২০২৬ সালের জুনের মাঝামাঝি, আমের মৌসুমের শেষভাগে এসেও পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জেলা রাঙ্গামাটির বাজারগুলো আমে ভরপুর ছিল। জাগো নিউজ ২৪ ওই বছরের ১৬ জুন জানায়, ফলন ভালো হওয়ায় ক্রেতারা সস্তায় আম পাচ্ছেন; অন্যদিকে চাষিরা বলছেন, যে দাম মিলছে তাতে বাগান তৈরি ও পাহাড় থেকে আম বের করে আনার খরচই উঠছে না।
জেলা শহর ছাড়াও উপজেলাগুলোতে তখন পাহাড়ের মাটিতে উৎপাদিত আম্রপালি, রাংগুই, ব্যানানা ম্যাঙ্গো, বারি আম-৪, হাড়িভাঙ্গা ও কাটিমন জাতের আম বিক্রি হচ্ছিল। প্রতিবেদন অনুযায়ী, শহরের তুলনায় উপজেলার বাজারগুলোতে এসব আম আরও কম দামে মিলছিল।
বেশি জমিতে বড় ফলন
রাঙ্গামাটি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, ২০২৪-২৫ মৌসুমে জেলায় তিন হাজার ৬২৫ হেক্টর জমিতে ৩৮ হাজার ২৮৫ টন আম উৎপাদন হয়েছিল। ২০২৫-২৬ মৌসুমে আবাদ বেড়ে দাঁড়ায় তিন হাজার ৬৩৫ হেক্টরে। পাহাড়ের ঢাল ও অনুকূল আবহাওয়ার কারণে ২০২৬ সালে ফলন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছিল অধিদপ্তর।
দেশীয় জাতের পাশাপাশি রাঙ্গামাটিতে তখন রাংগুই (মিয়ানমারের জাত), আম্রপালি (ভারতের জাত), বারি আম-৪, মিয়াজাকি, ব্যানানা ম্যাঙ্গো, ব্রুনাই কিং ও কাটিমনের মতো পরিচিত ও দামি বিদেশি জাতের বাণিজ্যিক বাগান গড়ে উঠছিল। প্রতিবেদনে আম্রপালিকে সবচেয়ে সুস্বাদু বলা হয়; এই আম মৌসুমের শেষভাগে বাজারে আসে বলে তখন এর চাহিদাই থাকে সবচেয়ে বেশি।
পাহাড়ে আম চাষের এই বিস্তার কয়েক বছর ধরেই চলছিল। ২০২১ সালের জুনে দৈনিক ইত্তেফাক "পাহাড়ে আম বিপ্লব" শিরোনামের প্রতিবেদনে সে বছরের হিসাব দিয়েছিল: তিন পার্বত্য জেলায় ১৩ হাজার ৩৪২ হেক্টর জমিতে আম, উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা এক লাখ ৫১ হাজার টন। এর মধ্যে রাঙ্গামাটিতে দুই হাজার ৩৯২ হেক্টর জমি ও ২৬ হাজার ৩১২ টনের লক্ষ্যমাত্রা, খাগড়াছড়িতে তিন হাজার ৩৬৯ হেক্টর ও প্রায় ৩৫ হাজার টন, আর সবচেয়ে বেশি বাগান ও বড় কৃষি-খামার বাগানের জেলা বান্দরবানে সাত হাজার ৫৮১ হেক্টর ও প্রায় ৯০ হাজার টন।
একই প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাহাড়ে আম্রপালির চাষ শুরু হয় ১৯৯৮-৯৯ সালে কালিকাপুর মডেল প্রকল্পের মাধ্যমে; পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড তখন বিনামূল্যে চারা ও সার দিয়েছিল। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের তৎকালীন অতিরিক্ত উপপরিচালক মো. নাসির উদ্দিন চৌধুরী পত্রিকাটিকে বলেছিলেন, "ভালো ফলন ও অধিক লাভজনক হওয়ায় পাহাড়ের মানুষ আম চাষে ঝুঁকে পড়েছে।" বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. জুলফিকার আলী ফিরোজ বলেছিলেন, পাহাড়ের মাটি ও আবহাওয়া অনেক জাতের আমের উপযোগী; কৃষক যেন ন্যায্য দাম পান এবং আম কম পচে, সে জন্য তিনি প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা ও হিমাগারের প্রয়োজনের কথা বলেছিলেন।
