২০২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি জাগো নিউজ ২৪-এর লাইফস্টাইল বিভাগে পেশোয়ারি গোশতের একটি রেসিপি প্রকাশিত হয়। গরু বা খাসির মাংসের এই পদের নাম এসেছে পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের রাজধানী পেশোয়ার শহর থেকে। রেসিপির মূল ভাবনা হলো, ভালো মানের মাংস, সঠিক সময় আর ধীর আঁচই স্বাদের ভার বহন করতে পারে, তাই রাঁধুনিকে মসলার লম্বা তালিকার ওপর নির্ভর করতে হয় না। মোটা তলার একটি হাঁড়িতে এক চামচ ঘি, টমেটো, আদা, কাঁচা মরিচ, গোলমরিচ, আস্ত আলু ও লবণের সঙ্গে সব মাংস একসঙ্গে দিয়ে ঢেকে রাখা হয়, আর মাংস নরম না হওয়া পর্যন্ত রান্না চলে।
জাগো নিউজ লিখেছিল, এভাবে রান্না করা গোশত ঝাল নয়, কিন্তু গভীর; ভারী নয়, কিন্তু তৃপ্তিকর। রান্নার এই পদ্ধতিকে পত্রিকাটি মাংসের নিজস্ব স্বাদকে সম্মান জানানোর এক উপায় হিসেবে তুলে ধরেছিল। তাদের শিরোনামে বলা হয়েছিল ‘মসলা ছাড়াই’ এত স্বাদের কথা। তবে উপকরণের তালিকায় আসলে কয়েকটি মসলা আছে: গোলমরিচ, আদা, কাঁচা মরিচ ও ধনিয়া পাতা। রেসিপিতে যা বাদ পড়েছে, তা হলো অনেক মাংসের তরকারিতে ব্যবহৃত গুঁড়া মসলার চেনা সারি ও গরম মসলা। এই প্রতিবেদনে প্রকাশিত রেসিপিটি যেমন ছিল তেমনভাবে তুলে ধরা হলো, রান্নার এই ধারা কোথা থেকে এসেছে তা ব্যাখ্যা করা হলো, আর লাল মাংস রান্না ও খাওয়া নিয়ে খাদ্য নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের পরামর্শ যোগ করা হলো।
জাগো নিউজের দেওয়া উপকরণ
রেসিপিটি এক কেজি মাংসের হিসাবে লেখা। কিছু উপকরণের মাপ দেওয়া আছে, বাকিগুলো রাঁধুনির বিবেচনার ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে:
- গরু বা খাসির মাংস ১ কেজি
- ঘি ১ চামচ
- লবণ পরিমাণমতো
- আস্ত আলু কয়েকটি
- কাঁচা মরিচ ২টি
- ধনিয়া পাতা পরিমাণমতো
- আদা কুচি ২ টেবিল চামচ
- টমেটো ২টি
- গোলমরিচ গুঁড়া পরিমাণমতো
- পানি প্রয়োজনমতো
তালিকায় পেঁয়াজ, রসুন, হলুদ, মরিচ গুঁড়া, জিরা, ধনিয়া গুঁড়া বা গরম মসলা নেই। বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া দেশে সাধারণভাবে চাষ হওয়া মসলার মধ্যে আদা, রসুন, হলুদ, পেঁয়াজ, মরিচ ও ধনিয়ার নাম উল্লেখ করেছে। বাংলাপিডিয়া আরও জানায়, লবঙ্গ, গোলমরিচ, দারুচিনি ও এলাচের মিশ্রণ গরম মসলা মূলত বিশেষ মাংসের তরকারি ও ভাতের পদে ব্যবহৃত হয়। এই চেনা মসলার সারি থেকে পেশোয়ারি রেসিপিতে রাখা হয়েছে শুধু আদা ও গোলমরিচ, সঙ্গে কাঁচা মরিচ আর তাজা ধনিয়া পাতা।
বাংলাপিডিয়ার সংজ্ঞা অনুযায়ী, যে সুগন্ধি উদ্ভিদ, উদ্ভিদের অংশ বা উদ্ভিদজাত পণ্য খাবারে স্বাদ ও গন্ধ আনতে ব্যবহৃত হয়, সেটিই মসলা। সেই তালিকায় আদাকে রাইজোম বা কন্দ থেকে পাওয়া মসলা, গোলমরিচ ও মরিচকে ফল থেকে পাওয়া মসলা এবং ধনিয়া পাতাকে পাতা থেকে পাওয়া মসলা হিসেবে দেখানো হয়েছে। তাই পদটিকে মসলা ছাড়া নয়, বরং অল্প মসলায় রান্না বলাই বেশি সঠিক। রেসিপির আসল কথা হলো সংযম: হাতে গোনা কয়েকটি মসলা, যা মাংসের স্বাদকে ঢেকে না দিয়ে আরও স্পষ্ট করে।
