ঈদুল ফিতরের আগে, ২০২৬ সালের ১৯ মার্চ বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম জাগো নিউজের লাইফস্টাইল বিভাগে ওটস সবজি কাটলেটের একটি রেসিপি প্রকাশিত হয়, যেখানে উৎসবের টেবিলে হালকা নাস্তা হিসেবে এই পদটি রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। কাটলেটটিতে ভেজানো ওটসের সঙ্গে মেশানো হয় সেদ্ধ আলুর ভর্তা আর পেঁয়াজ, আদা ও রসুনের সঙ্গে ভাজা সবজি; এরপর মিশ্রণটি কাটলেটের আকারে গড়ে ডিমে ডুবিয়ে, ব্রেডক্রাম্বে গড়িয়ে বাদামি করে ভাজা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘরে থাকা সাধারণ উপকরণ দিয়েই অল্প সময়ে পদটি তৈরি করা যায় এবং ছোট-বড় সবারই এটি ভালো লাগবে।
ঈদুল ফিতর বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের জন্য রমজান মাসের ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাসব্যাপী রোজার সমাপ্তি চিহ্নিত করে। দিনটি শুরু হয় জামাতে নামাজ দিয়ে, এরপর আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে বেড়ানো, উপহার দেওয়া আর একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া চলে; এ কারণেই ঈদের আগের দিনগুলোতে সংবাদপত্রে ঈদের টেবিলের রেসিপি ছাপা হয়। এই প্রতিবেদনে জাগো নিউজের দেওয়া রেসিপিটি তুলে ধরা হলো, সঙ্গে খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি বিষয়ক কর্তৃপক্ষ এবং তথ্যসূত্র গ্রন্থ থেকে নেওয়া উপকরণগুলোর পরিচয় ও নিরাপদে রান্নার তথ্য যোগ করা হলো।
কাটলেটে যা যা লাগে
রেসিপির ধাপগুলোতে নিচের উপকরণগুলোর নাম এসেছে। প্রতিবেদনের সংরক্ষিত লেখায় উপকরণের পরিমাণ দেওয়া নেই, তাই পরিমাণ রাঁধুনির বিবেচনায় ছেড়ে দেওয়া হলো; রেসিপিতে নিজেই লবণ স্বাদমতো দিতে বলা হয়েছে।
- ওটস, অল্প পানিতে ভিজিয়ে পরে পানি ঝরানো
- আলু, সেদ্ধ করে ভালো করে ভর্তা করা
- সবজি ভাজার জন্য অল্প তেল এবং কাটলেট ভাজার জন্য তেল
- পেঁয়াজকুচি
- আদা-রসুনবাটা
- গাজরকুচি
- ক্যাপসিকামকুচি (মিষ্টি মরিচ)
- গোলমরিচের গুঁড়ো
- কাঁচামরিচকুচি
- স্বাদমতো লবণ
- ধনেপাতাকুচি
- ডিম: মিশ্রণ বাঁধার জন্য অল্প এবং ডুবানোর জন্য আরও কিছুটা
- ওপরের আবরণের জন্য ব্রেডক্রাম্ব
ধাপে ধাপে তৈরির নিয়ম
জাগো নিউজ যে ক্রমে প্রণালী দিয়েছে, সেভাবেই:
- প্রথমে অল্প পানিতে ওটস ভিজিয়ে রাখুন। অন্যদিকে সেদ্ধ আলু ভালো করে ভর্তা করে নিন।
- একটি কড়াইয়ে অল্প তেল গরম করে পেঁয়াজকুচি হালকা করে ভেজে নিন।
- পেঁয়াজ ভাজা হলে আদা-রসুনবাটা দিয়ে একটু কষিয়ে নিন, তারপর গাজরকুচি দিয়ে ৫ মিনিট ভাজুন।