২০১৯ সালে ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব সাসটেইনেবল অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চে প্রকাশিত মো. জহুরুল ইসলামের এক গবেষণায় পার্বত্য চট্টগ্রামের ৪৫৯ জন ফলচাষির তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। তাতে দেখা যায়, সেখানে সবচেয়ে বেশি লাগানো আমের জাত রাংগুই: ৭৮ শতাংশ চাষির বাগানে এই জাত ছিল, দ্বিতীয় স্থানে আম্রপালি, ৩৬ শতাংশ। আম, কাঁঠাল ও লিচু তিন ফলেই চাষিদের বিক্রয়যোগ্য উদ্বৃত্ত প্রকৃত বিক্রির চেয়ে বেশি ছিল। বাজারের সঙ্গে চাষিদের টেকসই যোগাযোগে যেসব বাধা, গবেষণাটি সেগুলোকে চার ভাগে ভাগ করেছিল: বিপণন, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত।
বনরুপা বাজারে আমের দাম
২০২৬ সালের জুনে রাঙ্গামাটি শহরের বনরুপা বাজারে ফল বিক্রেতারা কম দামে আম বিক্রি করছিলেন। সেখানকার মৌসুমি ফল বিক্রেতা কাঞ্চন চাকমা জাগো নিউজকে বলেন, 'এ বছর ফলন ভালো হওয়াতে সস্তায় বিক্রি করছি আম্রপালি ও রাংগুই জাতের আম। তিন কেজি আম মাত্র ১০০ টাকায় পাবেন আমার কাছে। তবে কেউ যদি বেশি নেয় তখন আরও কিছু কমেও দিয়ে দেবো। গত চার বছর যাবৎ বিভিন্ন বাজারে মৌসুমি ফলের ব্যবসা করি। এ বছর আম সব চাইতে সস্তায় পাওয়া যাচ্ছে।'
একই বাজারের পুরোনো ফল ব্যবসায়ী বিন্দু মজুমদার জানান, তিনি বাজারের বাছাই করা সেরা আমটাই বিক্রি করেন, স্থায়ীভাবে এখানে বসে ব্যবসা করেন এবং কোনো আম খারাপ হলে ফেরতও নেন; তাই তাঁর দোকানে দাম তুলনামূলক বেশি। তাঁর দোকানে তখন আম্রপালি, বারি-৪ ও হাড়িভাঙ্গা প্রতি কেজি ৬০ টাকা এবং ব্যানানা ম্যাঙ্গো ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল।
আরেক খুচরা বিক্রেতা দয়ালাল চাকমা বাজারের ফুটপাতে শুধু ব্যানানা ম্যাঙ্গো নিয়ে বসেছিলেন। তিনি বলেন, 'এই জাতের আম এখন প্রচুর চাষ হচ্ছে। গত বছরের তুলনায় অর্ধেকে নেমেছে ব্যানানা আমের দাম। আগামী বছর হয়ত আরো কমে যাবে। বর্তমানে মাত্র ৮০ টাকা কেজিতে বিক্রি করছি ব্যানানা ম্যাঙ্গো।'
সমতা ঘাট: পাহাড়ের ফলের পাইকারি হাট
বনরুপা বাজারের সমতা ঘাট এলাকায় প্রায় প্রতিদিনই মৌসুমি ফলের হাট বসে। এখান থেকে স্থানীয় খুচরা বিক্রেতারা তো বটেই, পাইকারি ব্যবসায়ীরাও ফল কিনে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের আড়তে নিয়ে যান। পাহাড়ের আম বহু বছর ধরেই এ পথে যায়: ২০২১ সালের ইত্তেফাকের প্রতিবেদনেও বলা হয়েছিল, ঢাকা, চট্টগ্রাম, ফেনী ও কুমিল্লার পাইকাররাই পার্বত্য জেলাগুলোর বেশির ভাগ আম কেনেন, আর সে বছর পাহাড়ের আম অনলাইনেও বিক্রি শুরু হয়েছিল।
