ঐতিহ্যবাহী দেশি মুরগির মাংসের স্বাদ ফিরিয়ে আনতে উন্নত জাতের একটি মুরগি উদ্ভাবনের কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই)। ২০২০ সালের ২৭ জুন এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, মুরগিটি দেখতে অবিকল দেশি মুরগির মতো এবং বাংলাদেশের আবহাওয়ায় অত্যন্ত উপযোগী। বিএলআরআইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, এ জাতের মুরগির রোগবালাই কম হয় বলে পালনে ওষুধের ব্যবহারও অনেক কম, ফলে মাংস বেশি সুস্বাদু ও নিরাপদ। মুরগিটি বাজারজাত করতে আফতাব হ্যাচারি লিমিটেডের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করেছে বিএলআরআই। আপাতত জাতটির নাম রাখা হয়েছে "বিএলআরআই মাল্টি কালার টেবিল চিকেন"।
সেদিনই খবরটি প্রকাশ করে জাগো নিউজ ২৪, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ও দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস। বিএলআরআই জানায়, স্বল্পতম সময়ের মধ্যেই মুরগিটি বাজারে আসবে এবং চুক্তি অনুযায়ী কেবল আফতাব হ্যাচারিই তা বিক্রি করবে। বাণিজ্যিক ব্র্যান্ড নাম তখনো চূড়ান্ত হয়নি।
নতুন মুরগি নিয়ে বিএলআরআই যা বলেছে
বিএলআরআইয়ের বক্তব্য তিনটি দাবির ওপর দাঁড়িয়ে, যার সবগুলোই প্রতিষ্ঠানটির নিজের, সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দেওয়া এবং কোম্পানির কর্মকর্তাদের মুখে পুনরাবৃত্ত: মুরগিটি দেখতে দেশি মুরগির মতো, দেশের আবহাওয়ার উপযোগী, আর অসুখ কম হয় বলে ওষুধ কম লাগে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ভাষায়, লক্ষ্য হলো দেশি মুরগির স্বাদ ফিরিয়ে আনা এবং সেই সঙ্গে স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ একটি পণ্য দেওয়া। দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস লিখেছে, জাতটি বাংলাদেশের জলবায়ুর উপযোগী, এতে রোগ সংক্রমণের হার কম এবং ওষুধের প্রয়োজনও কম।
বিএলআরআইয়ের মহাপরিচালক ড. নাথুরাম সরকার এর পেছনের যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের মধ্যে দেশি মুরগির মাংসের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে, অথচ দেশি মুরগি বিলুপ্তপ্রায়। দেশি মুরগির মাংসের চাহিদা মেটাতে বিগত কয়েক বছরে সোনালি জাতের মুরগির প্রতি ভোক্তাদের আগ্রহ বেড়েছে। কিন্তু সোনালি মুরগির মূল জাত সংরক্ষণ না করায় রোগবালাই আগের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে। তাঁর ভাষ্যে, এতে একদিকে সোনালি মুরগিতে ওষুধের ব্যবহার বেড়েছে, অন্যদিকে নিরাপদ মুরগির মাংসের প্রাপ্যতা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে; এমন পরিস্থিতিতে নিরাপদ মাংস ও দেশি স্বাদের চাহিদা মেটাতে নতুন জাতটি উদ্ভাবন করা হয়েছে। দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি বলেন, সোনালির নির্দিষ্ট কোনো জাতবৈশিষ্ট্য না থাকায় রোগের সমস্যা দেখা দিয়েছে এবং খামারিরা যথেচ্ছভাবে ওষুধ ব্যবহার করছেন।
