২০২৬ সালের ৮ মার্চ, রমজান মাসে, বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম জাগো নিউজের লাইফস্টাইল বিভাগে ফলের চাট বানানোর একটি ছোট রেসিপি প্রকাশিত হয়। পদটি হলো তাজা ফল কিউব করে কেটে তার সঙ্গে সামান্য মসলা, লেবুর রস আর চাট মসলা মিশিয়ে নেওয়া। রেসিপিতে একে গরমের দিনের হালকা, স্বাস্থ্যকর ও মুখরোচক খাবার হিসেবে তুলে ধরা হয়, যা ঘরে থাকা ফল দিয়েই খুব অল্প সময়ে বানানো যায়। বিকেলের নাস্তা, অতিথি আপ্যায়ন এবং সূর্যাস্তে রোজা ভাঙার খাবার ইফতারে স্বাস্থ্যকর পদ হিসেবে এটি রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়।
বাংলাদেশে সেবারের রমজান শুরু হয়েছিল ২০২৬ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি, বৃহস্পতিবার। প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী, ঢাকার জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের সভাকক্ষে বৈঠক শেষে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি ১৮ ফেব্রুয়ারি জানায় যে দেশের আকাশে চাঁদ দেখা গেছে এবং পরদিন থেকে রোজা শুরু হবে। এর পরের কয়েক সপ্তাহ ঢাকায় ফলের দাম চড়া ছিল, নিচে উল্লেখ করা পত্রিকার প্রতিবেদনগুলো তা দেখায়। তাই হাতের কাছে থাকা ফল দিয়ে বানানো যায় এমন একটি রেসিপির বাস্তব উপযোগিতা ছিল।
জাগো নিউজের দেওয়া রেসিপি
প্রতিবেদনে বানানোর পদ্ধতি ছিল সংক্ষিপ্ত। সব ফল কিউব করে কেটে নিতে হবে, এরপর একটি বড় পাত্রে সব একসঙ্গে নিয়ে ভালোভাবে মিশিয়ে নিলেই চাট তৈরি। প্রতিবেদনে একে ভিন্ন স্বাদের পুষ্টিকর ফলের চাট বলা হয়। কোন ফল দেওয়া হবে, তা রাঁধুনির ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল; পদটিকে ঘরে থাকা ফল দিয়ে বানানোর খাবার বলা হয়, আর স্বাদের জন্য লেবুর রস, চাট মসলা ও সামান্য মসলার কথা বলা হয়, কোনো নির্দিষ্ট পরিমাণ ছাড়াই।
নিচের ধাপগুলো জাগো নিউজের পদ্ধতি অনুসরণ করেছে। শুরুর দিকের ধোয়া ও হাতে নেওয়ার ধাপগুলো যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের (এফডিএ) ফল ও সবজি পরিষ্কারের ভোক্তা নির্দেশিকা থেকে নেওয়া।
- ফল ধরার আগে ও পরে সাবান ও কুসুম গরম পানি দিয়ে ২০ সেকেন্ড ধরে হাত ধুয়ে নিন (এফডিএ)।
- ফলের থেঁতলানো বা নষ্ট অংশ কেটে ফেলে দিন (এফডিএ)।
- খোসা ছাড়ানোর আগে প্রতিটি ফল সাধারণ প্রবহমান পানিতে ধুয়ে নিন, যাতে ছুরির মাধ্যমে ময়লা ও ব্যাকটেরিয়া ফলের ভেতরে না যায়। এফডিএ বলছে, এ জন্য সাবান বা আলাদা কোনো ধোয়ার দ্রবণ লাগে না।
- বাঙ্গি বা তরমুজের মতো শক্ত খোসার ফল পরিষ্কার সবজি-ব্রাশ দিয়ে ঘষে নিন (এফডিএ)।
- পরিষ্কার কাপড় বা কাগজের তোয়ালে দিয়ে ফল মুছে শুকিয়ে নিন (এফডিএ)।
- প্রয়োজন অনুযায়ী খোসা ছাড়িয়ে ফল কিউব করে কেটে নিন (জাগো নিউজ)।
- সব টুকরো একটি বড় পাত্রে নিয়ে স্বাদমতো লেবুর রস, চাট মসলা ও সামান্য মসলা দিন (জাগো নিউজ)।
