সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৮°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৬২%বাতাস ৫ কিমি/ঘ

যশোরের শার্শায় সরিষার আবাদ ছুঁয়েছে ৬ হাজার ৫০২ হেক্টরের লক্ষ্যমাত্রা

২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর যশোরের শার্শা উপজেলা কৃষি অফিস জানায়, মৌসুমের পুরো লক্ষ্যমাত্রা ৬ হাজার ৫০২ হেক্টর জমিতে সরিষা বোনা হয়ে গেছে; তখনও বপন চলছিল, তাই আবাদ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়াবে বলে আশা ছিল অফিসের।

যশোরের শার্শায় সরিষার আবাদ ছুঁয়েছে ৬ হাজার ৫০২ হেক্টরের লক্ষ্যমাত্রা
ফুল

২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর জাগো নিউজের বেনাপোল (যশোর) প্রতিনিধি জানান, যশোরের শার্শা উপজেলার ফসলের মাঠ তখন সরিষার হলুদ ফুলে ছেয়ে গেছে, যতদূর চোখ যায় শুধু হলুদ, আর ফুলে ফুলে মুখরিত মৌমাছির দল। একসময় অব্যাহত লোকসানের কারণে যে কৃষকেরা সরিষা চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছিলেন, তাঁরা তখন বাম্পার ফলনের স্বপ্ন দেখছিলেন। উপজেলা কৃষি অফিস জানায়, মৌসুমের লক্ষ্যমাত্রা ৬ হাজার ৫০২ হেক্টরে এরই মধ্যে সরিষা বোনা হয়ে গেছে, আর আরও জমিতে তখনও বপন চলছিল।

প্রতিবেদনে উদ্ধৃত কৃষক ও কর্মকর্তাদের ভাষ্যে এই পরিবর্তনের দুটি কারণ উঠে আসে। আগের মৌসুমে স্থানীয় বাজারে উন্নত জাতের সরিষার ভালো দাম মিলেছিল, আর অনেক কৃষক কৃষি বিভাগ থেকে বিনা মূল্যে উচ্চ ফলনশীল জাতের বীজ পেয়েছিলেন। প্রতিবেদক উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নেই কৃষি বিভাগের পরামর্শে কৃষকদের সরিষা চাষ করতে দেখেন।

শার্শায় আবাদ, উৎপাদন ও লক্ষ্যমাত্রা


উপজেলা কৃষি অফিসের হিসাব অনুযায়ী, আগের মৌসুমে শার্শায় প্রায় ৫ হাজার ৯২৯ হেক্টর জমিতে সরিষার চাষ হয়েছিল, উৎপাদন হয়েছিল ৮ হাজার ৯২৯ মেট্রিক টন, অর্থাৎ হেক্টরপ্রতি ১.৫১ মেট্রিক টন। ২০২৫-২৬ মৌসুমে আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ৬ হাজার ৫০২ হেক্টর, আর প্রতিবেদনের সময় পর্যন্ত ৬ হাজার ৫০২ হেক্টর জমিতেই সরিষা বোনা হয়ে গিয়েছিল। অনেকে তখনও বপন করছিলেন, তাই চূড়ান্ত আবাদ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে বলে অফিসের ধারণা ছিল। মূল প্রতিবেদনের শিরোনামে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার কথা বলা হলেও এর নিজের দেওয়া হিসাবে দেখা যায়, সেদিন পর্যন্ত আবাদ লক্ষ্যমাত্রার সমান হয়েছিল, আর অফিস তা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশা করছিল।

অফিস জানায়, কৃষি বিভাগের নানা উদ্যোগে কৃষকেরা সরিষা চাষে দারুণ উৎসাহ পেয়েছেন, আর আগের বছর স্থানীয় বাজারে ভালো দাম পাওয়ায় সে মৌসুমে উপজেলার ১ হাজারের বেশি কৃষক সরিষা চাষ করেছেন। উন্নত জাতের সরিষায় কৃষকদের আগ্রহ সামনে আরও বাড়বে বলে অফিসের ধারণা ছিল। অফিস আরও বলে, শুধু ধান চাষ করলেই চলবে না; ধানের পাশাপাশি ভুট্টা, সরিষা, আলু, সূর্যমুখী, পাট, তিলসহ অন্যান্য ফসলের চাষেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