২০২০ সালের ২৭ জুনের প্রতিবেদনগুলোতে নতুন মুরগির বৃদ্ধির হার, জবাইয়ের সময়ের ওজন, খাদ্য গ্রহণ বা মাঠপর্যায়ের কোনো পরীক্ষার ফল উল্লেখ ছিল না, তাই এ প্রতিবেদনেও এমন কোনো সংখ্যা নেই। সেদিন যা ঘোষণা করা হয় তা হলো মুরগিটির উদ্ভাবন, এর অস্থায়ী নাম এবং বাজারজাতকরণের চুক্তি।
আফতাব হ্যাচারির সঙ্গে চুক্তি
নতুন জাতের এ মুরগি নিয়ে শুক্রবার আফতাব কার্যালয়ে একটি সভা হয়। সেখানে আফতাব বহুমুখী ফার্মসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলে রহিম খান শাহরিয়ার বলেন, ভোক্তার চাহিদা বিবেচনায় দীর্ঘদিন ধরেই এ ধরনের একটি নির্ভরযোগ্য জাতের মুরগির প্রত্যাশা করছিল আফতাব হ্যাচারি। তিনি জানান, তাঁদের মূল লক্ষ্য ছিল দেশি মুরগির স্বাদ ফিরিয়ে আনা, অর্থাৎ এমন একটি জাত উদ্ভাবন করা, যা বাংলাদেশের আবহাওয়ার উপযোগী এবং রোগবালাই সহিষ্ণু।
প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক (বিক্রয়) জি এইচ এন এরশাদ বলেন, খুব সহজেই এ মুরগি পালন করা যায় এবং দেশি মুরগির তুলনায় মাংসের পরিমাণও অনেক বেশি। তাঁর আশা, এ মুরগি দেশের খামারিদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলবে। তিনি জানান, জাতটিকে প্রাথমিকভাবে "বিএলআরআই মাল্টি কালার টেবিল চিকেন" নাম দেওয়া হলেও অচিরেই এর একটি ব্র্যান্ড নাম চূড়ান্ত করা হবে।
আফতাব বহুমুখী ফার্মসের হেড অব মার্কেটিং নুরুল মোর্শেদ খান বলেন, সোনালি জাতের মুরগিও সংকরায়নের মাধ্যমে দেশেই উদ্ভাবন করা হয়েছিল, কিন্তু এর পিওরলাইন বা বিশুদ্ধ ধারা সংরক্ষণ না করায় বছরের পর বছর অন্তঃপ্রজননের (ইনব্রিডিং) ফলে রোগজীবাণুর সংক্রমণ অনেক বেড়ে গেছে, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি ও ক্ষতির আশঙ্কা বাড়িয়েছে। তিনি জানান, বিএলআরআইয়ের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি অনুযায়ী কেবল আফতাব হ্যাচারির মাধ্যমেই এ জাতের মুরগি বাজারজাত করা হবে।
সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান জাত উদ্ভাবন করবে আর বেসরকারি হ্যাচারি তার বাচ্চা উৎপাদন ও বিক্রি করবে, এ ব্যবস্থা দেশের বাণিজ্যিক পোল্ট্রি শিল্পের কাঠামোর সঙ্গে মেলে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) জন্য ফ্রান্স ডলবার্গের তৈরি ২০০৮ সালের বাংলাদেশ পোল্ট্রি খাত পর্যালোচনায় সালেক (২০০৭)-এর বরাতে বলা হয়, বাণিজ্যিক খামারগুলোকে বাচ্চা জোগায় ১৩০টি প্যারেন্ট স্টক খামার ও ৮টি গ্র্যান্ড প্যারেন্ট খামার, আর প্রধান উৎপাদক পাঁচটি হ্যাচারি। পর্যালোচনা অনুযায়ী, ২০০৬ সালে পাঁচটি গ্র্যান্ড প্যারেন্ট খামার ব্রয়লারের প্যারেন্ট একদিন বয়সী বাচ্চার ৬২ শতাংশ উৎপাদন করত, আর সে বছর প্রতি সপ্তাহে উৎপাদন হতো ৫৫ লাখ ৪২ হাজার ব্রয়লার বাচ্চা ও ৪ লাখ ৮৮ হাজার লেয়ার বাচ্চা।

সোনালি মুরগি: যার সঙ্গে তুলনা টেনে নতুন জাতের কথা