- এবার ক্যাপসিকামকুচি, চটকে রাখা আলু, পানি ঝরানো ওটস, গোলমরিচের গুঁড়ো, কাঁচামরিচকুচি আর স্বাদমতো লবণ দিয়ে ভালোমতো মিশিয়ে ৫ মিনিট ভেজে চুলা থেকে নামিয়ে নিন।
- ভাজা মিশ্রণে ধনেপাতাকুচি আর অল্প ডিম দিয়ে ভালো করে মেখে কাটলেটের আকারে গড়ে নিন।
- প্রতিটি কাটলেট ডিমে ডুবিয়ে ব্রেডক্রাম্বে গড়িয়ে গরম তেলে বাদামি করে ভাজুন।
- ভাজা হয়ে গেলে পছন্দের প্লেটে পরিবেশন করুন।
রেসিপিতে সময়ের উল্লেখ আছে কেবল কড়াইয়ে সবজি ভাজার ক্ষেত্রে: আদা-রসুনবাটা দেওয়ার পর গাজরের জন্য ৫ মিনিট, আর ক্যাপসিকাম, আলু, ওটস ও মসলা দেওয়ার পর আরও ৫ মিনিট। কাটলেট ভাজার জন্য তেলের তাপমাত্রা বা সময় সেখানে দেওয়া নেই; শুধু বলা হয়েছে গরম তেলে বাদামি করে ভাজতে। ডিম নিয়ে এবং ভাজা আলুর খাবার কতটা গাঢ় রঙ পর্যন্ত ভাজা উচিত, সে বিষয়ে খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের পরামর্শ নিচে ভাজা নিয়ে অংশে দেওয়া হলো।
কাটলেট পদটি কোথা থেকে এল
কাটলেট শব্দটি এসেছে ফরাসি শব্দ কোৎলেৎ (côtelette) থেকে, যার মূলে আছে কোৎ (côte), অর্থাৎ পাঁজর। ইউরোপের রান্নাঘরে শুরুতে এর অর্থ ছিল ভেড়া, বাছুর, শূকর বা মুরগির পা কিংবা পাঁজরের মাংসের পাতলা টুকরা, যা প্রায়ই রুটির গুঁড়োয় মুড়িয়ে রান্না করা হতো; পরে কিমা করা মাংসে কাটলেটের আকারে গড়া ক্রোকেট বা প্যাটিকেও কাটলেট বলা শুরু হয়। তথ্যসূত্র গ্রন্থে আরেকটি অর্থের উল্লেখ আছে, যা এই রেসিপির কাছাকাছি: সবজির ভর্তা, সাধারণত আলুর, যা রুটির গুঁড়োর সঙ্গে ভাজা হয়।
ভারতীয় উপমহাদেশের রান্নায় কাটলেট বলতে বোঝায় আলু, গাজর, শিমের মতো সবজির ভর্তা অথবা রান্না করা মাংস বা মাছ, যা পেঁয়াজ, ধনেপাতা ও কাঁচামরিচের মতো মসলার সঙ্গে মিশিয়ে ডিমের মিশ্রণ বা কর্নফ্লাওয়ারে ডুবিয়ে, তারপর ব্রেডক্রাম্বে গড়িয়ে ঘি বা ভোজ্যতেলে ভাজা হয়। ভারতের পূর্বাঞ্চলে, বিশেষ করে কলকাতায়, মুরগি ও খাসির মাংসের কাটলেট জনপ্রিয় নাস্তা। নিরামিষ কাটলেটের পুর হয় আলুর ভর্তা, পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ, মসলা ও লবণ দিয়ে। কাটলেট ঐতিহ্যগতভাবে ডুবো তেলে ভাজা হয়, আর এখানেই আলু টিক্কির মতো সেঁকা প্যাটি থেকে এর পার্থক্য।
জাগো নিউজের ওটস সবজি কাটলেটও এই ধারা মেনে চলে: পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ, গোলমরিচ ও লবণ দিয়ে স্বাদ দেওয়া আলুর ভর্তার ভিত্তি, ডিম ও ব্রেডক্রাম্বের আবরণ, আর গরম তেলে ভাজা। নতুন সংযোজন হলো মিশ্রণে ভেজানো ওটস, সবজির মধ্যে গাজর ও ক্যাপসিকাম, আর স্বাদের জন্য আদা-রসুনবাটা ও ধনেপাতা।
ওটস কী এবং রোলড ওটস কীভাবে তৈরি হয়
