২০২৬ সালের জুনে, বর্ষায় বাজারে লটকন ওঠার সময়, জাগো নিউজ ২৪ এই টক-মিষ্টি দেশীয় ফলটি ঠিকভাবে সংরক্ষণের কয়েকটি নিয়ম তুলে ধরে। লটকন মৌসুমি ফল, বাজারে থাকে অল্প সময়ের জন্য, তাই অনেকে একসঙ্গে বেশি কিনে রাখেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, অতিরিক্ত গরম, আর্দ্রতা কিংবা ভুলভাবে রাখার কারণে ফল দ্রুত পচে যেতে পারে এবং এর স্বাদ, গন্ধ ও পুষ্টিমান নষ্ট হতে পারে। নিচে সেই পরামর্শগুলো খাদ্য নিরাপত্তা ও খাদ্য সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানের নির্দেশনার সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া হলো।
লটকন কোন ফল, কোথায় হয়
লটকন আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে পাকে। ফল ধরে থোকায় থোকায়, পাকা ফলের খোসা হলুদ। প্রতিটি ফলে দুই থেকে পাঁচটি বীজ থাকে, বীজের গায়ে লেগে থাকা রসালো অংশটিই খাওয়া হয়, যার স্বাদ জাতভেদে টক বা টক-মিষ্টি। বাংলাদেশে এর আরও কয়েকটি নাম আছে, যেমন বুবি, লটকা ও হাড়ফাটা।
২০২১ সালে ফুড সায়েন্স অ্যান্ড নিউট্রিশন সাময়িকীতে প্রকাশিত এক পর্যালোচনায় লটকনকে র্যাম্বাই (Baccaurea motleyana) প্রজাতির ফল হিসেবে উল্লেখ করা হয় এবং বলা হয়, বাংলাদেশে নরসিংদী, গাজীপুর, সিলেট ও নেত্রকোনাসহ বিভিন্ন জেলায় এর চাষ হয়। ইংরেজি উইকিপিডিয়ায় অবশ্য লটকন নামটি বার্মিজ গ্রেপ (Baccaurea ramiflora) প্রজাতির সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। দেশে লটকনের সবচেয়ে বেশি ফলন হয় নরসিংদীতে। এনটিভি অনলাইনের খবর অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল ‘নরসিংদীর লটকন’ ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পায়; জেলা প্রশাসন ২০২৩ সালে এর জন্য আবেদন করেছিল।

পুষ্টিগুণ নিয়ে গবেষণা যা বলে
ফুড সায়েন্স অ্যান্ড নিউট্রিশনের ওই পর্যালোচনা অনুযায়ী, এই ফল ভিটামিন, খনিজ ও খাদ্যআঁশের ভালো উৎস। এতে ফেনলিক অ্যাসিড, ফ্ল্যাভোনয়েড, ক্যারোটিনয়েড ও টারপিনের মতো জৈব সক্রিয় যৌগ রয়েছে। ফলের ভিটামিনগুলোর মধ্যে ভিটামিন সি-ই প্রধান, এরপর ভিটামিন বি৩। পাকা ফলের খনিজের মধ্যে সবচেয়ে বেশি থাকে পটাশিয়াম। পর্যালোচনায় আরও মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে, ভিটামিন সি-র ঘাটতিতে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়।

কেনা থেকে ফ্রিজে রাখা পর্যন্ত
যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) ফল-সবজি কেনার সময় থেঁতলানো বা ক্ষতিগ্রস্ত নয় এমনগুলো বেছে নিতে বলে, আর প্রস্তুত করার আগে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ কেটে বাদ দিতে ও পচা ফল ফেলে দিতে বলে। লটকনের ক্ষেত্রেও থোকা থেকে ফেটে যাওয়া বা পচে যাওয়া ফল আলাদা করে ফেলাই নিয়ম।
জাগো নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, কয়েক দিন বেশি ভালো রাখতে চাইলে লটকন ফ্রিজে রাখা যায়। এফডিএর নির্দেশনাও বলছে, দ্রুত নষ্ট হয় এমন ফল পরিষ্কার ফ্রিজে ৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তার কম তাপমাত্রায় রাখতে হবে এবং কাটা বা প্যাকেট করা ফল-সবজি অবশ্যই ফ্রিজে রাখতে হবে।
বেশি দিন রাখতে হিমায়িত করা
দীর্ঘ সময় রাখতে চাইলে লটকন ফ্রিজারে হিমায়িত করা যায়। জাগো নিউজের পরামর্শ আর যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব জর্জিয়ার ন্যাশনাল সেন্টার ফর হোম ফুড প্রিজারভেশনের নির্দেশনা মিলিয়ে ধাপগুলো এমন:
- খোসা ছাড়িয়ে রসালো অংশ বের করুন এবং বীজ আলাদা করুন।
- একবারে যতটুকু খাওয়া হবে, সেই পরিমাণে ছোট ছোট ভাগ করুন।
- প্যাকেটে যত কম সম্ভব বাতাস রেখে শক্ত করে মুখ বন্ধ করুন।
- চাইলে আগে ট্রেতে এক স্তরে ছড়িয়ে হিমায়িত করুন, জমে গেলেই দেরি না করে প্যাকেটে ভরুন, যাতে ফ্রিজার বার্ন না হয়।
হিমায়িত করলে ফলের স্বাভাবিক গঠন কিছুটা বদলে যায়। ওই কেন্দ্রের ভাষায়, গলানোর পর হিমায়িত ফল নরম ও থলথলে হয়ে যায়, তাই সামান্য বরফকুচি থাকতে থাকতেই পরিবেশন করা ভালো। এ কারণে হিমায়িত লটকন জুস বা ডেজার্ট তৈরিতে ব্যবহার করাই সুবিধাজনক।

কখন ধোবেন, কীভাবে প্রক্রিয়াজাত করবেন
জাগো নিউজের প্রতিবেদনে ফল ধুয়ে ভেজা অবস্থায় দীর্ঘ সময় রেখে না দিয়ে খাওয়ার আগে ধুয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়; আর আগে ধুয়ে রাখতেই হলে পুরোপুরি শুকিয়ে তারপর রাখতে বলা হয়। এফডিএর নির্দেশনাও বলছে, খাওয়া বা রান্নার আগে ফল-সবজি প্রবাহমান পানির নিচে ভালো করে ধুতে হবে, সাবান বা ডিটারজেন্ট ব্যবহার করা যাবে না, আর ধোয়ার পর পরিষ্কার কাপড় বা কাগজের তোয়ালে দিয়ে মুছে শুকিয়ে নিলে জীবাণু আরও কমে। খোসা না খেলেও খোসা ছাড়ানোর আগে ফল ধুয়ে নেওয়া জরুরি, যাতে খোসার ময়লা ও জীবাণু ভেতরের অংশে না যায়।
তাজা খাওয়া ছাড়াও লটকন প্রক্রিয়াজাত করে রাখা যায়। ফুড সায়েন্স অ্যান্ড নিউট্রিশনের পর্যালোচনা অনুযায়ী, পাকা ফল থেকে জুস ও জ্যাম তৈরি হয়; জাগো নিউজও জ্যাম ও জুস করে লটকন সংরক্ষণের কথা বলেছে।
ছবি: Salim Khandoker / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, ফুড সায়েন্স অ্যান্ড নিউট্রিশন (২০২১ সালের পর্যালোচনা), এনটিভি অনলাইন, যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ), ন্যাশনাল সেন্টার ফর হোম ফুড প্রিজারভেশন (ইউনিভার্সিটি অব জর্জিয়া), উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)