সোনালি একটি সংকর জাতের মুরগি, যা রোড আইল্যান্ড রেড মোরগ ও ফাউমি মুরগির মিলনে তৈরি। লাইভস্টক রিসার্চ ফর রুরাল ডেভেলপমেন্ট সাময়িকীতে ২০১৪ সালে প্রকাশিত এম সি সুমি, এম কে আই খান ও এম এম ইসলামের এক গবেষণাপত্রে বলা হয়, জাতটি গ্রামের মানুষের জন্য তৈরি এবং বাড়ির আঙিনায় বা আধা-মুক্ত (সেমি-স্ক্যাভেঞ্জিং) পদ্ধতিতে পালন করা হয়। এ পদ্ধতিতে সোনালি মুরগি বছরে মুরগিপ্রতি ১১৯টি (রহমান ও অন্যান্য, ১৯৯৭) এবং ১৩১টি (খান ও অন্যান্য, ২০০৭) ডিম দিয়েছে বলে নথিভুক্ত হয়েছে, যা রোড আইল্যান্ড রেডের সঙ্গে স্থানীয় হিলি মুরগির সংকরের চেয়ে বেশি।
দ্য পোল্ট্রি সাইট ২০১৫ সালের জুলাইয়ে এফএওর একটি সমীক্ষার সারসংক্ষেপ প্রকাশ করে, যাতে সোনালির বিস্তারের ইতিহাস রয়েছে। ১৯৯৬ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে দাতা সংস্থার অর্থায়নে পরিচালিত কর্মসূচির মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলে জাতটির প্রচলন হয়; এর মধ্যে ছিল ক্ষুদ্র খামারি প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্প (এসএলডিপি) ও অংশগ্রহণমূলক প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্প (পিএলডিপি), যেগুলো ১৯৯২ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত চলে এবং প্রায় ১০ লাখ নারী এতে যুক্ত ছিলেন। সমীক্ষায় বলা হয়, সোনালি দেখতে অনেকটা দেশি মুরগির মতো, দেশের পরিবেশের সঙ্গে ভালোভাবে খাপ খায় এবং অন্য জাতের তুলনায় কম যত্ন লাগে, ফলে নারী ও শিশুরাও সহজে পালন করতে পারে। ২০১০ সালে প্রায় ১৫ কোটি ৯ লাখ সোনালি একদিন বয়সী বাচ্চা উৎপাদিত হয়, যা দেশের বাণিজ্যিক ব্রয়লার ও লেয়ার উৎপাদনের প্রায় ৩৫ শতাংশ।
একই সমীক্ষা অনুযায়ী, ব্যবসায়ীরা দেশি মুরগির চেয়ে সোনালির জন্য বেশি দাম দিতেন এবং খামারিরাও দেশি জাতের চেয়ে সোনালিকে বেশি পছন্দ করতেন। সোনালির মাংস বাণিজ্যিক ব্রয়লারের মাংসের প্রায় দ্বিগুণ দামে বিক্রি হতো এবং দামের ওঠানামাও এতে কম প্রভাব ফেলত। রঙিন মুরগির চাহিদা মেটাতে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারিরা বাণিজ্যিকভাবে সোনালি পালন শুরু করেন। সমীক্ষায় দুর্বলতাও চিহ্নিত হয়: সোনালির জীবন্ত ওজন বাণিজ্যিক ব্রয়লারের চেয়ে কম, খাওয়ার ডিম উৎপাদনে এটি কম উপযোগী, আর অন্তঃপ্রজনন ও অপরিকল্পিত সংকরায়ন জাতটির জন্য ঝুঁকি। সমীক্ষায় জোর দিয়ে বলা হয়, প্রতিটি উৎপাদন পদ্ধতিতে জৈব নিরাপত্তা ও টিকাদান, বিশেষ করে উচ্চ সংক্রামক বার্ড ফ্লুর বিরুদ্ধে সুরক্ষা অপরিহার্য।
২০২০ সালের জুনের বক্তব্যগুলোর পটভূমি এই সতর্কবার্তা: বিএলআরআইয়ের মহাপরিচালক ও আফতাবের হেড অব মার্কেটিং দুজনেই সোনালির যে রোগবালাইয়ের কথা বলেছেন, তার কারণ হিসেবে বিশুদ্ধ ধারা সংরক্ষণ না করাকে দায়ী করেছেন।

সোনালির পেছনের দুই মূল জাত
রোড আইল্যান্ড রেড একটি মার্কিন জাত এবং যুক্তরাষ্ট্রের রোড আইল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের রাজ্য-পাখি। ঊনবিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে রোড আইল্যান্ড ও ম্যাসাচুসেটসে প্রাচ্যের বিভিন্ন জাতের সঙ্গে ইতালির বাদামি লেগহর্নের সংকরায়নে জাতটি তৈরি হয়। শুরুতে এটি মাংস ও ডিম দুটোর জন্যই পালিত হতো; ১৯৪০ সালের দিক থেকে প্রজননকারীরা ডিমপাড়ার দিকে বেশি মনোযোগ দেন, আর প্রথাগত ধরনের মুরগি বছরে ২০০ থেকে ৩০০টি বাদামি ডিম দেয়। প্রমিত আকারের মোরগের ওজন প্রায় ৩.৯ কেজি ও মুরগির প্রায় ৩ কেজি, আর পালকের রং গাঢ় লাল থেকে প্রায় কালো পর্যন্ত হয়।