রান্নার পদ্ধতি
জাগো নিউজে প্রকাশিত রান্নার ধাপগুলো সংক্ষিপ্ত:
- প্রথমে মোটা তলার একটি হাঁড়ি নিন।
- সব উপকরণ একসঙ্গে হাঁড়িতে দিয়ে ঢেকে রান্না করুন।
- প্রয়োজন হলে অল্প পানি দিন।
- মাঝে মাঝে ঢাকনা খুলে নেড়েচেড়ে আবার ঢেকে দিন।
- মাংস সেদ্ধ হয়ে নরম হয়ে এলে হাঁড়ি চুলা থেকে নামিয়ে নিন।
পত্রিকাটি এই গোশত রুটি, পরোটা, পোলাও বা খিচুড়ির সঙ্গে পরিবেশনের পরামর্শ দিয়েছিল। রেসিপিতে রান্নার নির্দিষ্ট সময় দেওয়া নেই; মাংস কতটা নরম হলো, তা দেখেই রাঁধুনি সিদ্ধান্ত নেবেন।
ঢাকনা দিয়ে, সামান্য পানি বা তরলে মাংস রান্না করা আসলে ব্রেইজিং বা স্টুইংয়ের মতো আর্দ্র তাপের রান্না, যা কম নরম কাটের মাংসের জন্য উপযোগী বলে বিবেচিত। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নেব্রাস্কা-লিংকনের সম্প্রসারণ বিভাগের ২০১৩ সালের অক্টোবরের একটি লেখায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে, কোলাজেন নামের যে প্রোটিন পেশিকে একসঙ্গে ধরে রাখে, শুকনো ও বেশি তাপে রান্না করলে তা জুতার চামড়ার মতো শক্ত হয়ে যায়। অন্যদিকে ধীর ও আর্দ্র তাপে আর্দ্র কোলাজেন গলে জেলাটিনে পরিণত হয়, ফলে মাংস নরম হয়। একই লেখায় কম নরম কাটের মাংসের মেরিনেডে কোলাজেন ভাঙতে সহায়ক অম্লীয় উপকরণের মধ্যে টমেটোর নাম আছে, আর গরুর চাক বা রাউন্ড অংশের বড় টুকরো ফয়েল বা ঢাকনা দিয়ে শক্ত করে ঢেকে কয়েক ঘণ্টা ধরে স্লো কুকার বা কম তাপের ওভেনে রান্নার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
কাট যা-ই হোক, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ‘নিরাপদ খাদ্যের পাঁচটি চাবিকাঠি’ অনুযায়ী মাংস ভালোভাবে রান্না করতে হবে। স্যুপ ও স্টুর মতো খাবার ফুটিয়ে নিতে বলেছে ডব্লিউএইচও, যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় খাবারের তাপমাত্রা ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে। মাংসের ক্ষেত্রে রস স্বচ্ছ হয়েছে কি না, গোলাপি নয়, তা দেখে নিতে বলা হয়েছে; সবচেয়ে ভালো হলো থার্মোমিটার ব্যবহার করা। ডব্লিউএইচও ব্যাখ্যা করেছে, ঠিকমতো রান্না প্রায় সব বিপজ্জনক অণুজীব মেরে ফেলে; গবেষণায় দেখা গেছে, খাবার ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত রান্না করলে তা খাওয়ার জন্য নিরাপদ হওয়া নিশ্চিত করতে সাহায্য করে। কিমা, গোল করে বাঁধা রোস্ট, মাংসের বড় টুকরো ও আস্ত মুরগির ক্ষেত্রে বিশেষ মনোযোগ দিতে বলেছে সংস্থাটি।
পেশোয়ার: যে শহরের নামে পদটি
