সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৮°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৬২%বাতাস ৫ কিমি/ঘ

যেভাবে কাটলে তরমুজের বীজ এক টানে সারি ধরে বের হয়ে আসে

জাপানি বলে পরিচিত ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় একটি কৌশলে তরমুজের ভেতরের হালকা রেখা ধরে কাটলে কালো বীজগুলো একটি একটি করে বাছতে হয় না, সারি ধরে উঠে আসে। ২০২৬ সালের ১১ এপ্রিল জাগো নিউজ ২৪ কৌশলটি তুলে ধরে।

যেভাবে কাটলে তরমুজের বীজ এক টানে সারি ধরে বের হয়ে আসে
রান্নাবান্না

২০২৬ সালের এপ্রিলে দেশজুড়ে তখন তরমুজের মৌসুম। ১১ এপ্রিল জাগো নিউজ ২৪-এর লাইফস্টাইল বিভাগ এমন একটি সমস্যার সমাধান নিয়ে রান্নাঘরের টিপস প্রকাশ করে, যা বিচিওয়ালা তরমুজ কেনেন এমন প্রতিটি পরিবারের চেনা: কালো বীজ। প্রতিবেদনে জাপানি বলে পরিচিত একটি কাটার কৌশলের কথা বলা হয়, যা তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। প্রতিটি কামড় থেকে বীজ বাছার বদলে লাল শাঁসের ভেতরের হালকা রেখা ধরে তরমুজটিকে ত্রিভুজাকার টুকরো করা হয়, তারপর চামচ বা ছুরি দিয়ে প্রতিটি টুকরোর বীজের সারি তুলে ফেলা হয়। প্রতিবেদনে সূত্র হিসেবে রান্নার চ্যানেল কিচেন প্রিন্সেস ব্যাম্বু ও খাবারবিষয়ক প্রকাশনা গুড ফুডের নাম ছিল। এই লেখায় কৌশলটি জাগো নিউজ যেভাবে বর্ণনা করেছে সেভাবেই রাখা হয়েছে; একই কৌশল নিয়ে আগে লেখা অন্য খাদ্যবিষয়ক লেখকদের বর্ণনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে; প্রকাশিত গবেষণা থেকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে তরমুজের বীজ কেন সারি বেঁধে থাকে; আর যোগ করা হয়েছে মার্কিন খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) ও একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের খাদ্য নিরাপত্তা ও সংরক্ষণের পরামর্শ, সঙ্গে টিপসটি প্রকাশের সময় পর্যন্ত বাংলাদেশে ২০২৬ সালের তরমুজ মৌসুমের হিসাব।

গরমের ফল, কিন্তু বীজের ঝামেলা


গরমে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই পানিসমৃদ্ধ ফলের দিকে ঝোঁকে, আর সে তালিকায় তরমুজ সবার আগে। জাগো নিউজের প্রতিবেদনে ফ্রিজ থেকে বের করা ঠান্ডা এক টুকরো তরমুজকে গরমের দিনে এক টুকরো স্বস্তি বলা হয়েছিল, যার মিষ্টি স্বাদ আর রসালো গঠন মুহূর্তেই ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয়। পানির কথাটি হিসাবেও মেলে। মার্কিন কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) ফুডডাটা সেন্ট্রাল তথ্যভান্ডার অনুযায়ী, ১০০ গ্রাম কাঁচা তরমুজের শাঁসে পানি থাকে ৯১.৪৫ গ্রাম। একই ১০০ গ্রাম থেকে মেলে ১২৭ কিলোজুল (৩০ কিলোক্যালরি) খাদ্যশক্তি, ৭.৫৫ গ্রাম শর্করা, যার ৬.২ গ্রাম চিনি, ০.৪ গ্রাম আঁশ, ০.৬১ গ্রাম আমিষ ও ০.১৫ গ্রাম চর্বি। এতে আছে ১১২ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম ও ৮.১ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি, আর লাল রং আসে ক্যারোটিনয়েড থেকে, প্রধানত লাইকোপিন, যার পরিমাণ তথ্যভান্ডারে প্রতি ১০০ গ্রামে ৪ হাজার ৫৩২ মাইক্রোগ্রাম। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় এক্সটেনশন এক বাক্যে বলেছে, তরমুজের নব্বই শতাংশই পানি। যাঁদের কোনো রোগের কারণে চিনি বা পটাশিয়াম মেপে খেতে হয়, কতটা ফল তাঁদের জন্য উপযুক্ত, তা চিকিৎসকের কাছ থেকে জেনে নেওয়া উচিত।