সমতা ঘাটের পাইকারি ব্যবসায়ী জিয়া উদ্দিন বাবলু জাগো নিউজকে বলেন, পাহাড়ে আমের উৎপাদন বেশি হওয়ায় ২০২৬ সালে দাম অনেক কম। তিনি বিভিন্ন মৌসুমি ফলের ব্যবসা করেন; এই বাজার থেকে ফল কিনে আড়তে নিয়ে বিক্রি করেন। প্রতিবেদনের সময় সেখানে হাড়িভাঙ্গা আম প্রতি মণ এক হাজার থেকে এক হাজার ৬০০ টাকা, আম্রপালি এক হাজার থেকে এক হাজার ৪০০ টাকা এবং রাংগুই ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। ফলের ব্যবসায় প্রচলিত ওজনের একক মণ প্রায় ৩৭ কেজি, ২০২১ সালে আমের দাম নিয়ে এক প্রতিবেদনে দ্য ডেইলি স্টার এভাবেই ব্যাখ্যা করেছিল।
তুলনার জন্য, ২০২১ সালের ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে খাগড়াছড়িতে ভালো মানের আম্রপালি খুচরা প্রতি কেজি ৫৫ থেকে ৬০ টাকা এবং পাইকারি ৪৫ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রির কথা বলা হয়েছিল।

চাষিরা বলছেন, এই দামে খরচ ওঠে না
চাষি পর্যায়ে তখন হতাশা বিরাজ করছিল। চাষিরা জাগো নিউজকে বলেন, বাগান তৈরি ও ফলন পর্যন্ত নিয়ে যেতে খরচ অনেক; তার সঙ্গে পরিবহন খরচ যোগ করলে ক্ষতি ছাড়া লাভের মুখ দেখা যায় না। অন্যান্য জাতের সঙ্গে পাহাড়ের মাটিতে রাংগুই জাতের আমের ফলন ভালো হয়, কিন্তু এই আম তখন পাইকারি মাত্র ১০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছিল; চাষিদের ভাষ্য, এতে উৎপাদন খরচই উঠছে না।
লংগদু উপজেলার কৃষক সাধন বিকাশ চাকমা বলেন, 'দুই একর জমির বিশাল আম বাগানটি বিক্রি করেছি মাত্র এক লক্ষ টাকায়। বাজারে দাম নেই বলে পাইকার এখনো আম গাছ থেকে পাড়ছে না। সিজনের শেষে কিছুটা দাম বাড়তে পারে। তখন তারা আম সংগ্রহ শুরু করবে। আরো অনেক চাষি আম চাষে নেমেছেন। কিন্তু দাম না পেলে কৃষকের তো লোকসান গুণতে হবে।'
লংগদুর সবচেয়ে বড় আম বাগানের মালিক পরিবারের সদস্য, জেলা পরিষদের সাবেক সদস্য আব্দুর রহিমের ছেলে ফারুক হোসেন জানান, প্রায় ৫০ একর পাহাড়ি জমিতে তাঁরা আম্রপালি, মল্লিকা, খিরসাপাত ও রাংগুই জাতের আম চাষ করেছেন। তিনি বলেন, '১৫ বছর বয়সি এই বাগান থেকে আগে প্রতিবছর ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা আয় হতো। এ বছর দাম কমে সাত লাখে ঠেকেছে।' তিনি আরও বলেন, 'বাগানের পেছনে যে পরিমাণ খরচ করেছি, তাতে দিনশেষে খুব একটা লাভবান হতে পারিনি।'
এই দুই চাষির উপজেলা লংগদু রাঙ্গামাটির ১০টি উপজেলার একটি। এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, উপজেলাটির আয়তন ৩৮৮.৪৯ বর্গকিলোমিটার; এর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জুড়ে কাপ্তাই হ্রদ, প্রধান নদী মাইনি। আম, কাঁঠাল, লিচু, কলা, নারকেল, আনারস ও পেঁপে এখানকার প্রধান ফল; ২০১১ সালের আদমশুমারির তথ্যে ৬৯ শতাংশ পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস কৃষি। উপজেলায় হাটবাজার ১২টি, এর মধ্যে বড় মাইনিমুখ বাজার, করল্যাছড়ি বাজার, বৈরাগী বাজার, কাট্টলী হাট ও ভাইবোনছড়া হাট উল্লেখযোগ্য। একই ভুক্তিতে ২৫ কিলোমিটার পাকা, ৫২ কিলোমিটার আধা-পাকা ও ১৯৬ কিলোমিটার কাঁচা রাস্তার পাশাপাশি ৫২ কিলোমিটার নৌপথের হিসাব রয়েছে।
