলিত ফল, যাকে বলা হয় কার্যকর তাপমাত্রা। এই কার্যকর তাপমাত্রা এলসিটির নিচে নামলেই শুরু হয় ঠান্ডাজনিত চাপ। তখন ভালো স্বাস্থ্যের একটি গাভিও শরীর গরম রাখতে বিপাকের হার বাড়িয়ে দেয়।
এলসিটি স্থির কোনো সংখ্যা নয়। এটি নির্ভর করে পশুর বয়স, শরীরের অবস্থা, বাতাস, আর্দ্রতা এবং সবচেয়ে বেশি গায়ের লোমের ওপর। কানাডার অন্টারিও কৃষি, খাদ্য ও গ্রামীণ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তথ্য অবলম্বনে বিসিআরসির সারণিতে ভালো স্বাস্থ্যের মাংসের গাভির জন্য, ঠান্ডা হাওয়া না থাকলে, এই আনুমানিক হিসাব দেওয়া আছে:
- গ্রীষ্মের লোম: ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস
- ভেজা লোম: ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস
- শুকনো শরতের লোম: ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস
- শুকনো শীতের লোম: ০ ডিগ্রি সেলসিয়াস
- শুকনো, ঘন শীতের লোম: মাইনাস ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস
বিসিআরসি আরও জানায়, গাভির শীতের লোম ভিজে গেলে বা গোবরে জট পাকিয়ে গেলে তার তাপ ধরে রাখার ক্ষমতা নষ্ট হয়, তখন এলসিটি উঠে যায় ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে এবং গাভি অনেক আগেই ঠান্ডার চাপে পড়ে। বাতাস পরিস্থিতি আরও খারাপ করে: বাতাসের গতি যত বাড়ে, শরীর থেকে তাপ তত দ্রুত বেরিয়ে যায়, কারণ চলমান ঠান্ডা বাতাস একই তাপমাত্রার স্থির বাতাসের চেয়ে বেশি তাপ টেনে নেয়।
বাংলাদেশে বরফ জমা শীত নেই, কিন্তু শৈত্যপ্রবাহ আছে। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের সংজ্ঞা অনুযায়ী তাপমাত্রা ৮ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে মৃদু, ৬ থেকে ৮ ডিগ্রি হলে মাঝারি এবং ৬ ডিগ্রির নিচে নামলে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ ধরা হয়। এই সব তাপমাত্রাই বিসিআরসির সারণির সেই ১৫ ডিগ্রির নিচে, যেখানে ভেজা লোমের গাভি ঠান্ডার চাপ টের পেতে শুরু করে। তাই কুয়াশাভেজা স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় খোলা, বাতাস ঢোকা গোয়ালের গরু থার্মোমিটারের পারদ খুব নিচে না নামলেও ঠান্ডায় কষ্ট পেতে পারে।
ঠান্ডার চাপ মানে বাড়তি শক্তি খরচ। বিসিআরসি জানায়, সাধারণভাবে স্বীকৃত হিসাব হলো তাপমাত্রা এলসিটির নিচে প্রতি এক ডিগ্রি নামলে শক্তির চাহিদা ২ শতাংশ বাড়ে, আর আবহাওয়া ও খাবারের প্রাপ্যতা অনুযায়ী গরু খাবার খাওয়া ২ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে পারে। ১৯৮১ সালের মার্কিন ন্যাশনাল রিসার্চ কাউন্সিলের প্রতিবেদন অবলম্বনে তাদের সারণি বলছে, ১৫ থেকে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে খাওয়ার ওপর কোনো প্রভাব পড়ে না, ৫ থেকে ১৫ ডিগ্রিতে খাওয়া বাড়ে ২ থেকে ৫ শতাংশ, আর মাইনাস ৫ থেকে ৫ ডিগ্রিতে বাড়ে ৩ থেকে ৮ শতাংশ। বাড়তি খাবার না পেলে গাভি শরীরের জমানো চর্বি পুড়িয়ে ওজন হারায়, আর যত রোগা হয় ঠান্ডা তাকে তত বেশি কাবু করে। শরীরের অবস্থা খারাপ নিয়ে শীতে বাচ্চা দেওয়া গাভির ঝুঁকি আরও বেশি।