ঝামেলা বীজ নিয়ে। বিচিওয়ালা তরমুজে বীজ ছড়িয়ে থাকে পুরো লাল শাঁসে, আর মূল প্রতিবেদনের ভাষায়, প্রতিটি কামড়ে মুখে বীজ চলে আসা শিশুদের মতো বড়দের কাছেও বিরক্তিকর। বীজ বাছতেই খাওয়ার অর্ধেক সময় চলে যায়, আর এই ঝামেলা এড়াতে অনেকে তরমুজ খাওয়াই কমিয়ে দেন। জাগো নিউজ জাপানি কৌশলটিকে এর সমাধান হিসেবে তুলে ধরেছিল: ঠিকভাবে কাটলে কাটার সময়ই বীজগুলো একসঙ্গে সারি ধরে চলে আসে, টুকরো টুকরো ঘেঁটে খুঁজতে হয় না।

কৌশলটি ধাপে ধাপে


জাগো নিউজের বর্ণনায় ধাপগুলো ছোট। লাগবে একটি বড় ধারালো ছুরি, একটি শক্ত কাটিং বোর্ড আর একটি চামচ।

  • শক্ত ও সমতল জায়গায় তরমুজটি রেখে ওপর ও নিচ থেকে পাতলা করে এক টুকরো কেটে ফেলুন। দুই মাথা সমান হলে তরমুজ স্থির থাকে, কাটার সময় গড়িয়ে যায় না; এতে পুরো কাজটি নিরাপদ ও সহজ হয়।
  • এরপর তরমুজটি মাঝখান দিয়ে দুই ভাগ করুন।
  • কাটা অংশের লাল শাঁস ভালো করে দেখুন। কিছু হালকা রেখা চোখে পড়বে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, রেখাগুলো সাধারণত একটি ত্রিভুজাকার নকশা তৈরি করে, আর বেশির ভাগ বীজ থাকে এখানেই। বাকি সব কাজ এই রেখা খুঁজে পাওয়ার ওপর নির্ভর করে।
  • ওই হালকা রেখা অনুসরণ করে তরমুজটি ত্রিভুজাকার টুকরো করুন। এভাবে কাটলে বীজ পুরো টুকরোয় ছড়িয়ে না থেকে প্রতিটি টুকরোর এক কিনারায় সারি বেঁধে থাকে।
  • প্রতিটি ত্রিভুজের কিনারায় এখন বীজের একটি স্পষ্ট সারি দেখা যাবে। চামচ বা ছুরির ডগা দিয়ে আলতো করে ওই অংশটি তুলে ফেলুন। কয়েক সেকেন্ডেই বীজ বের হয়ে যাবে, থাকবে পরিষ্কার, বীজহীন তরমুজের টুকরো।