ফাউমি মিসরের একটি জাত, যার নাম এসেছে কায়রোর দক্ষিণ-পশ্চিমের ফাইয়ুম প্রদেশ থেকে; এটিকে প্রাচীন জাত বলে মনে করা হয়। জাতটি ছোট আকারের: প্রমিত মোরগের ওজন ১.৩৫ থেকে ১.৮ কেজি এবং মুরগির ০.৯ থেকে ১.৬ কেজি। এটি কষ্টসহিষ্ণু, গরম আবহাওয়ার জন্য উপযোগী এবং নিজে খাবার খুঁটে খেতে পারদর্শী; মুরগি সাড়ে চার মাস বয়স থেকে ছোট সাদা বা ক্রিম রঙের ডিম দিতে শুরু করে। ১৯৪০-এর দশকে মিসর থেকে এর ডিম যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ে নেওয়া হয়েছিল, কারণ ধারণা করা হতো মিসরীয় এ জাতের ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধের ক্ষমতা বেশি।
ফলে সোনালি দুটি বিদেশি জাতের জিন বহন করলেও তার রং ও চেহারা গ্রামের মুরগির মতো। এফএওর সমীক্ষা বলেছে, সোনালি দেখতে অনেকটা দেশি মুরগির মতো, আর ক্রেতারা ব্রয়লারের চেয়ে এর জন্য বেশি দাম দিতেন; ২০২০ সালের জুনে বিএলআরআই ও আফতাব দুই পক্ষই জানায়, নতুন মুরগিটিও দেখতে দেশি মুরগির মতো।

গ্রামবাংলার দেশি মুরগি
যে দেশি মুরগির স্বাদ ফেরানোর কথা বলা হয়েছে, সেটি গ্রামের উঠানের মুরগি। এফএওর ২০০৮ সালের পর্যালোচনা অনুযায়ী, গ্রামের প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পরিবার হাঁস-মুরগি পালন করে, আর অতিদরিদ্র পরিবারগুলো সাধারণত হাঁস-মুরগি ছাড়া অন্য কোনো প্রাণী রাখে না। গ্রামের ঝাঁকগুলো ছোট, তিন থেকে দশটি মুরগির; হুক (১৯৯৯)-এর বরাতে বলা হয়, একটি মুরগি বছরে ৪০ থেকে ৬০টি ডিম দেয়, তবে বাছাইয়ের মাধ্যমে তা ১২০টি পর্যন্ত বাড়ানো যায়। পর্যালোচনার হিসাবে, এ পদ্ধতিতে প্রায় ১৪ কোটি মুরগি পালিত হয়, যার দেখভাল মূলত নারীরা করেন; এগুলো আংশিকভাবে পরিবারের খাবার আর আংশিকভাবে বিক্রির জন্য। বাণিজ্যিক ব্রয়লার ও ডিমের তুলনায় এ পদ্ধতির মাংস ও ডিম বেশি দামে বিক্রি হয়।
কৃষিসম্পদের মধ্যে হাঁস-মুরগির মালিকানাই সবচেয়ে সমভাবে বণ্টিত। পর্যালোচনায় আলম (২০০৮)-এর বরাতে বলা হয়, ১৯৯৬ সালের কৃষিশুমারির তথ্য ধরে অসমতার পরিমাপক জিনি সহগ জমির ক্ষেত্রে ০.৬৬, গবাদিপশুর ক্ষেত্রে ০.৩৭ এবং হাঁস-মুরগির ক্ষেত্রে মাত্র ০.১৭।
উন্নয়ন কর্মসূচিগুলো এর ওপর ভিত্তি করেই গড়ে ওঠে। গত শতকের সত্তরের দশকের শেষ দিকে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির সহায়তায় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (ডিএলএস) ও বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক একটি আধা-মুক্ত পোল্ট্রি মডেল তৈরি করে। এতে সাতটি উদ্যোগ যুক্ত: মডেল ব্রিডার, মিনি হ্যাচারি, বাচ্চা পালনকারী, কি-রিয়ারার, পোল্ট্রি কর্মী, খাদ্য বিক্রেতা ও ডিম সংগ্রাহক। মডেলটি তিনটি বড় জাতীয় প্রকল্পে ব্যবহৃত হয়: ক্ষুদ্র খামারি প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্প-১ (১৯৯২-১৯৯৮), অংশগ্রহণমূলক প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্প (১৯৯৮-২০০২) এবং ক্ষুদ্র খামারি প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্প-২ (১৯৯৯-২০০৩)। এগুলোতে সহায়তা দেয় ড্যানিডা, ইফাদ, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, সরকার ও বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা। এসব প্রকল্পের প্রথম লক্ষ্য উৎপাদন বাড়ানো নয়, বরং নারীদের দারিদ্র্য কমানো।
জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া জানায়, উন্নত জাতের তুলনায় দেশি মুরগি মাংস ও ডিম কম দেয়, এ কারণেই বাণিজ্যিক খামারগুলো উন্নত জাতের দিকে ঝুঁকেছে; তবে দেশি জাতে ফাউল প্যারালাইসিস রোগ কম হয়। বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, গ্রামাঞ্চলে মুরগির মৃত্যুর প্রধান কারণ রানীক্ষেত (নিউক্যাসল) রোগ; ফাউল টাইফয়েড গ্রীষ্মে এবং ফাউল পক্স শীতে বেশি দেখা যায়।

ঘোষণার আগে দেশের পোল্ট্রি খাত
২০২০ সালের অনেক আগেই দেশে হাঁস-মুরগির সংখ্যা ছিল বিশাল। এফএওর পর্যালোচনায় বিশ্লেষিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০০৫ সালের কৃষি নমুনা জরিপে প্রায় ১৮ কোটি ৮০ লাখ হাঁস-মুরগি গণনা করা হয়, যার অর্ধেকের বেশি ছিল ঢাকা ও রাজশাহী বিভাগে। দুই বিভাগের পালন পদ্ধতি ছিল একেবারে আলাদা: রাজশাহী বিভাগে মাত্র ৯.৪ শতাংশ মুরগি ছিল বাণিজ্যিক খামারের, আর ঢাকা বিভাগে ৫৩.৩ শতাংশ, কারণ রাজধানীর মাংস ও ডিমের চাহিদা সেখানে উৎপাদন বাড়িয়েছে।
এরপর উৎপাদন দ্রুত বাড়ে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ২০১৯ সালের ১২ অক্টোবর জানায়, ২০০৯ অর্থবছরে ৪৯৬ কোটি থেকে বেড়ে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ডিম উৎপাদন দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭১১ কোটিতে। ডেইলি স্টার ২০১৯ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ডিএলএসের বরাতে জানায়, ২০০৯-১০ থেকে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের মধ্যে মাংস উৎপাদন ৪৯৬ শতাংশ এবং ডিম উৎপাদন ১৯৮ শতাংশ বেড়েছে, মাংসের প্রবৃদ্ধিতে এগিয়ে মুরগি, আর দেশ মাংস ও ডিমে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে।
এই প্রবৃদ্ধির পেছনের খামারগুলো অবশ্য কঠিন সময়ও পার করেছে। দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের হিসাবে ২০১৯ সালের আগস্ট পর্যন্ত নিবন্ধিত পোল্ট্রি খামার ছিল ৮১ হাজার ৪২৫টি: ব্রয়লার ৫৪ হাজার ৪১১টি, লেয়ার ১৮ হাজার ৯৫৪টি ও হাঁসের খামার ৭ হাজার ৮২৯টি। পত্রিকাটি এক গবেষণার বরাতে জানায়, রোগের প্রাদুর্ভাবসহ নানা সমস্যায় খামারের সংখ্যা ২০০৭ সালের ১ লাখ ১৫ হাজার থেকে ২০১৩ সালে ৫৫ হাজারে নেমে আসে; ২০০৭, ২০০৯ ও ২০১১ সালে বার্ড ফ্লু আঘাত হানে। একই প্রতিবেদনে বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম মহাসচিব খন্দকার মো. মহসিন বলেন, খাতটি কঠিন সময় পার করছে এবং চলতি মূলধনের অভাবে ছোট ও মাঝারি খামারগুলো ব্যবসা ছেড়ে দিচ্ছে।