পেশোয়ার পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমের প্রদেশ খাইবার পাখতুনখোয়ার রাজধানী ও সবচেয়ে বড় শহর। শহরটি পেশোয়ার উপত্যকায় অবস্থিত। প্রায় ৭ হাজার ১৭৬ বর্গকিলোমিটারের এই প্রশস্ত উপত্যকার মধ্য দিয়ে কাবুল নদী বয়ে গেছে, আর তিন দিক ঘিরে আছে পর্বতশ্রেণি। উপত্যকার পশ্চিমে সফেদ কোহ পর্বতশ্রেণিতে খাইবার গিরিপথ, যা এটিকে আফগানিস্তানের কাবুল উপত্যকার সঙ্গে যুক্ত করেছে। শত শত বছর ধরে মধ্য এশিয়া ও ভারতীয় উপমহাদেশের মধ্যকার বেশির ভাগ বাণিজ্য এই পথ দিয়েই চলেছে, আর গিরিপথের মুখে অবস্থানের কারণেই পেশোয়ারের অর্থনৈতিক গুরুত্ব দীর্ঘদিনের।
দক্ষিণ এশিয়ায় টানা মানুষের বসতি থাকা প্রাচীনতম শহরগুলোর একটি পেশোয়ার; এর লিখিত ইতিহাস অন্তত খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক পর্যন্ত পৌঁছায়। পুরুষপুর নামে এটি প্রাচীন গান্ধারের প্রধান শহরগুলোর একটি ছিল, আর খ্রিস্টীয় দ্বিতীয় শতকে কনিষ্কের শাসনামলে ছিল কুষাণ সাম্রাজ্যের রাজধানী। পাকিস্তানের ২০২৩ সালের আদমশুমারিতে শহরটির জনসংখ্যা গণনা করা হয় ১৯ লাখ ৫ হাজার ৯৭৫ জন, যা দেশটির অষ্টম বৃহত্তম শহর। এখন শহরের প্রধান ভাষা পশতু; তবে একসময়ের রাস্তাঘাটের ভাষা হিন্দকো এখনো পুরোনো প্রাচীরঘেরা শহরে প্রচলিত।
পেশোয়ারের জলবায়ু উষ্ণ আধা-শুষ্ক; গ্রীষ্ম দীর্ঘ ও খুব গরম। শীতকাল চলে নভেম্বর থেকে মার্চের শেষ পর্যন্ত, আর সবচেয়ে ঠান্ডা মাসে গড় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা থাকে প্রায় ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। জাগো নিউজের রেসিপিটি বাংলাদেশে শীত মৌসুমের মাঝামাঝি প্রকাশিত হয়েছিল, আর পত্রিকাটি এর সঙ্গে আরও কয়েকটি মৌসুমি রেসিপির লিংক দিয়েছিল, যার একটি শীতের দুপুরের হাঁসের পদ।
পেশোয়ারের খাবার পশতুন রন্ধনধারার অংশ। এই রন্ধনধারা মূলত মাংসনির্ভর: খাসি বা ভেড়া, গরু, মুরগি ও মাছ খাওয়া হয় ভাত ও সবজির সঙ্গে, পাশে থাকে দই জাতীয় দুগ্ধজাত খাবার, বাদাম এবং তাজা ও শুকনো ফল। পেশোয়ার, কাবুল, হেরাত, বান্নু, কোয়েটা ও মারদানকে এই রন্ধনধারার কেন্দ্র হিসেবে ধরা হয়। সকালের খাবারের সঙ্গে সাধারণত থাকে এলাচ দেওয়া সবুজ চা, যার নাম কাহওয়া।
নমক মান্ডি আর লবণনির্ভর রান্নার ধারা
এ ধরনের খাবারের জন্য পেশোয়ারের সবচেয়ে পরিচিত জায়গা শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত নমক মান্ডি, অর্থাৎ ‘লবণের বাজার’। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে খাসি বা ভেড়ার মাংস পোড়ানোর ধোঁয়ার গন্ধে ভরা পুরোনো গলিপথের বর্ণনা দেওয়া হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, এই রান্না এসেছে আফগানিস্তান সীমান্তঘেঁষা পশতুন জনপদের প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলা রেসিপি থেকে। এএফপি লিখেছিল, পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলের সমভূমি ও দক্ষিণের উপকূলের জটিল তরকারি আর ঝাল খাবারের তুলনায় এই খাবার তার সরলতার জন্য পরিচিত। বাজারটির সবচেয়ে বিখ্যাত টিক্কার দোকানগুলোর একটি তাদের কয়েক দশকের সাফল্যের কৃতিত্ব দেয় খুব কম মসলা ব্যবহারকে।
এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেই রেস্তোরাঁয় টিক্কার জন্য মাংসের টুকরোয় প্রচুর লবণ মাখিয়ে শিকে চর্বির টুকরোর মাঝে মাঝে গেঁথে নেওয়া হয়, যাতে মাংস নরম ও সুস্বাদু হয়; এরপর কাঠের আগুনে ধীরে ধীরে রান্না করা হয়। তাদের আরেক বিখ্যাত পদ কড়াই গোশত, অর্থাৎ গভীর কড়াইয়ে রান্না করা ঝোলওয়ালা মাংস, তৈরি হয় ভেড়ার পেছনের অংশের সাদা চর্বির বড় টুকরোয় মাংসের ফালি রান্না করে, সঙ্গে সামান্য কাঁচা মরিচ ও টমেটো। দুটি পদই পরিবেশন করা হয় তন্দুর থেকে সদ্য নামানো নানের স্তূপ আর বাটি ভরা টাটকা দইয়ের সঙ্গে। খদ্দেররা সাধারণত দল বেঁধে আসেন, কেজি ধরে মাংসের অর্ডার দেন এবং কসাইকে পছন্দের অংশ দেখিয়ে দেন, যা তখনই রান্না করা হয়। একেকটি অর্ডার তৈরি হতে প্রায় এক ঘণ্টা লাগে, আর খাওয়ার পরও সবুজ চায়ের কাপে আড্ডা চলে অনেকক্ষণ। পাকিস্তানের এক রান্নার বইয়ের লেখক এএফপিকে বলেছিলেন, এই খাবার মূলত মাংসনির্ভর বলেই সারা দেশে এর এত জনপ্রিয়তা।

পাকিস্তানের দৈনিক ডন ২০১৬ সালের মার্চে ইসলামাবাদের সাইদপুর গ্রামের এমন এক রেস্তোরাঁ নিয়ে প্রতিবেদন করে, যারা নমক মান্ডির ধারায় রান্না করে। সেখানেও একই নীতির বর্ণনা পাওয়া যায়। তাদের নমকিন, অর্থাৎ লবণে রান্না টিক্কায় মাংসে মোটা দানার লবণ ছিটিয়ে খোলা শিকে ঝলসানো হয়, কয়েক মিনিট পর পর উল্টে দিয়ে হালকা করে ঘি মাখানো হয়, আর এভাবে চলে প্রায় ৪৫ মিনিট। যাঁরা মাংসের সঙ্গে কিছুটা ঝোল চান, তাঁদের জন্য নমকিন কড়াই: টুকরো করা মাংস কড়াইয়ে দেওয়া হয় তাজা টমেটো, কাঁচা মরিচ, রসুন, সবজির স্টক ও পশুর চর্বির সঙ্গে, তারপর লবণ দিয়ে কাঠকয়লার আগুনে প্রায় এক ঘণ্টা রান্না করা হয়। ডন লিখেছিল, খাইবার পাখতুনখোয়ায় খাবারে ভারী মসলা দেওয়া হয় না, মূল উপকরণের স্বাদই ফুটে ওঠে; আর ঝোলে পশুর চর্বি বেশি থাকে বলে কড়াইয়ের পর প্রথা মেনে সবুজ চা পান করা হয়।
জাগো নিউজের রেসিপি একই ভাবনাকে ঘরের রান্নাঘরে নিয়ে এসেছে: মাংসের সঙ্গে টমেটো ও কাঁচা মরিচ, সামান্য চর্বি, লবণ আর সময়। কাঠকয়লার আগুন ও ভেড়ার চর্বির বদলে এখানে আছে চুলায় ঢাকা হাঁড়ি আর এক চামচ ঘি, সঙ্গে যোগ হয়েছে আদা, গোলমরিচ, আলু ও ধনিয়া পাতা।
চাপলি কাবাব: পেশোয়ারের ঝাল দিক
তবে পেশোয়ারের সব রান্নাই সাদামাটা নয়। শহরের সবচেয়ে পরিচিত পথখাবার চাপলি কাবাব হলো কিমা করা মাংসের চ্যাপ্টা বড়া। ডনের ২০১৬ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পশতু ভাষায় এর নামের অর্থ ‘চ্যাপ্টা কাবাব’। টাটকা কিমার সঙ্গে পার্সলে পাতা, লবণ, ডালিমের দানা, শুকনো মরিচের কুচি ও টমেটো মেশানো হয়; তারপর মোটা বড়ার আকারে গড়ে বেশি আঁচে অল্প পরিমাণ পশুর চর্বিতে ভাজা হয়, যাতে বাইরেটা পুড়ে মচমচে হয় আর ভেতরটা থাকে রসালো। ডন যে রেস্তোরাঁয় গিয়েছিল, সেখানে কাবাবের ওপর দেওয়া হতো আধা ভাজা ডিম ও হাড়ের মজ্জা।
