২০২৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের অনলাইন সংবাদমাধ্যম জাগো নিউজ ২৪-এর লাইফস্টাইল ডেস্ক সরিষার তেলে খাসির মাংস রান্নার একটি রেসিপি প্রকাশ করে। রেসিপিতে বলা হয়, খাসির মাংসের স্বাদ বাড়ানোর একটি সহজ উপায় হলো সরিষার তেল ব্যবহার করা। সাধারণ তেল ও মসলার তুলনায় সরিষার তেলে রান্না করলে মাংসে আসে আলাদা এক হালকা ঝাঁজ ও সুগন্ধ, আর রান্না শেষে এই মাংস ভাত বা রুটির সঙ্গে খেতে বেশ উপভোগ্য হয়।
রান্নার শুরু এক কেজি খাসির মাংস দিয়ে। মাংসে প্রথমে লেবুর রস, লবণ ও গোলমরিচ মাখিয়ে রাখা হয়, তারপর টক দই, আদা ও রসুনবাটা, গুঁড়া মসলা, টমেটো আর আধা কাপ সরিষার তেল দিয়ে এক ঘণ্টা মেরিনেট করা হয়। এরপর ভাজা পেঁয়াজ ও আস্ত গরমমসলার সঙ্গে মাংস কষিয়ে পানি দিয়ে সেদ্ধ করা হয় এবং শেষে কাঁচা মরিচ, গরমমসলার গুঁড়া ও ধনেপাতা দেওয়া হয়। নিচে মূল রেসিপির উপকরণ ও ধাপগুলো যেমন ছিল তেমনই দেওয়া হলো। তার পরের অংশগুলোতে আছে এই রান্নার মূল দুটি উপাদান, তেল ও মাংস নিয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য: বাংলাদেশে সরিষার তেল কীভাবে ভাঙানো হয়ে এসেছে ও সরিষা কোথায় কতটা চাষ হয়, তেলের ঝাঁজ কোথা থেকে আসে, এর ইরুসিক অ্যাসিড নিয়ে বিভিন্ন দেশের খাদ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা কী বলেছে, ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল কেমন জাত, এবং রেসিপি প্রকাশের সময় পর্যন্ত স্বাস্থ্য ও খাদ্যনিরাপত্তা কর্তৃপক্ষগুলো লাল মাংস, চর্বি ও কাঁচা মাংস সামলানো নিয়ে কী পরামর্শ দিয়েছে।
সরিষার তেলে খাসির মাংস রান্নার উপকরণ
এক কেজি খাসির মাংসের জন্য রেসিপিতে এই উপকরণগুলো দেওয়া হয়েছে:
- খাসির মাংস: ১ কেজি
- লেবুর রস: ২ চা-চামচ
- লবণ: স্বাদমতো
- গোলমরিচের গুঁড়া: আধা চা-চামচ
- টক দই: আধা কাপ
- আদাবাটা: ১ টেবিল চামচ
- রসুনবাটা: ২ চা-চামচ
- ধনে গুঁড়া: ১ চা-চামচ
- জিরা গুঁড়া: ১ চা-চামচ
- হলুদের গুঁড়া: ১ চা-চামচ
- লাল মরিচের গুঁড়া: ২ চা-চামচ
- টমেটো স্লাইস: ১০০ গ্রাম
- সরিষার তেল: পৌনে ১ কাপ
- পেঁয়াজকুচি: ২০০ গ্রাম
- আস্ত গরমমসলা (তেজপাতা, এলাচ, দারুচিনি ও লবঙ্গ): প্রতিটি ৩ থেকে ৪টি করে
- পানি: পরিমাণমতো
- চিনি: ১ চা-চামচ
- গরমমসলার গুঁড়া: ১ চা-চামচ
- কাঁচা মরিচ: ৫ থেকে ৬টি
- ধনেপাতাকুচি: সামান্য
পৌনে এক কাপ সরিষার তেলের মধ্যে আধা কাপ তেল রেসিপিতে মাংসের সঙ্গে মেরিনেটের মিশ্রণে দেওয়া হয়; রান্নার শুরুতে পেঁয়াজ ও আস্ত গরমমসলা ভাজার সময় আবার তেল ব্যবহার করা হয়। গরমমসলাও দুইবার লাগে: আস্ত মসলা দেওয়া হয় শুরুতে গরম তেলে, আর গরমমসলার গুঁড়া তুলে রাখা হয় একেবারে শেষের পাঁচ মিনিটের জন্য।
যেভাবে রান্না করবেন, ধাপে ধাপে
- খাসির মাংস পরিষ্কার করে ধুয়ে নিন। এরপর লেবুর রস, লবণ ও গোলমরিচের গুঁড়া মাখিয়ে ২০ মিনিট রেখে দিন।