কৃষি বিভাগের সহযোগিতা আর অনুকূল আবহাওয়ার কারণে কৃষকেরা ভালো ফলনের পাশাপাশি ভালো দামেরও আশা করছিলেন। ভোজ্যতেলের আমদানিনির্ভরতা কমাতে কৃষি বিভাগের সহযোগিতায় সামনের মৌসুমগুলোতে সরিষার আবাদ আরও বাড়ানোর কথা ভাবছিল উপজেলা কৃষি অফিস।

উপজেলার বিভিন্ন সরিষাখেত ঘুরে দেখা যায়, কৃষি বিভাগের পরামর্শে শার্শা, বাগআঁচড়া, বেনাপোল, পুটখালী, বাহাদুরপুর, নিজামপুর, ডিহি ও লক্ষ্মণপুরসহ প্রতিটি ইউনিয়নের কয়েকজন কৃষক ৫ থেকে ৬ বিঘা করে জমিতে উচ্চ ফলনশীল জাতের সরিষা চাষ করেছেন।

বাংলাদেশের একটি মাঠে ফুল ফোটা সরিষাগাছ। ছবি: Hopeoflight / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
বাংলাদেশের একটি মাঠে ফুল ফোটা সরিষাগাছ। ছবি: Hopeoflight / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

কৃষকেরা যা বলেছেন


উপজেলার শ্যামলাগাছী গ্রামের কৃষক জাহাঙ্গীর আলম সে বছর ২ বিঘা জমিতে বারি-১৪ ও বিনা-৯-১০ জাতের সরিষা চাষ করেন। তিনি বলেন, 'প্রতি বিঘা সরিষা চাষে খরচ হয়েছে প্রায় ৫ হাজার টাকা। বাজারে চাহিদা ভালো থাকে এবং দাম ভালো পাওয়া যায়। বর্তমান সরিষার গাছ, ফুল-ফল ভালো হয়েছে। আশা করছি, বাম্পার ফলন হবে। গত বছরের মতো লাভবান হতে পারবো।'

বালুন্ডা গ্রামের কৃষক আবুল হোসেন বলেন, 'সরিষার চাহিদা ভালো থাকায় এবং চাষে ক্ষতির সম্ভাবনা কম থাকায় প্রতি মৌসুমে সরিষার চাষ করি। আশা করছি এবারও দাম ভালো পাওয়া যাবে। এ বছর উপযুক্ত দাম পেলে আগামী বছর সরিষা চাষে আরও অনেকেই ঝুঁকে পড়বেন।'

বেনাপোলের নারায়ণপুর এলাকার কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, 'বারি-১৪ জাতের সরিষার গাছ লম্বা হওয়ায় এর পাতা মাটিতে ঝরে পড়ে জৈব সারের কাজ করে। এ জাতের সরিষা আবাদের পর একই জমিতে বোরো আবাদে সারের পরিমাণও কম লাগে। কৃষি বিভাগের পরামর্শে এবার ২ বিঘা জমিতে উন্নত জাতের সরিষা আবাদ করেছি।'

গোগা গ্রামের নাজমুল বিশ্বাস বলেন, 'আমি এ বছর নতুন সরিষা চাষে উপজেলা কৃষি অফিস থেকে বারি-১৪ বীজ সংগ্রহ করে ২ একর জমিতে রোপণ করেছি। গত বছরের তুলনায় এ বছর সরিষা গাছ ও ফুল দেখে বোঝা যাচ্ছে, এ বছর দ্বিগুণ ফলন হবে। বাজারে দামও পাওয়া যাবে বেশি। তাই আমন ধান কাটার পরপরই জমিতে সরিষা চাষ করেছি।'

কৃষকদের কথায় একটি ধরন স্পষ্ট: হেমন্তে আমন ধান কাটার পর খালি হওয়া জমিতে সরিষা বোনা হয়, খরচ তুলনামূলক কম, আর শীতে বোরো ধান লাগানোর আগেই সরিষা মাঠ থেকে উঠে যায়।

