২০২৬ সালের ১১ জানুয়ারি জাগো নিউজের পাবনা জেলা প্রতিনিধি জানান, জেলার গ্রামগুলোতে তখন কুমড়া বড়ি তৈরির শীতকালীন মৌসুম পুরোদমে চলছে। ডাল বেটে তৈরি পেস্টের সঙ্গে পাকা চালকুমড়া, কালোজিরা ও অন্যান্য উপকরণ মিশিয়ে ছোট ছোট বড়ি বানিয়ে কাপড়ের ওপর বসিয়ে রোদে শুকানো হয়, এটাই কুমড়া বড়ি। গৃহবধূরা বাড়িতেই এ বড়ি বানান, পরিবারের সবাই এবং বাড়ির পুরুষরাও তাতে হাত লাগান, আর এখন অনেকেই বানাচ্ছেন বিক্রির জন্য। চাটমোহর ও ফরিদপুর উপজেলার কারিগররা প্রতিবেদককে জানান, বড়ি থেকে তাঁদের ভালো বাড়তি আয় হচ্ছে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) পাবনা কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক বলেন, উদ্যোক্তারা চাইলে ঋণ, বিপণন সহায়তা ও প্রশিক্ষণ পেতে তাঁর দপ্তর সাহায্য করবে।
শীতের ভোরে পাটায় ডাল বাটা
প্রতিবেদনে বলা হয়, শীতের কাকডাকা ভোরে অন্যরা যখন লেপের নিচে আরামে ঘুমাচ্ছেন, পাবনার গৃহিণীরা তখন কাজে ব্যস্ত: কেউ ভেজানো ডাল পাটায় বাটছেন, কেউ মেশিনে ডালের পেস্ট বানাচ্ছেন। এরপর সেই পেস্টের সঙ্গে পাকা চালকুমড়া, কালোজিরা ও অন্যান্য উপকরণ মিশিয়ে তৈরি করছেন কুমড়া বড়ি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বাদে অনন্য হওয়ায় তরকারিতে রসনাপ্রেমীদের পছন্দের শীর্ষে এই কুমড়া বড়ি। মাছের ঝোল কিংবা সবজির লাবড়ায় কয়েকটা বড়ি দিলে স্বাদ বেড়ে যায় কয়েকগুণ, আর তরকারিতে বাড়তি স্বাদের জন্য এই বড়ি দীর্ঘদিন ধরে বাঙালির খাদ্য ঐতিহ্যের অংশ হয়ে আছে।
বাজারে ভালো চাহিদা থাকায় দামও মিলছিল বেশ। তাই শীতের শুরুতেই পাবনার গ্রামগুলোতে বড়ি বানানোর ধুম পড়ে যায়, সেবারের শীতও তার ব্যতিক্রম ছিল না। কম খরচ ও তুলনামূলক কম পরিশ্রমে বাড়তি আয়ের আশায় অনেক পরিবার বাণিজ্যিকভাবে বড়ি বানাতে শুরু করেছেন, নারীদের সঙ্গে সাহায্য করছেন পুরুষরাও। প্রতিবেদনের ভাষায়, এভাবেই জেলার গ্রামগুলোতে নীরবে বাড়ছে কুমড়া বড়ি তৈরি; বাড়তি আয়ে তৈরি হচ্ছে নতুন সচ্ছলতা ও স্বাবলম্বী হওয়ার গল্প, বাড়ছে বাণিজ্যিক সম্ভাবনাও।
পাবনার কোথায় তৈরি হয় বড়ি
প্রতিবেদকের সংগ্রহ করা তথ্য অনুযায়ী, পাবনার ৯টি উপজেলার গ্রামগুলোতেই কমবেশি কুমড়া বড়ি তৈরি হয়, তবে সবচেয়ে বেশি তৈরি হয় চাটমোহর, ফরিদপুর, সাঁথিয়া ও সুজানগর উপজেলায়। চাটমোহরের ফৈলজানা, দোলং, রামনগর, মথুরাপুর, বোঁথর, কুমারগাড়া, হান্ডিয়াল ও পৌর এলাকার এক হাজারের বেশি পরিবার বড়ি তৈরি ও বিক্রির সঙ্গে যুক্ত। ফরিদপুর উপজেলার ডেমরা, ডেমরা মধ্যপাড়া, রতনপুর ও পাথারসহ অধিকাংশ গ্রামেই বড়ি তৈরি হয়। একইভাবে সাঁথিয়া, সুজানগর ও সদর উপজেলার গ্রামগুলোতেও শীতের শুরু থেকে বড়ি বানানোর ধুম পড়ে যায়।
এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ প্রকাশিত জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, পাবনা রাজশাহী বিভাগের একটি জেলা, আয়তন ২,৩৭৬.১৩ বর্গকিলোমিটার। জেলার উত্তরে নাটোর ও সিরাজগঞ্জ জেলা; দক্ষিণে পদ্মা নদী এবং রাজবাড়ী ও কুষ্টিয়া জেলা; পূর্বে মানিকগঞ্জ ও সিরাজগঞ্জ জেলা এবং যমুনা নদী। পাবনা জেলা গঠিত হয় ১৮৩২ সালে। প্রধান নদী পদ্মা, বড়াল, যমুনা, ইছামতি, আত্রাই, হুরাসাগর ও চিকনাই, আর উল্লেখযোগ্য জলাভূমি চলনবিল। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জেলার জনসংখ্যা ছিল ২৫ লাখ ২৩ হাজার ১৭৯। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে জেলার ৫৩.৭৫ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি, এরপর ব্যবসা ১৪.৯৭ শতাংশ।
প্রতিবেদনে সবচেয়ে বেশি বড়ি তৈরিকারী পরিবারের উপজেলা চাটমোহর, জেলার উত্তরাংশে এর আয়তন ৩১০.১০ বর্গকিলোমিটার; উত্তরে গুরুদাসপুর ও তাড়াশ উপজেলা। চাটমোহর থানা গঠিত হয় ১৯০৯ সালে, উপজেলা হয় ১৯৮২ সালে। এখানে একটি পৌরসভা ও ১১টি ইউনিয়ন রয়েছে; প্রতিবেদনে উল্লেখ করা ফৈলজানা, মথুরাপুর ও হান্ডিয়াল এর মধ্যে তিনটি ইউনিয়ন। প্রধান নদী বড়াল, চিকনাই ও আত্রাই; উল্লেখযোগ্য বিল ফৈলাম বিল, চলনবিল, কুড়াল বিল ও দিকশাল বিল। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে উপজেলার জনসংখ্যা ছিল ২ লাখ ৯১ হাজার ১২১। এখানকার ৭১ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি; বাংলাপিডিয়া প্রধান ফসল হিসেবে ধান, পাট, গম, আলু, মরিচ, পেঁয়াজ, রসুন, খেসারি, মসুর, সরিষা, ছোলা, ধনিয়া ও সুপারির নাম দিয়েছে। উপজেলার ২৭টি হাটবাজারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য চাটমোহর রেলবাজার, মির্জাপুর, মথুরাপুর ও চাটমোহর নতুন বাজার।
ডেমরা ও রতনপুর যে উপজেলায়, পাবনার সেই ফরিদপুর জেলার ছোট উপজেলাগুলোর একটি, আয়তন ১৩৭.৬৭ বর্গকিলোমিটার, ২০১১ সালে জনসংখ্যা ছিল ১ লাখ ৩০ হাজার ৩৩৫। সাঁথিয়ার আয়তন ৩৩১.৫৫ বর্গকিলোমিটার, জনসংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৮০ হাজার ৩০১; প্রধান নদী ইছামতি, বড়াল ও আত্রাই, প্রধান ফসল ধান, গম, আলু, পেঁয়াজ, সবজি ও সরিষা, আর ৬৫.৪৪ শতাংশ পরিবার প্রধানত কৃষির ওপর নির্ভরশীল। পদ্মাতীরের সুজানগরের আয়তন ৩৩৮.৬৫ বর্গকিলোমিটার, জনসংখ্যা ছিল ২ লাখ ৭৮ হাজার ৯৬; প্রধান ফসল ধান, গম, পাট, আখ, চিনাবাদাম, পেঁয়াজ, রসুন ও সবজি, আর ৬১.১৭ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি।
এক দিনে যেভাবে বড়ি তৈরি হয়
এসব এলাকা ঘুরে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে প্রতিবেদক জানতে পারেন, শীতের পুরো সময় গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে গৃহবধূরা কুমড়া বড়ি বানান, বাড়ির ছোটবড় সবাই তাতে হাত লাগান। আবহাওয়া ভালো থাকলে বিক্রির জন্য বড়ি তৈরি করা কারিগররা প্রায় প্রতিদিনই কাজ করেন। খুব ভোরে উঠে তিন থেকে পাঁচজন চার থেকে সাড়ে চার ঘণ্টা কাজ করলে এক দিনে প্রায় এক মণ বড়ি বানানো যায়, কেউ কেউ আরও বেশি বানান। ৮০০-৯০০ গ্রাম ডাল, কিছু কালোজিরা ও সামান্য পাকা চালকুমড়া দিয়ে তৈরি হয় এক কেজি কুমড়া বড়ি। এরপর বড়িগুলো কাপড়ের ওপর বসিয়ে দুই থেকে তিন দিন শুকানোর পর বিক্রির উপযোগী হয়।