- ভালোভাবে মিশিয়ে পরিবেশন করুন (জাগো নিউজ)।
প্রতিবেদনে মসলার কোনো পরিমাণ দেওয়া হয়নি, তাই চাট মসলা ও অন্য মসলা কতটা দেবেন, তা স্বাদের ব্যাপার। বেশির ভাগ চাট মসলায় লবণ থাকে, যা লবণ কম খেতে চান এমন মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ; নিচে খাদ্যাভ্যাসের অংশে এর ব্যাখ্যা আছে।
চাট কী
চাট শব্দটি এসেছে হিন্দি ‘চাট’ থেকে, যার সঙ্গে ‘চাটনা’ অর্থাৎ চেটে খাওয়ার সম্পর্ক আছে, যেমন খেতে খেতে আঙুল চেটে নেওয়া। শব্দটির মূল প্রাকৃত ‘চট্টেই’, যার অর্থ তৃপ্তি করে খাওয়া। দক্ষিণ এশীয় রান্নায় চাট বলতে একগুচ্ছ ঝাল-নোনতা নাশতাকে বোঝায়, যার শুরু ভারতে, শিকড় উত্তর প্রদেশে। এখন তা পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় খাওয়া হয়, প্রায়ই রাস্তার পাশের ঠেলাগাড়ি ও দোকান থেকে কিনে।
রন্ধন নৃবিজ্ঞানী কুরুশ দালালের দেওয়া এবং বিশ্বকোষধর্মী তথ্যসূত্রে উদ্ধৃত একটি বিবরণ অনুযায়ী, পদের একটি গোষ্ঠী হিসেবে চাটের উদ্ভব সপ্তদশ শতকের শেষ ভাগে উত্তর ভারতে, মোগল সম্রাট শাহজাহানের আমলে। বলা হয়, তখন রাজবৈদ্যরা যমুনার ক্ষারীয় পানির প্রভাব কাটাতে দিল্লির মানুষকে ঝাল ভাজা নাশতা ও দই খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। একই তথ্যসূত্র জানায়, উৎপত্তির এই কাহিনির পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ নেই, আর আজ পরিচিত বেশির ভাগ চাট রূপ পেয়েছে বিংশ শতকে উত্তর প্রদেশে।
প্রচলিত নোনতা চাটে থাকে আলুর টুকরা, মচমচে ভাজা রুটি, দই বড়া বা দই ভল্লা আর ছোলা, সঙ্গে টক-নোনতা মসলা। ওপরে দেওয়া হয় কাঁচা মরিচ, শুকনা আদা ও তেঁতুলের চাটনি ‘সোঁঠ’, ধনেপাতা ও দই। কুচানো পেঁয়াজ, সেউ (সরু, শুকনা, নোনতা ভাজা নুডলস) আর চাট মসলা অনেক ধরনের চাটেই থাকে। ঐতিহ্যগতভাবে এটি পরিবেশন করা হয় ছোট ধাতব থালায় বা কলাপাতায়। বিশ্বকোষধর্মী তালিকায় চাটের আঞ্চলিক রূপগুলোর মধ্যে ‘ঢাকা চাট’-এর নামও আছে।
ফলের চাটে চাটের মসলা ব্যবহার করা হয় ফলের ওপর। মসলাবিষয়ক তথ্যগ্রন্থে বলা হয়েছে, পেঁপে, সফেদা, আপেল ও কলা দিয়ে তৈরি ভারতীয় ফলের সালাদে চাট মসলা ব্যবহার করা হয়, আর রাস্তার বিক্রেতারা সাধারণত নিজেরাই চাট মসলা মিশিয়ে কাটা ফল বা তাজা সবজির ওপর ছিটিয়ে দেন। কখনো কখনো চাট মসলার বদলে শুধু বিট লবণ আর মরিচের গুঁড়া ব্যবহার করা হয়।

চাট মসলা: যে মসলায় পদটি চাট হয়ে ওঠে
চাট মসলা ভারতীয় উপমহাদেশের একটি গুঁড়া মসলার মিশ্রণ। এতে সাধারণত থাকে আমচুর (শুকনা আমের গুঁড়া), জিরা, ধনে, শুকনা আদা, লবণ (প্রায়ই বিট লবণ), গোলমরিচ, হিং ও মরিচের গুঁড়া। গরম মসলা ঐচ্ছিক উপকরণ হিসেবে যোগ করা হয়।
মসলা কোম্পানিগুলো ‘ফ্রুট চাট মসলা’ নামে আলাদা একটি মিশ্রণও বিক্রি করে। মসলাবিষয়ক তথ্যগ্রন্থ অনুযায়ী, এতে সাধারণ চাট মসলার চেয়ে জিরা, ধনে ও আদা কম থাকে, আর মরিচ, বিট লবণ, আমচুর ও হিং বেশি থাকে।