এএফপির ২০১৯ সালের প্রতিবেদনে চাপলি কাবাবকে বর্ণনা করা হয় নানা মসলা মেখে বড়ার আকার দেওয়া গরুর কিমা হিসেবে, যা লোহার তপ্ত চাটুতে ভাজা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, শীতের ঠান্ডা দিনে এর চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে, তখন শহরের কাবাবের দোকানগুলোতে খদ্দেরের ভিড় জমে। পেশোয়ার থেকে চাপলি কাবাব এখন নানা দেশের আফগান ও পাকিস্তানি রেস্তোরাঁর মেনুতে জায়গা পেয়েছে। এর পাশে রাখলে নমক মান্ডির লবণে রান্না টিক্কা ও কড়াই, আর এই পেশোয়ারি গোশতের মতো ঘরোয়া পদ একই রান্নাঘরের সংযত দিকটি দেখায়।
গোলমরিচ ও আদা: পদের স্বাদ ধরে রাখা দুই মসলা
গোলমরিচ (Piper nigrum) পিপারেসি পরিবারের একটি সপুষ্পক লতা, যা চাষ করা হয় এর ফলের জন্য; শুকানো ফলটিই গোলমরিচের দানা। গাছটি দক্ষিণ এশিয়ার স্থানীয় উদ্ভিদ, আর গোলমরিচ বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বেচাকেনা হওয়া মসলাগুলোর একটি। কালো গোলমরিচ তৈরি হয় সবুজ, কাঁচা ফল থেকে: ফলগুলো অল্প সময় গরম পানিতে ফুটিয়ে কয়েক দিন রোদে বা যন্ত্রে শুকানো হয়, তাতে বীজের চারপাশের খোসা কুঁচকে পাতলা কালো স্তরে পরিণত হয়। শুকনো দানা গুঁড়া করে তৈরি হয় গোলমরিচ গুঁড়া। গোলমরিচের ঝাঁজ আসে পিপেরিন নামের যৌগ থেকে, যা মরিচের ক্যাপসাইসিনের ঝাল থেকে আলাদা ধরনের; এই রেসিপিতে দুটিই আছে, গোলমরিচ গুঁড়া ও তাজা কাঁচা মরিচ।

বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, আদা (Zingiber officinale) জিঞ্জিবারেসি পরিবারের একটি সুগন্ধি বহুবর্ষজীবী বীরুৎ, যার আদি নিবাস দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া। রান্নায় ব্যবহৃত হয় এর রাইজোম বা মাটির নিচের কাণ্ড, যার বাইরের রং ফিকে হলুদ আর ভেতরে সবুজাভ হলুদ। আদার সুগন্ধ আসে এর প্রায় আড়াই শতাংশ উদ্বায়ী তেল থেকে, আর ঝাঁজালো স্বাদ আসে জিঞ্জেরল নামের অনুদ্বায়ী ওলিওরেজিন থেকে। বাংলাপিডিয়া জানায়, আদা মসলার চেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় স্বাদবর্ধক হিসেবে, আর এর উদ্বায়ী তেল খাবার ও পানীয়তে গন্ধ আনতে কাজে লাগে।
আদা বাংলাদেশের একটি কৃষিফসলও। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, দেশে উঁচু জমি ও পাহাড়ের ঢালে বৃষ্টিনির্ভর বার্ষিক ফসল হিসেবে আদার চাষ হয়; দিনাজপুর, রংপুর, টাঙ্গাইল, চট্টগ্রাম ও রাঙামাটি আদা চাষের গুরুত্বপূর্ণ জেলা, আর অনেক কৃষক বসতবাড়ির জমিতে আদা ফলান। বাংলাপিডিয়ায় দেশে বছরে প্রায় ৪৯ হাজার ৪০৫ মেট্রিক টন আদা উৎপাদনের হিসাব দেওয়া আছে, যা আসে প্রায় ১৯ হাজার ৫৫ হেক্টর জমি থেকে। প্রাচীন ও মধ্যযুগের গ্রন্থে আদার উল্লেখ আছে, আর অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতকে এ অঞ্চল থেকে বিপুল পরিমাণ আদা বিদেশে রপ্তানি হতো। ফলে এই রেসিপির দুই টেবিল চামচ আদা কুচিই এর সবচেয়ে দেশি উপকরণগুলোর একটি।

