কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলের কৃষকেরা কয়েক বছর ধরে ধানের পাশাপাশি ভুট্টা চাষে ঝুঁকছেন। জাগো নিউজ ২৪ ২০২৫ সালের ৯ এপ্রিল জানায়, সেবারের রবি মৌসুমে জেলায় ভুট্টার আবাদ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ১২ হাজার ২১০ হেক্টরে পৌঁছায় এবং ফলন ভালো হয়। কৃষকেরা বলেন, ভুট্টায় খরচ কম, লাভ বেশি এবং বর্ষার আগেই ফসল ঘরে তোলা যায় বলে আগাম বন্যার ঝুঁকিও কম। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) তখন বলে, এ অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতে ভুট্টা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে আবাদ
ডিএইর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ মৌসুমে কিশোরগঞ্জে ১২ হাজার ১০০ হেক্টর জমিতে ভুট্টা আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল; আবাদ হয় ১২ হাজার ২১০ হেক্টরে। সবচেয়ে বেশি চাষ হয় চার উপজেলায়: নিকলীতে ৩ হাজার ১১০ হেক্টর, মিঠামইনে ২ হাজার ৮৮০ হেক্টর, বাজিতপুরে ২ হাজার ১০ হেক্টর এবং অষ্টগ্রামে ৯৮০ হেক্টর।
এই বিস্তার কয়েক বছর ধরেই চলছিল। রাইজিংবিডি ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে জানিয়েছিল, মিঠামইন উপজেলায় ২০২১ সালে ১ হাজার ৯৬০ হেক্টরে ভুট্টার আবাদ হয়েছিল, আর ২০২২ সালে তা বেড়ে ২ হাজার ১৩৫ হেক্টরে দাঁড়ায়। সেবার উপজেলা কৃষি অফিস উঁচু ও পতিত জমিতে ভুট্টা চাষে কৃষকদের উৎসাহ দিচ্ছিল।
২০২৫ সালের এপ্রিলে মাঠে ফলন ভালো হওয়ায় উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশা করছিলেন কৃষকেরা। পাইকারেরা তখন মাঠ থেকেই প্রতি মণ ভুট্টা ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ টাকায় কিনছিলেন।

হাওরে কেন ভুট্টা
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, হাওর হলো বাটির মতো বিশাল নিচু জলাভূমি, যা বর্ষায় নদী ও খালের পানিতে বিস্তীর্ণ জলাশয়ে পরিণত হয় এবং বর্ষার পরে বেশির ভাগ অংশ শুকিয়ে যায়। বৃহত্তর সিলেট ও বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের এই সমভূমি বছরে প্রায় সাত-আট মাস পানির নিচে থাকে। শুকনো মৌসুমে এর উর্বর পলিমাটিতে প্রধানত ধানের চাষ হয়।
হাওরের কৃষকেরা বহুকাল ধরে ধান চাষ করে জীবিকা চালালেও আবহাওয়া প্রতিকূল হলে লাভ হতো সামান্য, আর আগাম বন্যায় ফসল হারানোর ঝুঁকি থাকত। দেশের পোলট্রি ও ফিড মিল খাতে ভুট্টার চাহিদা বাড়ার পর অনেকে ভুট্টা চাষে নতুন সম্ভাবনা দেখেন।
কিশোরগঞ্জ ডিএইর উপপরিচালক ড. মো. সাদিকুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, 'হাওরের নিরাপদ ফসল হিসেবেই ভুট্টা চাষে ঝুঁকছেন কৃষকেরা। হাওরে আগাম বন্যা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ভুট্টা চাষ করলে আগাম বন্যার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।' তিনি জানান, ভালো দাম ও চাহিদার কারণে হাওরাঞ্চলে ভুট্টা জনপ্রিয় হচ্ছে এবং বীজ নির্বাচন, সার ব্যবস্থাপনা থেকে রোগবালাই দমন পর্যন্ত মাঠপর্যায়ে কৃষকদের প্রযুক্তিগত পরামর্শ দিয়েছে ডিএই।

