সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৮°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৬২%বাতাস ৫ কিমি/ঘ

রজনীগন্ধা চাষ পদ্ধতি: কন্দ রোপণ, মাটি, সার, রোগ ও লাভের হিসাব

রজনীগন্ধা চাষে এক হেক্টরে খরচের তিন গুণের বেশি আয় হয়েছিল বারির সমীক্ষায়। জেনে নিন কন্দ বাছাই, রোপণ, সার, রোগ দমন ও গদখালীর বাজারের তথ্য।

রজনীগন্ধা চাষ পদ্ধতি: কন্দ রোপণ, মাটি, সার, রোগ ও লাভের হিসাব
ফুল

যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালীর পাইকারি ফুলের বাজারে বছরের সবচেয়ে ব্যস্ত মাস ফেব্রুয়ারি। ইউএনবির খবর অনুযায়ী, ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেখানকার চাষিরা আশা করছিলেন, আবহাওয়া অনুকূল থাকলে ওই এক মাসেই ৭০ থেকে ৮০ কোটি টাকার ফুল বিক্রি হবে। আর ওই এলাকায় যত ফুল উৎপাদন হয়, তার প্রায় এক-চতুর্থাংশই ছিল সাদা, রাতে সুগন্ধ ছড়ানো রজনীগন্ধা।

এই লেখায় জানা যাবে বাংলাদেশে রজনীগন্ধা কীভাবে চাষ হয়: গাছটি আসলে কী, সিংগেল ও ডাবল জাতের পার্থক্য, কেমন আবহাওয়া ও মাটি লাগে, কন্দ কীভাবে লাগাতে হয়, জৈব সার ও রাসায়নিক সার নিয়ে গবেষণা কী বলে, কোন রোগ ও পোকার দিকে নজর রাখতে হবে, আর বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) এক সমীক্ষায় এক হেক্টরে কত খরচ ও কত আয় হয়েছিল। প্রতিটি সংখ্যা যে সূত্রে যেভাবে আছে, সেভাবেই দেওয়া হয়েছে।

রজনীগন্ধা: ফুলটি কেমন, কেন এত কদর


রজনীগন্ধা একটি বহুবর্ষজীবী গাছ, যা মাটির নিচের কন্দ থেকে জন্মায়। দেশের চাষিরা এই কন্দকে বাল্ব বা কন্দ বলেন। এর ইংরেজি নাম টিউবরোজ (Tuberose), আর দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত বৈজ্ঞানিক নাম Polianthes tuberosa। এই লেখার আগের সংস্করণে, পুরোনো বইয়ের মতো, গাছটিকে Amaryllidaceae পরিবারের সদস্য বলা হয়েছিল। উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা এখন একে Asparagaceae পরিবারের Agavoideae উপপরিবারে রাখেন। আণবিক গবেষণায় দেখা গেছে, Polianthes গণটি আসলে বড় Agave গণের ভেতরেই পড়ে, তাই কোনো কোনো তথ্যসূত্রে এর নাম Agave amica লেখা হয়।

ধারণা করা হয়, গাছটির আদি নিবাস মধ্য ও দক্ষিণ মেক্সিকো। বনে-জঙ্গলে একে আর দেখা যায় না, সম্ভবত অ্যাজটেকরা বহু আগেই একে চাষের গাছে পরিণত করেছিল। এখন ক্রান্তীয় ও নাতিশীতোষ্ণ বহু দেশে এর চাষ হয়। পাতা নিষ্প্রভ সবুজ, প্রায় ১ থেকে দেড় ফুট লম্বা ও খানিকটা রসালো। ফুলের দণ্ড প্রায় ৩ ফুট পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। তাতে ধরে মোমের মতো মসৃণ, ধবধবে সাদা, নলাকার ফুল, যার মুখ ছয় ভাগে ছড়িয়ে যায় এবং যার সুগন্ধ খুব তীব্র।