- মাংস আবার ধুয়ে নিন। রেসিপি অনুযায়ী এতে খাসির মাংসের আশটে গন্ধ দূর হয়।
- গরমমসলার গুঁড়া বাদে বাকি সব গুঁড়া মসলা, টক দই, আদা ও রসুনবাটা, টমেটো এবং আধা কাপ সরিষার তেল দিয়ে মাংস ভালো করে মাখিয়ে মেরিনেটের জন্য ১ ঘণ্টা রেখে দিন।
- চুলায় পাতিল বসিয়ে তাতে তেল, পেঁয়াজকুচি ও আস্ত গরমমসলা দিয়ে পেঁয়াজ হালকা বাদামি রং হওয়া পর্যন্ত ভাজুন।
- মেরিনেট করা মাংস দিয়ে পাতিল ঢেকে ২০ মিনিট রান্না করুন।
- মসলায় মাংস ভালোভাবে কষানো হলে পরিমাণমতো পানি দিয়ে ঢেকে ৪০ মিনিট রান্না করুন।
- মাংস সেদ্ধ হয়ে এলে চিনি, কাঁচা মরিচ, গরমমসলার গুঁড়া ও ধনেপাতা দিয়ে কম আঁচে ঢেকে ৫ মিনিট রান্না করুন। তৈরি হয়ে গেল সরিষার তেলে খাসির মাংস।
মূল রেসিপিতে এই মাংস ভাত বা রুটির সঙ্গে পরিবেশনের কথা বলা হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে মাংস আবার ধোয়ার পরামর্শটি খাসির গন্ধ কমানোর জন্য রেসিপির নিজস্ব পরামর্শ। কাঁচা মাংস ধোয়া নিয়ে যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা (এনএইচএস) সাধারণভাবে কী বলে, আর কাঁচা মাংস অন্য খাবার থেকে আলাদা রাখা, পুরোপুরি রান্না করা ও বেঁচে যাওয়া খাবার সংরক্ষণ নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) কী পরামর্শ দেয়, তা নিচে খাদ্যনিরাপত্তার অংশে দেওয়া হলো।
বাঙালির রান্নাঘরে সরিষার তেল
বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া সরিষাকে বর্ণনা করেছে ক্রুসিফেরি গোত্রের এমন কিছু বীরুৎ উদ্ভিদ হিসেবে, যাদের বীজ থেকে তেল পাওয়া যায়; যেমন ব্রাসিকা নেপাস (রেপ) ও ব্রাসিকা নাইগ্রা (কালো সরিষা)। বাংলাপিডিয়ার ইংরেজি ভুক্তিতে বলা হয়েছে, মাত্র কয়েক দশক আগেও বাংলাদেশে রান্নার একমাত্র তেল ছিল সরিষার তেল।
সরিষার তেল কীভাবে ভাঙানো হতো, ভুক্তিটিতে তারও বর্ণনা আছে। অনেক জায়গায় এখনো সরিষা পেষা হয় ঘানি নামের প্রথাগত কলে। একটি গরু দিনের দীর্ঘ সময় ধরে, কখনো সারা রাত ধরেও, ঘানি টেনে ঘোরায়; আর এই পেশার মানুষটিকে বলা হয় কলু। বাংলাপিডিয়া লিখেছে, গরুর এই কাজ এতটাই একঘেয়ে যে 'কলুর বলদ' কথাটি বাংলায় এমন মানুষকে বোঝাতে ব্যবহার হয়, যে কেন বা কী করছে তা না জেনেই দিনের পর দিন একই কাজ করে যায়। ভুক্তিটি আরও জানায়, এখন সরিষার তেল বের করা হয় বৈদ্যুতিক কলে।
একই ভুক্তি অনুযায়ী, যা সর্বশেষ সম্পাদিত হয়েছে ২০২১ সালের জুনে এবং যেখানে পরিসংখ্যানের কোনো সাল উল্লেখ নেই, বাংলাদেশে প্রায় ০.২৪ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে সরিষার চাষ হয় এবং বছরে প্রায় ০.১৯ মিলিয়ন টন সরিষার তেল পাওয়া যায়। বাংলাপিডিয়ার ভাষায়, এই পরিমাণ দেশের রান্নার তেলের চাহিদার সামান্য অংশই মেটায়; তাই বিপুল পরিমাণ সয়াবিন ও সূর্যমুখী তেল আমদানি করতে হয়। আমদানি করা সয়াবিন তেল দেশি সরিষার তেলের চেয়ে সস্তা হওয়ায় সরিষার আবাদ আরও কমছে বলেও ভুক্তিতে উল্লেখ আছে। প্রায় সব জেলাতেই সরিষা চাষ হয়, তবে চট্টগ্রাম, সিলেট, ঢাকা, টাঙ্গাইল, যশোর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও পাবনায় এই রবি ফসলের আবাদ তুলনামূলক বেশি।