ওটস হলো অ্যাভেনা স্যাটাইভা (Avena sativa) নামের দানাশস্যের বীজ। এটি পোয়েসি (Poaceae) পরিবারের একটি ঘাসজাতীয় শস্য, যা পশুখাদ্য ও বীজ দুই উদ্দেশ্যেই চাষ করা হয়। ধারণা করা হয়, গমের মতো প্রথম দিকের চাষ করা শস্যের মাঠে আগাছা হিসেবে ওটসের যাত্রা শুরু, পরে এটি আলাদা ফসলে পরিণত হয়। জর্ডান উপত্যকায় প্রাক-মৃৎপাত্র নবপ্রস্তর যুগের প্রায় ১১,৪০০ থেকে ১১,২০০ বছর আগের একটি শস্যভান্ডারে বুনো ওটের প্রায় ১,২০,০০০ বীজ পাওয়া গেছে, যা পরিকল্পিত চাষের ইঙ্গিত দেয়; আর ইউরোপের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে গৃহপালিত ওটসের দানা দেখা যায় প্রায় ৩,০০০ বছর আগে থেকে। এখন ঘোড়া, গরু ও অন্যান্য জাবরকাটা প্রাণীকে ব্যাপকভাবে ওটস খাওয়ানো হয়; মানুষ মূলত পরিজ হিসেবে খায়, এ ছাড়া বেকারি পণ্য, সকালের সিরিয়াল ও ওট দুধেও এটি ব্যবহৃত হয়।

অন্যান্য দানাশস্যের মতো ওটের দানারও একটি শক্ত, অখাদ্য বাইরের খোসা থাকে, যা খাওয়ার আগে ছাড়াতে হয়। খোসা ছাড়ানোর পর তুষের স্তরসহ যে দানা থাকে, তাকে বলে গ্রোট। তুষের স্তর পুষ্টিকর হলেও এতে দানা চিবানো কঠিন হয়, আর এতে এমন একটি এনজাইম থাকে যা ওটসকে বাসি ও দুর্গন্ধযুক্ত করে তুলতে পারে। তাই গ্রোট সাধারণত ভাপে সেদ্ধ করা হয়: এতে দানা নরম হয়ে দ্রুত রান্না হয় এবং এনজাইম নিষ্ক্রিয় হয়ে ওটস বেশিদিন ভালো থাকে।
রোলড ওটস তৈরি হয় খোসা ছাড়ানো ও ভাপে সেদ্ধ গ্রোট ভারী রোলারের নিচে চেপে চ্যাপ্টা ফ্লেক বানিয়ে, তারপর হালকা সেঁকে স্থিতিশীল করে। এটি অল্প প্রক্রিয়াজাত গোটা শস্যের খাবার। মোটা করে চাপা বা ‘ওল্ড-ফ্যাশনড’ ওটস সাধারণত আস্ত থাকে। কারখানায় আরও পাতলা করে চেপে বেশি ভাপ দিলে ফ্লেকগুলো প্রায়ই ভেঙে যায়, সহজে পানি টানে ও দ্রুত রান্না হয়; এগুলো ‘কুইক’ বা ‘ইনস্ট্যান্ট’ ওটস নামে বিক্রি হয়। স্টিল-কাট বা পিনহেড ওটস আলাদা জিনিস: ভাপ দেওয়ার আগেই ধারালো ব্লেডে কুচি করা গ্রোট, যাতে তুষের স্তরের কিছু অংশ থেকে যায়।
এই প্রক্রিয়াই রেসিপির প্রথম ধাপের ব্যাখ্যা দেয়। রোলড ওটস সহজেই তরল শুষে নেয়; আকার, আকৃতি ও প্রক্রিয়াজাতকরণের ধরন অনুযায়ী পানি বা দুধে এক থেকে ছয় ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখলে আর রান্না ছাড়াই তা খাওয়া যায়। কাটলেটে ওটস অল্প পানিতে অল্প সময় ভেজানো হয়, আর রেসিপিতে পানি ঝরিয়ে তবেই আলু ও সবজির সঙ্গে কড়াইয়ে দেওয়া হয়, যেখানে মিশ্রণটি গড়া ও ভাজার আগে ৫ মিনিট রান্না হয়।

ওটসের আঁশ ও বিটা-গ্লুকান: কর্তৃপক্ষ যা বলে