২০২৬ সালের এপ্রিলের অনেক আগেই অন্য খাদ্যবিষয়ক লেখকেরা একই ধারণার কাছাকাছি কয়েকটি রূপ বর্ণনা করেছিলেন। ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট খাদ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট চাউহাউন্ডে এলিয়াস ন্যাশ লেখেন, তরমুজের ওপর-নিচ কেটে দাঁড় করিয়ে রাখতে হবে, তারপর লম্বালম্বি কাটতে হবে, যা তাঁর ভাষায় বেশির ভাগ মানুষ যা করেন তার উল্টো, আর প্রতিটি ফালি হবে প্রায় এক ইঞ্চি পুরু। তিনি লেখেন, এভাবে কাটা ফালিতে বীজ জমা থাকে দুই পাশ বেয়ে নেমে যাওয়া দুটি সারিতে, আর ফালিটি হাত দিয়ে বীজের শিরা বরাবর ভেঙে তিন ভাগ করা যায়; এরপর বেরিয়ে থাকা বীজ চপস্টিক বা টুথপিক দিয়ে ঠেলে বের করা যায়, কিংবা ছুরি দিয়ে চেঁছে ফেলা যায়। তাঁর মতে, প্রচলিত আড়াআড়ি গোল ফালি কেটে ত্রিভুজ করলে কাটা পড়ে বীজের শিরার বিপরীতে, ফলে প্রতিটি টুকরোয় বীজ ছড়িয়ে থাকে।

দশ দিন পর, ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট, দ্য টেকআউটে কেলি ব্রাউন প্রায় একই রকম আরেকটি পদ্ধতি লেখেন: দুই মাথা সমান করে খোসা কেটে ফেলা, তরমুজ দুই ভাগ করা, পাউরুটির মতো ফালি করা, তারপর প্রতিটি ফালি হাত দিয়ে ছিঁড়ে আলাদা করা, কারণ তাঁর ভাষায় তরমুজ নিজে থেকেই বীজের রেখা বরাবর ভেঙে যায়। তিনি সতর্ক করেন, প্রতিটি ফালিতে কাজটি দুই-তিনবার করতে হতে পারে। তাঁর পরামর্শ ছিল ছোট ছুরির বদলে লম্বা ধারালো ছুরি নেওয়া, বীজ রাখার জন্য একটি বাটি হাতের কাছে রাখা যাতে বীজ আবার শাঁসে মিশে না যায়, আর ছোট চামচ বা মেলন বলার ব্যবহার করা, যাতে বীজের সঙ্গে যতটা কম সম্ভব শাঁস উঠে আসে। ফল বেশি নাড়াচাড়া না করতেও বলেন তিনি, কারণ এতে রস বেরিয়ে শাঁস নরম হয়ে যেতে পারে।

তিনটি বর্ণনাই একই পর্যবেক্ষণের ওপর দাঁড়িয়ে: বীজ এলোমেলোভাবে ছড়ানো থাকে না, থাকে কিছু রেখা ধরে, আর ওই রেখা অনুসরণ করে কাটলে বা ভাঙলে সব বীজ একসঙ্গে বেরিয়ে পড়ে। পার্থক্য শুধু এটুকু যে কেউ রেখা বরাবর তরমুজ খোলেন ছুরি দিয়ে, কেউ হাত দিয়ে।

ফালি করা তরমুজ, লাল শাঁসে কালো বীজ দেখা যাচ্ছে। ছবি: Irvin calicut / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৩.০)
ফালি করা তরমুজ, লাল শাঁসে কালো বীজ দেখা যাচ্ছে। ছবি: Irvin calicut / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৩.০)

বীজ কেন সারি বেঁধে থাকে


উদ্ভিদবিজ্ঞানের ভাষায় তরমুজ (Citrullus lanatus) লাউ-কুমড়া পরিবার কিউকারবিটেসির সদস্য, আর এর ফল এক ধরনের বেরি, যার খোসা শক্ত; উদ্ভিদবিদেরা একে বলেন পেপো। মিষ্টি, রসালো শাঁস সাধারণত গাঢ় লাল থেকে গোলাপি, তাতে থাকে অসংখ্য বীজ, যা পরিপক্ব হলে কালো আর অপরিপক্ব অবস্থায় সাদা। বীজগুলো দেখে মনে হয় সমানভাবে ছড়ানো, কিন্তু সেগুলো তৈরি হয় এমন একটি ফলের ভেতরে, যার নিজস্ব একটি অভ্যন্তরীণ গঠন আছে।