রজনীগন্ধা নামের অর্থ রাতের সুগন্ধ: সন্ধ্যার দিকে ফুল ফোটে এবং অন্ধকার নামলে এর ঘ্রাণ সবচেয়ে বেশি ছড়ায়। বাংলাদেশ ও ভারতে এই ফুল দিয়ে মালা, তোড়া, বেণী, মুকুট আর বিয়ের সাজ তৈরি হয়। ফুলদানিতে কাটা দণ্ড প্রায় ৭ থেকে ১০ দিন সতেজ থাকে। সতেরো শতকে ফুলটি প্রথম ইউরোপে নেওয়ার পর থেকেই এর নির্যাস দিয়ে সুগন্ধি তৈরি হয়ে আসছে।

ভারতের গোয়ায় আইসিএআর সেন্ট্রাল কোস্টাল এগ্রিকালচারাল রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষকেরা ২০১৯ সালে লিখেছিলেন, সিংগেল জাতের ফুল মূলত সুগন্ধি তেল আহরণ, খোলা ফুল বিক্রি ও মালা গাঁথায় ব্যবহৃত হয়। এসব ফুলে ০.০৮ থেকে ০.১৪ শতাংশ কংক্রিট থাকে, যা উঁচু মানের সুগন্ধি তৈরির মোমজাতীয় নির্যাস। অন্যদিকে ডাবল জাতের ফুল বেশি ব্যবহৃত হয় কাট ফ্লাওয়ার হিসেবে ফুলদানিতে ও বাগান সাজাতে।

দেশের ফুলের অঞ্চল ও সেখানে রজনীগন্ধার জায়গা


বাংলাদেশে বাণিজ্যিক ফুল চাষ তখনও তুলনামূলক নতুন। বাংলাপিডিয়া লিখেছে, শখের ও বাণিজ্যিক দুই ধরনের ফুল চাষই এ দেশে প্রাথমিক পর্যায়ে, কাট ফ্লাওয়ারের (প্রধানত গোলাপ, রজনীগন্ধা, অর্কিড ও গ্লাডিওলাস) চাহিদা ধীরে ধীরে বাড়ছে, আর অল্প পরিমাণ গোলাপ ও রজনীগন্ধা মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে রপ্তানি হচ্ছে। নিয়মিত বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি হওয়া দেশি কাট ফ্লাওয়ারের তালিকায় বাংলাপিডিয়া 'সিংগেল' ও 'ডাবল' রজনীগন্ধার কথা উল্লেখ করেছে।

সরকারি হিসাবে ফুলের জমি তখনও কম হলেও বাড়ছিল। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য উদ্ধৃত করে বারির কৃষি অর্থনীতিবিদেরা জানান, ২০০৮-০৯ সালে দেশে ফুল চাষের জমি ছিল ৫২০.৬৪ হেক্টর এবং উৎপাদন ৪,৩০৮ মেট্রিক টন।

এই ব্যবসার কেন্দ্র ঝিকরগাছার গদখালী ইউনিয়ন। বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির সভাপতি আব্দুর রহিমের ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে ফুল চাষ শুরু হয় ১৯৮৩ সালে, মাত্র ৩০ শতক জমিতে। ২০২০ সালের বিভিন্ন প্রতিবেদনে এই ফুলের অঞ্চলের আয়তন নিয়ে কে হিসাব দিচ্ছেন তার ওপর নির্ভর করে বেশ আলাদা আলাদা সংখ্যা এসেছে:

  • ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটি জানায়, জমির পরিমাণ সাড়ে তিন হাজার হেক্টরের বেশি, ঝিকরগাছায় ফুলচাষি ৮ থেকে ১০ হাজার, আর গদখালীর পাইকারি বাজার থেকে দেশের মোট ফুলের প্রায় ৭০ শতাংশ সরবরাহ হয় (ইউএনবি, দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস)।
  • একই প্রতিবেদনে ঝিকরগাছার ফুলের হিস্যা দেওয়া হয়: গ্লাডিওলাস ৪৫ শতাংশ, রজনীগন্ধা ২৫ শতাংশ ও গোলাপ ২০ শতাংশ, বাকিটা জারবেরাসহ অন্যান্য ফুল।
  • ২০২০ সালের জুনে ইউএনবি লিখেছিল, ঝিকরগাছা ও শার্শা উপজেলার ৬৫টি গ্রামে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার হেক্টর জমিতে ফুল চাষ হয় এবং গদখালী দেশের সবচেয়ে বড় পাইকারি ফুলের বাজার।
  • ২০২০ সালের ডিসেম্বরে স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তা দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, ঝিকরগাছার ছয়টি ইউনিয়নের প্রায় ৬০০ হেক্টর জমিতে বাণিজ্যিক ফুল চাষ হচ্ছে, যার সঙ্গে যুক্ত ৭ হাজার কৃষক ও এক লাখ খেতমজুর।

২০২০ সালের ডিসেম্বরে গদখালীর চাষিরা দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, তখন ১০০টি রজনীগন্ধা বিক্রি হচ্ছিল ২০০ থেকে ২৫০ টাকায়, আর রজনীগন্ধার এক আঁটির দাম ছিল ৫০ টাকা।

এই ব্যবসায় ঝুঁকিও কম নয়। ২০২০ সালে করোনাভাইরাসের কারণে সাধারণ ছুটির মধ্যে পহেলা বৈশাখের আগে চাষিরা ফুল বিক্রি করতে পারেননি। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের খবরে বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটি জানায়, ছয় মাসে খাতটির ক্ষতি অন্তত ৪৫০ কোটি টাকা, যার প্রায় ১০০ কোটি টাকাই গদখালীতে। ইউএনবিকে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বলেন, ঘূর্ণিঝড় আম্পানে সে বছর গদখালীর সব ফুলের বাগান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

যশোরের গদখালীতে একটি ফুলের খেত, ফেব্রুয়ারি ২০২১। ছবি: SharierKabir / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
যশোরের গদখালীতে একটি ফুলের খেত, ফেব্রুয়ারি ২০২১। ছবি: SharierKabir / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সিংগেল, সেমি-ডাবল ও ডাবল রজনীগন্ধা


ফুলের আকার ও পাপড়ির বিন্যাস দেখে রজনীগন্ধাকে তিন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়:

  • সিংগেল: পাপড়ি থাকে একটি সারিতে। ফুল সম্পূর্ণ সাদা এবং খুব সুগন্ধি।
  • সেমি-ডাবল: পাপড়ি দুই বা তিন সারিতে সাজানো থাকে।
  • ডাবল: পাপড়ির সারি তিনটির বেশি। পাপড়ির কিনারায় হালকা লালচে আভা থাকে, আর সিংগেলের চেয়ে সুগন্ধ কম।

বাংলাদেশে সিংগেল ও ডাবল দুই ধরনেরই চাষ হয়। ২০১০ সালের জানুয়ারিতে বারির কৃষি অর্থনীতিবিদেরা যশোরের ঝিকরগাছা ও চুয়াডাঙ্গা সদরের ১০০ জন রজনীগন্ধা চাষির ওপর সমীক্ষা চালান। তাতে দেখা যায়, ৮৮ শতাংশ চাষি ডাবল ও ১২ শতাংশ সিংগেল জাতের চাষ করছিলেন; শুধু যশোরে এই অনুপাত ছিল ৮৫ ও ১৫।

বিদেশে নাম দেওয়া জাতের চল বেশি। ডাবল ফুলের 'দ্য পার্ল' জাতের পাতা চওড়া ও গাঢ়, দণ্ড খাটো; আর 'মেক্সিকান সিংগেল' দেখতে ততটা আকর্ষণীয় না হলেও কাট ফ্লাওয়ার হিসেবে বেশি দিন টেকে। ভারতের তামিলনাড়ু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (টিএনএইউ) সিংগেল জাতের মধ্যে ক্যালকাটা সিংগেল, মেক্সিকান সিংগেল, ফুলে রজনী ও প্রজ্বলের নাম দিয়েছে, আর ডাবল জাতের মধ্যে ক্যালকাটা ডাবল, পার্ল ডাবল, সুবাসিনী ও বৈভব।

