২০২৬ সালের জানুয়ারির শুরুতে মাগুরা জেলাজুড়ে সরিষার মাঠ ছিল ফুলে ফুলে হলুদ, আর কৃষক ও জেলা কৃষি বিভাগ দুই পক্ষই বাম্পার ফলনের আশা করছিল। ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি জাগো নিউজ জেলা থেকে জানায়, মাগুরা সদর উপজেলার আবালপুর, দেড়ুয়া, পাকাকাঞ্চনপুর, সত্যপুর রাঘবদাড় ও পাটকেলবাড়ি গ্রামের দিগন্তজোড়া মাঠ সেজে উঠেছিল হলুদ চাদরে। শীতের সকালের বাতাসে সরিষা ফুল দোল খাচ্ছিল, যেন কেউ হলুদের গালিচা বিছিয়ে রেখেছে। কোনো কোনো মাঠে তখনই সরিষার ফল (শুঁটি) এসে গিয়েছিল।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) জেলা কার্যালয় জানায়, সেই মৌসুমে জেলায় ২২ হাজার ৮৯৩ হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ হয়েছিল, লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৫ হাজার ৯০ হেক্টর, এবং অনুকূল আবহাওয়ার কারণে খুব ভালো ফলনের আশা করা হচ্ছিল। প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলা কৃষকেরা মোটামুটি দুই মাসের মধ্যে ফসল ঘরে তোলার আশা করছিলেন। মাগুরায় ডিএইর উপপরিচালক জানান, সরিষা চাষে উদ্বুদ্ধ করতে কৃষকদের বিনা মূল্যে বীজ ও সার দেওয়া হয়েছিল।
চার উপজেলায় সরিষার আবাদ
জেলা কৃষি বিভাগের হিসাবে, ২২ হাজার ৮৯৩ হেক্টর সরিষার জমি ছড়িয়ে ছিল জেলার চারটি উপজেলাতেই। সবচেয়ে বেশি আবাদ হয়েছিল মাগুরা সদরে, ১০ হাজার ৪০৮ হেক্টরে। এরপর শালিখায় ৭ হাজার ৩৬০ হেক্টর, মহম্মদপুরে ৩ হাজার ৭২০ হেক্টর এবং শ্রীপুরে ১ হাজার ৪০৫ হেক্টর। বছরের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ২৫ হাজার ৯০ হেক্টর; অর্থাৎ বছরের শুরুতে আবাদ তখনো মৌসুমের জন্য কৃষি বিভাগের ঠিক করা লক্ষ্যের নিচে ছিল।
কৃষি বিভাগ জানায়, পুরো মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় তারা বাম্পার ফলনের আশা করছিল। জেলার অনেক মাঠে তখন সরিষা পুরো ফুলে, আবার কোনো কোনো মাঠে ফুল থেকে ফল আসতে শুরু করেছিল। সরিষা রবি ফসল, অর্থাৎ বর্ষার ধান কাটার পর শুষ্ক ও ঠান্ডা মাসগুলোতে এর আবাদ হয়। কৃষকেরা যে সময়ের কথা বলছিলেন, বছরের শুরুতে ফুল আর কয়েক সপ্তাহ পরে পাকা, তা শীতের সেই ফসল-পঞ্জিকার সঙ্গেই মেলে।

কৃষকেরা যা বললেন
মাগুরা সদরের নরসিংহাটি গ্রামের সরিষাচাষি জামিল মিয়া জানান, সেবার তিনি ২ বিঘা জমিতে সরিষা আবাদ করেছিলেন। তিনি বলেন, 'এ চাষে খরচ কম, পরিশ্রম নেই। এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় সরিষা খুব ভালো হয়েছে। আমার জমিতে এখন সরিষার ফল আসতে শুরু করেছে। আমি দুই মাসের মধ্যেই সরিষা ঘরে তুলতে পারবো বলে মনে করছি।'
ছয়চার গ্রামের কৃষক শফিকুল ১ বিঘা জমিতে সরিষা আবাদ করেছিলেন। তিনি বলেন, 'এই চাষে প্রতিবারই ভালো ফল পেয়ে থাকি। গত বছরের তুলনায় এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আমার জমিতে সরিষার ভালো ফলন হবে বলে আশা রাখছি।'
