২০২৬ সালের ২৯ জুলাই, শ্রাবণের মাঝামাঝি, জাগো নিউজ ২৪-এর কৃষি ও প্রকৃতি ডেস্ক পাটচাষিদের জন্য এ মাসের করণীয় নিয়ে একটি পরামর্শ প্রকাশ করে। শ্রাবণ বর্ষার শেষ মাস। এ সময় সাধারণত নতুন করে পাট চাষ করা হয় না; মাঠের পরিপক্ব পাট কাটা, জাগ দেওয়া ও আঁশ ছাড়ানোর কাজ চলে। তবে ভালো মানের বীজ উৎপাদনের জন্য এ মাসে দেশি ও তোষা পাটের বীজ বোনা যায়, আর বন্যার কারণে গাছ থেকে সরাসরি বীজ নেওয়া না গেলে পাটগাছের ডগা বা কাণ্ড কেটে উঁচু জায়গায় লাগিয়েও বীজ পাওয়া যায়।
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, বাংলাদেশে দুই প্রজাতির পাট চাষ হয়: সাদা বা দেশি পাট (Corchorus capsularis) এবং তোষা পাট (Corchorus olitorius)। প্রজাতিভেদে সাধারণত ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে মে মাসের শেষ পর্যন্ত পাট বোনা হয় এবং ফুল আসার পর্যায়ে কাটা হয়। কৃষকেরা প্রথাগতভাবে জমির ছোট একটি অংশ বীজের জন্য রেখে দেন, সেখানে অক্টোবর-নভেম্বরে বীজ পাকে।

ফুল এলে কাটা, তারপর জাগ ও আঁশ ছাড়ানো
পরামর্শে বলা হয়, ক্ষেতের অর্ধেকের বেশি পাটগাছে ফুল এলে পাট কাটতে হবে; এতে আঁশের মান ও ফলন দুটোই ভালো হয়। কাটার পর আঁটি বেঁধে পাতা ঝরিয়ে জাগ দিতে হবে, আর পাট পচে গেলে আঁশ ছাড়াতে হবে। বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায়, পরিষ্কার, ধীরে বয়ে চলা পানি জাগের জন্য সবচেয়ে ভালো; ১২ থেকে ১৫ দিনে পচন শেষ হলে হাতে আঁশ ছাড়িয়ে ধুয়ে রোদে শুকানো হয়।
আঁশ উজ্জ্বল করতে পরামর্শ ছিল, আঁশ ছাড়িয়ে ভালো করে ধোয়ার পর ৪০ লিটার পানিতে এক কেজি তেঁতুল গুলে তাতে আঁশ ৫ থেকে ১০ মিনিট ডুবিয়ে রাখা। বিজেআরআইয়ের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. ইউনুস আলী ২০২৩ সালের আগস্টে বণিক বার্তায় একই অনুপাতের (৪০ কেজি পানিতে এক কেজি তেঁতুল) কথা লেখেন, তবে কালো আঁশ ৩ থেকে ৪ মিনিট ডুবিয়ে রাখতে বলেন। যেখানে জাগ দেওয়ার মতো পানি নেই, সেখানে রিবন রেটিং পদ্ধতিতে পাট পচানোর কথা বলা হয়। এ পদ্ধতিতে পুরো গাছ না ডুবিয়ে গাছ থেকে ছাড়ানো ছাল বা রিবন পচানো হয়; এতে আঁশের মান ভালো হয় এবং পচনের সময় কমে।
২০১৫ সালে সিআইজিআর জার্নালে প্রকাশিত মো. রোস্তম আলীসহ কয়েকজন গবেষকের নিবন্ধে বলা হয়, বাংলাদেশের কিছু এলাকায় জাগের পানির অভাব বড় সমস্যা, আর কম খরচের রিবন রেটিংয়ে কৃষকেরা ভালো মানের আঁশ পেতে পারেন। পানিস্বল্প এলাকার জন্য বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিজেআরআই) 'অটো-জুট পাওয়ার রিবনার' যন্ত্রও উদ্ভাবন করেছে বলে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলা ট্রিবিউন জানায়।