২০২১ সালে ফ্রন্টিয়ার্স ইন প্ল্যান্ট সায়েন্স সাময়িকীতে তরমুজ নিয়ে গবেষণা করা বিজ্ঞানীরা এই গঠন বর্ণনা করেন। তরমুজের ভেতরে তিনটি প্রকোষ্ঠ থাকে। ফল বড় হওয়ার পুরো সময় খোসা বাড়তে থাকে, কিন্তু ভেতরের শাঁসের কোষ বিভাজন থামে ফল ধরার সাত থেকে দশ দিন পর; এরপর প্লাসেন্টাল টিস্যু, অর্থাৎ যে কলায় বীজ ধরে থাকে, তার কোষগুলো পানি, চিনি, আমিষ ও পুষ্টি উপাদানে ভরে বড় হয়। বীজ তৈরি হয় এই প্লাসেন্টাল কলাতেই, তিনটি প্রকোষ্ঠের ভেতরে, তাই কাটা অংশে বীজ এলোমেলো না থেকে প্রকোষ্ঠগুলোর গঠন মেনে সারি ধরে দেখা দেয়: খাদ্যবিষয়ক লেখকেরা এটিকেই বলেছেন বীজের রেখা বা বীজের শিরা।

তরমুজ কাটার পর মাঝে মাঝে যে ত্রুটি চোখে পড়ে, একই গবেষণা তারও ব্যাখ্যা দেয়। খোসা আর ভেতরের শাঁসের বৃদ্ধির হার খুব বেশি আলাদা হলে তিনটি প্রকোষ্ঠ আলাদা হয়ে মাঝখানে ফাটল বা ফাঁপা জায়গা তৈরি হয়, যাকে বলে হলো হার্ট। বীজহীন তরমুজ নিয়ে করা ২০২১ সালের ওই গবেষণায় বলা হয়, হলো হার্ট বাইরে থেকে বোঝা যায় না, আর মৌমাছি কম আসা কিংবা ঠান্ডা বা ভেজা আবহাওয়ার কারণে পরাগায়ন ঠিকমতো না হলে এটি দেখা দেয়। গবেষণায় এ-ও দেখা যায়, হলো হার্ট ফলের খাওয়ার মানে প্রভাব ফেলেনি; এমন তরমুজ খাওয়া নিরাপদ।

পরিষ্কার হাত, পরিষ্কার তরমুজ, পরিষ্কার বোর্ড


ছুরি খোসা ভেদ করে শাঁসে ঢোকে, তাই তরমুজের গায়ে যা লেগে থাকে তা ভেতরেও চলে যেতে পারে। নিরাপদে ফলমূল ও সবজি বাছাই ও পরিবেশন নিয়ে এফডিএর ভোক্তা নির্দেশিকা, ২০২৪ সালের ৫ মার্চ থেকে চালু সংস্করণে, খাওয়া বা রান্নার আগে সব ফলমূল ও সবজি প্রবহমান পানিতে ভালো করে ধুতে বলে, আর নির্দিষ্ট করে বলে, তরমুজ ও শসার মতো শক্ত খোসার ফল পরিষ্কার একটি ব্রাশ দিয়ে ঘষে ধুতে হবে। এতে আরও বলা হয়, ধোয়ায় জীবাণু কমে, কিন্তু পুরোপুরি দূর হয় না।

একই নির্দেশিকায় আরও কিছু মৌলিক নিয়ম আছে:

  • ধোয়ার পর পরিষ্কার কাপড় বা কাগজের তোয়ালে দিয়ে ফল মুছে শুকিয়ে নিন।
  • সাবান, ডিটারজেন্ট বা বাজারের প্রডিউস ওয়াশ দিয়ে ফল ধোবেন না। এফডিএ বলছে, ভালো করে ধোয়ার পরও সাবান ও গৃহস্থালি ডিটারজেন্ট ফল ও সবজিতে শোষিত হয়ে থাকতে পারে এবং মানুষকে অসুস্থ করতে পারে।
  • খাওয়া বা রান্নার আগে থেঁতলানো বা নষ্ট অংশ কেটে ফেলুন, আর পচা দেখালে পুরোটাই ফেলে দিন।
  • সম্ভব হলে ফলমূল ও সবজির জন্য একটি কাটিং বোর্ড আর কাঁচা মাংস, মুরগি ও সামুদ্রিক খাবারের জন্য আলাদা বোর্ড রাখুন; বোর্ড, থালাবাসন, ছুরি-চামচ ও কাজের জায়গা সাবান ও গরম পানি দিয়ে ধুয়ে নিন।
  • কাটা বা প্যাকেটজাত ফল পরিষ্কার ফ্রিজে ৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তার কম তাপমাত্রায় রাখুন।