দেশি না সংকর: কোন গরুর বেশি যত্ন দরকার
মূল প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছিল, বাংলাদেশে সংকরায়ণের মাধ্যমে তৈরি জাতগুলো শীত ভালোভাবে সহ্য করতে পারে না। জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া এর বড় ছবিটি তুলে ধরে। ষাটের দশক থেকে দেশের খামারিরা তিন ধরনের গরু পালন করছেন: বিদেশি খাঁটি জাত, সংকর জাত এবং দেশি গরু। বাংলাপিডিয়া বলছে, খাঁটি ও সংকর জাতের পুষ্টির চাহিদা বেশি, পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর ক্ষমতা কম, এবং দেশি গরুর তুলনায় এরা পরজীবী ও রোগে বেশি আক্রান্ত হয়। অন্যদিকে দেশি গরুর রোগবালাই কম, গরম সহ্য করতে পারে, নিম্নমানের খড়-ঘাস ভালোভাবে কাজে লাগায় এবং কঠিন পরিবেশে টিকে থাকে।
দেশের সেরা দেশি গরু পাওয়া যায় কয়েকটি এলাকায়। বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায় পাবনা ও সিরাজগঞ্জের পাবনা গরু দিনে ৩ থেকে ৫ লিটার দুধ দিতে পারে, চট্টগ্রামের লাল গরু (রেড চিটাগং) দেয় প্রায় ২ লিটার; এ ছাড়া আছে মুন্সিগঞ্জের সাদা গরু ও উত্তরবঙ্গের ধূসর গরু। দুধের উৎপাদন বাড়াতে হলস্টেইন-ফ্রিজিয়ান, জার্সি, শাহিওয়াল, হরিয়ানা ও সিন্ধি জাত আনা হয়। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে এক দুগ্ধকালে শাহিওয়াল-পাবনা সংকর দেয় ১,২৪০ লিটার, ফ্রিজিয়ান-পাবনা সংকর ১,৪৬০ লিটার, শাহিওয়াল-দেশি সংকর ৭২৮ লিটার এবং ফ্রিজিয়ান সংকর ১,৮০০ লিটার দুধ।
বাংলাপিডিয়া জানায়, বিদেশি ও সংকর জাতের গরু পালন হয় সরকারি ও বাণিজ্যিক ডেইরি খামারে এবং দুধ উৎপাদনপ্রধান এলাকায়। সাভারে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় গো-প্রজনন ও দুগ্ধ খামারের ১৬ বছরের (১৯৯২ থেকে ২০০৭) রেকর্ড বিশ্লেষণ করে ২০১৩ সালে ইউরেশিয়ান জার্নাল অব ভেটেরিনারি সায়েন্সেসে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, দেশি বাছুরের তুলনায় বিদেশি ও সংকর জাতের বাছুরের মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
বিষয়টি জাতীয় পর্যায়েও গুরুত্বপূর্ণ। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের প্রকাশনা 'লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্লান্স ২০২৩-২৪' অনুযায়ী ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে গরু ছিল ২৫০.১৩ লাখ এবং মহিষ ১৫.২৪ লাখ। দুধ উৎপাদন হয়েছিল ১৫০.৪৪ লাখ মেট্রিক টন, যেখানে চাহিদা ছিল ১৫৮.৭৮ লাখ মেট্রিক টন; মাথাপিছু প্রাপ্যতা ছিল দৈনিক ২৩৪.৪৫ মিলিলিটার। কৃষি জিডিপির ১৬.৩৩ শতাংশ এসেছে প্রাণিসম্পদ খাত থেকে। যে দেশ এখনো চাহিদার চেয়ে কম দুধ উৎপাদন করে, সেখানে শীতের সকালে হারানো প্রতিটি লিটারের দাম আছে।

