২০২৬ সালের জুনের শেষে জাগো নিউজ ২৪-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে আসে, দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের খুলনা জেলায় প্রায় ২৫ হাজার হেক্টরে বছরে ৮০ হাজার টনের বেশি ফল হলেও বাণিজ্যিক ফল খাত গড়ে ওঠেনি। লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা, সংরক্ষণাগারের অভাব, আধুনিক প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের ঘাটতি এবং দুর্বল বাজারব্যবস্থার কারণে খুলনার ফল তখনো স্থানীয় বাজারেই আটকে ছিল। কৃষক ন্যায্যমূল্য পাচ্ছিলেন না, আর জেলা থেকে তখন পর্যন্ত কোনো ফল বিদেশে রপ্তানি হয়নি।
৪৫ প্রজাতির ফল, ৮০ হাজার টনের বেশি উৎপাদন
২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, ৪ হাজার ৩৯৪ দশমিক ৪৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের খুলনা জেলায় ২৬ লাখ ১৩ হাজার ৩৮৫ জন মানুষের বাস। জেলাটি ৯টি উপজেলায় বিভক্ত; এর দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, আর দক্ষিণাংশজুড়ে সুন্দরবন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে খুলনার বিভিন্ন উপজেলায় ২৪ হাজার ৯৮৮ দশমিক ১৬ হেক্টর জমিতে ৪৫ প্রজাতির ফলের চাষ হয় এবং মোট উৎপাদন দাঁড়ায় ৮০ হাজার ৩২২ দশমিক ২১ টন। সবচেয়ে বেশি জমিতে চাষ হয় আম: ৪ হাজার ৮৮৪ দশমিক ৬৬ হেক্টরে উৎপাদন ১২ হাজার ৯৩০ দশমিক ৩৮ টন। নারিকেল উৎপাদন হয় ১ হাজার ৮০৩ হেক্টরে ১৯ হাজার ৯২১ টন, আর কাঁঠাল ২৭২ হেক্টরে ৮ হাজার ৮৪০ টন। অন্য ফলের উৎপাদন ছিল এমন:
- পেয়ারা: ৪২২ হেক্টরে ৫ হাজার ৫৪৮ টন
- তাল: ২৮০ হেক্টরে ৮ হাজার টন
- খেজুর: ২২৯ হেক্টরে প্রায় সাড়ে ৮ হাজার টন
- তেঁতুল: ১ হাজার ৭৫৩ হেক্টরে প্রায় ৭ হাজার টন
- সুপারি: ৬৯২ হেক্টরে ১ হাজার ৯২৫ টন
- কুল: ৪৫৫ হেক্টরে ১ হাজার ৯০৮ টন
- জাম: ১১৬ হেক্টরে ১ হাজার ১২১ টন
কৃষি সংশ্লিষ্টরা জানান, সে সময় দেশি মাল্টা, ড্রাগন ফল, তরমুজ ও আম চাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছিল।

বাজার, কোল্ড চেইন ও রপ্তানির ঘাটতি
খুলনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জাগো নিউজ জানায়, জেলায় ফলের কোনো সংগঠিত সংগ্রহকেন্দ্র, পাইকারি বিপণনব্যবস্থা বা রপ্তানিযোগ্য সরবরাহ চেইন নেই। ফলে বড় বিনিয়োগকারীরা আগ্রহ দেখাননি। ইপিবির খুলনা আঞ্চলিক কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. কবির হোসেন খান বলেন, ফল দ্রুত পচনশীল পণ্য, তাই রপ্তানির জন্য আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থা, কোল্ড চেইন ও দ্রুত পরিবহন জরুরি; এসব সুবিধা ও বাণিজ্যিক উৎপাদন না থাকায় খুলনা জেলা থেকে তখনো কোনো ফল বিদেশে যায়নি।
ব্যবসায়ীরা জানান, জেলার নিজস্ব উৎপাদন সীমিত হওয়ায় মৌসুমে আম, কাঁঠাল, লিচু ও তরমুজ অন্য অঞ্চল থেকে এনে খুলনার বাজারে বিক্রি হয়। আপেল, কমলা, মাল্টার মতো বিদেশি ফলও আসে আমদানিকারকদের হাত ঘুরে। আড়তদার ইকরামুল হক জানান, তখন পর্যন্ত কোনো রপ্তানিকারকের সঙ্গে তাঁদের ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি, আর আম-কাঁঠালের মতো দ্রুত নষ্ট হওয়া ফলের জন্য খুলনায় আধুনিক সংরক্ষণাগার বা প্রসেসিং সেন্টার নেই।

লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতায় পিছিয়ে উপকূল
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক মো. আব্দুল মান্নান জাগো নিউজকে বলেন, ভৌগোলিক ও জলবায়ুগত কারণেই খুলনাঞ্চল বাণিজ্যিক ফল চাষে পিছিয়ে। ১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিন চালু হয় ১৯৯৬ সালের মার্চে। অধ্যাপক মান্নানের ব্যাখ্যায়, উপকূলীয় লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা, উঁচু ভূগর্ভস্থ পানির স্তর, ঝড় ও পোকামাকড়ে অনেক ফল পরিপক্ব হওয়ার আগেই ঝরে পড়ে, আর আম লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে না।
তিনি বলেন, নারিকেলের মতো কিছু ফল উপকূলীয় পরিবেশে ভালো হয়। উদ্ভিদবিষয়ক তথ্যসূত্রও বলে, নারিকেলগাছ বালুময় মাটিতে ভালো জন্মায় এবং লবণাক্ততা ভালোভাবে সহ্য করে। অন্যদিকে কাঁঠালগাছ জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না; টানা কয়েক দিন গোড়ায় পানি জমলে গাছ মারা যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। বাংলাদেশের জাতীয় ফল কাঁঠাল ভালো নিষ্কাশিত, আর্দ্র মাটিতে ভালো হয়। আম চাষের জন্য দরকার শুষ্ক ও উষ্ণ আবহাওয়া, যা উত্তরাঞ্চলে বেশি অনুকূল। তাঁর মতে, লবণপানি নিয়ন্ত্রণ, নদী ও পানি ব্যবস্থাপনা, আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ উদ্যোক্তা, বিনিয়োগ ও কার্যকর বাজারের সমন্বিত উদ্যোগ নিলে প্রতিকূল পরিবেশেও এ খাত শিল্পে রূপ নিতে পারে।

উদ্যোক্তা তৈরি ও পার্টনার পদ্ধতির প্রকল্প
ডিএই খুলনার উপপরিচালক নজরুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, 'খুলনা থেকে এখনো ফল রপ্তানি হয়নি। ছোট বাগান থেকে ফল রপ্তানি করা সম্ভব হয় না। বাণিজ্যিক বাগান হলে ফল রপ্তানি করা সম্ভব। আমরা এজন্য উদ্যোক্তা তৈরি করার চেষ্টা করছি।' ভালো উদ্যোক্তা তৈরি হলে সম্ভাবনাময় বাজার গড়ে উঠবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
খুলনা বিভাগীয় কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোছা. শাহনাজ বেগম জানান, বিভাগে বাণিজ্যিক উৎপাদনের জন্য পার্টনার পদ্ধতিতে প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছিল; সাতক্ষীরায় তা চলমান ছিল, আর খুলনায় কমিটি গঠনের মধ্য দিয়ে কাজ শুরু হয়েছিল। বিশ্বব্যাংকের প্রকল্প তথ্যে 'পার্টনার' (PARTNER) নামে বাংলাদেশের কৃষি খাতের একটি কর্মসূচির উল্লেখ আছে, যা ২০২৩ সালের ২৭ এপ্রিল অনুমোদন পায়; এতে বিশ্বব্যাংকের প্রতিশ্রুতি ৫৪৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর বাস্তবায়নকারী সংস্থার মধ্যে ডিএই ও কৃষি বিপণন অধিদপ্তরও রয়েছে।
ছবি: Masum Ibn Musa / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বিশ্বব্যাংক (পার্টনার কর্মসূচির প্রকল্প তথ্য), উইকিপিডিয়া (খুলনা জেলা, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, নারিকেল, কাঁঠাল)





মন্তব্য
(০)