অন্য উদ্ভিজ্জ উপকরণগুলো আমাদের রান্নাঘরে প্রতিদিনের। বাংলাপিডিয়া জানায়, বাংলাদেশে কচি ধনিয়া গাছ সবজি ও মাছের তরকারিতে স্বাদ ও গন্ধ আনতে সাধারণভাবে ব্যবহৃত হয়, আর মরিচ দেশে সবচেয়ে বেশি চাষ হওয়া মসলাগুলোর একটি। এই রেসিপিতে ধনিয়া পাতা ও কাঁচা মরিচ বাকি সব উপকরণের সঙ্গে একসঙ্গেই হাঁড়িতে যায়, আর আস্ত আলু মাংসের সঙ্গে একই ঝোলে সেদ্ধ হয়।
গরু না খাসি, আর এক চামচ ঘি
রেসিপিতে গরু বা খাসি, যেকোনো মাংস বেছে নেওয়ার সুযোগ আছে। বাংলাদেশে ছাগল মূলত গ্রামেই পালন করা হয়। বাংলাপিডিয়ার ছাগল-বিষয়ক ভুক্তি অনুযায়ী, দেশের ৯০ শতাংশের বেশি ছাগল পালন করেন গ্রামের মানুষ; দেশে ছাগলের সংখ্যা প্রায় ৩০ দশমিক ৩৩ মিলিয়ন, যার ৯০ শতাংশের বেশি ব্ল্যাক বেঙ্গল জাতের, বাকিগুলো যমুনাপারি ও এর সংকর। বাংলাপিডিয়া লিখেছে, ছাগলের মাংস নরম, সুস্বাদু ও কম চর্বির জন্য বিখ্যাত। ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল আকারে ছোট, অল্প বয়সে প্রজননক্ষম হয় এবং দেশের কঠিন পরিবেশে ভালোভাবে মানিয়ে নেয়। পতিত জমি, ক্ষেতের আল, রাস্তার পাশ ও বাঁধে চরিয়েই এদের খাওয়ানো হয়, আর বেশির ভাগ ছাগল পালন করেন নারী ও শিশুরা, ফলে উৎপাদন খরচ থাকে খুব কম।
গরুর মাংসের ক্ষেত্রে নেব্রাস্কা-লিংকন বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখায় বলা হয়েছে, মাংস কতটা নরম হবে তা নির্ভর করে কাট ও রান্নার ধরন দুটির ওপরই। রাউন্ড ও চাক অংশের অনেক কাটে কোলাজেন বেশি থাকায় সেগুলো কম নরম, আর এগুলো দীর্ঘ সময় ধরে ধীরে, ঢেকে রান্নার উপযোগী। রিব, লয়েন, সারলয়েন ও টেন্ডারলয়েন এতটাই নরম যে প্রায় যেকোনোভাবে রান্না করা যায়। পেশোয়ারি গোশতের মতো ঢাকা হাঁড়ির এক-পাত্রের রান্না সেই আর্দ্র ও ধীর পদ্ধতিরই উদাহরণ, যা ওই লেখায় শক্ত কাটের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।
রেসিপিতে রান্নার চর্বি বলতে শুধু এক চামচ ঘি। ঘি হলো পরিশোধিত মাখন: মাখন জ্বাল দিয়ে ওপরের ময়লা তুলে ফেলা হয়, নিচে জমা কঠিন অংশ বাদ দিয়ে স্বচ্ছ চর্বিটুকু রেখে দেওয়া হয়। সাধারণত গরু বা মহিষের দুধের মাখন থেকে ঘি তৈরি হয়; বাদামের মতো স্বাদ এবং পুড়ে না গিয়ে বেশি তাপে গরম করা যায় বলে এর কদর। এএফপি ও ডনের বর্ণনা অনুযায়ী পেশোয়ারের রেস্তোরাঁয় চর্বির বড় অংশ আসে পশুর নিজের শরীর থেকে; ঘরোয়া এই রেসিপি নির্ভর করে মাংসের নিজস্ব চর্বি আর ওই সামান্য ঘিয়ের ওপর।
ঘরে কাঁচা মাংস নিরাপদে সামলানো