বাংলাদেশের শীতের মাঠে সরিষা
সরিষা রবি বা শীত মৌসুমের ফসল। দেশেই বেশি সরিষা ফলানোর সরকারি উদ্যোগ এই রেসিপি প্রকাশের আগেও খবরে এসেছে। ২০২৪ সালের ১০ জানুয়ারি সংবাদ সংস্থা ইউএনবি যশোর থেকে জানায়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) জেলা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী সেখানে সরিষার আবাদ মৌসুমের লক্ষ্যমাত্রা ২৯ হাজার ৯০০ হেক্টর ছাড়িয়ে ৩০ হাজার ২৬৫ হেক্টরে পৌঁছেছে। ডিএই সূত্র সংস্থাটিকে জানায়, ভোজ্যতেলের আমদানি কমানোর সরকারি উদ্যোগের অংশ হিসেবেই আবাদ বেড়েছে।
ইউএনবির প্রতিবেদনে বলা হয়, যশোর সদর উপজেলার চূড়ামনকাটি গ্রামের কৃষকেরা বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) উদ্ভাবিত বারি-৯ ও বারি-১৪ জাতের সরিষা চাষ করেছেন। চাষে উৎসাহ দিতে সরকার প্রত্যেক কৃষককে প্রতি বিঘা জমির জন্য এক কেজি বীজ ও ২০ কেজি সার দিয়েছে, এবং জেলাজুড়ে ৩৭ হাজার ৮০০ কৃষক বীজ ও সার পেয়েছেন; এর মধ্যে অভয়নগর উপজেলাও আছে, যেখানে সরিষার আবাদ হয়েছে ২ হাজার ১১০ হেক্টরে। ঝিকরগাছা উপজেলার এক কৃষক ইউএনবিকে বলেন, ধানের মতো অন্য ফসলের তুলনায় সরিষা চাষে খরচ কম, লাভ বেশি। যশোরে ডিএইর উপপরিচালক সংস্থাটিকে জানান, সরিষার মতো রবি ফসলের আবাদ বাড়িয়ে ভোজ্যতেলের আমদানি কমানোই লক্ষ্য।

সরিষার তেলের ঝাঁজ আসে কোথা থেকে
রেসিপিতে যে ঝাঁজের কথা বলা হয়েছে, তার উৎস সরিষাদানার রসায়ন। অস্ট্রেলিয়ার সাউদার্ন ক্রস ইউনিভার্সিটির গবেষকদের লেখা এবং ২০২৪ সালের আগস্টে ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব মলিকুলার সায়েন্সেস সাময়িকীতে প্রকাশিত সরিষাজাতীয় উদ্ভিদ নিয়ে একটি পর্যালোচনায় সরিষার তেলকে বলা হয়েছে উচ্চমূল্যের তেলবীজ পণ্য, যা এশিয়ার বহু দেশে জনপ্রিয় এবং খাবারে বিশেষ ধরনের ঝাল ও মসলাদার স্বাদ যোগ করে। পর্যালোচনা অনুযায়ী, প্রথাগত সরিষা বা রেপসিড তেল তৈরি হয় ব্রাসিকা নেপাস, ব্রাসিকা জানসিয়া, ব্রাসিকা রাপা ভ্যারাইটি ক্যাম্পেস্ট্রিস ও ব্রাসিকা টুর্নেফোর্টি প্রজাতির বীজ থেকে।
পর্যালোচনাটি জানায়, সরিষাদানার বড় অংশই তেল (২৮ থেকে ৪২ শতাংশ); এরপর আছে আমিষ (২৫ থেকে ৪০ শতাংশ), শর্করা (১৫ থেকে ৩৫ শতাংশ), আঁশ (১০ থেকে ১৫ শতাংশ), খনিজ (৫ থেকে ১০ শতাংশ) এবং সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত উদ্ভিজ্জ গৌণ যৌগ, যার মধ্যে আছে গ্লুকোসিনোলেট, ফেনলজাতীয় যৌগ ও ট্যানিন। সব ধরনের সরিষার পরিচিত ঝাঁজের কারণ এই গন্ধকযুক্ত গ্লুকোসিনোলেট। অক্ষত দানায় এগুলো মাইরোসিনেজ নামের একটি এনজাইম থেকে আলাদা থাকে; দানা পিষলে বা কোষ ভাঙলে এনজাইমটি বেরিয়ে এসে গ্লুকোসিনোলেট ভেঙে আইসোথায়োসায়ানেটের মতো যৌগ তৈরি করে। সবচেয়ে বেশি পাওয়া গ্লুকোসিনোলেটগুলোর একটি সিনিগ্রিন, আর ভাঙনের ফলে তৈরি যেসব যৌগের নাম পর্যালোচনায় এসেছে, তার একটি অ্যালাইল আইসোথায়োসায়ানেট।