কাপ্তাই হ্রদ ও দূরত্বের খরচ
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রাঙ্গামাটি জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. মনিরুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, কাপ্তাই হ্রদ-সংলগ্ন দুর্গম বাগানগুলো থেকে আম পরিবহনে খরচ অনেক বেশি পড়ে। তাঁর এই কথার পেছনে আছে জেলার ভূগোল।
কাপ্তাই হ্রদ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় মানবসৃষ্ট মিঠাপানির জলাধার। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, মূলত জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য কাপ্তাই শহরের কাছে কর্ণফুলী নদীতে বাঁধ দিয়ে এটি তৈরি করা হয়। হ্রদটি পুরোপুরি রাঙ্গামাটি জেলার মধ্যে, রাঙ্গামাটি সদর, কাপ্তাই, নানিয়ারচর, লংগদু, বাঘাইছড়ি, বরকল, জুরাছড়ি ও বিলাইছড়ি উপজেলা জুড়ে বিস্তৃত। ইংরেজি 'H' আকৃতির এই হ্রদের আয়তন ৫৮ হাজার ৩০০ হেক্টর। এর কাসালং বাহুতে পানি আসে মাইনি ও কাসালং নদী থেকে, আর রাঙ্গামাটি-কাপ্তাই বাহুতে চেঙ্গী ও রাইংখ্যং থেকে।
হ্রদটি কর্ণফুলীর মধ্যভাগের উপত্যকার প্রায় পুরোটাই ডুবিয়ে দিয়েছে। বাংলাপিডিয়া লিখেছে, এতে একটি দীর্ঘ ও বিস্তৃত নৌপথও তৈরি হয়েছে: যেসব জায়গায় পৌঁছাতে আগে এক দিন বা তারও বেশি লাগত, স্পিডবোট বা লঞ্চে এখন সেখানে এক ঘণ্টায় যাওয়া যায়। বছরের বিভিন্ন মাসে হ্রদের পানির উচ্চতা বিভিন্ন স্তরে রাখা হয় বলে তীরের জমি উর্বর থাকে; এমন প্রায় ছয় হাজার ৭৫ হেক্টর জমিতে স্থানীয় সরকারের সঙ্গে চুক্তির ভিত্তিতে ইজারায় চাষাবাদ হয়।
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, রাঙ্গামাটি জেলার আয়তন ছয় হাজার ১১৬.১১ বর্গকিলোমিটার। জেলায় ১০টি উপজেলা: কাউখালী, কাপ্তাই, জুরাছড়ি, নানিয়ারচর, বরকল, বাঘাইছড়ি, বিলাইছড়ি, রাঙ্গামাটি সদর, রাজস্থলী ও লংগদু। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জনসংখ্যা ছিল পাঁচ লাখ ৯৫ হাজার ৯৭৯। জেলার নদী কর্ণফুলী, কাসালং, চেঙ্গী ও মাইনি; ৫৯.০৮ শতাংশ মানুষের প্রধান আয়ের উৎস কৃষি। চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরাসহ বহু নৃগোষ্ঠীর মানুষ এখানে বাস করে।

ফ্রুট ব্যাগিং: ক্ষুদ্র চাষির নাগালের বাইরে
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আমের মানের কথাও তোলেন। তিনি বলেন, ফ্রুট ব্যাগিং পদ্ধতিতে, অর্থাৎ গাছে থাকা অবস্থায় প্রতিটি কচি আম ব্যাগে মুড়ে রাখলে আম পোকা ও ছত্রাকমুক্ত থাকে; কিন্তু প্রতিটি ব্যাগের দাম তিন থেকে সাড়ে তিন টাকা হওয়ায় অর্থাভাবে ক্ষুদ্র চাষিরা এটি পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারছেন না। ফলে উৎপাদন বেশি হলেও কৃষক মানে ভালো করতে পারছেন না, তাই বাজারে দামও তুলনামূলক কম, বলেন তিনি।