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) তালিকাভিত্তিক পুষ্টি তথ্য অনুযায়ী, রান্না না করা গোটা ওটসের ১০০ গ্রামে থাকে ৩৭৯ ক্যালরি, প্রায় ১০ গ্রাম খাদ্য আঁশ এবং ৪ গ্রাম বিটা-গ্লুকান, যা একধরনের দ্রবণীয় আঁশ। একই পরিমাণে দুটি বি ভিটামিন, থায়ামিন ও প্যান্টোথেনিক অ্যাসিড, এবং ম্যাঙ্গানিজ ও ফসফরাস খনিজ উচ্চমাত্রায় থাকে।
খাদ্যের মোড়কে লেখা স্বাস্থ্যদাবির মধ্যে ওটসের দাবিটি সবচেয়ে পরিচিতগুলোর একটি, আর এর কারণ বিটা-গ্লুকান। যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) ১৯৯৭ সালের জানুয়ারিতে এই দাবির অনুমোদন দেয়, যা দেশটির কোড অব ফেডারেল রেগুলেশনসের ২১ নম্বর টাইটেলের ১০১.৮১ ধারায় আছে। এতে কোনো খাদ্য বলতে পারে যে, সম্পৃক্ত চর্বি ও কোলেস্টেরল কম এমন খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে গোটা ওটসের দ্রবণীয় আঁশ হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে পারে। দাবিটি গোটা ওটস বা বার্লি অথবা দুটি মিলিয়ে দৈনিক ৩ গ্রাম বা তার বেশি বিটা-গ্লুকান দ্রবণীয় আঁশ গ্রহণের সঙ্গে যুক্ত, আর দাবি লেখা খাদ্যের প্রতি পরিবেশনে অন্তত ০.৭৫ গ্রাম ওই দ্রবণীয় আঁশ থাকতে হয়।
কোন ওটস পণ্য এর আওতায় পড়বে, বিধিতে তাও নির্ধারিত আছে। শুকনো ওজনের ভিত্তিতে ওট ব্র্যানে অন্তত ৫.৫ শতাংশ বিটা-গ্লুকান ও ১৬ শতাংশ মোট খাদ্য আঁশ থাকতে হয়। রোলড ওটস ও গোটা ওটের আটায় অন্তত ৪ শতাংশ বিটা-গ্লুকান ও অন্তত ১০ শতাংশ মোট খাদ্য আঁশ থাকতে হয়। দাবি করা খাদ্যকে এফডিএর সংজ্ঞা অনুযায়ী কম সম্পৃক্ত চর্বি ও কম কোলেস্টেরলের শর্তও পূরণ করতে হয়।
এই দাবির পেছনের প্রমাণ পর্যালোচনা করা হয় ২৮টি র্যান্ডমাইজড কন্ট্রোলড ট্রায়ালের একটি মেটা-অ্যানালিসিসে, যা ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে আমেরিকান জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশনে প্রকাশ করেন যুক্তরাজ্যের ল্যাঙ্কাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়, অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব উলংগং, এগ্রিকালচার অ্যান্ড অ্যাগ্রি-ফুড কানাডা এবং ইউনিভার্সিটি অব টরন্টোর গবেষকেরা। এতে দেখা যায়, দৈনিক ৩ গ্রাম বা তার বেশি ওট বিটা-গ্লুকান তুলনামূলক খাদ্যাভ্যাসের চেয়ে এলডিএল কোলেস্টেরল লিটারপ্রতি ০.২৫ মিলিমোল এবং মোট কোলেস্টেরল লিটারপ্রতি ০.৩০ মিলিমোল কমিয়েছে, তবে এইচডিএল কোলেস্টেরল বা ট্রাইগ্লিসারাইডে কোনো পরিবর্তন আনেনি। লেখকেরা উল্লেখ করেন, বিশ্বের বিভিন্ন খাদ্যমান সংস্থার অনুমোদিত এ ধরনের দাবিগুলো দৈনিক অন্তত ৩ গ্রাম ওট বিটা-গ্লুকানযুক্ত খাদ্যাভ্যাসের ওপর ভিত্তি করে তৈরি।