পোল্ট্রিতে ওষুধের ব্যবহার ও খাদ্য আইনের বিধান
কম ওষুধে পালনযোগ্য মুরগির যে প্রতিশ্রুতি বিএলআরআই দিয়েছে, তা গবেষকদের নথিভুক্ত একটি সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে ভেটেরিনারি ওয়ার্ল্ড সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জান্নাতুল ফেরদৌস ও তাঁর সহকর্মীরা ২০১৭ সালের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে ময়মনসিংহ জেলার সাতটি উপজেলার ১২০টি ছোট লেয়ার খামারে জরিপ চালান। তাঁরা সাতটি শ্রেণির ১০টি অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার পান; সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছিল সিপ্রোফ্লক্সাসিন, এনরোফ্লক্সাসিন, অ্যামোক্সিসিলিন ও অক্সিটেট্রাসাইক্লিন। বেশির ভাগ খামারি (৭৫.৮৩ শতাংশ) পানির সঙ্গে ওষুধ দিতেন, আর ১৮.৩৪ শতাংশ কোনো ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই নিজেরা ওষুধ প্রয়োগ করতেন।
গবেষকেরা লেখেন, বাংলাদেশের লেয়ার খামারে নির্বিচার ও বিবেচনাহীন অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার একটি সাধারণ চর্চা, এবং এ ধরনের ব্যবহারই অবশিষ্টাংশ ও অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণুর সমস্যার জন্য দায়ী। তাঁরা কঠোর জৈব নিরাপত্তা, খামারি ও সংশ্লিষ্টদের শিক্ষা, জাতীয় অবশিষ্টাংশ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি, নিয়মিত বিক্রির তথ্য সংগ্রহ এবং ব্যবস্থাপত্র-সংক্রান্ত আইনের প্রয়োগের সুপারিশ করেন। তাঁরা এ-ও উল্লেখ করেন, নমুনা ছোট এবং একটি জেলার, তাই তা পুরো শিল্পের প্রতিনিধিত্ব করে না।
আইনেও একটি সীমা টানা ছিল। মৎস্যখাদ্য ও পশুখাদ্য আইন, ২০১০-এর ১৪ ধারায় বলা হয়েছে, মৎস্যখাদ্য ও পশুখাদ্যে অ্যান্টিবায়োটিক, গ্রোথ হরমোন, স্টেরয়েড ও কীটনাশকসহ অন্যান্য ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করা যাবে না, এবং এ বিধান লঙ্ঘন আইনের অধীন অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। অসুস্থ মুরগির চিকিৎসা আলাদা বিষয়; এ জন্য প্রতিটি উপজেলায় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর খামারিদের সেবা দেয়।
অর্থাৎ ২০২০ সালের জুনে নতুন মুরগিতে কম ওষুধ লাগার কথাটি ছিল বিএলআরআইয়ের নিজের উদ্ভাবিত জাত সম্পর্কে তাদের বক্তব্য, প্রকাশিত কোনো পরীক্ষার ফল নয়; আর সেটি এসেছিল এমন একটি সমস্যার জবাব হিসেবে, যা শিল্প, নিয়ন্ত্রক ও গবেষক সবাই স্বীকার করতেন।
বিএলআরআই ও তার আগের মুরগির জাত