কৃষকের অভিজ্ঞতা
মিঠামইন উপজেলার কৃষক আব্দুর রহিম বলেন, 'বন্যায় আমাদের হাওরাঞ্চলে ধান চাষে ঝুঁকি থাকলেও ভুট্টা চাষে তেমন ঝুঁকি নেই। কারণ বর্ষা আসার আগেই আমরা ভুট্টার ফলন ঘরে তুলতে পারি। এ ছাড়া ভুট্টা চাষে ধান চাষের চেয়ে খরচ কম হয় কিন্তু লাভ বেশি হয়।'
কৃষক শরিফ উদ্দিন জানান, তাঁর উঁচু জমিগুলো আগে পতিত পড়ে থাকত; সেখানে ভুট্টা চাষ করে ভালো ফলন পেয়েছেন। তাঁর ভাষায়, 'যদি দরদাম ঠিক থাকে, তাহলে লাভবান হবো। কৃষি অফিস থেকেও আমরা ভুট্টা চাষে সহযোগিতা পেয়েছি।'
ইটনা হাওরের কৃষক নাজিম উদ্দিন বলেন, ভুট্টা থেকে তাঁদের তিনভাবে লাভ হয়: দানা বিক্রি, কাঁচা পাতা গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে খাওয়ানো এবং গাছ শুকিয়ে লাকড়ি হিসেবে ব্যবহার। স্থানীয়রা অবশ্য বলেন, বাজারজাতকরণে কৃষকের স্বার্থ নিশ্চিত করা গেলেই ভুট্টা তাঁদের জন্য প্রকৃত সুফল বয়ে আনবে।

পশুখাদ্য শিল্পের চাহিদা ও দেশের প্রেক্ষাপট
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) বৈদেশিক কৃষি সেবার ঢাকা দপ্তর ২০২৪ সালের ৯ এপ্রিলের প্রতিবেদনে জানায়, আবাদি জমি ও উৎপাদনের দিক থেকে ধানের পরেই ভুট্টা বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম দানাশস্য। দেশে উৎপাদিত ভুট্টার প্রায় ৯০ শতাংশ যায় পশুখাদ্য শিল্পে। মোট উৎপাদনের প্রায় ৮৫ শতাংশ আসে শীতকালীন মৌসুম থেকে, যার বীজ নভেম্বর-ডিসেম্বরে বোনা হয় এবং ফসল তোলা হয় মার্চ-এপ্রিলে। প্রতিবেদনে ২০২৩-২৪ বিপণন বছরে দেশে ভুট্টার আবাদ ৬ লাখ ২০ হাজার হেক্টর ও উৎপাদন ৫৪ লাখ টন ধরা হয়।
একই প্রতিবেদনে বলা হয়, একই মৌসুমে বোরো ধান ও সবজির চেয়ে ভুট্টায় উপকরণ খরচ কম, আর নদীতীর ও চরের জমিতে অন্য ফসলের তুলনায় ভালো ফলন দেয় বলে সেখানে ভুট্টা জনপ্রিয় হচ্ছে। দ্য ডেইলি স্টার বাংলা ২০২৩ সালের মে মাসে ডিএইর বরাতে জানায়, ২০১১-১২ অর্থবছরে দেশে ৪ লাখ ৮৭ হাজার একর জমিতে ভুট্টা চাষ হয়েছিল, আর ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা ১৪ লাখ একর ছাড়িয়ে যায়।
ছবি: Reaid Hossain / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, ইউএসডিএ বৈদেশিক কৃষি সেবা (গ্রেইন অ্যান্ড ফিড অ্যানুয়াল, বাংলাদেশ, ২০২৪), দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, রাইজিংবিডি, বাংলাপিডিয়া




মন্তব্য
(০)