শীতের খাবার: বাড়তি শক্তি আর পর্যাপ্ত আঁশযুক্ত খাদ্য
খাবার নিয়ে মূল প্রতিবেদনের মূল পরামর্শ ছিল, শীতে গরুকে বেশি খাবার দিতে হবে, কারণ শরীর গরম রাখতে বাড়তি শক্তি লাগে, এবং ঘাস ও খড়ের মতো আঁশযুক্ত খাবার পর্যাপ্ত দিতে হবে। বিসিআরসির তথ্য দুটি কথাকেই সমর্থন করে: ঠান্ডার চাপে বাড়তি শক্তির চাহিদা সাধারণত খাবার বাড়িয়েই মেটানো যায়, আর গাভির শরীরের তাপের একটি অংশ আসে খাবারের স্বাভাবিক হজম প্রক্রিয়া থেকে।
কীভাবে খাওয়াতে হবে, সে বিষয়ে বিসিআরসির পরামর্শ বাস্তবসম্মত। ভালো স্বাস্থ্যের গাভির জন্য উন্নত মানের ঘাস-খড়ই যথেষ্ট হতে পারে। তীব্র ঠান্ডায় অথবা আগে থেকেই রোগা গাভির জন্য খাদ্যতালিকায় দানাদার খাবার যোগ করার পরামর্শ দেয় সংস্থাটি। খাবারে যেকোনো পরিবর্তন আনতে হবে ধীরে ধীরে, কারণ হঠাৎ বদলালে রুমেনের গোলমাল হতে পারে। শীতের খাদ্যে সাধারণত সবচেয়ে বেশি ঘাটতি থাকে শক্তির, তারপর আমিষের। পর্যাপ্ত আমিষ রুমেনের আঁশ হজমকারী ব্যাকটেরিয়াকে সাহায্য করে, ফলে ঘাস-খড় বেশি হজম হয় এবং গরু বেশি খায়।
বাংলাদেশের খামারিদের হাতে আসলে কী খাবার থাকে, বাংলাপিডিয়া তার তালিকা দেয়। আঁশযুক্ত খাবারের বেশির ভাগ আসে ফসলের অবশিষ্টাংশ থেকে, যেমন ধান, গম ও ডালের খড় এবং আখের আগা; মিল থেকে আসে ভুসি ও খৈল; কাঁচা ঘাসের মধ্যে আছে রাস্তার ধারের দেশি ঘাস, কাঁঠাল ও আমপাতা এবং কচুরিপানা; আর চাষ করা ঘাসের মধ্যে নেপিয়ার, পারা ও জার্মান ঘাস এবং ভুট্টা, খেসারি, ওটের মতো মৌসুমি ফসল। বাংলাপিডিয়া জানায়, ডিসেম্বর থেকে এপ্রিলের শুষ্ক মৌসুমে চারণভূমিতে ঘাস প্রায় হয় না বললেই চলে, তাই শীতের খাবার অনেকটাই নির্ভর করে আগে থেকে মজুত করা খড়-ঘাসের ওপর।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কৃষি আবহাওয়া সেবা ২০১৮-১৯ সালের শীতে যে প্রাণিসম্পদ পরামর্শ দিয়েছিল, তাতে পশুকে সুস্থ রাখতে প্রতিদিন খাবার, ঘাস বা বারসিমের সঙ্গে ৫০ গ্রাম আয়োডিনযুক্ত লবণ এবং ৫০ থেকে ১০০ গ্রাম খনিজ মিশ্রণ দিতে বলা হয়, আর ঠান্ডার সময় গরুকে শুকনো খাবার খাওয়াতে বলা হয়।
মূল প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, শীতে গরুর হজমশক্তি ও দুধের উৎপাদন বাড়ে। এই দাবিটি বাদ দেওয়া হয়েছে: ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে উত্তরের জেলাগুলো থেকে আসা প্রতিবেদনে ঠান্ডায় দুধ কমে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে, আর এখানে উদ্ধৃত গবেষণা বলছে বাড়তি খাবারের শক্তি প্রথমে খরচ হয় শরীর গরম রাখতে।
পানি: প্রতিদিন পরিষ্কার ও টাটকা