সংরক্ষণের ব্যাপারে ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় এক্সটেনশনের পরামর্শ, না কাটা তরমুজ ঘরের তাপমাত্রায় প্রায় দুই সপ্তাহ রাখা যায়, বিশেষ করে ঘরের তাপমাত্রা ৪৫ থেকে ৫০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের মধ্যে থাকলে; আর কাটা টুকরো প্লাস্টিকের মোড়কে শক্ত করে ঢেকে ফ্রিজে রাখতে হবে দুই থেকে তিন দিন। বীজের রেখা ধরে কাটা তরমুজের বেলাতেও নিয়ম একই: কাটা হয়ে গেলে টুকরোর জায়গা ফ্রিজে।

বীজহীন তরমুজ ও জাপানের যোগসূত্র


বীজহীন তরমুজ কিনলে এই কৌশলের দরকারই পড়ে না, আর মজার ব্যাপার হলো বীজহীন তরমুজের শুরুও জাপানে। ১৯৩৯ সালে জাপানি বিজ্ঞানীরা ট্রিপ্লয়েড সংকর, অর্থাৎ তিন সেট ক্রোমোজোমওয়ালা গাছ তৈরি করে প্রথম বীজহীন তরমুজ উদ্ভাবন করেন, যদিও শুরুর ওই জাতগুলোর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা যথেষ্ট ছিল না। একবিংশ শতাব্দীতে বীজহীন তরমুজ অনেক বেশি জনপ্রিয় হয়, আর ২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি হওয়া তরমুজের প্রায় ৮৫ শতাংশই ছিল বীজহীন।

ট্রিপ্লয়েড গাছ বন্ধ্যা। টেট্রাপ্লয়েড একটি মাতৃগাছের সঙ্গে সাধারণ ডিপ্লয়েড গাছের সংকরায়ণ করে এর বীজ তৈরি করতে হয়, তাই বীজের দাম বেশি, আর গাছগুলো নিজেরা কার্যকর পরাগরেণু তৈরি করে না। অথচ ফল ধরাতে পরাগায়ন লাগেই, তাই চাষিরা এদের মাঝে সাধারণ বিচিওয়ালা জাতের সারি লাগান, যাতে পরাগরেণু মেলে। ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় এক্সটেনশন বীজহীন জাতকে বলেছে স্ববন্ধ্যা সংকর, যাতে দেখতে স্বাভাবিক ফল হয় কিন্তু পুরোপুরি গঠিত বীজ হয় না, আর বাড়ির বাগানে যাঁরা এগুলো লাগান তাঁদের পাশে একটি সাধারণ বিচিওয়ালা জাত লাগাতে বলেছে। বাণিজ্যিক খেতের জন্য মার্কিন কৃষি বিভাগ বিচিওয়ালা জাতে একরপ্রতি অন্তত একটি মৌচাক এবং বীজহীন জাতে একরপ্রতি তিনটি মৌচাক রাখার পরামর্শ দেয়, কারণ কার্যকর পরাগরেণু কম থাকলে পরাগায়ন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