বীজ বিতরণ ও কৃষি কর্মকর্তার বক্তব্য


উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা দীপক কুমার সাহা জাগো নিউজকে বলেন, 'কৃষকদের যথাযথ পরামর্শ ও পরিচর্যার বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। চলতি মৌসুমে উপজেলায় বারি-৮, বারি-১৪, বারি-১৭, বারি-১৮, বিনা-৪, বিনা-৯ বীজ সরবরাহ ও বিতরণ করা হয়েছে। সরিষা বপনের মাত্র ৭৫-৮০ দিনের মধ্যে ফলন পাওয়া যায়। গত বছর ভালো দাম পাওয়ায় কৃষকেরা বেশি আগ্রহী হয়েছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এ বছর ভালো আবাদ হওয়ার সম্ভাবনা আছে।'

কর্মকর্তার বলা এই স্বল্প জীবনকালের কারণেই দুই ধানের মাঝখানে সরিষা জায়গা করে নিতে পারে। পরের ধানের আবাদ কত বড়, তার একটি ধারণা একই অফিস জাগো নিউজকে দিয়েছিল ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে: ২০২৪-২৫ মৌসুমে শার্শায় বোরো ধানের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৩ হাজার ১৫০ হেক্টর, বীজতলার লক্ষ্যমাত্রা ১ হাজার ১৫৭ হেক্টর, যার মধ্যে তখনই ১ হাজার ১৭৫ হেক্টরে বীজতলা তৈরি হয়ে গিয়েছিল। সেই প্রতিবেদনে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জানুয়ারির তীব্র শীত ও কুয়াশায় বোরোর বীজতলা পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখার পরামর্শ দেন, কারণ ঠান্ডায় ধানের চারা নষ্ট হতে পারে।

বারি জাতগুলো উদ্ভাবন করেছে রাষ্ট্রীয় ফসল গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, আর বিনা জাতগুলো আরেকটি রাষ্ট্রীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট। প্রতিবেদনে যে উপজেলা অফিস কথা বলেছে, সেটি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই), যে সরকারি সংস্থা প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় কৃষকদের বীজ ও সার দেয় এবং মাঠে পরামর্শ দেয়।

শার্শা উপজেলা: সীমান্তের কৃষিপ্রধান জনপদ


শার্শা যশোর জেলার পশ্চিম প্রান্তে, ভারতের সীমান্তঘেঁষা উপজেলা। দেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, এর আয়তন ৩৩৬.২৮ বর্গকিলোমিটার, অবস্থান ২২°৫৫' থেকে ২৩°১২' উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৮°৫১' থেকে ৮৯°০১' পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে। এর উত্তরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য ও চৌগাছা উপজেলা, দক্ষিণে কলারোয়া উপজেলা, পূর্বে ঝিকরগাছা উপজেলা এবং পশ্চিমে পশ্চিমবঙ্গ। প্রধান নদী বেতনা; উল্লেখযোগ্য বিলের মধ্যে রয়েছে জিলা বিল, সোনানদিয়া বিল, বড়কোনা বিল, বনমান্দার বিল, কালিয়ানীর বিল, বালুন্ডা বিল ও রানতাপাড়া বিল।

শার্শা থানা গঠিত হয় ১৯১০ সালে, উপজেলা হয় ১৯৮৩ সালের ৩ জুলাই। এখানে একটি পৌরসভা, বেনাপোল, আর ১১টি ইউনিয়ন: উলাশী, কায়বা, গোগা, ডিহি, নিজামপুর, পুটখালী, বাগআঁচড়া, বাহাদুরপুর, বেনাপোল, লক্ষ্মণপুর ও শার্শা। ২০১১ সালের জনশুমারিতে উপজেলার জনসংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৪১ হাজার ৩২৮। ভারতের পেট্রাপোলের বিপরীতে অবস্থিত বেনাপোলে রয়েছে দেশের সবচেয়ে বড় স্থলবন্দর।

এখানকার জীবন মূলত কৃষিনির্ভর। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে ৬৬.৩২ শতাংশ পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস কৃষি, এরপর ব্যবসা ১২.৪০ শতাংশ; ৪৬.৫৬ শতাংশ পরিবার ভূমিহীন। প্রধান ফসলের তালিকায় আছে ধান, পাট, আলু, গম, সরিষা, মসুর, তিল ও সবজি, আর মাষকলাই ও তিসিকে বিলুপ্ত বা বিলুপ্তপ্রায় বলা হয়েছে। প্রধান রপ্তানিপণ্য খেজুরের গুড়, তিল ও সবজি। উপজেলায় হাটবাজার ৩০টি, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য শার্শা, নাভারণ, বেনাপোল, বাগআঁচড়া, উলাশী, লক্ষ্মণপুর, নিজামপুর, কায়বা, গোগা ও বাহাদুরপুর হাট।