চাউলিয়া ইউনিয়নের বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের নাজিম উদ্দিন আবাদ করেছিলেন ৩ বিঘা জমিতে। তিনি বলেন, 'মাঠে মাঠে হলুদ ফুল শোভা পাচ্ছে। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ফুল থেকে ফল আসতে শুরু করবে। তারপর দেড় থেকে দুই মাসের মধ্যে সরিষা পাকতে শুরু করবে।'
কৃষকেরা যে বিঘার হিসাবে জমির কথা বলছিলেন, সেটি গ্রামবাংলার প্রচলিত জমির মাপ; ২০২৩ সালে সরকারের একটি প্রণোদনা কর্মসূচির খবরে দ্য ডেইলি স্টার এক বিঘাকে মোটামুটি এক একরের তিন ভাগের এক ভাগ বলে উল্লেখ করেছিল। তিন কৃষকই আশার কারণ হিসেবে আবহাওয়ার কথা বলেছিলেন, আর তাঁদের দুজনের হিসাবে ফসল তোলা তখন মোটামুটি দুই মাস দূরে।
বিনা মূল্যে বীজ ও সার, কৃষি বিভাগের প্রত্যাশা
মাগুরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. তাজুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, 'এই বছর আবহাওয়া ও পরিবেশ অনুকূলে থাকায় সরিষার বাম্পার ফলন হবে। তীব্র শীত, কুয়াশা ও শৈত্যপ্রবাহে সরিষার তেমন ক্ষতি হবে না। চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে বিনা মূল্যে বীজ ও সার বিতরণ করা হয়েছে।' জেলায় কতজন কৃষক এই উপকরণ পেয়েছিলেন বা প্রত্যেকে কতটা পেয়েছিলেন, তা তিনি জানাননি।
সেই শরতে রবি মৌসুমের জন্য সরকারের কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় বহু জেলায় এ ধরনের বিনা মূল্যের উপকরণ দেওয়া হয়েছিল, যার অর্থ এসেছিল ২০২৫-২৬ অর্থবছরের কৃষি পুনর্বাসন সহায়তা খাতের বরাদ্দ থেকে। যেমন শেরপুরের নালিতাবাড়ীতে উপজেলা কৃষি কার্যালয় ২০২৫ সালের ১ নভেম্বর ৩ হাজার ৪৪০ জন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের জন্য বিতরণ শুরু করে। খবর সংযোগ পরদিন জানায়, তাঁদের মধ্যে ৩ হাজার ২০০ জনের প্রত্যেকের পাওয়ার কথা ছিল ১ কেজি সরিষা বীজ, ১০ কেজি ডিএপি সার ও ১০ কেজি এমওপি সার। সেখানে বাকি কৃষকদের দেওয়া হয়েছিল গম, শীতকালীন পেঁয়াজ ও মসুরের প্যাকেজ।
এই কর্মসূচি আগের বছরগুলোর ধারাবাহিকতাতেই চলছিল। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে কৃষি মন্ত্রণালয় রবি মৌসুমের ১০টি ফসলের জন্য ১৮৮ কোটি ৪৯ লাখ টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করে: গম, ভুট্টা, সরিষা, সূর্যমুখী, চিনাবাদাম, সয়াবিন, শীতকালীন পেঁয়াজ, মুগ, মসুর ও খেসারি। মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত বাজেটের কৃষি পুনর্বাসন সহায়তা এবং বীজ ও চারা খাত থেকে এটি ৬৪ জেলার ১৯ লাখ ৫৩ হাজার ৭০০ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষককে বিনা মূল্যে দেওয়ার কথা ছিল। দ্য ডেইলি স্টার জানায়, একজন কৃষক ১০টি ফসলের যেকোনো একটির জন্য এক বিঘা জমির সহায়তা পেতে পারতেন, আর সরিষা বা সূর্যমুখীর প্যাকেজে ছিল ১ কেজি বীজ।
মাগুরা জেলা ও তার কৃষিজমি