বারির সমীক্ষায় চাষিরা তাঁদের দ্বিতীয় বড় সমস্যা হিসেবে উচ্চফলনশীল রোপণ উপকরণের অভাবের কথা বলেন; প্রথম সমস্যা ছিল উন্নত চাষপদ্ধতি সম্পর্কে কারিগরি জ্ঞানের অভাব। গবেষকেরা সুপারিশ করেন, সঠিক সময়ে চাষিদের হাতে উচ্চফলনশীল রজনীগন্ধার চারা পৌঁছে দিতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াইয়ের মাউইতে ডাবল জাতের রজনীগন্ধা ফুল। ছবি: Forest and Kim Starr / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)
যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াইয়ের মাউইতে ডাবল জাতের রজনীগন্ধা ফুল। ছবি: Forest and Kim Starr / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)

আবহাওয়া, মাটি, মৌসুম ও কন্দ রোপণ


রজনীগন্ধা উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া পছন্দ করে, তাই বাংলাদেশে গরমের মৌসুমে এর চাষ হয়। টিএনএইউ লিখেছে, ২৮ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার ক্রান্তীয় আবহাওয়া এ ফসলের উপযোগী, আর পানি সহজে নেমে যায় এমন দোআঁশ মাটি, যার পিএইচ ৬.৫ থেকে ৭.৫, সবচেয়ে ভালো। জৈব পদার্থে ভরপুর, পানি জমে না এমন দোআঁশ মাটিতে এ ফসল ভালো হয়। কন্দ লাগানোর পর ফুল আসা পর্যন্ত গাছের প্রায় চার মাস উষ্ণ আবহাওয়া দরকার।

বারির সমীক্ষায় প্রত্যেক চাষি পাওয়ার টিলার দিয়ে জমি তৈরি করেছিলেন, গড়ে পাঁচবার চাষ দিয়ে (যশোরে ছয়বার, চুয়াডাঙ্গায় চারবার)। সবাই সারি করে কন্দ লাগিয়েছিলেন। রোপণ চলেছিল মার্চ থেকে এপ্রিল পর্যন্ত, আর ফুল তোলা হয়েছিল সেপ্টেম্বর থেকে মে পর্যন্ত।

রজনীগন্ধা বীজ থেকেও হয়, তবে বাংলাদেশে প্রায় পুরোটাই চাষ হয় কন্দ থেকে। প্রতিটি গাছের গোড়ায় পেঁয়াজের মতো একটি কন্দ তৈরি হয়। পুরোনো গাছের গোড়ায় ঝাড় আকারে অনেক কন্দ থাকে, যার মাঝেরটি সবচেয়ে বড়। কন্দ থেকে জন্মানো গাছে মা-গাছের সব বৈশিষ্ট্য অটুট থাকে এবং অল্প সময়েই ফুল আসে। শীতকালে কন্দগুলো মাটির নিচে সুপ্ত থাকে, শীতের শেষে লাগানোর উপযোগী হয়।

লাগানোর জন্য মাঝারি থেকে বড় আকারের কন্দ বেছে নেওয়া হয়। বড় কন্দ থেকে সবল গাছ হয় এবং তাড়াতাড়ি ফুল আসে; ছোট কন্দ থেকে দুর্বল গাছ হয় এবং দেরিতে ফুল আসে। তামিলনাড়ুর জন্য টিএনএইউর নির্দেশিকায় রোপণের হিসাব এমন:

  • ২৫ থেকে ৩০ গ্রাম ওজনের কন্দ ব্যবহার করা হয়।
  • কন্দ লাগানো হয় আইলের পাশে, ৪৫ x ২০ সেন্টিমিটার দূরত্বে ও ২.৫ সেন্টিমিটার গভীরে; হেক্টরে প্রায় ১,১২,০০০টি কন্দ লাগে।
  • পুরোনো গাছ থেকে কন্দ তোলার প্রায় ৩০ দিন পর তা লাগানো হয়।