তরমুজের গল্পে জাপানের নাম আরও আছে। অ্যামিনো অ্যাসিড সিট্রুলিনের নাম এসেছে তরমুজের লাতিন নাম সিট্রুলাস থেকে, আর ১৯১৪ সালে জাপানি গবেষক ইয়াতারো কোগা ও রিও ওতাকে প্রথম তরমুজ থেকেই এটি আলাদা করেন। বাক্সের ভেতরে বড় করা ঘনক আকৃতির তরমুজ ১৯৭৮ সালে জাপানে উদ্ভাবন করেন গ্রাফিক ডিজাইনার তোমোইউকি ওনো, যাতে তরমুজ ফ্রিজে কম জায়গা নেয় এবং কাটার সময় গড়িয়ে না যায়। এগুলো মূলত শোভাবর্ধক ও দামি, কারণ আকৃতি ধরে রাখতে পাকার আগেই তুলে ফেলতে হয়।

কেটে রাখা একটি ছোট বীজহীন তরমুজ, ২০০৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় কেনা। ছবি: Scott Ehardt / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)
কেটে রাখা একটি ছোট বীজহীন তরমুজ, ২০০৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় কেনা। ছবি: Scott Ehardt / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)

বীজ আর খোসাও ফেলনা নয়


চামচে তুলে ফেলা বীজ খাওয়া যায়। তরমুজের বীজের স্বাদ বাদামের মতো; শুকিয়ে ভেজে খাওয়া যায়, গুঁড়া করে আটাও বানানো যায়, আর থাইল্যান্ডে লবণ দিয়ে ভাজা তরমুজের বীজ প্যাকেটে নাশতা হিসেবে বিক্রি হয়, যেমনটি নিচের ছবিতে দেখা যাচ্ছে। খোসাও খাওয়া যায়: এর আচার হয়, ভাজি হয়, ঝোল রান্না হয়; পুরোনো মোটা খোসার জাত 'টম ওয়াটসন', 'জর্জিয়া র‍্যাটলস্নেক' ও 'ব্ল্যাক ডায়মন্ড' কদর পেত মূলত তরমুজের আচারের জন্যই। গাছ সিট্রুলিন তৈরি করে এই খোসাতেই।

থাইল্যান্ডের লবণ দিয়ে ভাজা তরমুজের বীজের প্যাকেট, নাশতা হিসেবে বিক্রি হয়। ছবি: Mx. Granger / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি০)
থাইল্যান্ডের লবণ দিয়ে ভাজা তরমুজের বীজের প্যাকেট, নাশতা হিসেবে বিক্রি হয়। ছবি: Mx. Granger / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি০)

কাটার আগে পাকা তরমুজ চেনা


শাঁস শক্ত ও রঙিন, এমন পাকা তরমুজে কৌশলটি সবচেয়ে ভালো কাজ করে। ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় এক্সটেনশন চারটি লক্ষণ একসঙ্গে মিলিয়ে দেখতে বলে। তরমুজ যেখানে বোঁটায় লেগে থাকে, তার কাছের হালকা সবুজ প্যাঁচানো আকর্ষ সাধারণত বাদামি হয়ে শুকিয়ে যায়। নিচের দিক, অর্থাৎ যেখানে তরমুজটি মাটিতে লেগে ছিল, সেই অংশ হলদে বা ক্রিম রঙের হওয়া উচিত; সাদা বা ফ্যাকাশে সবুজ হলে তরমুজ তখনো তৈরি হয়নি, আর এক্সটেনশন বিভাগ এটিকেই সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ বলেছে। পাকা তরমুজ আকারের তুলনায় খুব ভারী হয়, খোসা শক্ত হয়, আর খোসা ছুঁলে খসখসে লাগে, নখ দিয়ে চাপলে সহজে ভেদ করা যায় না।

সবচেয়ে পরিচিত পরীক্ষাটিও বাতিল করেছে এক্সটেনশন বিভাগ। তাদের ভাষায়, চাপড় দেওয়া, টোকা দেওয়া, শোঁকা বা ঝাঁকানো, কোনোটি দিয়েই আসলে পাকা কি না বোঝা যায় না; অনেক তরমুজ পাকলেও সেই প্রবাদপ্রতিম ভোঁতা শব্দ করে না।