বিট লবণ, দক্ষিণ এশিয়ায় যা ‘কালা নমক’ নামে পরিচিত, এক ধরনের খনিজ বা রক লবণ, যা এ অঞ্চলে খাবারে স্বাদ বাড়াতে ব্যবহৃত হয়। এর স্বাদ নোনতা এবং গন্ধ ঝাঁজালো। এই রেসিপিতে লবণ আসে চাট মসলার সঙ্গে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) প্রাপ্তবয়স্কদের দিনে ৫ গ্রামের কম লবণ, অর্থাৎ ২ গ্রাম সোডিয়াম, খাওয়ার পরামর্শ দেয়। তাই এক বাটি ফলের ওপর ছিটানো চাট মসলার লবণও দিনের মোট লবণের মধ্যে ধরা পড়ে।
লেবুর রস কেন দেওয়া হয়
ফলের চাটে লেবুর রস দুটি কাজ করে: ফলের মিষ্টতার সঙ্গে টক স্বাদের ভারসাম্য আনে, আর কাটা ফলের বাদামি হয়ে যাওয়া ধীর করে। অনেক ফল, যার মধ্যে আপেল সবচেয়ে পরিচিত, কাটার কিছুক্ষণ পরই বাদামি হয়ে যায়। একে বলা হয় এনজাইমজনিত বাদামি হওয়া: শাঁস অক্সিজেনের সংস্পর্শে এলে পলিফেনল অক্সিডেজ নামের একটি এনজাইম ফলের প্রাকৃতিক ফেনলকে কুইনোনে রূপান্তর করে, যা আরও বিক্রিয়ার মাধ্যমে শাঁসের ওপর বাদামি রঞ্জক তৈরি করে।
পলিফেনল অক্সিডেজ পিএইচ ৫ থেকে ৭-এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকে, আর পিএইচ ৩-এর নিচে এর কাজ বাধা পায়। খাদ্যশিল্পে বাদামি হওয়া ঠেকাতে সাইট্রিক অ্যাসিড ও অ্যাসকরবিক অ্যাসিড (ভিটামিন সি) ব্যবহার করা হয়, আর কাটা খাবারকে উজ্জ্বল রাখতে লেবুর রসের যে প্রভাব, তা এর সাইট্রিক ও অ্যাসকরবিক অ্যাসিডের কারণে বলে মনে করা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, আনারসের রসও আপেল ও কলার বাদামি হওয়া ধীর করে।
লেবুর রস এবং চাটে ব্যবহৃত অনেক ফল ভিটামিন সি-র উৎস। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের ভোক্তা স্বাস্থ্যসেবা মেডলাইনপ্লাস জানায়, শরীরের সব অংশের টিস্যুর বৃদ্ধি ও মেরামতের জন্য এই ভিটামিন দরকার: এটি কোলাজেন তৈরি, ক্ষত সারানো, তরুণাস্থি, হাড় ও দাঁত ঠিক রাখা এবং আয়রন শোষণে সাহায্য করে, আর এটি একটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। ভিটামিন সি-র সবচেয়ে সমৃদ্ধ উৎস হিসেবে সেখানে যেসব ফলের নাম আছে, তার মধ্যে রয়েছে ক্যান্টালুপ (বাঙ্গিজাতীয় একটি ফল), কমলা ও জাম্বুরার মতো লেবুজাতীয় ফল, কিউই, আম, পেঁপে, আনারস, স্ট্রবেরিসহ বিভিন্ন বেরি এবং তরমুজ। ১৯ বছর ও তার বেশি বয়সী পুরুষের জন্য দৈনিক প্রস্তাবিত পরিমাণ ৯০ মিলিগ্রাম, নারীর জন্য ৭৫ মিলিগ্রাম।
সেই রমজানে ঢাকার বাজারে ফল
রেসিপিটি এসেছিল ফলের চড়া দামের মৌসুমে। রোজা শুরুর দুই দিন আগে, ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি, প্রথম আলো ঢাকার হাতিরপুল, বড় মগবাজার, রামপুরা কাঁচাবাজার ও কারওয়ান বাজারে খোঁজ নেয়। দেশি কলার দাম ডজনে ৪০ থেকে ৬০ টাকা বেড়েছিল: কারওয়ান বাজারে চাঁপা কলা ডজন ১০০ টাকা, সবরি ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা আর বাংলা কলা ১৪০ থেকে ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। তরমুজের মৌসুম পুরোপুরি শুরু না হলেও আকারভেদে কেজিপ্রতি ৭০ থেকে ৯০ টাকা চাওয়া হচ্ছিল। পেয়ারা কেজি ১০০ থেকে ১৫০ টাকা, আনারস প্রতিটি ৪০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল, আর দেশি পেঁপের দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা বেড়েছিল।