টিএনএইউর দেওয়া রোপণের সময় (জুন থেকে জুলাই) দক্ষিণ ভারতের জন্য; যশোর ও চুয়াডাঙ্গার চাষিরা কন্দ লাগিয়েছিলেন মার্চ-এপ্রিলে। নির্দিষ্ট জমির জন্য মৌসুম ও দূরত্ব উপজেলা কৃষি অফিস থেকে জেনে নেওয়াই ভালো।

জৈব ও রাসায়নিক সার: গবেষণা কী বলে


রজনীগন্ধার জন্য উর্বর মাটি দরকার, তবে গবেষণা বলছে রাসায়নিক সার বেশি দিলেই ফলন বাড়ে না। এই লেখার আগের সংস্করণে সারের যে মাত্রা ছিল, তা বারি, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বা কৃষি তথ্য সার্ভিসের কোনো প্রকাশিত সুপারিশে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাই সেখানে এখন গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকাশিত তথ্য দেওয়া হলো।

বারির ২০১০ সালের সমীক্ষায় যশোর ও চুয়াডাঙ্গার চাষিরা হেক্টরপ্রতি আসলে কী দিয়েছিলেন, তার হিসাব আছে: ৬.৫৩ টন জৈব সার, আর ২৭৪ কেজি ইউরিয়া, ২৬৮ কেজি টিএসপি, ২১৬ কেজি এমওপি, ৫৪ কেজি জিপসাম ও ৭ কেজি জিংক সালফেট। উৎপাদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, জৈব সার কম দিলে এবং ইউরিয়া, টিএসপি ও এমওপি সুপারিশকৃত মাত্রার বেশি দিলে ফলন কমে যায়।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষকেরা ২০০৯ সালের এপ্রিল থেকে ২০১০ সালের মার্চ পর্যন্ত ময়মনসিংহ সদরের সুতিয়াখালীতে এক কৃষকের জমিতে পরীক্ষা চালান। সেখানে হেক্টরপ্রতি ৪০০ কেজি ইউরিয়া, ৩০০ কেজি টিএসপি, ৩০০ কেজি এমপি ও ১০০ কেজি জিপসামের সুপারিশকৃত রাসায়নিক মাত্রার সঙ্গে জৈব সার ও অর্ধেক রাসায়নিক সারের তুলনা করা হয়। হেক্টরপ্রতি ৫ টন কেঁচো সার, ২০ টন মুরগির বিষ্ঠা বা ২০ টন গোবর, প্রতিটির সঙ্গে অর্ধেক রাসায়নিক সার দিলে শুধু রাসায়নিক সারের চেয়ে কন্দ বড় হয়েছে এবং ফুল বেশি এসেছে। সবচেয়ে বেশি কন্দ ও ফুলের ফলন এসেছে মুরগির বিষ্ঠায়, এরপর গোবরে।

ভারতে টিএনএইউ ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব হর্টিকালচারাল রিসার্চের (আইআইএইচআর) সুপারিশ উদ্ধৃত করেছে: হেক্টরপ্রতি ২৫ টন খামারজাত সার এবং নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশ ২০০:২০০:২০০ কেজি। পুরো ফসফরাস ও পটাশ জমি তৈরির শেষ চাষে দিতে হয়, আর নাইট্রোজেন তিন সমান ভাগে: রোপণের সময়, রোপণের ৬০ দিন পর ও ৯০ দিন পর। অণুপুষ্টির জন্য সংস্থাটি পাতায় ০.৫ শতাংশ জিংক সালফেট, ০.২ শতাংশ ফেরাস সালফেট ও ০.১ শতাংশ বরিক এসিড স্প্রে করার কথা বলেছে।