কারিগরদের ব্যবহৃত মণ বাংলাদেশের প্রচলিত ওজনের একক। বাংলাপিডিয়ার কৃষি পরিমাপ বিষয়ক ভুক্তিতে বলা হয়েছে, কৃষিপণ্যের জন্য বিভিন্ন জেলায় দীর্ঘদিন ধরে নিজস্ব স্থানীয় একক চালু আছে, প্রচলিত হিসাবে ৪০ সেরে এক মণ, আর সরকার ১৯৮২ সাল থেকে একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে ওজন ও পরিমাপের মেট্রিক পদ্ধতি চালু করে; তবু গ্রামের হাটবাজারে পুরোনো এককগুলো এখনো রোজকার ব্যবহারে আছে।
পাশের জেলাগুলো থেকে আগে প্রকাশিত প্রতিবেদনে একই কাজের ধাপগুলোর বিবরণ আছে। ২০২১ সালের ৮ জানুয়ারি নওগাঁর আত্রাই উপজেলা থেকে বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রথমে মাষকলাই রোদে শুকিয়ে যাঁতায় ভেঙে পরিষ্কার করা হয়, তারপর পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে খোসা ছাড়ানো হয়। এরপর ঢেঁকি অথবা পাটায় পিষে চালকুমড়ার সঙ্গে মেশানো হয়। ভোর থেকে রোদেলা খোলা জায়গা, বাড়ির আঙিনা বা ছাদে পাতলা কাপড়ের ওপর সারি সারি বড়ি বসিয়ে শুকাতে দেওয়া হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, টানা দুই থেকে তিন দিনের রোদ লাগে, রোদ কম হলে তিন থেকে চার দিন; আর পাঁচ কেজি চালকুমড়ার সঙ্গে দুই কেজি মাষকলাইয়ের মিশ্রণে বড়ি ভালো হয়। সেখানকার এক নারী কারিগর জানান, আশ্বিন থেকে ফাল্গুন, এই ছয় মাস বড়ি তৈরির ধুম চলে, পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে বাকিটা বাজারে বিক্রি হয়।
২০২৪ সালের ৯ ডিসেম্বর সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার নওগাঁ গ্রাম থেকে প্রথম আলোর প্রতিবেদনে দেখা যায়, নারীরা সকালের ঠান্ডায় চাল, কুমড়া ও মাষকলাইয়ের মিশ্রণে মণ্ড তৈরি করে বাঁশের কাঠির তৈরি নেটের ওপর টানানো পাতলা কাপড়ে বড়ি দিচ্ছেন; রোদে একটু শক্ত হলে আরও কয়েকজন সেগুলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন। ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর মেহেরপুর থেকে রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসের প্রতিবেদনে ঘরে ঘরে সারা দিনের প্রস্তুতির বিবরণ আছে: চালকুমড়া কুরানো, ডাল তৈরি ও ভিজিয়ে রাখা, ভোরে দলবেঁধে পুকুরঘাট বা নদীর ধারে ডাল ধুয়ে খোসা ছাড়ানো এবং ভোরেই পিষে আনা, যাতে রোদ উঠলেই বড়ি বসানো শুরু করা যায়। বাসস জানায়, রোদে শুকিয়ে বয়ামে সংরক্ষণ করে পরিবারগুলো সারা বছর বড়ি দিয়ে রান্না করে।
চালকুমড়া, ডাল আর কালোজিরা
যে সবজির নামে কুমড়া বড়ি, সেটি চালকুমড়া। বাংলাপিডিয়া একে Benincasa hispida হিসেবে বর্ণনা করেছে, সম্ভবত ভারতীয় উপমহাদেশেই এর আদি নিবাস। যেকোনো মাটিতে চাষ করা গেলেও দোআঁশ ও বেলে দোআঁশ মাটি বেশি উপযোগী; বীজ বোনার উপযুক্ত সময় ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ। কচি ফল ৪৫ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে তোলা যায়, আর পাউডারের মতো সাদা আবরণে ঢাকা পরিপক্ব ফল তোলা হয় বীজ বোনার ৮০ থেকে ৯০ দিন পর। স্থানীয় জাতের মধ্যে আছে সাচি কুমড়া ও ডিমি কুমড়া, ফলন হেক্টরে ২০ থেকে ৩০ টন। বাংলাপিডিয়া লিখেছে, পরিপক্ব চালকুমড়া পিষে মাষকলাইয়ের সঙ্গে মিশিয়ে বড়ি বানানো হয় এবং ভালোভাবে সংরক্ষণের জন্য রোদে শুকানো হয়; মাছের সঙ্গে রান্না করা এই বড়ি স্থানীয় খাদ্যতালিকায় একটি সুস্বাদু পদ। পরিপক্ব ফল দিয়ে মোরব্বাও তৈরি হয়, আর কচি পাতা ও ডগা শাক হিসেবে খাওয়া হয়।