২০২৬ মৌসুমে বাংলাদেশে তরমুজ


জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া আম, কাঁঠাল, কলা ও আনারসের সঙ্গে তরমুজকে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি চাষ হওয়া ফলগুলোর তালিকায় রেখেছে। ফসলের বড় অংশ এখন আসে উপকূলীয় দক্ষিণাঞ্চল থেকে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য উদ্ধৃত করে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি জানায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে রেকর্ড ২৫ লাখ ৪৭ হাজার টন তরমুজ উৎপাদিত হয়েছিল। এর মধ্যে পটুয়াখালীতে ৯ লাখ ৬৩ হাজার টন, যা জাতীয় উৎপাদনের ৩৭.৮ শতাংশ; এরপর খুলনায় ৫ লাখ ৫৯ হাজার টন, ভোলায় ৫ লাখ ১৩ হাজার টন, নোয়াখালীতে ১ লাখ ৬০ হাজার টন এবং বরগুনায় ৭৮ হাজার টন। পত্রিকাটি আরও জানায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বরিশাল বিভাগে ৬৪ হাজার ১৮৩ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ হয়ে উৎপাদন হয়েছিল ২৭ লাখ ২৪ হাজার টন।

২০২৬ সালের মৌসুম ছিল আরও বড়। ২০২৬ সালের ৩ মার্চ পটুয়াখালী থেকে রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসস জানায়, জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের হিসাবে সে বছর জেলায় ৩৪ হাজার ৪৮০ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ হয়েছে, আগের বছর যা ছিল ২৭ হাজার ৩৫০ হেক্টর; বাউফল, রাঙ্গাবালী, গলাচিপা, দশমিনা, কলাপাড়া, মির্জাগঞ্জ ও সদর উপজেলায়, তেঁতুলিয়া নদীর চরগুলোতে চাষ ছড়িয়ে পড়ছিল। মৌসুমে জেলায় ৩০০ থেকে ৩৫০ কোটি টাকার বাণিজ্যের আশা করা হচ্ছিল, আর চাষিরা রমজানের চাহিদা ধরতে ফসল প্রস্তুত করছিলেন।

জাগো নিউজের টিপস প্রকাশের নয় দিন আগে, ২০২৬ সালের ২ এপ্রিল প্রথম আলো জানায়, বরিশাল বিভাগে ৭০ হাজার ৩৬২ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে পটুয়াখালীতে ৩৫ হাজার ৫৭ হেক্টর, ভোলায় ১৯ হাজার ৭৫৩, বরগুনায় ১২ হাজার ৩২৪, বরিশালে ২ হাজার ৭০৫, পিরোজপুরে ৩৯৬ এবং ঝালকাঠিতে ১২৭ হেক্টর। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা হেক্টরপ্রতি ৫৫ টন ফলন এবং বিভাগে মোট ৩৮ লাখ ২১ হাজার ৭২৯ টন উৎপাদনের আশা করছিলেন। তবে একই প্রতিবেদনে ক্রেতাসংকটে চাষিদের দুশ্চিন্তার কথাও উঠে আসে। কলাপাড়ার চাষি ফেরদৌস তালুকদার পত্রিকাটিকে বলেন, বাজারে মণপ্রতি ২ হাজার ২০০ টাকা পাচ্ছিলেন, কিন্তু বাধ্য হয়ে ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে; আর কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের বরিশাল আঞ্চলিক কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক এস এম মাহবুব আলম দক্ষিণাঞ্চলে চাহিদা কম থাকার কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, মৌসুম সবে শুরু হয়েছে।

ঢাকার চকবাজারের ইফতার বাজারে এক তরমুজ বিক্রেতা, ২০২৩ সালের এপ্রিলে। ছবি: Wasiul Bahar / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)
ঢাকার চকবাজারের ইফতার বাজারে এক তরমুজ বিক্রেতা, ২০২৩ সালের এপ্রিলে। ছবি: Wasiul Bahar / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)