জমিভেদে মাটির গুণ আলাদা, তাই নির্দিষ্ট জমিতে কতটা সার লাগবে তা জানার সবচেয়ে নিশ্চিত উপায় মাটি পরীক্ষা এবং উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ।

সেচ, নিড়ানি ও মৌসুমজুড়ে পরিচর্যা


রজনীগন্ধা শ্রমনির্ভর ফসল। বারির সমীক্ষায় এক হেক্টরে ৫৭১ শ্রমদিবস লেগেছিল, যার ২৫০ দিন পরিবারের সদস্যদের আর ৩২১ দিন ভাড়া করা শ্রমিকের। মোট খরচের ৩০ শতাংশই ছিল শ্রমের, যা একক খাত হিসেবে সবচেয়ে বড়।

দ্বিতীয় বছরের বাগানে চাষিরা গড়ে ১০ বার নিড়ানি দিয়েছিলেন, ১১ বার সেচ দিয়েছিলেন এবং পাঁচবার কীটনাশক স্প্রে করেছিলেন। উৎপাদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, শ্রম, ভালো মানের চারা ও সেচ বাড়ালে ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে।

এক মৌসুমেই ফসল শেষ হয় না। টিএনএইউর তথ্যমতে, একবার লাগানো রজনীগন্ধা দুই বছর পর্যন্ত থাকে এবং ভালো যত্নে তৃতীয় বছরও রাখা যায়। বারির গবেষকেরা দ্বিতীয় বছরের বাগান থেকে তথ্য নিয়েছিলেন, কারণ বাণিজ্যিক ফুল তোলা শুরু হয় দ্বিতীয় বছরে।

রোগ ও পোকামাকড়ে নজর


রজনীগন্ধা কন্দ দিয়ে ছড়ায় বলে রোগও কন্দের সঙ্গে এক জমি থেকে আরেক জমিতে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্প্রসারণ গবেষণায় এ ফসলের প্রধান সমস্যাগুলো এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে:

  • পাতার কৃমি (Aphelenchoides besseyi): গরম ও ভেজা আবহাওয়ায় পাতার মধ্যশিরা বরাবর কালো, তেলতেলে দাগ পড়ে; বেশি আক্রান্ত পাতা বেঁকে যায়, ঢলে পড়ে ও শুকিয়ে যায়।
  • শিকড়ে গিঁট কৃমি (Meloidogyne প্রজাতি): শিকড় ফুলে গিঁট হয়, গাছ খাটো হয়ে যায় এবং পাতার আগা হলুদ হয়; আক্রান্ত কন্দ ও মাটির মাধ্যমে এটি ছড়ায়।
  • কাণ্ড পচা (Sclerotium rolfsii): গরম ও ভেজা আবহাওয়ায় মাটির কাছে গাছের গোড়ার পাতা হঠাৎ নেতিয়ে পড়ে; গোড়ায় সাদা তুলার মতো ছত্রাক ও বাঁধাকপির বীজের মতো ছোট গোল দানা দেখা যায়।
  • ফুলের কুঁড়ি পচা: ব্যাকটেরিয়াজনিত পচন, যা কুঁড়িতে ডিম পাড়া এক পোকার সঙ্গে যুক্ত।
  • থ্রিপস: গরম ও ভেজা আবহাওয়ায় পাপড়িতে হলদে-বাদামি দাগ ফেলে, বেশি আক্রমণে পুরো ফুল কুঁকড়ে মরচে-বাদামি হয়ে যায়।

টিএনএইউও থ্রিপস, জাবপোকা, শিকড়ে গিঁট কৃমি এবং গোড়া বা কাণ্ড পচাকে এ ফসলের প্রধান পোকা ও রোগ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

হাওয়াইয়ের পরীক্ষায় সুপ্ত কন্দ ৫০ থেকে ৫৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস গরম পানিতে ১০ থেকে ২০ মিনিট ডুবিয়ে রাখার পর সব কন্দ বেঁচে ছিল, কৃমিমুক্ত হয়েছিল এবং প্রতি ঝাড়ে চারটি করে ফুলের দণ্ড এসেছিল, যেখানে শোধন না করা কন্দে এসেছিল একটি। গবেষকেরা জোর দিয়েছিলেন, শোধনের মতোই জরুরি হলো রোগের লক্ষণ কম এমন পরিষ্কার, বড় কন্দ বেছে নেওয়া।