মূল প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, শীতে শরীরবৃত্তীয় কাজে পানি কম লাগে এবং পানি খুব ঠান্ডা থাকে বলে সব প্রাণীই পানি কম খায়। তাই ট্যাংকে জমিয়ে রাখা বাসি, ঠান্ডা পানি না দিয়ে গরুকে পরিষ্কার, টাটকা পানি দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।
পানি খাওয়ার সঙ্গে খাবার খাওয়ার সরাসরি সম্পর্ক আছে। বিসিআরসি সতর্ক করে, ঠান্ডার সময় পর্যাপ্ত পানি না পেলে গরুর খাবার খাওয়া কমে যায় এবং শক্তির চাহিদা মেটানোর ক্ষমতাও কমে। যে গাভি কম পানি খায়, সে খাবারও কম খায়, ঠিক তখন, যখন শরীর গরম রাখতে তার বেশি খাবার দরকার।
ছোট বাছুরের ক্ষেত্রেও একই সতর্কতা। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন-ম্যাডিসনের সম্প্রসারণ বিভাগের পরামর্শ, শীতে বাছুরের পানি হালকা গরম রাখতে হবে, বাছুরের শরীরের তাপমাত্রার কাছাকাছি, যাতে পানি গরম করতে বাছুরকে নিজের শক্তি খরচ করতে না হয়। ইউনিভার্সিটি অব ডেলাওয়্যারের প্রাণিবিজ্ঞান সম্প্রসারণ বিভাগ ঠান্ডার সময় দুধের পাশাপাশি দিনে কয়েকবার হালকা গরম পানি দেওয়ার পরামর্শ দেয় এবং জানায়, পানি খেলে বাছুর দানাদার স্টার্টার খাবারও বেশি খায়।
গোয়ালঘর: ঠান্ডা বাতাস আটকান, ভেতরের বাতাস চলাচল রাখুন
বাসস্থান নিয়ে মূল প্রতিবেদনের পরামর্শ ছিল, ঠান্ডা বাতাস যেন সরাসরি গরুর গায়ে না লাগে, সে জন্য বাতাস ঢোকার পথগুলো চটের বস্তা, পলিথিন বা অন্য কোনো উপায়ে বন্ধ করে দিতে হবে। ঠান্ডা বাতাসে গরু নিউমোনিয়াসহ ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হতে পারে। প্রয়োজনে রাতে গরুকে পুরোনো কম্বল বা পাটের বস্তা জাতীয় জিনিস দিয়ে ঢেকে রাখা যায়।
সরকারি পরামর্শও একই কথা বলে। ২০১৮-১৯ সালের শীতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কৃষি আবহাওয়া সেবা মৌলভীবাজার, পঞ্চগড়, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও চুয়াডাঙ্গার খামারিদের রাতে পশুকে ঘরের ভেতরে রাখতে, গোয়ালঘরের খোলা জায়গা চটের বস্তা দিয়ে ঢেকে দিতে এবং বাচ্চা পশুকে চটের বস্তা দিয়ে ঢেকে রাখতে বলে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে লালমনিরহাট জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাও, দ্য ডেইলি স্টার বাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঠান্ডা থেকে রক্ষায় গরুকে চটের বস্তা দিয়ে ঢেকে রাখা এবং গোয়ালঘরের চারদিক পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখার পরামর্শ দেন।
