২০২৬ সালের ৯ মে জাগো নিউজ পশ্চিম আফ্রিকার ফল মিরাকল বেরি কীভাবে চাষ করা যায়, তা নিয়ে একটি নির্দেশিকা প্রকাশ করে। এই ফল খাওয়ার পর কিছুক্ষণ টক খাবারও মিষ্টি লাগে, আর এই অদ্ভুত বৈশিষ্ট্যের জন্যই ফলটি বিশ্বজুড়ে পরিচিত। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশেও এ ফল চাষ করা যায় এবং শখের বাগান ও ছাদ বাগানে এটি জনপ্রিয় হচ্ছে।
মিরাকল বেরি কী
মিরাকল বেরির বৈজ্ঞানিক নাম সিনসেপালাম ডালসিফিকাম (Synsepalum dulcificum)। এটি সাপোটেসি পরিবারের একটি চিরসবুজ গুল্ম। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডার খাদ্য ও কৃষিবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের (ইউএফ/আইএফএএস) ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরের এক প্রকাশনা অনুযায়ী, গাছটির আদি নিবাস পশ্চিম আফ্রিকার ঘানা থেকে কঙ্গো পর্যন্ত দেশগুলো। গাছ কয়েক মিটার উঁচু হতে পারে, তবে ফল তোলার সুবিধার জন্য ছেঁটে ছোট রাখা হয়। ফল উজ্জ্বল লাল, প্রায় ২ সেন্টিমিটার লম্বা। ভেতরের বড় বীজকে ঘিরে থাকা সাদা শাঁসে থাকে মিরাকুলিন নামের একটি প্রোটিন।
মিরাকুলিন জিহ্বার স্বাদগ্রাহকের ওপর সাময়িকভাবে কাজ করে টক বা অম্লীয় খাবারকে মিষ্টি অনুভূত করায়। ইউএফ/আইএফএএসের বাগানবিষয়ক পাতায় বলা হয়েছে, এই প্রভাব ১৫ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা পর্যন্ত থাকে। ফলটির নিজের স্বাদ তেমন জোরালো নয় এবং এতে চিনির পরিমাণ কম।
ফ্লোরিডার গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, মিরাকুলিনের স্বাস্থ্যগুণ নিয়ে যেসব গবেষণা আছে, তার অনেকগুলোর নমুনা ছোট, কিছু আবার মানুষের ওপর করা হয়নি। তাই এ ফলকে কোনো রোগের চিকিৎসা হিসেবে দেখা উচিত নয়। ডায়াবেটিস বা অন্য কোনো স্বাস্থ্যসমস্যায় খাদ্যাভ্যাস বদলানোর আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

মাটি, আলো ও রোপণ
জাগো নিউজের নির্দেশিকা অনুযায়ী, সামান্য অম্লীয় ও সুনিষ্কাশিত দোআঁশ মাটি এ গাছের জন্য উপযোগী। উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, গাছটি পিএইচ ৪.৫ থেকে ৫.৮ মাত্রার অম্লীয় মাটিতে, আংশিক ছায়ায় ও উচ্চ আর্দ্রতায় সবচেয়ে ভালো বাড়ে, তবে পূর্ণ রোদও সহ্য করতে পারে। ইউএফ/আইএফএএস বলছে, ক্ষারীয় মাটি এ গাছ সহ্য করতে পারে না। এ কারণে দক্ষিণ ফ্লোরিডায় বাণিজ্যিকভাবে গাছটি বড় টবে (প্রায় ২০ গ্যালন) মাটিবিহীন মিশ্রণে চাষ করা হয়।
টবে বা সরাসরি মাটিতে, দুইভাবেই গাছ লাগানো যায়। টবে লাগালে বড় টব বেছে নিতে এবং নিয়মিত পানি ও যত্ন দিতে বলা হয়েছিল জাগো নিউজের প্রতিবেদনে। সেখানে দ্রুত ফল পেতে কলমের চারা লাগানোর পরামর্শও দেওয়া হয়। ইউএফ/আইএফএএস জানায়, বীজ থেকে চারা করা যায়, তবে বীজ শুকিয়ে যেতে দেওয়া যাবে না, কারণ তোলার পর দ্রুত এর অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা কমে যায়। শিকড় গজানো ডাল বা কাটিং থেকেও চারা তৈরি করা যায়।