যশোরে সরিষা চাষ যেভাবে বেড়েছে


বাংলাপিডিয়া চট্টগ্রাম, সিলেট, ঢাকা, টাঙ্গাইল, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও পাবনার সঙ্গে যশোরকেও তুলনামূলক বেশি সরিষা আবাদের জেলা হিসেবে উল্লেখ করেছে। একসময় ফসলটির আবাদ কেন কমেছিল, তাও জ্ঞানকোষটি বলেছে: আমদানি করা সয়াবিন তেল স্থানীয় সরিষার তেলের চেয়ে সস্তা হওয়ায় দেশে সরিষার আবাদি জমি কমে যাচ্ছিল।

জেলার হিসাবেই ফিরে আসার চিত্র দেখা যায়। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম আলো কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের যশোর কার্যালয়ের বরাতে জানায়, জেলায় ২০১৭-১৮ রবি মৌসুমে সরিষা চাষ হয়েছিল ৯ হাজার ২৩০ হেক্টরে, ২০১৮-১৯ মৌসুমে ৯ হাজার ৭৭৫ হেক্টরে এবং ২০১৯-২০ মৌসুমে ১৩ হাজার ৬৪০ হেক্টরে। ২০২০-২১ মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৫ হাজার হেক্টর, চাষ হয় ১৫ হাজার ৪৬৫ হেক্টরে। সবচেয়ে বেশি চাষ হয়েছিল টরি-৭, বারি সরিষা-৯, বারি সরিষা-১৪, বারি সরিষা-১৫ ও সম্পদ জাতের, আর আগে ফসল তোলা কৃষকেরা তখনই একই জমিতে বোরো ধান লাগাচ্ছিলেন।

২০২৩-২৪ মৌসুমে জেলার সরিষার আবাদ আরও অনেক বড় হয়। ২০২৪ সালের ১০ জানুয়ারি ইউএনবি যশোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বরাতে জানায়, সে মৌসুমে ২৯ হাজার ৯০০ হেক্টরের প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে জেলায় সরিষা চাষ হয়েছে ৩০ হাজার ২৬৫ হেক্টরে; প্রধান জাত ছিল বারি-৯ ও বারি-১৪। সরকার জেলার ৩৭ হাজার ৮০০ কৃষককে প্রতি বিঘার জন্য এক কেজি বীজ ও ২০ কেজি সার দিয়েছিল, আর শুধু অভয়নগর উপজেলাতেই সরিষা চাষ হয়েছিল ২ হাজার ১১০ হেক্টরে। যশোরে অধিদপ্তরের উপপরিচালক ইউএনবিকে বলেন, জেলায় রেকর্ড ফলন হয়েছে।

দক্ষিণ-পশ্চিমের প্রতিবেশী জেলাগুলোতেও একই ধারা দেখা গেছে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে দ্য ডেইলি স্টার বাংলায় প্রকাশিত কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে কুষ্টিয়ায় সরিষা উৎপাদন ছিল ২০২১-২২ সালে ১৩ হাজার ৭২১ মেট্রিক টন, ২০২২-২৩ সালে ১৭ হাজার ৫৮০ মেট্রিক টন এবং ২০২৩-২৪ সালে ২২ হাজার ৮৭২ মেট্রিক টন, যা জেলার রেকর্ড। তখন কুষ্টিয়ার হাটে প্রতি মণ সরিষা পাইকারি বিক্রি হচ্ছিল ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়।

শার্শায় বিতরণ করা জাতগুলো


শার্শার তিন কৃষক যে বারি সরিষা-১৪-এর কথা বলেছেন, সেটিই স্বল্প জীবনকালের সেই জাত, যা যশোরে দুই ধানের মাঝে সরিষা চাষকে সহজ করেছে। ২০২১ সালে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের যশোর কার্যালয় প্রথম আলোকে জানায়, জাতটি ৭৫ থেকে ৮০ দিনে পাকে এবং হেক্টরপ্রতি প্রায় দেড় হাজার কেজি ফলন দেয়, যা পুরোনো স্থানীয় জাতের চেয়ে বেশি; স্থানীয় জাতে ফলন কম হতো, পাকতেও সময় বেশি লাগত। জেলার উপপরিচালক তখন বলেছিলেন, বারি সরিষা-১৪-এর গাছের পাতা মাটিতে ঝরে জৈব সারের কাজ করে ও জমির উর্বরতা বাড়ায়, আর সরিষা তোলার পর একই জমিতে বোরো লাগানো যায়; ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বেনাপোলের কৃষকও ঠিক এই কথাই বলেছেন। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সিরাজগঞ্জে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, সেখানে কৃষকদের সবচেয়ে পছন্দের জাত বারি ১৪।

