২০১৯ সালের জুলাইয়ে রাজধানী ঢাকায় ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে গেলে ঘরে বসে মশা তাড়ানোর ক্রিম বানানোর একটি পদ্ধতি বিভিন্ন অনলাইন সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পদ্ধতিটি জানিয়েছিলেন ফ্রান্সে বসবাসরত বাংলাদেশি লেখক ও গবেষক রবিশঙ্কর মৈত্রী। দ্য অ্যাগ্রো নিউজও তা প্রকাশ করে। কিন্তু এমন ঘরোয়া মিশ্রণ এডিস মশার কামড় বা ডেঙ্গু থেকে নির্ভরযোগ্যভাবে রক্ষা করে, এমন কোনো প্রমাণ নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) এবং প্রকাশিত গবেষণা এ বিষয়ে কী বলে, তা এখানে তুলে ধরা হলো।
যে ঘরোয়া পদ্ধতিটি ছড়িয়েছিল
রবিশঙ্কর মৈত্রীর পদ্ধতিতে বলা হয়েছিল, মোমবাতির মোম গুঁড়ো করে তার সঙ্গে নিম তেল, গ্লিসারিন ও পানি মিশিয়ে গরম পানির পাত্রে বসিয়ে গলাতে হবে, পরে কয়েক ফোঁটা লেবুর রস ও সুগন্ধি মিশিয়ে ক্রিম বানাতে হবে। তাঁর দাবি ছিল, এই ক্রিম হাতে-পায়ে মাখলে মশা কাছে আসবে না। একই লেখায় নিম পাতার পেস্ট বা নিম সাবান গায়ে মাখা এবং ঘরের কোণে নিম পাতা ছড়িয়ে রাখার কথাও ছিল।
এই নির্দিষ্ট মিশ্রণটি মশার ওপর পরীক্ষা করা হয়েছে, এমন কোনো গবেষণা পাওয়া যায়নি। তাই ক্রিমটি কতক্ষণ বা আদৌ সুরক্ষা দেয় কি না, তা বলা যায় না। এ কারণে এখানে মিশ্রণের মাপজোখ আর দেওয়া হলো না।

নিম ও উদ্ভিজ্জ মশা নিরোধক নিয়ে গবেষণা যা বলে
লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের গবেষক মার্তা মাইয়া ও সারা মুরের ২০১১ সালে ম্যালেরিয়া জার্নালে প্রকাশিত পর্যালোচনায় বলা হয়, নিম নিয়ে গবেষণার ফল মিশ্র: ভারতের কয়েকটি মাঠ গবেষণায় খুব ভালো ফল মিললেও অন্য গবেষকেরা মাঝারি মাত্রার কার্যকারিতা পেয়েছেন। নির্ভরযোগ্য গবেষণার অভাবে রোগপ্রবণ এলাকায় নিম তেলকে কার্যকর মশা নিরোধক হিসেবে সুপারিশ করা হয় না। যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা (ইপিএ) ত্বকে মাখার মশা নিরোধক হিসেবে নিমকে অনুমোদন দেয়নি। পর্যালোচনায় আরও বলা হয়, উদ্ভিজ্জ উপাদান দ্রুত উড়ে যায়, ফলে মাখার অল্প সময় পর আর সুরক্ষা থাকে না।
২০০২ সালে নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিনে প্রকাশিত মার্ক ফ্র্যাডিন ও জোনাথন ডের তুলনামূলক গবেষণায় দেখা যায়, ডিইইটি-যুক্ত পণ্য সবচেয়ে দীর্ঘ সময় পূর্ণ সুরক্ষা দেয়; ২৩ দশমিক ৮ শতাংশ ডিইইটির একটি পণ্যে গড়ে ৩০১ দশমিক ৫ মিনিট সুরক্ষা মেলে। সয়াবিন তেলভিত্তিক একটি পণ্য ছাড়া পরীক্ষিত অন্য উদ্ভিজ্জ পণ্যগুলো গড়ে ২০ মিনিটেরও কম সুরক্ষা দিয়েছিল। গবেষকদের উপসংহার ছিল, মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি যেখানে বেশি, সেখানে এসব পণ্যের ওপর দীর্ঘ সুরক্ষার জন্য ভরসা করা যায় না।
স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ: নিবন্ধিত নিরোধক ও প্রজননস্থল ধ্বংস
ডব্লিউএইচও জানায়, ডেঙ্গু ছড়ানো মশা দিনের বেলায় সক্রিয় থাকে। সংস্থাটি ডিইইটি, পিকারিডিন বা আইআর৩৫৩৫ যুক্ত মশা নিরোধক ব্যবহার, শরীর যতটা সম্ভব ঢাকা পোশাক পরা, মশারি ও জানালায় নেট ব্যবহারের পরামর্শ দেয়। সিডিসি জানায়, প্রাকৃতিক উপাদানের অনেক নিরোধকসহ অনিবন্ধিত নিরোধকের কার্যকারিতা জানা নেই। সংস্থাটির আরও পরামর্শ:
- সানস্ক্রিন ব্যবহার করলে আগে সানস্ক্রিন, পরে মশা নিরোধক মাখুন।
- শিশুর হাত, চোখ, মুখ, কাটা বা জ্বালাপোড়া হওয়া ত্বকে নিরোধক লাগাবেন না।
- লেমন ইউক্যালিপটাস তেল (ওএলই) বা পিএমডিযুক্ত পণ্য তিন বছরের কম বয়সী শিশুর গায়ে ব্যবহার করবেন না।
এডিস মশা ঘরের আশপাশে জমে থাকা পানিতে ডিম পাড়ে ও বংশবৃদ্ধি করে। ডব্লিউএইচও সপ্তাহে একবার পানি রাখার পাত্র ঢেকে রাখা, খালি করা ও পরিষ্কার করার পরামর্শ দেয়। সিডিসির পরামর্শ হলো, টায়ার, বালতি, ফুলের টবের নিচের থালা, খেলনা ও ময়লার পাত্রের মতো যেসব জিনিসে পানি জমে, সেগুলো সপ্তাহে একবার খালি করে ঘষে পরিষ্কার করা, উল্টে রাখা, ঢেকে দেওয়া বা ফেলে দেওয়া।


জ্বর হলে দেরি নয়
ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, ডেঙ্গুর লক্ষণের মধ্যে আছে তীব্র জ্বর, প্রচণ্ড মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, পেশি ও গিঁটে ব্যথা, বমিভাব, বমি ও র্যাশ। ব্যথার জন্য প্যারাসিটামল ব্যবহার করতে এবং রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়ায় বলে আইবুপ্রোফেন ও অ্যাসপিরিনের মতো ওষুধ এড়াতে বলে সংস্থাটি। পেটে তীব্র ব্যথা, বারবার বমি, দাঁতের মাড়ি বা নাক দিয়ে রক্ত পড়া, বমি বা মলে রক্ত, দ্রুত শ্বাস নেওয়া কিংবা অস্থিরতা মারাত্মক ডেঙ্গুর সতর্কসংকেত। জ্বর হলে ঘরোয়া প্রতিকারের ওপর ভরসা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
ছবি: Graham Snodgrass, Army Medicine / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)
সূত্র: দ্য অ্যাগ্রো নিউজ, আওয়ার ইসলাম টোয়েন্টিফোর (৩০ জুলাই ২০১৯), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডেঙ্গু ও মারাত্মক ডেঙ্গু), যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (মশার কামড় প্রতিরোধ), মাইয়া ও মুর, ম্যালেরিয়া জার্নাল (২০১১), ফ্র্যাডিন ও ডে, নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন (২০০২)



মন্তব্য
(০)