মাগুরা দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমে খুলনা বিভাগের একটি জেলা। এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ প্রকাশিত জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়ার হিসাবে জেলার আয়তন ১ হাজার ৩৯.১০ বর্গকিলোমিটার, অবস্থান ২৩°১৫' থেকে ২৩°৪১' উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৯°১৫' থেকে ৮৯°৪২' পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে। এর উত্তরে রাজবাড়ী জেলা, দক্ষিণে যশোর ও নড়াইল জেলা, পূর্বে ফরিদপুর জেলা এবং পশ্চিমে ঝিনাইদহ জেলা।
জেলায় উপজেলা চারটি, কৃষি কার্যালয়ের সরিষার হিসাবেও এই চারটিরই নাম আছে: মাগুরা সদর, আয়তন ৪০১.৫৮ বর্গকিলোমিটার; মহম্মদপুর, ২৩৩.৭০ বর্গকিলোমিটার; শালিখা, ২২৮.৬৫ বর্গকিলোমিটার; এবং শ্রীপুর, ১৭৫.১৫ বর্গকিলোমিটার। বাংলাপিডিয়ার তালিকায় জেলায় একটি পৌরসভা, ৩৬টি ইউনিয়ন, ৫১৩টি মৌজা ও ৭১১টি গ্রাম রয়েছে। প্রধান নদী গড়াই-মধুমতী, নবগঙ্গা ও কুমার।
মাগুরা মহকুমা হয় ১৯৪৫ সালে, আর জেলা হয় ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জেলার জনসংখ্যা ছিল ৯ লাখ ১৮ হাজার ৪১৯, প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৮৮৪ জন। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে জেলার আয়ের প্রধান উৎস কৃষি, যার অংশ ৬৬.৩ শতাংশ; তাই প্রতিবেদনে নাম আসা গ্রামগুলোর মতো অসংখ্য পরিবারের কাছে রবি ফসলের ফলন বড় বিষয়।
আগের মৌসুমগুলোতে মাগুরার সরিষা
কয়েক বছর ধরেই মাগুরায় সরিষার আবাদ বাড়ছিল, আর জেলা থেকে আগের প্রতিবেদনগুলোতেও অনুকূল আবহাওয়া ও সরকারি সহায়তার একই রকম চিত্র উঠে এসেছিল। ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস জানায়, মাগুরায় প্রায় ২০ হাজার কৃষক উচ্চফলনশীল সরিষা চাষ করছিলেন। জেলার ডিএইর এক কর্মকর্তা পত্রিকাটিকে বলেন, মাগুরার মাটি ও আবহাওয়া সরিষা চাষের উপযোগী এবং বিভাগ চাষিদের বীজ ও প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। সদর উপজেলার কুল্লিয়া গ্রামের এক কৃষক জানান, আগের বছর ২ বিঘা জমি থেকে তিনি ৩৫ হাজার টাকা আয় করেছিলেন এবং সে মৌসুমে ৪ বিঘায় আবাদ করেছিলেন; কচুন্দি গ্রামের এক কৃষক বলেন, চাষিরা একদিকে বাম্পার ফলন পাচ্ছেন, অন্যদিকে ন্যায্য দামও পাচ্ছেন।
তিন বছর পর, ২০২১ সালের জানুয়ারিতে একই পত্রিকা জানায়, ডিএইর হিসাবে জেলায় ১৩ হাজার ৩১০ হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ হয়েছিল এবং উৎপাদনের প্রাক্কলন ছিল ১৮ হাজার ৬৩৪ টন। বিভাগটি ৯ হাজার ২০০ সরিষাচাষির প্রত্যেককে ২০ কেজি এমওপি, ১০ কেজি ডিএপি ও ৫ কেজি বীজ দিয়েছিল। তখনকার উপপরিচালক বলেছিলেন, বীজ, সার ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং আগের সপ্তাহের আবহাওয়া বাম্পার ফলনে সহায়ক হবে। দেফুলিয়া গ্রামের এক কৃষক তাঁর ২ বিঘা জমি থেকে প্রায় ১২ মণ ফলনের আশা করছিলেন।