বাসসের মেহেরপুর প্রতিবেদনে জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) উপপরিচালক বলেন, বড়ি তৈরিতে চালকুমড়ার কোনো বিকল্প নেই। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানীয় চাহিদা মেটাতে এখন বাণিজ্যিকভাবে চালকুমড়ার চাষ হচ্ছে; বসতবাড়ির আঙিনা, পতিত জমি এবং সাথি ফসল হিসেবে চাষ বাড়ছে। প্রতি বিঘায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকার কুমড়া বিক্রি হয় এবং মাত্র ১০০ দিনেই খেত থেকে কুমড়া তোলা যায় বলে তিনি জানান।
ডালের ক্ষেত্রে জাগো নিউজের প্রতিবেদনে পাবনার কারিগররা এ্যাংকর ডাল ব্যবহারের কথা বলেছেন; রতনপুরের মাসুরা বেগম জানান, আগের দিন ডাল ভিজিয়ে রেখে পরদিন তাঁরা বড়ি বানান। আত্রাই, সিরাজগঞ্জ ও মেহেরপুরের প্রতিবেদনে প্রচলিত উপকরণ হিসেবে মাষকলাই বা কলাইয়ের ডালের কথা আছে। বাংলাপিডিয়া মাষকলাইকে বাংলাদেশের অত্যন্ত সমাদৃত ডালগুলোর একটি বলেছে, যা আস্ত সেদ্ধ করে বা ভেঙে ডাল হিসেবে খাওয়া হয়। এর শুকনো দানায় প্রায় ২৩.৪ শতাংশ আমিষ, ৫৭.৩ শতাংশ শর্করা, ১ শতাংশ চর্বি, ৩.৮ শতাংশ আঁশ ও ৯.৭ শতাংশ পানি থাকে। গাছটি সবুজ সার, আচ্ছাদন ফসল ও গোখাদ্য হিসেবেও চাষ হয়।
বাংলাপিডিয়া জানায়, ডালে ২০ থেকে ২৫ শতাংশ আমিষ থাকে এবং প্রাণিজ খাবারের চেয়ে দাম কম হওয়ায় ডালকে কখনো কখনো ‘গরিবের মাংস’ বলা হয়। জ্ঞানকোষটির তালিকায় দেশের প্রচলিত ডাল মসুর, মুগ, মাষকলাই, ছোলা, খেসারি ও মটর; এগুলো প্রধানত দেশের পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলে রবি ফসল হিসেবে চাষ হয়। বাংলাপিডিয়া আরও লিখেছে, ধানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ডাল চাষের জমি অনেক কমে গেছে এবং দেশের ডাল উৎপাদন চাহিদার তুলনায় কম। ডাল গবেষণার একটি কেন্দ্রও পাবনাতেই: বাংলাপিডিয়া ঈশ্বরদী উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার তালিকায় ডাল গবেষণা কেন্দ্রের নাম রেখেছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা তৃতীয় উপকরণ কালোজিরা একটি মসলা। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, মসলার মূল্য তার সুগন্ধে, যা আসে উদ্বায়ী তেল থেকে; পুষ্টিগুণের জন্য মসলাকে খাদ্য হিসেবে ধরা হয় না। বড়িতে স্বাদ ও ঘ্রাণের জন্য ছোট কালো দানাগুলো ডালের পেস্টে মেশানো হয়।

খরচ, দাম ও বাজার
পাবনার কারিগররা প্রতিবেদককে জানান, সেই শীতে এ্যাংকর ডাল দিয়ে এক কেজি বড়ি তৈরিতে খরচ পড়ছিল ৬০-৭০ টাকা, আর মেশিনে ডাল পেস্ট করলে কেজিতে খরচ ১০ টাকা বাড়ে। কারিগররা এই বড়ি পাইকারি বিক্রি করছিলেন কেজি ৯০-১১০ টাকায়। পাবনার বড়ি শুধু জেলাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না; ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় যায়, পাঠানো হয় প্রবাসী স্বজনদের কাছেও। প্রতিবেদনের ভাষায়, এভাবেই তরকারির স্বাদ বাড়ানোর এই উপকরণের বিস্তার ঘটছে, আর বাড়তি আয়ে সচ্ছলতা বাড়ছে গ্রামীণ পরিবারগুলোতে।