আমদানি করা ফলের দাম ছিল আরও বেশি। একই খোঁজে কারওয়ান বাজারে মাল্টা কেজি ৩১০ থেকে ৩৪০ টাকা, আপেল ৩৩০ থেকে ৪০০ টাকা আর কমলা ৩২০ থেকে ৩৪০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা যায়। রামপুরার এক বিক্রেতা জানান, ২২ থেকে ২৩ কেজির এক পেটি কমলার দাম ৫ হাজার থেকে ৫ হাজার ৩০০ টাকা থেকে বেড়ে ৬ হাজার থেকে ৬ হাজার ৫০০ টাকা হয়েছে। রেসিপিতে যে লেবুর রস লাগে, সেই লেবুর দামও বেড়েছিল: কয়েক সপ্তাহ আগে সাধারণ মানের যে লেবুর হালি ২০ থেকে ৪০ টাকা ছিল, তা তখন ৬০ থেকে ৮০ টাকা, আর বড় লেবুর হালি ৮০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। বিক্রেতারা জাতীয় নির্বাচনের পর সরবরাহ কমে যাওয়া এবং কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়া পরিবহন খরচকে দায়ী করেন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, কিছু পাইকারি বাজারে সিন্ডিকেট করে দাম বাড়ানোর অভিযোগ আছে।
রোজা চলাকালে ২২ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলো জানায়, ফলের চাহিদা বেড়েছে এবং অনেক ক্রেতা দেশি ফলের দিকে ঝুঁকছেন, কারণ ৩০০ টাকার নিচে ভালো মানের বিদেশি ফল মিলছিল না, অথচ তরমুজ, কলা, পেঁপে, সাম্মাম, বেল ও আনারস মোটামুটি ২০০ টাকার মধ্যে কেনা যাচ্ছিল। তখন সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া তরমুজের কেজি ছিল ৮০ থেকে ১০০ টাকা, আর ৩ কেজি ওজনের একটি তরমুজ ২৪০ থেকে ৩০০ টাকা। মানভেদে সাম্মাম কেজি ১০০ থেকে ১৫০ টাকা, বাঙ্গি ৮০ থেকে ১০০ টাকা, পাকা পেঁপে ৮০ থেকে ১২০ টাকা, সফেদা ১৫০ থেকে ১৮০ টাকা, আতাফল ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা এবং ড্রাগন ফল ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল; মৌসুম না থাকায় শেষের দুটির দাম বেশি ছিল। আনারস প্রতিটি ৩০ থেকে ৬০ টাকা আর বেল আকারভেদে প্রতিটি ৮০ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল।
বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক নুরুদ্দিন আহমেদ পত্রিকাটিকে জানান, ঢাকার পাইকারি বাজারে প্রতিদিন ২০০ থেকে ২৫০ কোটি টাকার ফল বেচাকেনা হয়, যার ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ আমদানি করা। তাঁর ভাষ্য, রোজার আগে আমদানি করা ফলের জাহাজ আসতে দেরি হওয়ায় দাম বেড়েছে, এবং কিছুদিনের মধ্যে দাম কমে আসবে বলে তিনি আশা করেন।

বাদামতলী ও আমদানি করা ফলের ব্যবসা