পদটি যেহেতু কাঁচা মাংস দিয়ে শুরু হয়, তাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘নিরাপদ খাদ্যের পাঁচটি চাবিকাঠি’, যা ২০০৬ সালে নির্দেশিকা হিসেবে প্রকাশিত হয়, রান্নার প্রতিটি ধাপে প্রযোজ্য। ডব্লিউএইচও ব্যাখ্যা করেছে, বেশির ভাগ অণুজীব রোগ সৃষ্টি না করলেও বিপজ্জনক অণুজীব মাটি, পানি, প্রাণী ও মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে থাকে, আর হাত, মোছার কাপড় ও রান্নার সরঞ্জাম, বিশেষ করে কাটার বোর্ডের মাধ্যমে ছড়াতে পারে। কাঁচা মাংস ও তার রসে বিপজ্জনক অণুজীব থাকতে পারে, যা খাবার তৈরি ও সংরক্ষণের সময় অন্য খাবারে চলে যেতে পারে। পাঁচটি চাবিকাঠি হলো:
- পরিচ্ছন্ন থাকুন: খাবারে হাত দেওয়ার আগে এবং রান্নার সময় বারবার হাত ধুয়ে নিন, টয়লেট ব্যবহারের পরও হাত ধুয়ে নিন; রান্নায় ব্যবহৃত সব জায়গা ও সরঞ্জাম ধুয়ে জীবাণুমুক্ত করুন; রান্নাঘর ও খাবারকে পোকামাকড়, ইঁদুর ও অন্য প্রাণী থেকে রক্ষা করুন।
- কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখুন: কাঁচা মাংস, মুরগি ও সামুদ্রিক খাবার অন্য খাবার থেকে দূরে রাখুন; কাঁচা খাবারের জন্য আলাদা ছুরি ও কাটার বোর্ড ব্যবহার করুন; খাবার পাত্রে ঢেকে রাখুন, যাতে কাঁচা ও রান্না করা খাবারের সংস্পর্শ না ঘটে।
- ভালোভাবে রান্না করুন: স্টু ফুটিয়ে নিন, যাতে তা ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায়; মাংসের রস স্বচ্ছ হয়েছে কি না, গোলাপি নয়, দেখে নিন; রান্না করা খাবার আবার গরম করার সময় ভালোভাবে গরম করুন।
- খাবার নিরাপদ তাপমাত্রায় রাখুন: রান্না করা খাবার ঘরের তাপমাত্রায় দুই ঘণ্টার বেশি ফেলে রাখবেন না; রান্না করা ও দ্রুত নষ্ট হয় এমন খাবার দেরি না করে ফ্রিজে রাখুন, সম্ভব হলে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে; পরিবেশনের আগে রান্না করা খাবার ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপে গরম রাখুন; ফ্রিজেও খাবার বেশি দিন রাখবেন না; হিমায়িত খাবার ঘরের তাপমাত্রায় রেখে গলাবেন না।
- নিরাপদ পানি ও কাঁচামাল ব্যবহার করুন: নিরাপদ পানি ব্যবহার করুন বা পানি শোধন করে নিন; টাটকা ও ভালো খাবার বেছে নিন; ফল ও সবজি ধুয়ে নিন, বিশেষ করে কাঁচা খাওয়ার হলে; মেয়াদ পেরোনো খাবার ব্যবহার করবেন না।
ডব্লিউএইচও জানায়, ঘরের তাপমাত্রায় রাখা খাবারে অণুজীব খুব দ্রুত বংশ বাড়াতে পারে; খাবার ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে বা ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে রাখলে অণুজীবের বৃদ্ধি ধীর হয় বা থেমে যায়, যদিও কিছু বিপজ্জনক অণুজীব ৫ ডিগ্রির নিচেও বাড়তে পারে। বড় হাঁড়িতে রান্না করা পদের ক্ষেত্রে, যেমন আলুসহ এক কেজি মাংস, এর মানে হলো বেঁচে যাওয়া খাবার দ্রুত ঠান্ডা করে ফ্রিজে রাখা এবং আবার খাওয়ার আগে ভালোভাবে গরম করা।
খাদ্যতালিকায় লবণ, চর্বি ও লাল মাংস
হাঁড়িতে মসলা কম থাকায় স্বাদের বড় অংশ আসে লবণ থেকে, আর রেসিপিতে লবণ দিতে বলা হয়েছে পরিমাণমতো। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১২ সালের সোডিয়াম-বিষয়ক নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের দিনে ৫ গ্রামের কম লবণ খাওয়া উচিত, যা এক চা-চামচের সামান্য কম। কারণ অতিরিক্ত সোডিয়াম রক্তচাপ বাড়ায়, আর তাতে হৃদ্রোগ ও রক্তনালির রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