পর্যালোচনা অনুযায়ী, তেলটি মূলত ট্রাইগ্লিসারাইড দিয়ে গঠিত। জাতভেদে এতে সম্পৃক্ত ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে প্রায় ৭ থেকে ১২ শতাংশ, একক অসম্পৃক্ত ফ্যাটি অ্যাসিড ১৫ থেকে ৬৫ শতাংশ এবং বহু অসম্পৃক্ত ফ্যাটি অ্যাসিড প্রায় ৮ থেকে ৪০ শতাংশ। একক অসম্পৃক্ত অংশের প্রধান উপাদান ইরুসিক অ্যাসিড (৪০ থেকে ৫০ শতাংশ) ও ওলেইক অ্যাসিড (৫ থেকে ১২ শতাংশ); বহু অসম্পৃক্ত অংশে প্রধানত থাকে ওমেগা-৬ ফ্যাটি অ্যাসিড লিনোলেইক অ্যাসিড (১০ থেকে ১৫ শতাংশ) এবং ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড লিনোলেনিক অ্যাসিড (৮ থেকে ১৫ শতাংশ)।

ইরুসিক অ্যাসিড ও খাদ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর অবস্থান
বিদেশের কিছু খাদ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা সরিষার তেলকে অন্য রান্নার তেলের মতো দেখে না, আর এর কারণ ইরুসিক অ্যাসিড। যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের (এফডিএ) ইমপোর্ট অ্যালার্ট ২৬-০৪, যা প্রকাশিত হয় ২০১৬ সালের ১৮ নভেম্বর এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারিতেও সংস্থাটির ওয়েবসাইটে ছিল, তাতে বলা হয়েছে, পেষণ করে বের করা সরিষার তেল উদ্ভিজ্জ তেল হিসেবে ব্যবহারের অনুমতি নেই। অ্যালার্টে বলা হয়, এই তেলে ২০ থেকে ৪০ শতাংশ ইরুসিক অ্যাসিড থাকতে পারে, যা পরীক্ষাগারের প্রাণীর দেহে পুষ্টির ঘাটতি ও হৃৎপিণ্ডে ক্ষত তৈরি করতে দেখা গেছে; আরও বলা হয়, কিছু সংস্কৃতিতে এই তেল রান্নায় ব্যবহারের তথ্য আছে। অ্যালার্টটি এফডিএর মাঠ কার্যালয়গুলোকে বাহ্যিক পরীক্ষা ছাড়াই এ ধরনের সরিষার তেলের চালান আটকে রাখার সুযোগ দেয়।
একই অ্যালার্টে এই ঘন, চর্বিজাতীয় তেলকে আলাদা করা হয়েছে 'সরিষার তেল' নামে পরিচিত আরেকটি পণ্য থেকে: সরিষার এসেনশিয়াল অয়েল বা উদ্বায়ী তেল, যা কালো সরিষার গুঁড়া বা খৈল থেকে বাষ্প-পাতন পদ্ধতিতে তৈরি একটি সুগন্ধি উপাদান। এফডিএ এই এসেনশিয়াল অয়েলকে সাধারণভাবে নিরাপদ (জিআরএএস) হিসেবে গণ্য করে এবং মার্কিন ফেডারেল বিধির ২১ সিএফআর ১৮২.২০ অনুযায়ী অনুমোদিত সুগন্ধি উপাদান হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।