তবে ঠান্ডা হাওয়া আটকানো আর ঘর পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া এক কথা নয়। ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন-ম্যাডিসনের সম্প্রসারণ বিভাগ বলছে, ঘরের ভেতরে কিছুটা বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখতে হবে, আবার সরাসরি ঠান্ডা হাওয়াও ঢুকতে দেওয়া যাবে না; ঘরে পর্যাপ্ত বাতাস বদল না হলে শীতে প্রায়ই শ্বাসতন্ত্রের রোগ বেড়ে যায়। উত্তর আয়ারল্যান্ডের অ্যাগ্রি-ফুড অ্যান্ড বায়োসায়েন্সেস ইনস্টিটিউটও (এএফবিআই) ভালো বাছুর-ঘর বলতে বোঝায় এমন ঘর, যেখানে বাতাস চলাচল আছে কিন্তু সরাসরি হাওয়া লাগে না। বাস্তবে এর মানে, পশুর গায়ের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া হাওয়া আটকাতে হবে, কিন্তু ভেতরের ভেজা, বাসি বাতাস বেরোনোর পথ খোলা রাখতে হবে।

শুকনো মেঝে ও পরিষ্কার বিছানা
মূল প্রতিবেদনে পরিচ্ছন্নতার ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল: ঠান্ডার সময় গরুর শেডে যেন পানি বা প্রস্রাব জমে না থাকে, মেঝে যতটা সম্ভব শুকনো রাখতে হবে, দরকার হলে মেঝেতে ম্যাট ব্যবহার করতে হবে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের শীতকালীন পরামর্শেও গোয়ালঘর পরিষ্কার ও শুকনো রাখতে বলা হয়েছে।
শুকনো মেঝের গুরুত্ব বোঝা যায় লোমের কথা ভাবলে। বিসিআরসি ব্যাখ্যা করে, বিছানা পশু ও ঠান্ডা মাটির মাঝে একটি অন্তরক স্তর তৈরি করে এবং গরুকে শুকনো ও কাদামুক্ত রাখে। কাদা ও ভেজাভাব দুটোই লোমের তাপ ধরে রাখার ক্ষমতা কমায়, ফলে খাবারের চাহিদা বাড়ে; আগের সারণিতে যেমন দেখা গেছে, লোম ভিজে গেলে গাভির এলসিটি উঠে যায় ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।
বাছুরের ক্ষেত্রে উইসকনসিন-ম্যাডিসনের সম্প্রসারণ বিভাগ বলছে, বিছানা বাছুরকে ঠান্ডা মাটি থেকে এবং বিছানা ভেদ করে চুইয়ে আসা প্রস্রাব, পানি বা দুধের ভেজাভাব থেকে আলাদা রাখে। শীতে তারা খড়ের বিছানার পরামর্শ দেয়, কারণ বালুর তুলনায় খড়ে বাছুরের শরীর থেকে মাটিতে তাপ কম যায়। বিছানা যথেষ্ট পুরু কি না, তা বোঝার সহজ উপায় উইসকনসিন ও ডেলাওয়্যার দুই সম্প্রসারণ বিভাগই দিয়েছে: বাছুর শুয়ে থাকলে তার পা যেন বিছানায় পুরোপুরি ঢেকে যায়।
শীতের রোগ: নিউমোনিয়া, সর্দি-জ্বর এবং কখন চিকিৎসক ডাকবেন
মূল প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছিল, শীতে গরুর নিউমোনিয়া, কাশিসহ ঠান্ডাজনিত রোগের আশঙ্কা বেশি, তাই লক্ষণ দেখলেই দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। উত্তরের জেলাগুলোতে তার বাস্তব চিত্র দেখা গেছে: ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে দ্য ডেইলি স্টার বাংলা জানায়, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামে গরু শীতজনিত জ্বর ও সর্দিতে আক্রান্ত হচ্ছে এবং কৃষকেরা ক্ষুরারোগের আশঙ্কা করছেন।