এই ব্যাগ যেসব শত্রু থেকে আম রক্ষা করে, সেগুলো ভালোভাবে নথিভুক্ত। বাংলাপিডিয়া জানায়, নার্সারি থেকে পাকা পর্যন্ত প্রায় তিন ডজন পোকা আমের ক্ষতি করে; এর মধ্যে প্রধান আমের হপার বা শোষক পোকা, আমের আঁটির পোকা, কাণ্ড ও ডগা ছিদ্রকারী পোকা এবং আমের মাছি পোকা (Dacus dorsalis)। ছত্রাকজনিত প্রধান রোগ অ্যানথ্রাকনোজ, শুটি মোল্ড, পাতা ঝলসানো, ডাইব্যাক বা আগা মরা এবং পাউডারি মিলডিউ।
দেশের গবেষণায় ব্যাগিংয়ের ফল মাপা হয়েছে। ২০২০ সালের মার্চে জার্নাল অব দ্য বাংলাদেশ অ্যাগ্রিকালচারাল ইউনিভার্সিটিতে প্রকাশিত এক পরীক্ষায় মো. জোবায়ের হোসেন ও সহকর্মীরা আম্রপালি জাতে বাদামি কাগজ, সাদা কাগজ, সাদা পলিথিন ও কালো পলিথিনের ব্যাগ এবং ব্যাগহীন আম তুলনা করেন। ব্যাগিং আমের ওজন, আকার, খোসার রং, ভিটামিন সি, শর্করা, মোট দ্রবণীয় কঠিন পদার্থ ও সংরক্ষণকালের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে। বাদামি কাগজের ব্যাগে রাখা আম সবচেয়ে বেশি দিন, ১৫ দিন ভালো ছিল; ব্যাগহীন আম টিকেছিল আট দিন। খোসার রং, ভিটামিন সি ও সংরক্ষণকালে বাদামি ও সাদা কাগজের ব্যাগকে গবেষকেরা শ্রেয় পেয়েছেন।
আরেকটি গবেষণা প্রকাশিত হয় ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব পোস্টহারভেস্ট টেকনোলজি অ্যান্ড ইনোভেশনে (খণ্ড ৬, সংখ্যা ২, ২০১৯)। মো. আতিকুর রহমান ও বারির উদ্যানতত্ত্ববিদ মো. শরফ উদ্দিনসহ গবেষকেরা বাণিজ্যিক জাত খিরসাপাতে ব্যাগিংয়ের সঙ্গে উন্নত সংগ্রহোত্তর পদ্ধতি (উন্নত হারভেস্টার, কষ ঝরানোর ট্রে ও গরম পানিতে শোধন) প্রয়োগ করেন। প্রচলিত পদ্ধতিতে সামলানো ব্যাগহীন আমের তুলনায় এতে বোঁটা পচা ও অ্যানথ্রাকনোজের প্রকোপ ৮৬.৭ শতাংশ এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে সংগ্রহোত্তর ক্ষতি ৭০ শতাংশ কমে; আমের খোসার রং আকর্ষণীয় থাকে, খুচরা পর্যায়ে ১০ দিন পর্যন্ত বিক্রয়যোগ্য থাকে, আর স্বাদ-গন্ধে কোনো পরিবর্তন হয়নি।
কোন জাতে কোন ব্যাগ, কখন পরাতে হবে আর কখন খুলতে হবে, তা জাত ও বাগানভেদে আলাদা; পদ্ধতিটি ব্যবহার করতে চাইলে চাষিদের উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়াই ভালো।

পাহাড়ের দোকানে যেসব জাতের আম
২০২৬ সালের জুনে রাঙ্গামাটির দোকানে যে আমগুলো বিক্রি হচ্ছিল, সেগুলোর উৎস একেবারে ভিন্ন ভিন্ন জায়গায়; প্রকাশিত সূত্রে এদের পরিচয় এভাবে পাওয়া যায়।
- রাংগুই: জাগো নিউজের প্রতিবেদনে একে মিয়ানমারের জাত বলা হয়েছে; ২০১৯ সালের জরিপে পার্বত্য চট্টগ্রামের চাষিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি লাগানো আম এটি। পাহাড়ের মাটিতে এর ফলন ভালো, কিন্তু ২০২৬ সালের জুনে সমতা ঘাটে এটিই ছিল সবচেয়ে সস্তা, প্রতি মণ ৪০০ টাকা।