আফ্রিকার ফল, এখন সবচেয়ে বেশি ফলে চীনে


তরমুজের উৎপত্তি আফ্রিকায়, প্রথম চাষও সেখানেই; খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ সালের মধ্যেই মিসরে এর চাষ হতো। সপ্তম শতকে ভারতে এবং দশম শতকের মধ্যে চীনে তরমুজ চাষ পৌঁছে যায়। শুরুর দিকের তরমুজ মিষ্টি ছিল না, ছিল তেতো, শাঁস হলদেটে সাদা, আর খোলাও ছিল কঠিন। দীর্ঘ সময় ধরে বাছাই করে প্রজননের মাধ্যমে আজকের মিষ্টি ও সহজে খোলা যায় এমন তরমুজ তৈরি হয়েছে। এখন এর জাত এক হাজারের বেশি, যার অনেকগুলোতে লাগানোর ১০০ দিনের মধ্যে পরিপক্ব ফল পাওয়া যায়।

গাছটির উষ্ণতা দরকার; ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রায়, পানি সহজে নেমে যায় এমন বেলে দোআঁশ মাটিতে, যার পিএইচ ৫.৭ থেকে ৭.২, এটি সবচেয়ে ভালো জন্মায়। প্রধান শত্রুপোকা জাবপোকা, ফলের মাছি ও শিকড়ে গিঁট সৃষ্টিকারী নেমাটোড, আর আর্দ্র আবহাওয়ায় পাউডারি মিলডিউ ও মোজাইক ভাইরাসের ঝুঁকি থাকে। ফাওস্ট্যাটের ২০২৩ সালের হিসাবে সে বছর বিশ্বে প্রায় ১০ কোটি ৫০ লাখ টন তরমুজ উৎপাদিত হয়, যার ৬ কোটি ৩৮ লাখ টন, অর্থাৎ ৬৪ শতাংশ, ফলেছে মূল ভূখণ্ডের চীনে। এরপর ভারত ৩৬ লাখ টন, তুরস্ক ৩১ লাখ টন, আলজেরিয়া ২৫ লাখ টন এবং ব্রাজিল ১৮ লাখ টন।

ছবি: Ronggy / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, চাউহাউন্ড, দ্য টেকআউট, ফ্রন্টিয়ার্স ইন প্ল্যান্ট সায়েন্স (২০২১), মার্কিন খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ), ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় এক্সটেনশন, ইউএসডিএ ফুডডাটা সেন্ট্রাল, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, বাসস, প্রথম আলো, বাংলাপিডিয়া, ফাওস্ট্যাট, উইকিপিডিয়া

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

রান্নাবান্না

সম্পর্কিত খবর

রান্নাবান্না

ঘরেই ক্যাফে-স্টাইলের ক্রিমি প্রন পাস্তা: উপকরণ আর রান্নার ধাপ

২৫০ গ্রাম পাস্তা, এক কাপ চিংড়ি, ১০০ গ্রাম চিজ, মেয়োনিজ আর দুধে তৈরি ঘন ক্রিমি সসে প্রন পাস্তা; সেদ্ধ থেকে পরিবেশন পর্যন্ত সময় লাগে অল্পই।

সারাবাংলা১৪ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
স্বাস্থ্য

প্রোটিন শেক কি খাবারের বিকল্প? কার কতটা প্রোটিন লাগে

প্রাপ্তবয়স্কের দৈনিক প্রতি কেজি ওজনে ০.৮ গ্রাম প্রোটিন লাগে, ৭০ কেজির মানুষের ৫৬ গ্রাম, যা সুষম খাবার থেকেই মেলে; প্রোটিন শেক দরকার কেবল যাঁদের চাহিদা খাবারে পূরণ হয় না।

প্রথম আলো১৪ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
রান্নাবান্না

মৌসুমি তালের পিউরিতে নরম কেক, ঘরে বানানোর সহজ রেসিপি

আধা কাপ তালের পিউরি, এক কাপ ময়দা, দুটি ডিম আর এক-তৃতীয়াংশ কাপ গুঁড়া দুধ ও তেলে ওভেনে ১৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ৩৫-৪০ মিনিটে তৈরি হয় তুলতুলে তালের কেক।

এগ্রিকেয়ার২৪১৪ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)