২০২৬ সালের শুরুতে জানানো ২২ হাজার ৮৯৩ হেক্টর আবাদ ছিল ২০২১ সালের জানুয়ারিতে জানানো ১৩ হাজার ৩১০ হেক্টরের চেয়ে অনেক বেশি, আর ২৫ হাজার ৯০ হেক্টরের লক্ষ্যমাত্রা দেখায় যে কৃষি বিভাগ আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা করছিল।
সরিষা, তোরি আর স্বল্পমেয়াদি জাত
বাংলাপিডিয়া সরিষাকে বর্ণনা করেছে ক্রুসিফেরি পরিবারের এমন সব বীরুৎ হিসেবে, যাদের বীজ থেকে তেল মেলে; যেমন ব্রাসিকা ন্যাপাস (রেপ) ও ব্রাসিকা নাইগ্রা (কালো সরিষা)। মাত্র কয়েক দশক আগেও বাংলাদেশে রান্নার একমাত্র তেল ছিল সরিষার তেল। অনেক জায়গায় এখনো ঘানি নামের প্রচলিত কলে বীজ পিষে তেল বের করা হয়, যা দিনের দীর্ঘ সময় ধরে একটি বলদ টানে; এই পেশার মানুষকে বলা হয় কলু। এখন বেশির ভাগ সরিষার তেল বের করা হয় বৈদ্যুতিক কলে। দেশের প্রায় সব জেলাতেই রবি ফসল হিসেবে সরিষার চাষ হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ (ইউএসডিএ) উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশের কৃষকেরা রেপসিড ও আসল সরিষা দুটোকেই সাধারণ কথায় 'সরিষা' বলেন। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ঢাকা ট্রিবিউনের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো তখন পর্যন্ত ২০টির বেশি জাত অবমুক্ত করেছিল। প্রচলিত রেপসিড বা তোরি ধরনের জাতের মধ্যে ছিল টরি-৭, এসএস-৭৫ এবং বারি সরিষা-৬ থেকে ৮, আর আসল সরিষার মধ্যে রাই-৫, দৌলত, সম্বল এবং বারি সরিষা-১০, ১২ ও ১৬। একই প্রতিবেদনে উদ্ধৃত একজন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দেশে সরিষার গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ১.৩ টন বলে জানান।

সরিষার আবাদ বাড়ার বড় কারণ দুই ধানের মাঝের ফাঁকা সময়ে খাপ খায় এমন স্বল্পমেয়াদি জাত। বাসস ও দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসে ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, রংপুরের বুড়িরহাটে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) এক মাঠ দিবসে বারির বিজ্ঞানীরা বারি সরিষা-১৪-কে স্বল্পমেয়াদি উচ্চফলনশীল জাত হিসেবে বর্ণনা করেন, যা মোটামুটি ৭৫ থেকে ৮০ দিনে পাকে এবং হেক্টরপ্রতি প্রায় ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ কেজি ফলন দেয়। তাঁরা বলেন, রোপা আমন ও বোরো ধানের মাঝে যে জমি পতিত পড়ে থাকে, সেখানে আমন, সরিষা, বোরো এই ক্রমে জাতটি চাষ করা যায়।
পাশের জেলা ফরিদপুরে সিরিয়াল সিস্টেমস ইনিশিয়েটিভ ফর সাউথ এশিয়া ইন বাংলাদেশের (সিসা-বিডি) একটি প্রদর্শনী, যার খবর ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত হয়, দেখিয়েছিল সময় কেন গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে ডিসেম্বরে আমন কাটা আর ফেব্রুয়ারিতে বোরো রোপণের মাঝে জমি সাধারণত প্রায় দুই মাস ফাঁকা পড়ে থাকত। স্বল্পমেয়াদি আমন জাত চাষ করে, আর ধান কাটার ঠিক আগে ভেজা জমিতে সরিষার বীজ ছিটিয়ে দিয়ে মাটিতে থেকে যাওয়া রস কাজে লাগিয়ে অন্তত ২০ দিন সময় বাঁচানো গিয়েছিল। ফরিদপুর সদর ও নগরকান্দা উপজেলার ৩৪ জন কৃষকের জমিতে সেই প্রদর্শনীতে বারি সরিষা-১৪ ৮০ দিনে হেক্টরপ্রতি ০.৯৪ টন দানা দিয়েছিল, যা পরীক্ষিত সরিষা জাতগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভালো।