ঢাকার ফলের চাটে ব্যবহৃত আমদানি করা ফলের বড় অংশ আসে বাদামতলী হয়ে। বুড়িগঙ্গার তীরে, সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল ও আহসান মঞ্জিলের কাছে অবস্থিত এই বাজার দেশের সবচেয়ে বড় পাইকারি ফলের বাজার। ২০২৫ সালের ৩০ অক্টোবরের এক প্রতিবেদনে প্রথম আলো বাজারটিকে প্রায় একশ বছরের পুরোনো বলে উল্লেখ করে। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ব্রিটিশ আমলে ১৯৩৫ সালের দিকে চার-পাঁচজন ব্যবসায়ী সেখানে ফলের পাইকারি ব্যবসা শুরু করেন। ১৯৭১ সাল পর্যন্ত এখানে মূলত দেশি মৌসুমি ফল এবং ভারত ও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আনা কিছু ফল বিক্রি হতো; স্বাধীনতার পর ধীরে ধীরে এটি আমদানি করা ফলের প্রধান বাজারে পরিণত হয়। ভোরে বেচাকেনা শুরু হয়ে চলে দুপুর পর্যন্ত, আর এতে লাখের বেশি মানুষ জড়িত।
প্রতিবেদনে বাজারটির দৈনিক লেনদেন প্রায় একশ কোটি টাকা বলা হয়। পাঁচ শতাধিক ফড়িয়া ও পাইকারি বিক্রেতা মিলিয়ে ব্যবসায়ীদের নিজেদের হিসাবে দৈনিক লেনদেন ১৫০ থেকে ২০০ কোটি টাকা, আর মন্দার সময় তা নেমে আসে ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকায়। আমদানি করা ফলের বেশির ভাগ দেশে আসে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে; অ্যাভোকাডো ও চেরির মতো কিছু ফল আসে আকাশপথে, আর খেজুর আসে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। আমদানি করা ফলের একটি বড় অংশ এখন অনলাইনে আগাম বিক্রি হয়ে চট্টগ্রাম থেকেই সরাসরি দেশের বিভিন্ন জায়গায় চলে যায়, ফলে বাদামতলীর বেচাকেনা কিছুটা কমেছে।
একই প্রতিবেদন অনুযায়ী, খেজুর বাদে বাংলাদেশে বছরে দুই থেকে আড়াই লাখ টন ফল আমদানি হয়, আর খেজুর আমদানি হয় ৮৫ থেকে ৯০ হাজার টন। সবচেয়ে বেশি আমদানি হয় মাল্টা, যার বেশির ভাগ আসে মিসর, দক্ষিণ আফ্রিকা ও চীন থেকে। আপেল ও কমলা আসে মূলত চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ভারত থেকে; আঙুর চীন ও ভারত থেকে; বেদানা ভারত ও মিসর থেকে; আর নাশপাতি চীন থেকে। মাল্টা, আপেল, কমলা ও আঙুর এই চারটি ফল মিলে মোট ফল আমদানির ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ। মাল্টার উৎস মৌসুমের সঙ্গে বদলায়: জানুয়ারি থেকে জুন মিসর, জুন থেকে অক্টোবর দক্ষিণ আফ্রিকা এবং আগস্ট থেকে অক্টোবর ভারত থেকে আসে।
দেশের নিজস্ব ফল
ফলের চাটের খরচ কম রাখতে চাইলে দেশি ফলই বিকল্প। বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, দেশে সাধারণত ৯টি প্রধান ও ৪৮টি অপ্রধান ফল উৎপন্ন হয়। প্রধান ফলের মধ্যে আছে আম, কলা, কাঁঠাল, আনারস, পেঁপে, লিচু ও কুল; নারকেলও একটি গুরুত্বপূর্ণ ফলগাছ। ফলগাছ চাষের প্রায় ৯০ শতাংশই আম, কাঁঠাল ও নারকেলের।
দেশি ফলের বেশির ভাগ পাকে বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ় ও শ্রাবণ মাসে, আর মে, জুন ও জুলাইকে বলা হয় ফলের উৎসবের মাস। বাংলাপিডিয়া জানায়, দেশের প্রায় ৫৪ শতাংশ ফল এই ভরা মৌসুমের মাসগুলোতে সংগ্রহ ও বাজারজাত হয়, বাকি ৪৬ শতাংশ বছরের অন্য আট মাসে। পেঁপে ও কলা সারা বছরই পাওয়া যায়। ফেব্রুয়ারি-মার্চে পড়া রমজান তাই দেশি ফলের মূল মৌসুমের আগে এসেছিল; এ কারণেই সে মাসের বাজার প্রতিবেদনে দেশি ফল হিসেবে কলা, পেঁপে, পেয়ারা, আনারস, বেল, আগাম তরমুজ ও বাঙ্গি-সাম্মামের নাম দেখা যায়।