এসব ফলাফল সম্পৃক্ত চর্বি কম এমন সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসের ভেতরে ওটস নিয়ে; কোনো একটি পদ নিয়ে নয়, আর তেলে ভাজা এর অংশ নয়। যাঁদের কোলেস্টেরল বেশি, ডায়াবেটিস বা হৃদরোগ আছে, ওটস ও ভাজা নাস্তা তাঁদের নিজের খাদ্যতালিকায় কীভাবে মানাবে, তা নিয়ে চিকিৎসক বা নিবন্ধিত পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সবজিগুলো: আলু, গাজর, ক্যাপসিকাম ও কাঁচামরিচ
কাটলেটের ভিত্তি আলু, সোলানাসি পরিবারের সোলানাম টিউবারোসাম (Solanum tuberosum), যাকে বাংলাপিডিয়া বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান খাদ্য হিসেবে বর্ণনা করেছে। ধারণা করা হয়, ষোড়শ শতকে স্প্যানিশ অভিযাত্রীরা পেরু থেকে আলু স্পেনে নিয়ে যান, আর সপ্তদশ শতকের শুরুতে পর্তুগিজ নাবিকেরা প্রথম ভারতে আলু আনেন; উপমহাদেশে আলুর প্রথম দিকের চাষ হয় কলকাতার আশপাশে। বাংলাদেশে শীতকালে সব জেলায় আলুর চাষ হয়। নভেম্বরের প্রথম পক্ষ সাধারণ রোপণের সময়, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কিছু কৃষক আগাম ফসলের জন্য অক্টোবরেই রোপণ করেন, আর বেশির ভাগ জাতের আলু তোলা হয় ফেব্রুয়ারি-মার্চে; ফলে মার্চে পড়া ঈদ আসে আলু তোলার মৌসুমের শেষ দিকে।
বাংলাপিডিয়া জানায়, আলু শর্করায়, মূলত শ্বেতসারে, সমৃদ্ধ এবং আমিষ, ভিটামিন সি, বি ভিটামিন, পটাশিয়াম, ফসফরাস ও লৌহের ভালো উৎস; এর বেশির ভাগ খনিজ ও আমিষ থাকে খোসার নিচের পাতলা স্তরে, আর খোসা নিজেই আঁশের উৎস। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনের স্বাস্থ্যসেবা মেডলাইনপ্লাস পটাশিয়ামের ভালো উৎস সবজির তালিকায় আলু, বিশেষ করে খোসাসহ আলু, রেখেছে; হৃদ্যন্ত্রের সুস্থতা, পেশির কাজ, হাড়ের স্বাস্থ্য এবং অম্ল-ক্ষারের ভারসাম্যের জন্য শরীরের এই খনিজটি দরকার। বাংলাদেশে প্রায় ২৭টি স্থানীয় জাতের আলুর চাষ হয়, যেগুলো ফলন কম হলেও স্বাদ ও রান্নার গুণের জন্য টিকে আছে; পাশাপাশি নেদারল্যান্ডস থেকে আনা কার্ডিনালের মতো উচ্চফলনশীল জাতও চাষ হয়।

বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী গাজর (Daucus carota) বাংলাদেশের একটি শীতকালীন সবজি, যা খাওয়ার উপযোগী মূলের জন্য ষোড়শ শতক থেকে চাষ হয়ে আসছে। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরে সরাসরি মাঠে বীজ বোনা হয়, তিন মাসের মধ্যে মূল তোলার উপযোগী হয়, আর হেক্টরপ্রতি ফলন ৫ থেকে ৭ টন। বাংলাপিডিয়া গাজরকে চিনি, ক্যারোটিন, ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসে সমৃদ্ধ বলেছে এবং সালাদ, স্যুপ, তরকারি ও জুসে এর ব্যবহারের কথা জানিয়েছে। ক্যারোটিনের গুরুত্ব এই যে বিটা-ক্যারোটিনই সবচেয়ে প্রচলিত প্রোভিটামিন এ। মেডলাইনপ্লাস গাজরের মতো কমলা ও হলুদ সবজিকে ভিটামিন এ-র সবচেয়ে সমৃদ্ধ খাদ্য উৎসের মধ্যে রেখেছে এবং বলেছে, ভিটামিন এ সুস্থ দাঁত, হাড়, নরম টিস্যু, শ্লেষ্মা ঝিল্লি ও ত্বক গঠন ও রক্ষায় সাহায্য করে এবং বিশেষ করে কম আলোয় ভালো দৃষ্টিশক্তিতে ভূমিকা রাখে।