মাগুরার কৃষকেরাও একই ফসল-পঞ্জিকার কথা বলছিলেন: বছরের শুরুতে ফুল, তার পরপরই ফল, আর মোটামুটি দুই মাসের মধ্যে ফসল তোলা, যাতে পরের ফসলের জন্য জমি সময়মতো খালি হয়।
শীত, কুয়াশা ও ফসলের রোগবালাই
উপপরিচালক যে বলেছিলেন তীব্র শীত, কুয়াশা ও শৈত্যপ্রবাহে সরিষার তেমন ক্ষতি হবে না, তা ছিল ভরা শীতে সরিষাচাষিদের প্রধান দুশ্চিন্তার জবাব। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে এক শৈত্যপ্রবাহের সময় কৃষি মন্ত্রণালয় ফসল রক্ষায় কৃষকদের পরামর্শ দিয়েছিল। সরিষার ক্ষেত্রে সেখানে সতর্ক করা হয় যে অলটারনারিয়া ব্লাইট রোগ দেখা দিতে পারে, এবং রোগ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনুমোদিত মাত্রায় ইপ্রোডিয়ন গোত্রের ছত্রাকনাশক ১০ থেকে ১২ দিন পর পর ৩ থেকে ৪ বার স্প্রে করার পরামর্শ দেওয়া হয়। বালাইনাশক ও তার অনুমোদিত মাত্রা ভিন্ন ভিন্ন হয় বলে যেকোনো স্প্রের আগে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কাছ থেকে নিশ্চিত হয়ে নেওয়াই ভালো।
অলটারনারিয়া ব্লাইট হয় অলটারনারিয়া গণের ছত্রাক থেকে। এর একটি, অলটারনারিয়া ব্রাসিকি, রেপসিড, বাঁধাকপি ও ব্রকলিসহ প্রায় সব ব্রাসিকা প্রজাতিকে আক্রমণ করতে পারে; কচি চারায় এটি গোড়া পচা বা ড্যাম্পিং অফ এবং বড় গাছের পাতায় দাগ সৃষ্টি করে।
ফসলের আরেক পরিচিত শত্রু সরিষার জাব পোকা (লিপাফিস এরিসিমি), যাকে শালগমের জাব পোকাও বলা হয়। এটি কেবল কপি গোত্রের গাছেই খায়, ফসল ও বুনো সরিষার মতো আগাছা দুটোতেই, এবং শালগম মোজাইক ও ফুলকপি মোজাইক ভাইরাসসহ অন্তত ১০টি উদ্ভিদ ভাইরাস ছড়াতে পারে। ডানাহীন একটি স্ত্রী পোকা ২০ থেকে ৪০ দিনে প্রায় ৮০ থেকে ১০০টি বাচ্চা দিতে পারে, তাই পোকার কলোনি দ্রুত বাড়ে। ফুলের মাথায় বা কচি শুঁটিতে জাব পোকার কলোনি দেখলে দমনের বিষয়ে উপজেলা কৃষি কার্যালয়ের পরামর্শ নেওয়ার কথা বলা হয়।

সরিষাখেতের মৌমাছি ও মধু
হলুদ মাঠ থেকে আসে আরেকটি ফসলও। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে দ্য ডেইলি স্টারে উদ্ধৃত বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) মৌচাষ প্রকল্পের সাবেক প্রধানের হিসাবে, দেশে বছরে প্রায় ১০ হাজার টন মধু উৎপাদিত হয়, যার বেশির ভাগ নভেম্বর থেকে এপ্রিলের মধ্যে, আর এর প্রায় ৮০ শতাংশ সংগ্রহ হয় সরিষার মৌসুমে। নর্থ বেঙ্গল বিকিপার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি পত্রিকাটিকে বলেন, সরিষার ফুল থাকে ৪০ থেকে ৬০ দিন, যা অন্য যেকোনো ফসলের চেয়ে বেশি; এ কারণেই মৌচাষিরা তাঁদের মৌবাক্স সরিষাখেতে নিয়ে যান।