বারি সরিষা-১৭ ও বারি সরিষা-১৮ পরে উদ্ভাবিত জাত। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে বাংলা ট্রিবিউন ফরিদপুর থেকে জানায়, সেখানে দুটি জাতেরই চাষ হচ্ছিল, আর বারি সরিষা-১৮ উচ্চ ফলনশীল জাত, যাতে ইরুসিক অ্যাসিডের পরিমাণ খুব কম; ফরিদপুরে বিএডিসির ডাল ও তৈলবীজ উৎপাদন খামারের এক কর্মকর্তা বলেন, সয়াবিন তেলের বিকল্প হিসেবে এই জাতের তেল ব্যবহার করা যেতে পারে।

বিনা সরিষা-৯ বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের জাত। ২০২০ সালের মার্চে বিনার গোপালগঞ্জ উপকেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ঢাকা ট্রিবিউনকে বলেন, বপনের ৮০ থেকে ৮৪ দিনের মধ্যে জাতটি কাটা যায়, আর বিনার এক বিজ্ঞানী একে জলবায়ুসহিষ্ণু জাত হিসেবে বর্ণনা করেন, যার চারা ভারী বৃষ্টিসহ প্রতিকূল আবহাওয়ায় টিকে থাকতে পারে এবং পাতা পোড়াসহ কয়েকটি সাধারণ রোগ প্রতিরোধ করতে পারে। সেই প্রতিবেদনে গোপালগঞ্জের এক কৃষক এক হেক্টর জমি থেকে প্রায় ১ হাজার ৬০০ কেজি ফলন পান, যেখানে স্থানীয় জাতে পেতেন ৬০০ কেজি। শার্শায় বিতরণ করা অন্য বিনা জাতটি ছিল বিনা-৪।

অন্য এলাকার কৃষকেরাও একই ফসলচক্রের কথা বলেন। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে রংপুরের এক কৃষক দ্য ডেইলি স্টার বাংলাকে জানান, তিনি আমন কাটার পর সরিষা বোনেন, ফেব্রুয়ারিতে তা তোলেন, তারপর বোরো লাগান। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে রংপুরের কৃষকেরা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, নভেম্বরের শুরু থেকে এই ফসল বোনা হয় এবং ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি ঘরে তোলা যায়, আর অনেক ফসলের চেয়ে এতে চাষ, সেচ ও সার কম লাগে। সারের মাত্রা ও রোগবালাই দমনের ব্যবস্থা মাটি ও জাতভেদে আলাদা, তাই এ বিষয়ে কৃষকদের উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শ নিতে বলা হয়।

মৌমাছি, পরাগায়ন ও মধু


শার্শার প্রতিবেদনের মৌমাছিরা শীতের একটি বড় অর্থনীতির অংশ। দ্য ডেইলি স্টার ২০২৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি জানায়, ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশের সরিষাখেতগুলো বুনো ও পালিত মৌমাছিতে ভরে থাকে, কারণ সরিষা ফুল পরাগ ও মধুরসের প্রচুর উৎস, আর এর মধুরস মৌমাছির জন্য সহজলভ্য। সেই প্রতিবেদনে উদ্ধৃত কৃষি বিভাগের হিসাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে সরিষা আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৬ হেক্টর, যার মধ্যে প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার ১৭১ হেক্টর মধু সংগ্রহের জন্য নির্ধারিত; সে মৌসুমে ৯৩ হাজার ৪৭৮টি মৌবাক্স বসানো হয়েছিল এবং বিশেষজ্ঞদের ধারণা ছিল ১.৫ মিলিয়ন কেজির বেশি মধু সংগ্রহ হবে।