ইউরোপে ইউরোপীয় খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ (ইএফএসএ) ২০১৬ সালের একটি বৈজ্ঞানিক মতামতে ইরুসিক অ্যাসিডের সহনীয় দৈনিক গ্রহণমাত্রা নির্ধারণ করেছে প্রতিদিন দেহের প্রতি কেজি ওজনের জন্য ৭ মিলিগ্রাম; পোল্যান্ডের ক্রাকোভের জাগিয়েলোনিয়ান ইউনিভার্সিটি মেডিকেল কলেজের গবেষকদের ২০২৩ সালে মলিকিউলস সাময়িকীতে প্রকাশিত পর্যালোচনায় এ তথ্য উল্লেখ আছে। উদ্ভিদ প্রজননবিদেরা এই উদ্বেগের জবাব দিয়েছেন কম ইরুসিকযুক্ত জাত উদ্ভাবন করে। ২০২৪ সালের পর্যালোচনাটি জানায়, ব্রাসিকা নেপাস ও ব্রাসিকা রাপা থেকে উদ্ভাবিত ক্যানোলার বীজের তেলে ইরুসিক অ্যাসিড ২ শতাংশের কম; কম ইরুসিকযুক্ত তেলের সীমা ওজন হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে ২ শতাংশের নিচে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নে ৫ শতাংশের নিচে; আর এফডিএ ১৯৮৫ সালে ক্যানোলাকে মানুষের খাওয়ার জন্য সাধারণভাবে নিরাপদ হিসেবে অনুমোদন দেয়। পর্যালোচনাটি আরও জানায়, বেশি ইরুসিকযুক্ত সরিষার তেলের শিল্প-ব্যবহারও আছে, যেমন লুব্রিকেন্ট, ডিটারজেন্ট, প্লাস্টিকজাত পণ্য ও জৈব জ্বালানি তৈরিতে।
তবে বৈজ্ঞানিক চিত্রটি একপেশে নয়। ২০২৩ সালের মলিকিউলস পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, উদ্বেগের ভিত্তি মূলত প্রাণীর ওপর করা গবেষণা, যার বেশির ভাগ প্রকাশিত হয় ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে; সেসব গবেষণায় দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চমাত্রায় ইরুসিক অ্যাসিড খাওয়ানো ইঁদুরের হৃৎপেশিতে চর্বি জমতে দেখা যায়, যাকে বলা হয় মায়োকার্ডিয়াল লিপিডোসিস। পর্যালোচনার লেখকেরা জোর দিয়ে বলেছেন, হৃৎপিণ্ডের এই ক্ষতিকর প্রভাব মানুষের ক্ষেত্রে নিশ্চিত হয়নি; প্রাণীর ওপর পরীক্ষাগুলো বেশির ভাগই প্রায় চার দশক আগের, এবং সেগুলোর সীমাবদ্ধতা ছিল, যেমন প্রাণীর সংখ্যা কম এবং মাত্রা অত্যন্ত বেশি; আর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রভাবটি ছিল ফিরিয়ে আনা যায় এমন। তাঁরা আরও মনে করিয়ে দেন, ১৯৮১ সালে স্পেনে ২০ হাজারের বেশি মানুষ এক গণবিষক্রিয়ার শিকার হন, যা 'টক্সিক অয়েল সিনড্রোম' নামে পরিচিত; প্রথমে এর জন্য ইরুসিক অ্যাসিডকে দায়ী করা হলেও পরের বিশ্লেষণে তাকে কারণ হিসেবে বাদ দেওয়া হয়।
পর্যালোচনায় উদ্ধৃত মানুষের ওপর করা গবেষণার ফলও দুই দিকেই যায়। চীনের সিচুয়ান প্রদেশে নিয়মিত বেশি পরিমাণে, মাসে প্রায় ৫০০ মিলিলিটার, সরিষা বা রেপসিড তেল খাওয়া ১০ জন রোগীর ওপর করা এক গবেষণায় উচ্চ ইরুসিক গ্রহণ ও হৃদ্রোগের মধ্যে কোনো সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি বড় গবেষণা দল, কার্ডিওভাসকুলার হেলথ স্টাডি ও অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস রিস্ক ইন কমিউনিটিজ স্টাডিতে রক্তে ইরুসিক অ্যাসিড বেশি থাকার সঙ্গে কনজেস্টিভ হার্ট ফেইলিওরের ঝুঁকি বেশি থাকার সম্পর্ক পাওয়া যায়, যার হ্যাজার্ড রেশিও ছিল ১.৩৪ থেকে ১.