ক্যাপসিকাম, যাকে বেল পেপার বা মিষ্টি মরিচও বলা হয়, ক্যাপসিকাম অ্যানুয়াম (Capsicum annuum) প্রজাতির গ্রসাম গ্রুপের গাছের ফল। এর বিভিন্ন জাতে লাল, হলুদ, কমলা, সবুজ, সাদা ও বেগুনি রঙের ফল হয়; উদ্ভিদবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এগুলো বেরি জাতীয় ফল, তবে রান্নাঘরে সবজি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মরিচের আদি নিবাস মেক্সিকো, মধ্য আমেরিকা, ক্যারিবীয় অঞ্চল ও দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরাংশ; ১৪৯৩ সালে এর বীজ স্পেনে পৌঁছায় এবং সেখান থেকে ইউরোপ ও এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। ২১ থেকে ২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার উষ্ণ, আর্দ্র মাটিতে গাছটি সবচেয়ে ভালো জন্মায়।
রেসিপির কাঁচামরিচ ক্যাপসিকামেরই ঝাল আত্মীয়। বাংলাপিডিয়া মরিচকে (Capsicum frutescens) সোলানাসি পরিবারের, মেক্সিকোর আদি নিবাসের ফসল হিসেবে বর্ণনা করেছে, যা বাংলাদেশে গ্রীষ্ম ও শীত দুই মৌসুমেই প্রায় ৬৬,২৩৫ হেক্টর জমিতে ব্যাপকভাবে চাষ হয়, আর কাঁচামরিচের গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ৫ থেকে ৬ টন। শীতকালীন ফসল হিসেবে এর চাষ বেশি হয় কুমিল্লা, নোয়াখালী, ফরিদপুর, বরিশাল, পটুয়াখালী ও বগুড়ায়; স্থানীয় জাতের মধ্যে আছে বালিজুড়ি, বোনা, সাইটা, সূর্যমুখী, ধানী ও পাটনাই।
ডিম ও ভাজা: খাদ্য নিরাপত্তার পরামর্শ
রেসিপিতে ডিম দুবার লাগে: মিশ্রণ বাঁধতে অল্প, আর ব্রেডক্রাম্বের নিচের আবরণ হিসেবে আরও কিছুটা। এফডিএর পরামর্শ, ডিম ৪০ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তার কম তাপমাত্রায় ফ্রিজে রাখতে হবে, আর কাঁচা ডিম বা কাঁচা ডিমযুক্ত খাবারের সংস্পর্শে আসার আগে ও পরে হাত, বাসনপত্র, সরঞ্জাম ও কাজের জায়গা গরম সাবান-পানিতে ধুতে হবে। ডিমযুক্ত পদ ১৬০ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত রান্না করতে হবে এবং ফুড থার্মোমিটারে তা নিশ্চিত করতে হবে। ডিমযুক্ত খাবার দুই ঘণ্টার বেশি, আর তাপমাত্রা ৯০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের ওপরে থাকলে এক ঘণ্টার বেশি, ফ্রিজের বাইরে রাখা উচিত নয়; বেশি পরিমাণ গরম ডিমের পদ কয়েকটি অগভীর পাত্রে ভাগ করে রাখলে তা দ্রুত ঠান্ডা হয়, আর বেঁচে যাওয়া খাবার পরিবেশনের আগে ১৬৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত ভালো করে গরম করতে হবে।