পানি, সার ও রোগবালাই
গাছের গোড়ায় পানির ঘাটতি রাখা যাবে না, মাটি সব সময় আর্দ্র রাখতে হবে, তবে জলাবদ্ধতা এড়িয়ে চলতে হবে। ইউএফ/আইএফএএসও শুষ্ক মৌসুমে বাড়তি সেচের কথা বলেছে। জাগো নিউজ কম্পোস্ট বা ভার্মি কম্পোস্টের মতো জৈব সার দেওয়ার পরামর্শ দেয় এবং নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশিয়ামযুক্ত সার খুব কম পরিমাণে ব্যবহার করতে বলে। ফ্লোরিডার গবেষকেরা জানিয়েছেন, নিয়মিত সুষম ধীর-নিঃসরণ সার গাছের বৃদ্ধি ও ফলনে সাহায্য করে, তবে এ গাছের জন্য সারের নির্দিষ্ট মাত্রা এখনো গবেষণায় ঠিক হয়নি। তাই সারের পরিমাণ জানতে উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শ নেওয়াই ভালো।
দক্ষিণ ফ্লোরিডায় এ গাছের বড় কোনো রোগ দেখা যায়নি বলে ইউএফ/আইএফএএস জানিয়েছে। সেখানে প্রধান শত্রু মিলিবাগ ও মাকড়, যা পণ্যের লেবেলের নির্দেশনা মেনে হর্টিকালচারাল তেল বা সাবান দিয়ে দমন করা হয়। উইকিপিডিয়ায় উল্লেখ আছে, আফ্রিকায় এর পাতায় প্রজাপতি ও মথ জাতীয় পোকার শূককীট এবং ফলে ফলের মাছির শূককীট আক্রমণ করে। কোনো বালাইনাশক ব্যবহারের আগে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলা উচিত। ফল তোলার সুবিধার জন্য বছরে একবার ছাঁটাই করার কথা বলেছে ইউএফ/আইএফএএস।
কখন ফল আসে, কীভাবে তুলবেন
ইউএফ/আইএফএএস অনুযায়ী, সুস্থ গাছ তৃতীয় বছরে ফল দিতে শুরু করে এবং পঞ্চম বছরের দিকে সবচেয়ে বেশি ফলন দেয়। বোঁটার কাছের অংশসহ পুরো ফল লাল হলে তা তোলা হয় এবং তখন সরাসরি খাওয়া যায়। ফল বেশি পেকে নষ্ট হওয়া ঠেকাতে প্রতি সপ্তাহে তোলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তাজা ফল বেশি দিন রাখা যায় না এবং তাপে মিরাকুলিন নষ্ট হয়, তাই ফল হিমায়িত করে বা ফ্রিজ-ড্রাই করে সংরক্ষণ করতে হয়।
বাংলাদেশেও এ গাছে ফল ধরার নজির আছে। ২০২৫ সালের মে মাসে প্রথম আলো জানায়, চাঁদপুর সদর উপজেলার শাহতলী গ্রামের একটি ফলবাগানে প্রায় তিন বছর আগে লাগানো পাঁচটি মিরাকল বেরি গাছের প্রতিটিতেই ফল ধরেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ঝরে পড়ার পর ফলটি ৪৮ ঘণ্টার বেশি সংরক্ষণ করা যায় না এবং সহজে বাজারে মেলে না।

ছবি: scott.zona / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)
সূত্র: জাগো নিউজ, ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডা আইএফএএস (এডিস প্রকাশনা এইচএস১৪৪৯ ও গার্ডেনিং সলিউশনস), প্রথম আলো, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)