বিসিকের ওই সাবেক প্রকল্পপ্রধান বলেন, সরিষাখেতে মৌমাছি পালন করলে বিঘাপ্রতি ফলন ১৫ শতাংশ বাড়ে, এবং যে কৃষকেরা আগে ফলন কমার ভয়ে মৌচাষিদের খেতে ঢুকতে দিতেন না, তাঁদের অনেকে মত বদলেছেন। এক কৃষক পত্রিকাটিকে জানান, এক বিঘা জমি মৌচাষিদের ব্যবহার করতে দেওয়ার পর তাঁর ফলন বিঘাপ্রতি ৪ থেকে সাড়ে ৪ মণ থেকে বেড়ে সাড়ে ৬ মণ হয়েছিল। সরিষাখেত থেকে মৌসুমজুড়ে মৌচাষিরা এরপর যান ধনিয়া, কালিজিরা ও লিচুর বাগানে।

সরিষা ও দেশের ভোজ্যতেল
বিনা মূল্যে বীজ দেওয়া আর সরিষার আবাদ বাড়ানোর চেষ্টার পেছনে আছে আমদানি করা রান্নার তেলের ওপর দেশের নির্ভরতা। ২০২৩ সালের মে মাসে কৃষি মন্ত্রণালয় ডিএইর তথ্য উদ্ধৃত করে জানায়, সে বছর ৮ লাখ ১২ হাজার হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ হয়েছিল, আগের বছর যা ছিল ৬ লাখ ১০ হাজার হেক্টর, আর উৎপাদন ৮ লাখ ২৪ হাজার টন থেকে বেড়ে হয়েছিল ১১ লাখ ৫২ হাজার টন। মন্ত্রণালয়ের হিসাবে দেশে বছরে ভোজ্যতেলের চাহিদা প্রায় ২৪ লাখ টন, যার মধ্যে প্রায় ৩ লাখ টন বা ১২ শতাংশ আসে দেশে উৎপাদিত সরিষা, তিল ও সূর্যমুখী থেকে; বাকিটা আমদানি করতে হয়।
মন্ত্রণালয় তখন জানায়, তিন বছরের একটি পরিকল্পনার লক্ষ্য ছিল ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মধ্যে দেশের ভোজ্যতেলের চাহিদার ৪০ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ১০ লাখ টন, দেশেই উৎপাদন করা, যাতে আমদানিতে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হয়।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ঢাকা ট্রিবিউন ডিএইর তথ্য উদ্ধৃত করে জানায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১৩ লাখ ৪০ হাজার হেক্টর জমিতে তেলবীজ আবাদ হয়েছিল এবং উৎপাদন হয়েছিল প্রায় ১৮ লাখ ৩০ হাজার টন, যা আগের বছরের চেয়ে যথাক্রমে ৩১ শতাংশ ও ২৯ শতাংশ বেশি; এই বৃদ্ধির মূল কারণ দেশের সবচেয়ে বড় তেলবীজ ফসল সরিষার আবাদ বাড়া। একই প্রতিবেদনে ভোজ্যতেলের চাহিদা প্রায় ৩০ লাখ টন বলা হয়, যার প্রায় ৭৫ শতাংশ সয়াবিন ও পাম তেল, এবং ভোজ্যতেল আমদানিতে বছরে ব্যয় হয় ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি।
ছবি: Hopeoflight / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪ (১ জানুয়ারি ২০২৬), বাংলাপিডিয়া (এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ: মাগুরা জেলা; সরিষা), দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস (৬ জানুয়ারি ২০১৮, ১ জানুয়ারি ২০২০ ও ৮ জানুয়ারি ২০২১), দ্য ডেইলি স্টার (৭ জানুয়ারি ২০২১), দ্য ডেইলি স্টার বাংলা (১ মে ২০২৩ ও ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩), দেশ রূপান্তর (১৫ জানুয়ারি ২০২৪), ঢাকা ট্রিবিউন (২৫ জানুয়ারি ২০২৫), খবর সংযোগ (২ নভেম্বর ২০২৫), সিসা (২ জানুয়ারি ২০১৪), উইকিপিডিয়া (লিপাফিস এরিসিমি; অলটারনারিয়া ব্রাসিকি)





মন্তব্য
(০)