বীজের জন্য শ্রাবণ থেকে ভাদ্র পর্যন্ত বপন
পরামর্শ অনুযায়ী, বীজ উৎপাদনের জন্য শ্রাবণের শুরু (মধ্য জুলাই) থেকে ভাদ্রের শেষ (মধ্য সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত পাটবীজ বোনা যায়, আর ভালো বীজ পেতে দেশি পাটের বীজ শ্রাবণেই বুনতে হবে। বপনের হার দেওয়া হয় এভাবে, যা ২০১৯ সালে কৃষি তথ্য সার্ভিসের কৃষিকথায় বিজেআরআইয়ের কৃষিতত্ত্ব বিভাগের এক বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তার দেওয়া হারের সঙ্গে মেলে:
- সারিতে বুনলে প্রতি শতাংশ জমিতে তোষা পাটের ১৬ গ্রাম এবং দেশি পাটের ২০ গ্রাম বীজ।
- ছিটিয়ে বুনলে প্রতি শতাংশে তোষা পাটের ২০ গ্রাম এবং দেশি পাটের ২৪ গ্রাম বীজ।
দেরিতে বুনে বীজ উৎপাদনের এই পদ্ধতি বিজেআরআইয়ের 'নাবী পাট বীজ উৎপাদন' প্রযুক্তি নামে পরিচিত। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে বিজেআরআইয়ের বরাতে জানানো হয়, সাধারণত পাটবীজ উৎপাদনে ৮ থেকে ৯ মাস লাগে, কিন্তু নাবী পদ্ধতিতে মাত্র ৪ থেকে ৫ মাসে দ্বিগুণের বেশি ফলন হয় এবং হেক্টরপ্রতি প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ কেজি বীজ পাওয়া যায়।

ডগা ও কাণ্ড কেটে বীজ উৎপাদনের ধাপ
বন্যার কারণে গাছ থেকে সরাসরি বীজ নেওয়া সম্ভব না হলে আঁশের জন্য বোনা ক্ষেত থেকেই ডগা কেটে উঁচু জায়গায় লাগিয়ে সহজে বীজ উৎপাদন করা যায়। পরামর্শে ধাপগুলো ছিল:
- শ্রাবণে (মধ্য জুলাই) আঁশ ফসলের জমি থেকে সুস্থ ও সবল মাতৃগাছ বাছাই করতে হবে, যেগুলোতে এখনো ফুল আসেনি কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে আসবে; সেসব গাছের কাণ্ড ও ডগা নিতে হবে।
- ধারালো চাকু বা ব্লেড দিয়ে তেরছা করে ২০ থেকে ২৫ সেন্টিমিটার (৮ থেকে ১০ ইঞ্চি) লম্বা করে কাটতে হবে।
- মেঘলা দিনে বা পড়ন্ত রোদে ডগা রোপণ করা ভালো।
- সারিতে রোপণ করতে হবে: সারি থেকে সারির দূরত্ব ৩০ সেন্টিমিটার (১ ফুট), ডগা থেকে ডগার দূরত্ব ১০ সেন্টিমিটার (৪ ইঞ্চি)।
- প্রতিটি ডগার প্রায় ৫ সেন্টিমিটার (২ ইঞ্চি) অংশ ৪৫ ডিগ্রি কোণে, অর্থাৎ তেরছাভাবে মাটির নিচে পুঁতে দিতে হবে।
ডগার দৈর্ঘ্য ও অবস্থান নিয়ে বিজেআরআইয়ের গবেষণাও আছে। কিশোরগঞ্জের আঞ্চলিক কেন্দ্রে ২০০৯ সালের আগস্ট থেকে ২০১০ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত তোষা পাটে ১৫, ২০ ও ২৫ সেন্টিমিটার লম্বা এবং গাছের ওপর থেকে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় অংশের ডগা পরীক্ষা করা হয়। ২০১৮ সালে 'দ্য এগ্রিকালচারিস্টস' সাময়িকীতে প্রকাশিত ফলাফলে সবচেয়ে বেশি ফলন, হেক্টরপ্রতি ৯১৭ কেজি, আসে একেবারে ওপরের ১৫ সেন্টিমিটার ডগা থেকে, আর সেই বীজের অঙ্কুরোদ্গমের হারও ছিল সবচেয়ে বেশি, ৮৯ শতাংশ। গবেষকদের সিদ্ধান্ত, গাছের ওপরের অংশের ডগা থেকেই সবচেয়ে বেশি ও ভালো মানের বীজ পাওয়া যায়।
জাত বাছাই, বীজ শোধন, সার ও বালাই ব্যবস্থাপনার বিষয়ে চাষিরা উপজেলা কৃষি অফিস বা বিজেআরআইয়ের আঞ্চলিক কেন্দ্রের পরামর্শ নিতে পারেন।
ছবি: Masum-al-hasan / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাপিডিয়া, কৃষি তথ্য সার্ভিস (কৃষিকথা, শ্রাবণ ১৪২৬), বণিক বার্তা (২০২৩), বাংলা ট্রিবিউন, দ্য এগ্রিকালচারিস্টস (বিজেআরআই গবেষণা, ২০১৮), সিআইজিআর জার্নাল (২০১৫), উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)