এসব পরামর্শ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ২০০৬ সালে প্রকাশিত ‘নিরাপদ খাদ্যের পাঁচ চাবিকাঠি’র সঙ্গে মেলে, যার মূল বার্তা হলো: পরিচ্ছন্ন থাকুন; কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখুন; ভালোভাবে রান্না করুন; খাবার নিরাপদ তাপমাত্রায় রাখুন; এবং নিরাপদ পানি ও কাঁচামাল ব্যবহার করুন। ডব্লিউএইচও জানায়, এই বার্তাগুলোর পোস্টার ৮৭টির বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে।
দ্বিতীয় বিষয়টি কাটলেট কতটা বাদামি হবে তা নিয়ে। অ্যাক্রিলামাইড এমন একটি রাসায়নিক, যা ভাজা, রোস্ট বা বেক করার মতো উচ্চ তাপের রান্নায় কিছু খাবারে তৈরি হতে পারে। এটি প্রাকৃতিক শর্করা ও অ্যাসপারাজিন নামের অ্যামিনো অ্যাসিড থেকে তৈরি হয় এবং মূলত উদ্ভিজ্জ খাবারে, বিশেষ করে আলুর তৈরি খাবার ও দানাশস্যের খাবারে, পাওয়া যায়। গবেষণাগারের পরীক্ষায় খাবারে থাকা মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি মাত্রায় অ্যাক্রিলামাইড প্রাণীর দেহে ক্যানসার ঘটিয়েছে, আর খাবারের অনেক কম মাত্রা মানুষের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে কি না, এফডিএ তা নিয়ে গবেষণা করছে বলে জানিয়েছে। সংস্থাটির মূল পরামর্শ হলো ফল, সবজি ও গোটা শস্যপ্রধান এবং সম্পৃক্ত চর্বি, লবণ ও যোগ করা চিনি সীমিত রাখা স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস; অ্যাক্রিলামাইড কমাতে স্বাস্থ্যকর গোটা শস্যের খাবার কমানোর পরামর্শ এফডিএ দেয় না।
যাঁরা অ্যাক্রিলামাইড কমাতে চান, তাঁদের জন্য এফডিএ জানায়, আলু রান্নার বিভিন্ন পদ্ধতির মধ্যে ভাজায় সবচেয়ে বেশি অ্যাক্রিলামাইড তৈরি হয়, আর আলু সেদ্ধ করলে তা একেবারেই তৈরি হয় না। সংস্থাটি আলু ফ্রিজে না রেখে অন্ধকার, ঠান্ডা জায়গায় রাখার পরামর্শ দেয়, কারণ ফ্রিজে রাখা আলু রান্নার সময় বেশি অ্যাক্রিলামাইড তৈরি করতে পারে; কাটা আলুর খাবার বাদামি না করে সোনালি হলুদ রঙ পর্যন্ত ভাজতে বলে; আর খুব বাদামি অংশ এড়িয়ে চলতে বলে, কারণ সেখানেই সবচেয়ে বেশি অ্যাক্রিলামাইড থাকে। এই রেসিপিতে আলু ভর্তা করার আগে সেদ্ধ করা হয়, আর ভাজা হয় কেবল শেষে তৈরি কাটলেট; এফডিএর পরামর্শ অনুযায়ী গাঢ় বাদামি না করে সোনালি রঙ হলেই কাটলেট তেল থেকে তুলে নেওয়া ভালো।
গ্লুটেন, লবণ এবং কাদের সতর্ক থাকা দরকার