২০২৩ সালের জুলাইয়ে হালনাগাদ করা ডব্লিউএইচওর চর্বি-বিষয়ক নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, দুই বছর ও তার বেশি বয়সী সবার মোট খাদ্যশক্তির ১০ শতাংশের বেশি যেন সম্পৃক্ত চর্বি থেকে না আসে, আর প্রাপ্তবয়স্কদের মোট চর্বি খাদ্যশক্তির ৩০ শতাংশ বা তার কমে সীমিত রাখা উচিত। নির্দেশিকায় সম্পৃক্ত চর্বির প্রধান উৎস হিসেবে চর্বিযুক্ত মাংস, দুগ্ধজাত খাবার এবং মাখন, ঘি, লার্ড, পাম তেল ও নারকেল তেলের মতো কঠিন চর্বি ও তেলের নাম আছে। এর বদলে বহু-অসম্পৃক্ত চর্বি, উদ্ভিজ্জ এক-অসম্পৃক্ত চর্বি অথবা গোটা শস্য, সবজি, ফল ও ডাল থেকে আসা শর্করা খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
২০১৫ সালের অক্টোবরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ক্যানসার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যানসার (আইএআরসি) লাল মাংস খাওয়াকে মানুষের জন্য ‘সম্ভাব্য ক্যানসার সৃষ্টিকারী’ (গ্রুপ ২এ) হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করে। আইএআরসির সংজ্ঞায় লাল মাংস বলতে স্তন্যপায়ী প্রাণীর সব পেশির মাংস বোঝায়, যার মধ্যে গরু, বাছুর, শূকর, ভেড়া, খাসি, ঘোড়া ও ছাগলের মাংস রয়েছে। ১০টি দেশের ২২ জন বিশেষজ্ঞের কার্যদল এই সিদ্ধান্ত নেয় মানুষের ওপর সীমিত প্রমাণ, প্রধানত মলাশয় ও মলদ্বারের ক্যানসারের ক্ষেত্রে, এবং শক্ত জৈব প্রক্রিয়াগত প্রমাণের ভিত্তিতে। হ্যাম, সসেজ ও কর্নড বিফের মতো প্রক্রিয়াজাত মাংসকে সংস্থাটি ‘ক্যানসার সৃষ্টিকারী’ (গ্রুপ ১) হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করে এবং জানায়, প্রতিদিন খাওয়া প্রতি ৫০ গ্রাম প্রক্রিয়াজাত মাংসে মলাশয়ের ক্যানসারের ঝুঁকি ১৮ শতাংশ বাড়ে। পেশোয়ারি গোশত তাজা মাংসে তৈরি, প্রক্রিয়াজাত মাংসে নয়। আইএআরসির পরিচালক তখন বলেছিলেন, এই ফলাফল মাংস খাওয়া সীমিত রাখার জনস্বাস্থ্য সুপারিশকে সমর্থন করে, তবে লাল মাংসের পুষ্টিগুণও রয়েছে।
যাঁদের উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্রোগ বা কিডনির রোগ আছে, কিংবা যাঁদের লবণ, চর্বি বা লাল মাংস কমাতে বলা হয়েছে, তাঁরা এ ধরনের পদ কত দিন পর পর ও কতটা খাওয়া যাবে, সে বিষয়ে চিকিৎসক বা যোগ্য পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিন।
ছবি: Miansari66 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, এএফপি (ইজিপ্ট ইনডিপেনডেন্টে প্রকাশিত), ডন, বাংলাপিডিয়া, ইউনিভার্সিটি অব নেব্রাস্কা-লিংকন এক্সটেনশন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যানসার, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)