- আম্রপালি: দশেরি ও নীলম জাতের সংকর; ভারতের দিল্লিতে ইন্ডিয়ান অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চ ইনস্টিটিউটে ড. পীযূষকান্তি মজুমদার এটি উদ্ভাবন করেন, ১৯৭১ সালে জাতটি অবমুক্ত হয়। গাছ খাটো, প্রতিবছর নিয়মিত ফল দেয়; ফল ছোট, থোকায় ধরে, শাঁস গাঢ় কমলা-লাল ও বিটা-ক্যারোটিনে সমৃদ্ধ, তবে অনেক জাতের তুলনায় কম দিন টেকে। আগেই বলা হয়েছে, পাহাড়ে এর চাষ শুরু হয় ১৯৯৮-৯৯ সালে।
- বারি আম-৪: যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার রঙিন জাত এম৩৮৯৬ ও দেশি আশ্বিনার সংকরায়ণে বারির উদ্ভাবিত জাত, অবমুক্ত হয় ২০০৩ সালে। ২০২১ সালের আগস্টে দ্য ডেইলি স্টার জানিয়েছিল, চার থেকে পাঁচ হাজার হেক্টর জমিতে এর চাষ হচ্ছে, দেশের মোট উৎপাদনের প্রায় ১ শতাংশ এই জাতের, আর নাবি জাত বলে এর চাহিদা বেশি; সাধারণত জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহ থেকে আগস্টজুড়ে বাজারে পাওয়া যায়।
- ব্যানানা ম্যাঙ্গো: থাইল্যান্ড থেকে আনা জাত; ২০২১ সালে দ্য ডেইলি স্টার জানিয়েছিল, তখন অল্প কয়েকজন কৃষক এটি চাষ করতেন, উৎপাদন ছিল প্রায় পাঁচ টন। দয়ালাল চাকমার কথাতেই বোঝা যায়, ২০২৬ সালের জুনে পাহাড়ে এর চাষ অনেক বেড়েছে।
- কাটিমন: থাইল্যান্ডের জাত; ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে দ্য ডেইলি স্টার জানায়, প্রায় ছয় বছর আগে স্থানীয় উদ্যোক্তারা এটি দেশে আনেন। একই প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর গাছ ছয় ফুটের নিচে থাকে, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ২০২১-২২ সালে সারা দেশে ৭০০ হেক্টরে এর চাষ নথিভুক্ত করে, আর রাজশাহীর এক উপপরিচালক সতর্ক করেছিলেন যে সারা বছর ফলনের বাড়তি ব্যবস্থাপনা খরচে জাতটি বাণিজ্যিকভাবে অলাভজনক হতে পারে। ২০২৩ সালে বাসসের যে প্রতিবেদন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড প্রকাশ করে, তাতে বলা হয়, এর গাছে বছরে তিন-চারবার ফুল ও ফল আসে।
- হাড়িভাঙ্গা: উত্তরের জেলা রংপুরের জাত। দ্য ডেইলি স্টারের ২০২৫ সালের জুনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর মাতৃগাছটি মিঠাপুকুর উপজেলার টেকানী গ্রামে, ১৯৪৯ সালে কৃষক নফল উদ্দিন পাইকার গাছটি লাগান। মুকুল রক্ষায় গাছে পানিভর্তি মাটির হাঁড়ি ঝুলিয়ে রাখতেন তিনি, আর গ্রামের ছেলেরা সেগুলো ভেঙে ফেলত; সেখান থেকেই নাম হাড়িভাঙ্গা। এর শাঁস আঁশহীন ও দৃঢ়, অনেক দিন টেকে। বাসস জানায়, ২০২৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি যে চারটি পণ্য ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পায়, হাড়িভাঙ্গা আম তার একটি; এতে দেশের জিআই পণ্যের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৮।