মৌমাছির পরাগায়নে ফসলেরও লাভ হয়। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, মৌমাছির পরাগায়ন কৃষকের উৎপাদন সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে পারে, আর সিরাজগঞ্জের এক কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা জানান, অনেক কৃষক এখনো ভুল করে মৌমাছিকে ফসলের জন্য ক্ষতিকর মনে করেন। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে রংপুরের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর আরও সতর্ক হিসাব দেয়: বাংলাদেশ প্রতিদিনকে কৃষি অফিস জানায়, সরিষাখেতে মৌবাক্স বসালে ফলন ৩ থেকে ৫ শতাংশ বাড়ে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) দ্য ডেইলি স্টারকে জানায়, আগের বছর ৭ হাজার টনের প্রক্ষেপণের বিপরীতে মৌচাষিরা ৭ হাজার ৪৪৯.৪০ টন মধু সংগ্রহ করেছিলেন, আর সংস্থাটি প্রতিবছর ৪৮০ জনকে মৌচাষের প্রশিক্ষণ দেয়।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বাগুলায় সরিষা ফুলে একটি মৌমাছি। ছবি: Amitoon / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বাগুলায় সরিষা ফুলে একটি মৌমাছি। ছবি: Amitoon / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)

ভোজ্যতেল আমদানি ও সরিষা বাড়ানোর জাতীয় উদ্যোগ


একসময় সরিষার তেলই ছিল দেশের প্রধান রান্নার তেল। বাংলাপিডিয়া লিখেছে, মাত্র কয়েক দশক আগেও বাংলাদেশে রান্নায় একমাত্র সরিষার তেলই ব্যবহার হতো; তেল ভাঙানো হতো ঘানি নামের প্রথাগত কলে, যা বলদ দিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ঘোরানো হতো, আর এই পেশার মানুষকে বলা হতো কলু। এখন বৈদ্যুতিক কলে তেল ভাঙানো হয়। বাংলাপিডিয়া আরও বলেছে, দেশে উৎপাদিত সরিষার তেল রান্নার তেলের চাহিদার সামান্য অংশই মেটায়, তাই প্রচুর সয়াবিন ও সূর্যমুখী তেল আমদানি করতে হয়।

২০২২ সালের জুনে ইউএনবি জানায়, কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে দেশে বছরে ভোজ্যতেলের চাহিদা ২৪ লাখ টন, যার প্রায় ৯০ শতাংশ আমদানি করতে হয়। তিন বছরের এক পরিকল্পনায় মন্ত্রণালয় ২০২৪-২৫ অর্থবছর থেকে চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশ, অর্থাৎ ১০ লাখ টন ভোজ্যতেল দেশে উৎপাদনের লক্ষ্য নেয়, যাতে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। এ জন্য ধানের উৎপাদন না কমিয়ে সরিষা, তিল, চিনাবাদাম, সয়াবিন ও সূর্যমুখীর আবাদ বিদ্যমান ৮ দশমিক ৬ লাখ হেক্টর থেকে ২৩ দশমিক ৬০ লাখ হেক্টরে নেওয়ার কথা বলা হয়। দেশে তেলের উৎপাদন তখন ছিল প্রায় ৩ লাখ টন।

এরপর সরিষার আবাদ দ্রুত বাড়ে। ২০২৩ সালের ১ মে কৃষি মন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য প্রকাশ করে দ্য ডেইলি স্টার বাংলা জানায়, এক বছরে সরিষার আবাদ ৬ লাখ ১০ হাজার হেক্টর থেকে বেড়ে ৮ লাখ ১২ হাজার হেক্টর হয়েছে, উৎপাদন ৮ লাখ ২৪ হাজার মেট্রিক টন থেকে বেড়ে ১১ লাখ ৫২ হাজার মেট্রিক টন; তেলের হিসাবে যা ১ লাখ ২১ হাজার মেট্রিক টন বেশি। তবু সরিষা, তিল ও সূর্যমুখী মিলিয়ে দেশে উৎপাদিত প্রায় ৩ লাখ টন তেল ২৪ লাখ টন চাহিদার মাত্র ১২ শতাংশ মেটাত।