গবেষণা দেখায় ক্ষতিটা কোথায় বেশি। কেন্দ্রীয় গো-প্রজনন ও দুগ্ধ খামারের গবেষণায় (হোসেন, কামাল ও রহমান, ২০১৩) ১৬ বছরে বাছুর মৃত্যুর প্রধান কারণ ছিল শ্বাসতন্ত্রের রোগ (৩৮.৭৫ শতাংশ), যক্ষ্মা (২০.০২ শতাংশ) এবং পরিপাকতন্ত্রের সংক্রমণ (১৬.৭৩ শতাংশ)। গবেষণায় বাছুরের মৃত্যুহার শীতে ৩৭.৯৮ শতাংশ, গ্রীষ্মে ৩৩.০৩ শতাংশ এবং বর্ষায় ২৮.৯৯ শতাংশ পাওয়া যায়, এবং গবেষকেরা বলেন, জন্মের প্রথম মাসের বাছুরের ঝুঁকি সম্ভবত সবচেয়ে বেশি।
ইউনিভার্সিটি অব ডেলাওয়্যারের সম্প্রসারণ বিভাগ জানায়, ঠান্ডার চাপে থাকা বাছুরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয় এবং সে সহজে রোগে আক্রান্ত হয়; উইসকনসিনের সম্প্রসারণ বিভাগ শীতে ঘরে বাতাস চলাচলের অভাবকে শ্বাসতন্ত্রের রোগ বাড়ার সঙ্গে যুক্ত করে। তাই ভালো ঘর, শুকনো বিছানা আর পর্যাপ্ত খাবারই সুরক্ষার প্রথম ধাপ।
মূল প্রতিবেদনে প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য হাতের কাছে বিশুদ্ধ মধু ও তুলসী গাছ রাখার পরামর্শ ছিল। এই নির্দেশিকার জন্য যেসব প্রাণিসম্পদ ও ভেটেরিনারি কর্তৃপক্ষের তথ্য দেখা হয়েছে, তাদের কেউ এটিকে চিকিৎসা হিসেবে সুপারিশ করে না, তাই পরামর্শটি বাদ দেওয়া হয়েছে। গরু কাশলে, দ্রুত শ্বাস নিলে, জ্বর এলে, খাওয়া ছেড়ে দিলে বা দুধ অনেক কমে গেলে নিবন্ধিত ভেটেরিনারি চিকিৎসককে দেখাতে হবে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরে চিকিৎসা এবং ক্ষুরারোগের মতো রোগের টিকা সম্পর্কে পরামর্শের জন্য যোগাযোগ করা যায়। চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বা অন্য কোনো ওষুধ দেবেন না।
নবজাতক বাছুরের সবচেয়ে বেশি সুরক্ষা দরকার
মূল প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ঠান্ডায় সবচেয়ে বেশি কষ্ট পায় নবজাতক বাছুর, কারণ তার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম। তাই শীতে বাছুরকে গরম কাপড়ে জড়িয়ে গরম ও শুকনো জায়গায় রাখতে হবে এবং ঠান্ডাজনিত কোনো সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের শীতকালীন পরামর্শেও সদ্য বাচ্চা দেওয়া গাভির বিশেষ যত্ন নিতে এবং নবজাতক বাছুর ও তার ঘর পরিষ্কার ও শুকনো রাখতে বলা হয়েছে।
বড় গরুর চেয়ে বাছুর দ্রুত তাপ হারায়। এএফবিআই জানায়, জন্মের সময় এবং প্রথম কয়েক সপ্তাহ বাছুর নিজের শরীরের তাপমাত্রা ঠিকমতো নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না; তাদের হিসাবে বাছুরের এলসিটি জন্মের সময় ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা তিন সপ্তাহ বয়সে নেমে আসে ৮ ডিগ্রিতে। উইসকনসিনের সম্প্রসারণ বিভাগ যোগ করে, জন্মের সময় বাছুরের শরীরের ওজনের মাত্র দুই থেকে চার শতাংশ চর্বি থাকে, আর ওজনের তুলনায় ছোট বাছুরের শরীরের উপরিতল বেশি বলে সে দ্রুত তাপ হারায়। ভেজা নবজাতককে তাড়াতাড়ি মুছে শুকিয়ে তারপর গরম রাখতে হবে।