৯২; যদিও সেই গবেষণার লেখকেরা বলেছেন, প্রভাবটি রক্তে থাকা অন্য দীর্ঘ শিকলের ফ্যাটি অ্যাসিডের কারণেও হতে পারে। মলিকিউলস পর্যালোচনার নিজস্ব উপসংহার হলো, যুক্তিসংগত পরিমাণে ব্যবহার করলে ইরুসিক অ্যাসিড আগে যতটা বিষাক্ত মনে করা হতো, ততটা নয়। হৃদ্রোগ আছে বা চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে খাদ্যতালিকা মেনে চলেন এমন যে কেউ রান্নার তেল নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
খাসির মাংস ও ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল
এই রেসিপির মাংস খাসির, অর্থাৎ ছাগলের। বাংলাপিডিয়ার ছাগলবিষয়ক ভুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশে ছাগল আছে প্রায় ৩০.৩৩ মিলিয়ন, যার ৯০ শতাংশের বেশি ব্ল্যাক বেঙ্গল জাতের; বাকিগুলো যমুনাপাড়ি ও তার সংকর। দেশের ৯০ শতাংশের বেশি ছাগল পালন করেন গ্রামের মানুষ, তাঁদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু, আর এ কারণে উৎপাদন খরচ সবচেয়ে কম থাকে বলে জানিয়েছে জ্ঞানকোষটি। মাংস, দুধ ও চামড়া উৎপাদনে দেশের গবাদিপ্রাণীর মধ্যে ছাগলের অবস্থান দ্বিতীয়; মোট উৎপাদনে এর অংশ যথাক্রমে প্রায় ২৮, ২৩ ও ২৮ শতাংশ।
ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল সারা বাংলাদেশে এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে, ছড়িয়ে আছে। বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায় এটি ছোট আকারের প্রাণী; রং সাধারণত কালো, তবে বাদামি, ধূসর ও সাদাও দেখা যায়; লোম ছোট, নরম ও চকচকে; পা খাটো, আর পাঁঠা ও ছাগী দুটোরই শিং থাকে। প্রাপ্তবয়স্ক পাঁঠার ওজন ১৬ থেকে ১৮ কেজি, ছাগীর ১২ থেকে ১৪ কেজি। জাতটি দ্রুত প্রজননক্ষম হয়; প্রথম বাচ্চা দেয় প্রায় ১২ মাস বয়সে, আর ছাগী বছরে দুইবার অথবা দুই বছরে তিনবার বাচ্চা দেয়। পতিত জমি, খেতের আল, রাস্তার পাশ ও বাঁধে চরেই এরা খাবার জোগাড় করে, বাড়তি খাবার লাগে সামান্যই। ভুক্তিতে বলা হয়েছে, এর মাংস কোমলতা, স্বাদ ও কম চর্বির জন্য বিখ্যাত, আর এর চামড়া চামড়াজাত পণ্যের জন্য দেশে-বিদেশে সমাদৃত।

লাল মাংস, চর্বি ও স্বাস্থ্য
স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষগুলো খাসির মাংসকে লাল মাংস হিসেবেই গণ্য করে। ২০১৫ সালের ২৬ অক্টোবর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ক্যানসার গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যানসার (আইএআরসি) জানায়, ১০টি দেশের ২২ জন বিশেষজ্ঞের একটি কার্যনির্বাহী দল ৮০০-র বেশি গবেষণা পর্যালোচনা করে লাল মাংস খাওয়াকে মানুষের জন্য সম্ভাব্য ক্যানসার সৃষ্টিকারী (গ্রুপ ২এ) হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করেছে। এই সম্পর্ক মূলত দেখা গেছে কোলোরেক্টাল বা বৃহদন্ত্রের ক্যানসারের ক্ষেত্রে, তবে অগ্ন্যাশয় ও প্রোস্টেট ক্যানসারের সঙ্গেও সম্পর্ক দেখা গেছে। প্রক্রিয়াজাত