এই লেখায় কোনো কীটনাশক বা ছত্রাকনাশকের মাত্রা দেওয়া হয়নি। এসব লক্ষণ দেখলে চাষির উচিত আক্রান্ত গাছের নমুনা নিয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বা ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার কাছে যাওয়া, যিনি সমস্যা শনাক্ত করে অনুমোদিত প্রতিকার জানাতে পারবেন।

ফুল তোলা, ফলন, খরচ ও আয়


কাট ফ্লাওয়ারের জন্য টিএনএইউ গোড়ায় ৪ থেকে ৬ সেন্টিমিটার রেখে পুরো দণ্ড কাটার পরামর্শ দেয়। খোলা ফুল ও সুগন্ধি আহরণের জন্য সকাল ৮টার আগে, ফুল ফুটতে শুরু করলেই, আলাদা আলাদা ফুল তোলা হয়। সংস্থাটির হিসাবে বছরে হেক্টরপ্রতি ২ থেকে ৩ লাখ দণ্ড কাট ফ্লাওয়ার, অথবা ১৪ থেকে ১৫ টন খোলা ফুল পাওয়া যায়।

বারির সমীক্ষা বাংলাদেশের ছবিটা দেয়। যশোর ও চুয়াডাঙ্গার চাষিরা হেক্টরে গড়ে ৪,৫৪,৪২৫টি স্টিক তুলেছিলেন এবং প্রতিটি বিক্রি করেছিলেন দেড় টাকায়। হেক্টরপ্রতি মূল হিসাব ছিল এমন:

  • মোট খরচ ২,০০,৭৬১ টাকা, এর মধ্যে পরিবর্তনশীল খরচ ১,২৯,২৮৩ টাকা।
  • খরচের ৩০ শতাংশ শ্রমে, ২৩ শতাংশ জমি ব্যবহারে, ১৭ শতাংশ সারে এবং ১২ শতাংশ সেচে।
  • মোট আয় ৬,৮১,৬৩৭ টাকা, মোট লাভ (গ্রস মার্জিন) ৫,৫২,৩৫৪ টাকা এবং নিট লাভ ৪,৮০,৮৭৬ টাকা।
  • আয়-ব্যয়ের অনুপাত মোট খরচের ভিত্তিতে ৩.৩৯ এবং পরিবর্তনশীল খরচের ভিত্তিতে ৫.২৭।

একই ধরনের জমিতে প্রতিদ্বন্দ্বী ফসল কলার চেয়ে রজনীগন্ধা চাষে খরচ ২৬ শতাংশ এবং পেঁপের চেয়ে ১২ শতাংশ বেশি ছিল, কিন্তু নিট লাভ কলার চেয়ে ৬৫ শতাংশ ও পেঁপের চেয়ে ৭১ শতাংশ বেশি। ভালো জমি তৈরি ও উর্বর মাটির কারণে যশোরে ফলন বেশি হয়েছিল, আর খরচ কম থাকায় নিট লাভ বেশি ছিল চুয়াডাঙ্গায়।

গবেষকেরা সুপারিশ করেন, চাষিদের উচ্চফলনশীল চারা দিতে হবে, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে প্রশিক্ষণের আয়োজন করতে হবে এবং বাজার অবকাঠামো ও পরিবহন উন্নত করতে হবে, কারণ দক্ষ পরিবহনের অভাব ছিল চাষিদের বলা তৃতীয় সমস্যা।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে রজনীগন্ধার কুঁড়ি। ছবি: Joydeep / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে রজনীগন্ধার কুঁড়ি। ছবি: Joydeep / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