- খিরসাপাত ও মল্লিকা: লংগদুর সবচেয়ে বড় বাগানে এ দুই জাতেরও চাষ হয়; বাংলাপিডিয়া খিরসাপাতকে দেশের অভিজাত কলমি জাতগুলোর তালিকায় রেখেছে।
দেশের আমের মানচিত্রে রাঙ্গামাটি
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, আম (Mangifera indica) ভারতীয় উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলের, অর্থাৎ বাংলাদেশ, আসাম ও মিয়ানমার অঞ্চলের আদি ফল; দেশে আমের প্রায় ১০০টি জাত আছে। গাছে ফুল আসে জানুয়ারি থেকে মার্চে, আর এ সময় কুয়াশা, বৃষ্টি বা মেঘলা আবহাওয়ায় ফল ধরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উৎকৃষ্ট জাতগুলোর চাষ দীর্ঘদিন ধরে মূলত উত্তর-পশ্চিমের রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও দিনাজপুরে।
জাতীয় পর্যায়ে, দ্য ডেইলি স্টার ২০২১ সালের আগস্টে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বরাতে জানায়, সে বছর দুই লাখ হেক্টর জমিতে প্রায় ২৫ লাখ টন আম হয়েছে; আগের মৌসুমে এক লাখ ৯০ হাজার হেক্টরে হয়েছিল ২৪ লাখ ৬৮ হাজার টন। ততদিনে বারি ১৭টি এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ২৫টি আমের জাত উদ্ভাবন করেছিল।
২০২৬ সালের মৌসুম রাঙ্গামাটির এই প্রতিবেদনের কয়েক সপ্তাহ আগেই শুরু হয়েছিল। রাজশাহীতে ১৫ মে, জ্যৈষ্ঠের প্রথম দিনে বাগান থেকে আম নামানো শুরু হয়; কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রাজশাহীর অতিরিক্ত উপপরিচালক পাপিয়া রহমান মৌরি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, জেলায় ১৯ হাজার ৬২ হেক্টর জমিতে আমবাগান রয়েছে, উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা দুই লাখ ৪৩ হাজার ৯৯৫ টন, যার সম্ভাব্য বাজারমূল্য ৭৮০ কোটি ৬৮ লাখ টাকা।
রাঙ্গামাটিতে ২০২৬ সালের জুনে যে উদ্বেগগুলো উঠে এসেছিল, অর্থাৎ হ্রদ পেরিয়ে আম পরিবহনের খরচ, ব্যাগের দাম ও সংরক্ষণের অভাব, তার সঙ্গে মিলে যায় ২০২১ সালে বারির ড. জুলফিকার আলী ফিরোজের পাহাড়ে প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা ও হিমাগার গড়ার আহ্বান।
ছবি: MohammedSuman22 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দৈনিক ইত্তেফাক, দ্য ডেইলি স্টার, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, বাসস, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, বাংলাপিডিয়া (এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ), জার্নাল অব দ্য বাংলাদেশ অ্যাগ্রিকালচারাল ইউনিভার্সিটি, ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব পোস্টহারভেস্ট টেকনোলজি অ্যান্ড ইনোভেশন, ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব সাসটেইনেবল অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চ, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)