দ্য ডেইলি স্টার ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর জানায়, ২০২৪-২৫ মৌসুমে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সারা দেশে ১.১৬৪ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ ও ১.৭২৬ মিলিয়ন টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছিল; ২৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১.০১৪ মিলিয়ন হেক্টরে, অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার ৮৭.০৮ শতাংশ জমিতে, বপন হয়েছিল। অধিদপ্তরের ফসল উইংয়ের এক উপপরিচালক বলেন, সয়াবিন আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতেই সরিষার উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্য।

বিনা মূল্যে বীজ ও সার ছিল এর প্রধান হাতিয়ার। যেমন, ২০২২ সালের অক্টোবরে কৃষি মন্ত্রণালয় সরিষাসহ রবি ফসলের আবাদ বাড়াতে ১৩৭ কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করে, যার আওতায় সারা দেশের ১৬ লাখ ৭১ হাজার ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক প্রত্যেকে এক বিঘা জমির প্রয়োজনীয় বীজ ও সার পান; অর্থ আসে মন্ত্রণালয়ের কৃষি পুনর্বাসন সহায়তা খাত থেকে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে শার্শার কৃষকেরা যে বিনা মূল্যের উচ্চ ফলনশীল বীজের কথা বলেছেন, তা এ ধরনের সহায়তারই অংশ।

শার্শার কৃষকেরা যেমন বলেছেন, দামই তাঁদের সরিষা চাষে ধরে রাখে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে কুষ্টিয়ার এক তেলকলের মালিক দ্য ডেইলি স্টার বাংলাকে জানান, তখন প্রতি মণ সরিষার গড় দাম ছিল ২ হাজার ৪০০ টাকা, ভালো মানের সরিষার তেল উৎপাদনে লিটারপ্রতি সর্বোচ্চ খরচ ১১৪ টাকা, আর কলে দেশি সরিষার তেল বিক্রি হচ্ছিল লিটারপ্রতি ১৭০ টাকায়; এক খুচরা বিক্রেতা জানান, খোলা সরিষার তেল লিটারপ্রতি ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল।

সরিষার তেল ও সরিষা, ২০০৩ সালে ভারতের কলকাতায় তোলা ছবি। ছবি: Biswarup Ganguly / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)
সরিষার তেল ও সরিষা, ২০০৩ সালে ভারতের কলকাতায় তোলা ছবি। ছবি: Biswarup Ganguly / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)

ছবি: Hopeoflight / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাপিডিয়া, প্রথম আলো, ইউএনবি, দ্য ডেইলি স্টার, দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, বাংলা ট্রিবিউন, ঢাকা ট্রিবিউন, বাংলাদেশ প্রতিদিন, উইকিপিডিয়া

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

ফুল

সম্পর্কিত খবর

জৈব

গরুর চারণের আচ্ছাদন ফসলে সূর্যমুখী, সেই মাঠেই ফুল তুলতে আসেন দর্শনার্থী

কানাডার ম্যানিটোবার আর্নেসের দুগিদ পরিবার পুনরুৎপাদনশীল চারণের আচ্ছাদন ফসলে কাটা ফুলের সূর্যমুখী জাত যোগ করেছে। এখন একই মাঠ তাদের গরুর খাবার জোগায়, আবার দর্শনার্থীদের নিজ হাতে ফুল তোলার দিনেও ভিড় টানে।

Manitoba Co-operator১৫ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
ফুল

আগুনরঙা সুগন্ধি পানামা রোজ: গোলাপ নয়, রঙ্গনের আত্মীয়; কাটিংয়েই চারা

মিরপুরের জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে ফোটা কমলা-লাল পানামা রোজ (Rondeletia odorata) পানামা ও কিউবার গুল্ম; অক্টোবর থেকে মে পর্যন্ত ফোটে, ১০-১৫ সেন্টিমিটার ডাল কেটে পুঁতলে তিন থেকে পাঁচ সপ্তাহে শিকড় গজায়।

সমকাল১৪ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
ফুল

পাবনার বিল-ঝিলে লাল-সাদা শাপলার সমারোহ, তবু কমছে শাপলা জন্মানোর জায়গা

গাজনার বিল, ডিকশির বিল, চলনবিলসহ পাবনার জলাশয়ে এখন লাল ও সাদা শাপলা ফুটেছে; তবে জলাশয় ভরাট, অপরিকল্পিত মাছ চাষ আর কীটনাশকে শাপলার জায়গা সংকুচিত হচ্ছে বলে জানান স্থানীয়রা।

দেশ রূপান্তর১২ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)