মাংসকে শ্রেণিভুক্ত করা হয় মানুষের জন্য ক্যানসার সৃষ্টিকারী (গ্রুপ ১) হিসেবে। আইএআরসির সংজ্ঞায় লাল মাংস মানে স্তন্যপায়ী প্রাণীর সব ধরনের পেশির মাংস, যেমন গরু, বাছুর, শূকর, ভেড়ার বাচ্চা, ভেড়া, ঘোড়া ও ছাগলের মাংস। সংস্থাটির পরিচালক ক্রিস্টোফার ওয়াইল্ড তখন বলেন, এই ফল মাংস খাওয়া সীমিত রাখার প্রচলিত জনস্বাস্থ্য পরামর্শকে আরও সমর্থন করে; একই সঙ্গে তিনি বলেন, লাল মাংসের পুষ্টিমূল্যও আছে।
যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা এনএইচএসের নির্দেশনা, যা সর্বশেষ পর্যালোচিত হয় ২০২৪ সালের মে মাসে, অনুযায়ী লাল মাংস থেকে আয়রন, জিংক ও ভিটামিন বি পাওয়া যায়, আর খাদ্যে ভিটামিন বি১২-এর প্রধান উৎসগুলোর একটি মাংস; এনএইচএস লাল মাংসের তালিকায় ছাগল ও ভেড়ার মাংসের নাম রেখেছে। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কেউ দিনে ৯০ গ্রামের (রান্না করা অবস্থার ওজন) বেশি লাল বা প্রক্রিয়াজাত মাংস খেলে তা কমিয়ে ৭০ গ্রামে আনা উচিত, আর কোনো দিন বেশি খেলে পরের দিনগুলোতে কম খাওয়া যায়। এনএইচএস সতর্ক করেছে, কিছু মাংসে সম্পৃক্ত চর্বি বেশি থাকে, যা বেশি খেলে রক্তে কোলেস্টেরল বাড়াতে পারে; তাই রান্নার আগে দৃশ্যমান চর্বি কেটে ফেলা, বাড়তি চর্বি বা তেল এড়ানো এবং স্টু ও তরকারিতে মাংসের একাংশের বদলে সবজি ও ডাল ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বাস্থ্যকর খাদ্যবিষয়ক তথ্যপত্র, যা হালনাগাদ হয় ২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি, প্রাপ্তবয়স্কদের দৈনিক মোট শক্তির ৩০ শতাংশ বা তার কম চর্বি থেকে নিতে বলে; সম্পৃক্ত চর্বি ১০ শতাংশের বেশি নয়, আর ট্রান্স ফ্যাট ১ শতাংশের কম। মাছ, বাদাম এবং সূর্যমুখী, সয়াবিন, ক্যানোলা ও জলপাই তেলের মতো অসম্পৃক্ত চর্বিকে সংস্থাটি চর্বিযুক্ত মাংস, মাখন, ঘি ও লার্ডের সম্পৃক্ত চর্বির চেয়ে ভালো বলেছে, এবং জানিয়েছে ছাগলের মতো জাবরকাটা প্রাণীর মাংস ও দুধজাত খাবারে প্রাকৃতিকভাবে ট্রান্স ফ্যাট থাকে। তথ্যপত্রে মাংসের দৃশ্যমান চর্বি ছেঁটে ফেলা এবং ভাজার বদলে ভাপে বা সেদ্ধ করে রান্নার পরামর্শ আছে; প্রাপ্তবয়স্কদের দিনে ৫ গ্রামের কম লবণ খেতে বলা হয়েছে; আর বলা হয়েছে, অনেক প্রাপ্তবয়স্কের জন্য উদ্ভিজ্জ আমিষের দিকে ঝোঁকা, বিশেষ করে লাল মাংস থেকে সরে আসা, স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে। হৃদ্রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ কোলেস্টেরল, ডায়াবেটিস বা কিডনির রোগ থাকলে মসলাদার তেলে রাঁধা মাংস কত ঘন ঘন খাওয়া যায়, তা নিজের চিকিৎসকের কাছ থেকে জেনে নিন।
কাঁচা মাংস ও বেঁচে যাওয়া খাবার নিরাপদে রাখা