এএফবিআইয়ের মতে বাছুরকে গরম রাখার সবচেয়ে সহজ উপায় পুরু, শুকনো বিছানা। তাদের গবেষকদের দুটি গবেষণায় বাছুরের গায়ে জ্যাকেট পরালে চামড়ার তাপমাত্রা যথাক্রমে ৬.৪ ও ৪.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি পাওয়া যায়, কিন্তু বৃদ্ধি বা স্বাস্থ্যে কোনো পার্থক্য হয়নি, কারণ বাছুরগুলো আগে থেকেই বাতাস চলাচল আছে অথচ হাওয়া লাগে না এমন ঘরে পুরু, শুকনো খড়ের বিছানায় ছিল। প্রতিষ্ঠানটির সিদ্ধান্ত, যেখানে বাছুর বাতাস, সরাসরি হাওয়া বা ভেজা বিছানার মুখোমুখি, সেখানে জ্যাকেট উপকারে আসতে পারে; মূল প্রতিবেদনের গরম কাপড়ে জড়িয়ে রাখার পরামর্শ ঠিক এই পরিস্থিতির জন্যই।
ঠান্ডায় বাছুরের খাবারও বেশি লাগে। ইউনিভার্সিটি অব ডেলাওয়্যারের সম্প্রসারণ বিভাগ ঠান্ডার সময় বেশি দুধ বা মিল্ক রিপ্লেসার খাওয়ানোর তিনটি উপায় বলে: দিনে তৃতীয় একবার খাওয়ানো, প্রতিবারের পরিমাণ এক-তৃতীয়াংশ বাড়ানো, অথবা মোট কঠিন পদার্থের পরিমাণ বাড়ানো। তারা প্রথম সপ্তাহ থেকেই অল্প অল্প দানাদার স্টার্টার খাবার দেওয়ার পরামর্শ দেয়, কারণ বাছুর যত আগে দানা খাওয়া শুরু করে তত বেশি তাপ তৈরি করতে পারে; আর তীব্র ঠান্ডার সময় দুধ ছাড়ানো পিছিয়ে দিতে বলে।
বাছুর বিপজ্জনক মাত্রায় ঠান্ডা হয়ে গেছে কি না, তার লক্ষণ জানা দরকার। বিসিআরসির হিসাবে বাছুরের শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ৩৫ থেকে ৩৮ ডিগ্রিতে বাছুর হালকা হাইপোথারমিয়ায় ভোগে; তখন সে কাঁপতে পারে, দুর্বলভাবে দুধ টানে, হাত-পা ঠান্ডা থাকে। ৩৫ ডিগ্রির নিচে নামলে কাঁপুনি থেমে যায়, বাছুর নিস্তেজ হয়ে পড়ে, ধীরে শ্বাস নেয়, মুখ, কান ও পা খুব ঠান্ডা থাকে এবং কাত হয়ে শুয়ে থাকে, উঠতে পারে না। বিসিআরসি জানায়, গরম করার শুরু শরীরের তাপমাত্রার শালদুধ খাওয়ানো দিয়ে, সরাসরি তাপের উৎসের কাছে বাছুরকে কখনো একা রাখা যাবে না, আর গুরুতর অবস্থায় ভেটেরিনারি চিকিৎসা লাগে। দুর্বল, ঠান্ডা বা দুধ না টানা বাছুরকে দেরি না করে উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরে বা নিবন্ধিত ভেটেরিনারি চিকিৎসকের কাছে নিতে হবে।

ছবি: Kritzolina / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: দ্য এগ্রো নিউজ (নিজস্ব প্রতিবেদক; তথ্য: বাংলাদেশ গবাদি পশু ও পাখি খামারি উন্নয়ন সংগঠন), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (বাংলাদেশ কৃষি আবহাওয়া তথ্য পদ্ধতির প্রাণিসম্পদ পরামর্শ), দ্য ডেইলি স্টার বাংলা (৩১ জানুয়ারি ২০২৪), দ্য ডেইলি স্টার (১৬ জানুয়ারি ২০২৩), প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্লান্স ২০২৩-২৪), বাংলাপিডিয়া, বিফ ক্যাটল রিসার্চ কাউন্সিল, অ্যাগ্রি-ফুড অ্যান্ড বায়োসায়েন্সেস ইনস্টিটিউট (৫ নভেম্বর ২০১৯), ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন-ম্যাডিসন, ইউনিভার্সিটি অব ডেলাওয়্যার, ইউরেশিয়ান জার্নাল অব ভেটেরিনারি সায়েন্সেস (২০১৩)




মন্তব্য
(০)