সেই রমজানে ঢাকার বাজারে আসা ফলের একটি সাম্মাম। প্রথম আলো ২২ ফেব্রুয়ারি জানায়, ফলটি মূলত আরব অঞ্চলের হিসেবে পরিচিত, তবে এখন বাংলাদেশেও চাষ হচ্ছে। সাম্মামের দুটি ধরন আছে: একটির বাইরের অংশ সবুজ ও ভেতর লাল, অন্যটির বাইরে হলুদ ও ভেতর লাল। কারওয়ান বাজারের ফল বিক্রেতা মো. শাহজাহান পত্রিকাটিকে বলেন, তখন বাজারে থাকা সাম্মাম আগাম চাষের; এপ্রিলের দিকে ভরা মৌসুমে ১ থেকে আড়াই কেজি ওজনের বড় সাম্মাম আসবে, আর তখন দাম আরও কমবে বলে আশা করা হচ্ছিল।
বাংলাপিডিয়ায় আরও বলা হয়েছে, সুস্থ জীবনের জন্য প্রত্যেক মানুষের দিনে অন্তত ৮৫ গ্রাম ফল খাওয়া উচিত, অথচ গড়ে খাওয়া হয় মাত্র প্রায় ৩৫ গ্রাম। এই গ্রহণও অসম; অনেক দরিদ্র মানুষ প্রয়োজনের চেয়ে অনেক কম ফল খান, যা অপুষ্টি বাড়ায়।

ফল, ইফতার ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বাস্থ্যকর খাদ্যবিষয়ক তথ্যপত্র, যার তারিখ ২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি, বলছে: ১০ বছরের বেশি বয়সী সবার দিনে অন্তত ৪০০ গ্রাম ফল ও সবজি খাওয়ার লক্ষ্য রাখা উচিত। তথ্যপত্রে তাজা ফল ও সবজিকে চমৎকার পছন্দ বলা হয়েছে; হিমায়িত ও টিনজাত ফল-সবজিও ভালো, যদি তাতে বাড়তি চিনি বা অতিরিক্ত সোডিয়াম না থাকে। তথ্যপত্র অনুযায়ী, স্বাস্থ্যকর খাদ্য সব ধরনের অপুষ্টি থেকে এবং ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, স্ট্রোক ও ক্যানসারসহ অসংক্রামক রোগ থেকে সুরক্ষা দিতে সাহায্য করে।
ডব্লিউএইচও ‘ফ্রি সুগার’ বা মুক্ত চিনি বলতে বোঝায় প্রস্তুতকারক, রাঁধুনি বা ভোক্তার হাতে খাবার ও পানীয়তে যোগ করা চিনি, সঙ্গে মধু, সিরাপ, ফলের রস ও ঘন ফলের রসে প্রাকৃতিকভাবে থাকা চিনি। সংস্থাটি দৈনিক মোট শক্তির ১০ শতাংশের কম মুক্ত চিনি খাওয়ার পরামর্শ দেয়। দিনে প্রায় ২ হাজার ক্যালরি খান এমন স্বাস্থ্যকর ওজনের একজন প্রাপ্তবয়স্কের জন্য এর পরিমাণ প্রায় ৫০ গ্রাম, বা মোটামুটি ১২ সমান চা-চামচ; ৫ শতাংশের নিচে রাখলে বাড়তি উপকার মিলতে পারে। জাগো নিউজের রেসিপিতে আস্ত ফল ব্যবহার করা হয়েছে, বাড়তি চিনি নয়। তথ্যপত্রে আরও বলা হয়েছে, প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য দিনে অন্তত ৯০ মিলিমোল (৩ হাজার ৫১০ মিলিগ্রাম) পটাশিয়াম গ্রহণ উপকারী হতে পারে।