পরামর্শ কোথায় পাবেন


নতুন চাষি শুরু করতে পারেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপজেলা কৃষি অফিস থেকে। বারির ওই গবেষণায় ঝিকরগাছা ও চুয়াডাঙ্গার রজনীগন্ধা চাষিদের তালিকা তৈরিতে এই অধিদপ্তরের কর্মীরাই সহায়তা করেছিলেন। নির্দিষ্ট জমির মাটি, রোপণ উপকরণ, সার ও পোকামাকড় নিয়ে তাঁরা পরামর্শ দিতে পারেন।

ফুল নিয়ে গবেষণা হয় গাজীপুরে বারির উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রে। বাংলাপিডিয়া লিখেছে, বাণিজ্যিক ফুল চাষ এগিয়ে নিতে বারি ফুল নিয়ে আলাদা গবেষণা শাখা চালু করেছে।

ছবি: JDP90 (Joydeep) / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

সূত্র: দ্য এগ্রো নিউজ (নিজস্ব প্রতিবেদক), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (হক ও অন্যান্য, বাংলাদেশ জার্নাল অব এগ্রিকালচারাল রিসার্চ, সেপ্টেম্বর ২০১২), কবির ও অন্যান্য, জার্নাল অব এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ন্যাচারাল রিসোর্সেস (২০১১), বাংলাপিডিয়া (Floriculture), তামিলনাড়ু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (টিএনএইউ অ্যাগ্রিটেক পোর্টাল, Tuberose), আইসিএআর সেন্ট্রাল কোস্টাল এগ্রিকালচারাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট (জার্নাল অব হর্টিকালচারাল সায়েন্সেস, ২০১৯), হাওয়াই বিশ্ববিদ্যালয় কো-অপারেটিভ এক্সটেনশন সার্ভিস (সার্কুলার ৪২৭, Diseases of Tuberose in Hawaii, ১৯৬৮), উইকিপিডিয়া (Tuberose, ফেব্রুয়ারি ২০২২), ইউএনবি ও প্রথম আলো (৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১৭ জুন ২০২০), দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস (৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০), দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (৫ আগস্ট ২০২০), দ্য ডেইলি স্টার (৮ ডিসেম্বর ২০২০)

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

ফুল

সম্পর্কিত খবর

জৈব

গরুর চারণের আচ্ছাদন ফসলে সূর্যমুখী, সেই মাঠেই ফুল তুলতে আসেন দর্শনার্থী

কানাডার ম্যানিটোবার আর্নেসের দুগিদ পরিবার পুনরুৎপাদনশীল চারণের আচ্ছাদন ফসলে কাটা ফুলের সূর্যমুখী জাত যোগ করেছে। এখন একই মাঠ তাদের গরুর খাবার জোগায়, আবার দর্শনার্থীদের নিজ হাতে ফুল তোলার দিনেও ভিড় টানে।

Manitoba Co-operator১৫ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
ফুল

আগুনরঙা সুগন্ধি পানামা রোজ: গোলাপ নয়, রঙ্গনের আত্মীয়; কাটিংয়েই চারা

মিরপুরের জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে ফোটা কমলা-লাল পানামা রোজ (Rondeletia odorata) পানামা ও কিউবার গুল্ম; অক্টোবর থেকে মে পর্যন্ত ফোটে, ১০-১৫ সেন্টিমিটার ডাল কেটে পুঁতলে তিন থেকে পাঁচ সপ্তাহে শিকড় গজায়।

সমকাল১৪ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
ফুল

পাবনার বিল-ঝিলে লাল-সাদা শাপলার সমারোহ, তবু কমছে শাপলা জন্মানোর জায়গা

গাজনার বিল, ডিকশির বিল, চলনবিলসহ পাবনার জলাশয়ে এখন লাল ও সাদা শাপলা ফুটেছে; তবে জলাশয় ভরাট, অপরিকল্পিত মাছ চাষ আর কীটনাশকে শাপলার জায়গা সংকুচিত হচ্ছে বলে জানান স্থানীয়রা।

দেশ রূপান্তর১২ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)