বিএলআরআই প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮৪ সালে ঢাকার সাভারে, দ্য লাইভস্টক রিসার্চ ইনস্টিটিউট অর্ডিন্যান্স, ১৯৮৪ (১৯৮৪ সালের ২৮ নং অধ্যাদেশ, ২৩ এপ্রিল ১৯৮৪) অনুযায়ী। পরে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট আইন, ২০১৮ (২০১৮ সালের ৫৩ নং আইন, ১৪ নভেম্বর ২০১৮) ওই অধ্যাদেশ রহিত করে; নতুন মুরগির ঘোষণার সময় এ আইনই বলবৎ ছিল। আইনের ১০ ধারায় ইনস্টিটিউটের কার্যাবলির তালিকা রয়েছে; এর মধ্যে আছে দুধ, মাংস ও কর্ষণ শক্তি উৎপাদন বৃদ্ধিতে প্রাণিসম্পদের উন্নত জাত এবং ডিম ও মাংসের উৎপাদন বৃদ্ধিতে পোল্ট্রির উন্নত জাত উদ্ভাবন, প্রাণিসম্পদের রোগ দ্রুত শনাক্তকরণের পদ্ধতি উদ্ভাবন, প্রাণী থেকে মানুষে সংক্রমণযোগ্য ও আন্তঃদেশীয় প্রাণিরোগ প্রতিরোধে মানসম্পন্ন টিকা উদ্ভাবন এবং ওয়ান হেলথ বা একস্বাস্থ্য বিষয়ক গবেষণা।
বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায়, সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ী ও বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িতে ইনস্টিটিউটের আঞ্চলিক কেন্দ্র রয়েছে; পোল্ট্রি উৎপাদনসহ এর ছয়টি গবেষণা ও সহায়ক বিভাগ আছে, আর মহাপরিচালকের কাজ তত্ত্বাবধান করে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন একটি বোর্ড। বিএলআরআইয়ের কাজের মধ্যে বাংলাপিডিয়া উল্লেখ করেছে পাবনা জাতের গরু, ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল, মহিষ, গয়াল এবং আধা-মুক্ত পদ্ধতিতে পালিত মুরগির বাছাই প্রজনন কর্মসূচি।
এর আগেও ইনস্টিটিউটটি মুরগির জাত উদ্ভাবন করেছে। ডেইলি স্টার ২০১৫ সালের ৮ মার্চ জানায়, বিএলআরআই "বিএলআরআই লেয়ার স্ট্রেইন-২" বা স্বর্ণা উদ্ভাবন করেছে, যা ২০১১ সালে উদ্ভাবিত "বিএলআরআই লেয়ার স্ট্রেইন-১" বা শুভ্রার পর প্রতিষ্ঠানটির দ্বিতীয় লেয়ার জাত। শুভ্রা সাদা ডিম দেয়, স্বর্ণা বাদামি। স্বর্ণার বাচ্চা ফোটার দিনই লিঙ্গ আলাদা করা যায়: সাদা বাচ্চা মোরগ আর বাদামি বাচ্চা মুরগি; অন্য জাতে মোরগ-মুরগি চিনতে খামারিদের সাধারণত ১০ থেকে ১২ সপ্তাহ লাগে। বিএলআরআইয়ের পোল্ট্রি উৎপাদন গবেষণা বিভাগের তৎকালীন প্রধান মো. সাজেদুল করিম সরকারের হিসাবে, এতে একজন খামারি ১০ সপ্তাহে প্রতি ১ হাজার মুরগিতে ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত সাশ্রয় করতে পারেন। জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) সহায়তায় জাতটি উদ্ভাবিত হয়, টাঙ্গাইল, জামালপুর ও বরিশালে খামারিদের সঙ্গে এর পরীক্ষা হয়, আর প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মাধ্যমে তা সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার কথা ছিল।
ওই দুটি ছিল ডিমপাড়া মুরগি। ২০২০ সালের জুনে ঘোষিত মুরগিটি, নামেই যেমন বোঝা যায়, একটি টেবিল চিকেন অর্থাৎ মাংসের জন্য উদ্ভাবিত জাত, আর এর একমাত্র বিক্রেতা হিসেবে নাম এসেছে আফতাব হ্যাচারির।
ছবি: TawsifSalam / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, দ্য ডেইলি স্টার, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), দ্য পোল্ট্রি সাইট, লাইভস্টক রিসার্চ ফর রুরাল ডেভেলপমেন্ট, ভেটেরিনারি ওয়ার্ল্ড, বাংলাপিডিয়া, বাংলাদেশ আইন (লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগ), উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)