রোজার মাসের জন্য ডব্লিউএইচওর বাংলাদেশ কার্যালয় ‘রমজানে সুস্থ থাকুন’ শিরোনামে পরামর্শ প্রকাশ করেছে। সেখানে মাথাব্যথা এড়াতে ও শরীরের প্রয়োজনীয় শক্তি পেতে খেজুর দিয়ে ইফতার শুরু করা; খাবারকে ইফতার, হালকা রাতের খাবার ও সেহরি এই তিন ভাগে ভাগ করা; প্রচুর পানি পান করা ও পানিসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া; ফলের রসের বদলে ফল খাওয়া; এবং চর্বিযুক্ত, ডুবো তেলে ভাজা, প্রক্রিয়াজাত, ঝাল বা লবণাক্ত খাবার কমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, কারণ এসব খাবার রোজার সময় তৃষ্ণা বাড়ায়। বাংলাপিডিয়া বাংলাদেশের প্রথার বর্ণনা দিয়ে বলেছে, খেজুর এবং ঠান্ডা কিছু, যেমন এক গ্লাস পানি বা শরবত দিয়ে রোজা ভাঙা হয়, আর রমজানে ইফতারের খাবার তৈরি ও বিক্রির জন্য রাস্তার পাশে অনেক দোকান বসে।
এ ধরনের সাধারণ পরামর্শ সব পাঠকের জন্য খাটে না। ডায়াবেটিস, কিডনির রোগ, উচ্চ রক্তচাপ বা অন্য দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভোগা মানুষ, অন্তঃসত্ত্বা নারী এবং বিশেষ খাদ্যতালিকা মেনে চলা যে কেউ কতটা ফল ও লবণ খাবেন এবং রোজা রাখবেন কি না ও কীভাবে রাখবেন, সে বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন।
কাটা ফল নিরাপদ রাখা
ফলের চাট কাঁচা খাওয়া হয়, তাই ফল কেনা, রাখা ও কাটার সময়ের সতর্কতাই একে নিরাপদ রাখে। ফল-সবজি বাছাই ও পরিবেশন নিয়ে এফডিএর নির্দেশিকায় থেঁতলানো বা নষ্ট নয় এমন ফল বেছে নেওয়া; আগে থেকে কাটা ফল কিনলে কেবল ফ্রিজে রাখা বা বরফে ঘেরা ফলই কেনা; বাজার থেকে ফেরার পথে তাজা ফল-সবজি কাঁচা মাংস, মুরগি ও সামুদ্রিক খাবার থেকে আলাদা ব্যাগে রাখা; কেটে বা প্যাকেট করে কেনা সব ফল-সবজি ফ্রিজে রাখা; এবং দ্রুত নষ্ট হয় এমন ফল-সবজি ৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তার কম তাপমাত্রায় রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
রান্নাঘরে কাঁচা খাওয়া হবে এমন ফল ও সবজি কাঁচা মাংস, মুরগি ও সামুদ্রিক খাবার থেকে দূরে রাখতে এবং কাটার বোর্ড, থালাবাসন, ছুরি-চামচ ও কাজের জায়গা সাবান ও গরম পানি দিয়ে ধুতে বলেছে এফডিএ। ফলের চাটের ক্ষেত্রে এর মানে, সদ্য মাছ বা মাংস কাটা বোর্ড ও ছুরি না ধুয়ে ফল কাটার কাজে ব্যবহার না করা।
২০০৬ সালে প্রকাশিত ডব্লিউএইচওর ‘নিরাপদ খাদ্যের পাঁচটি চাবিকাঠি’ পাঁচটি বার্তার ওপর দাঁড়িয়ে: পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা; কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখা; ভালোভাবে রান্না করা; খাবার নিরাপদ তাপমাত্রায় রাখা; এবং নিরাপদ পানি ও কাঁচামাল ব্যবহার করা। ফলের চাট রান্না করা হয় না, তাই তৃতীয় চাবিকাঠিটি এখানে খাটে না; বাকি চারটি খাটে, পরিষ্কার হাত ও বোর্ড থেকে শুরু করে ফল ধোয়ার নিরাপদ পানি পর্যন্ত।
ছবি: Miansari66 / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রথম আলো, প্রথম আলো ইংরেজি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), ডব্লিউএইচও বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ), মেডলাইনপ্লাস (যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিন), বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)