গ্লুটেন এড়িয়ে চলা মানুষ প্রায়ই ওটস বেছে নেন, তবে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডায়াবেটিস অ্যান্ড ডাইজেস্টিভ অ্যান্ড কিডনি ডিজিজেস (এনআইডিডিকে) জানায়, সিলিয়াক রোগীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি মিশ্র। গবেষণা বলছে, এই রোগে আক্রান্ত বেশির ভাগ মানুষ পরিমিত পরিমাণে ওটস নিরাপদে খেতে পারেন, কিন্তু গ্লুটেনযুক্ত শস্যের সঙ্গে ওটসের সংস্পর্শ সাধারণ ঘটনা এবং তা তাঁদের জন্য ওটসকে অনিরাপদ করে তুলতে পারে; তাই তাঁরা যে ওটস খাবেন তা গ্লুটেনমুক্ত হতে হবে, আর ওটস খাবেন কি না এবং কতটা খাবেন, তা নিয়ে চিকিৎসক বা নিবন্ধিত পুষ্টিবিদের সঙ্গে কথা বলা উচিত। ওটসে অ্যাভেনিন নামে গ্লুটেনসদৃশ একধরনের আমিষও থাকে, এবং সিলিয়াক রোগীদের একটি ছোট অংশের বিশুদ্ধ ওটসেও প্রতিক্রিয়া হয়।
ব্রেডক্রাম্ব আলাদা বিষয়। গম ও এর বিভিন্ন ধরন, বার্লি ও রাইয়ে প্রাকৃতিকভাবে গ্লুটেন থাকে, আর এনআইডিডিকে গ্লুটেনযুক্ত খাবারের তালিকায় রুটিকে রেখেছে; তাই মিশ্রণে যে ওটসই ব্যবহার করা হোক, সাধারণ গমের রুটির গুঁড়ো দিয়ে তৈরি ব্রেডক্রাম্বে গ্লুটেন থাকে।
এই রেসিপিতে লবণ দেওয়া হয় স্বাদমতো। ডব্লিউএইচও প্রাপ্তবয়স্কদের দৈনিক ২,০০০ মিলিগ্রামের কম সোডিয়াম, অর্থাৎ ৫ গ্রামের কম লবণ বা মোটামুটি এক চা-চামচ, খাওয়ার পরামর্শ দেয় এবং বলে, সোডিয়ামবহুল খাদ্যের প্রধান স্বাস্থ্য প্রভাব উচ্চ রক্তচাপ, যা অন্যান্য অসুখের পাশাপাশি হৃদ্রোগ ও রক্তনালির রোগ এবং কিডনি রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
সিলিয়াক রোগ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ বা খাদ্য অ্যালার্জি থাকলে খাদ্যাভ্যাস বদলানোর আগে কিংবা স্বাস্থ্য উপকারের জন্য কোনো একটি খাবারের ওপর ভরসা করার আগে চিকিৎসক বা নিবন্ধিত পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিন।
ছবি: Biswarup Ganguly / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ, যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (২১ সিএফআর ১০১.৮১; ডিম নিরাপত্তা; অ্যাক্রিলামাইড), আমেরিকান জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশন (হোয়াইটহেড ও অন্যান্য, ২০১৪), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (নিরাপদ খাদ্যের পাঁচ চাবিকাঠি; লবণ কমানো), যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডায়াবেটিস অ্যান্ড ডাইজেস্টিভ অ্যান্ড কিডনি ডিজিজেস, মেডলাইনপ্লাস (ইউএস ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিন), বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)