এনএইচএস রান্নার আগে কাঁচা মাংস ধোয়ার বিরুদ্ধে পরামর্শ দেয়। সংস্থাটির ভাষায়, কেউ কেউ রান্নার আগে মাংস ধুয়ে নেন, কিন্তু এতে আসলে খাদ্যে বিষক্রিয়ার ঝুঁকি বাড়ে, কারণ পানির ছিটা আশপাশের জায়গায় পড়ে সেখানে ব্যাকটেরিয়া ছড়িয়ে দিতে পারে। যাঁরা রেসিপির ধোয়ার ধাপগুলো মেনে চলবেন, তাঁরা সাবধানে ধুয়ে, ছিটা অন্য খাবার থেকে দূরে রেখে এবং পরপরই সিংক, রান্নার জায়গা ও হাত পরিষ্কার করে এই ঝুঁকি কমাতে পারেন; বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার 'নিরাপদ খাবারের পাঁচটি চাবিকাঠি'-ও এমন পরিচ্ছন্নতার কথা বলে।
এই পাঁচটি চাবিকাঠি হলো: পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা; কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখা; পুরোপুরি রান্না করা; খাবার নিরাপদ তাপমাত্রায় রাখা; এবং নিরাপদ পানি ও কাঁচামাল ব্যবহার করা। এ ধরনের রান্নার ক্ষেত্রে ডব্লিউএইচওর পোস্টারে যে পরামর্শগুলো আছে, তার মধ্যে রয়েছে:
- খাবার ধরার আগে এবং রান্নার সময় বারবার হাত ধোয়া, আর রান্নায় ব্যবহৃত সব জায়গা ও সরঞ্জাম ধুয়ে জীবাণুমুক্ত করা।
- কাঁচা মাংস অন্য খাবার থেকে আলাদা রাখা এবং কাঁচা খাবারের জন্য আলাদা ছুরি ও কাটার বোর্ড ব্যবহার করা।
- স্টু বা ঝোলজাতীয় খাবার ফুটিয়ে নেওয়া, যাতে তাপমাত্রা ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়; মাংসের ক্ষেত্রে রস যেন স্বচ্ছ হয়, গোলাপি নয়, তা নিশ্চিত করা।
- রান্না করা খাবার ঘরের তাপমাত্রায় ২ ঘণ্টার বেশি ফেলে না রাখা; দ্রুত ফ্রিজে রাখা, সম্ভব হলে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে; আর পরিবেশনের আগ পর্যন্ত খাবার ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রায় গরম রাখা।
- রান্না করা খাবার আবার ভালোভাবে গরম করা, আর হিমায়িত খাবার ঘরের তাপমাত্রায় রেখে বরফ না গলানো।
এনএইচএস আরও বলে, কাঁচা মাংস পরিষ্কার, মুখবন্ধ পাত্রে ফ্রিজের সবচেয়ে নিচের তাকে রাখতে হবে, যাতে এর রস অন্য খাবারে না পড়ে; রান্না করা মাংস সঙ্গে সঙ্গে না খেলে দ্রুত ঠান্ডা করে ফ্রিজে বা ডিপ ফ্রিজে রাখতে হবে; আর রান্না করা মাংস একবারের বেশি গরম করা উচিত নয়।
ছবি: Satwik Cuttack / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাপিডিয়া (বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি), ইউনাইটেড নিউজ অব বাংলাদেশ (ইউএনবি), যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (ইমপোর্ট অ্যালার্ট ২৬-০৪), ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব মলিকুলার সায়েন্সেস (রহমান ও অন্যান্য, ২০২৪), মলিকিউলস (গালান্তি ও অন্যান্য, ২০২৩), ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যানসার (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা), যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা (এনএইচএস), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা





মন্তব্য
(০)