অন্য জেলা থেকে আগে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাম ছিল বেশি, তবে সেগুলোতে ভিন্ন ডাল আর বেচাকেনার ভিন্ন স্তরের কথা বলা হয়েছে। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে আত্রাইয়ের এক নারী কারিগর বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, এক কেজি বড়ি তৈরিতে প্রায় ১২০ টাকা খরচ হয় আর বাজারে বিক্রি হয় ২০০ থেকে ২৫০ টাকায়; তখন স্থানীয় বাজারে মাষকলাই কেজি ১০০ থেকে ১২০ টাকা আর চালকুমড়া কেজি ১৫ থেকে ২০ টাকা, আকারভেদে একেকটি ৫০ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। সেখানকার এক বড়ি ব্যবসায়ী জানান, ঢাকা, যশোর ও খুলনায় এর চাহিদা সবচেয়ে বেশি। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সিরাজগঞ্জের এক ব্যবসায়ী প্রথম আলোকে জানান, বাজারে সাধারণ মানের কুমড়া বড়ি কেজি ২০০-২৫০ টাকা আর ভালো মানের বড়ি ৪৫০-৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, তবে কারিগররা পাইকারদের কাছে অনেক কম দামে বিক্রি করেন; সেই গ্রামের ১৫-২০টি পরিবার এ কাজে যুক্ত, আর সেখানে নারী শ্রমিকেরা দিনে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা কাজ করে ১৫০-২০০ টাকা মজুরি পান।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে মেহেরপুর শহরের বড় বাজারের এক বড়ি ব্যবসায়ী বাসসকে জানান, স্থানীয় বড়ির সুনাম দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে এবং তিনি প্রতিদিন প্রায় এক মণ বড়ি বিক্রি করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু বিক্রেতা অন্য সবজি মিশিয়ে কম দামে বড়ি বিক্রি করায় কয়েক বছর চাহিদা কমেছিল, তবে আগের বছর থেকে চাহিদা আবার বাড়তে শুরু করেছে।
কারিগররা যা বললেন
চাটমোহরের দোলং গ্রামের উষা রাণী প্রতিবেদককে বলেন, ‘এই গ্রামে আমরা বেশকিছু পরিবার ৫০ বছর ধরে বড়ি তৈরি করে আসছি। আগে পাটায় ডাল পিষতে হতো। এখন অনেকেই মেশিনে সেই কাজটি করে। কষ্টসাধ্য হলেও এ থেকে আমাদের ভালোই আয় হয়।’
ফরিদপুর উপজেলার ডেমরা মধ্যপাড়ার আবু সাইদ বলেন, ‘ভোর তিনটায় উঠে সকাল ৭টা পর্যন্ত কাজ করলে মণখানেক বড়ি বানানো যায়। সকালে এগুলো বানিয়ে বাজারগুলোতে পাইকারি ১০০ টাকা দরে বিক্রি করি। কেজিতে ২০-৩০ টাকা লাভ হয়। এতে সাধারণ আয়ের সঙ্গে এই বাড়তি আয়ে আমরা ভালোই আছি।’
রতনপুরের মাসুরা বেগম বলেন, ‘শীতের পুরো সময় আমরা বড়ি বানাই। আগের দিন এ্যাংকর ডাল ভিজিয়ে রেখে পরদিন বানাই। এরপর রোদে শুকানোর পর বাড়ির পুরুষ ছেলেরা বিক্রি করে। কোনো কোনো বাড়িতে আবার পুরুষরাও এই কাজ করে।’
অন্য জেলার কারিগররাও কাজটির কথা প্রায় একইভাবে বলেছেন। সিরাজগঞ্জের প্রতিবেদনে নারীরা জানান, সংসারের কাজের ফাঁকে তাঁরা বড়ি তৈরির কাজ করেন এবং যা উপার্জন করেন তা সংসারে খরচ করেন। পারিবারিক ব্যবসা হিসেবে বড়ি তৈরি করে আসা এক ব্যবসায়ী বলেন, আধুনিক যন্ত্রপাতিতে কাজ কিছুটা সহজ হয়েছে, আর সরকারি সহায়তা পেলে তাঁরা বড় পরিসরে বড়ি তৈরি করতে পারবেন। মেহেরপুরে এক গৃহবধূ বাসসকে বলেন, বড়ি তৈরিতে পরিশ্রম অনেক, দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত প্রস্তুতির পর ভোরে উঠে ডাল পিষতে হয়, তবে স্বাদের কারণে সেই কষ্ট ভুলে যেতে হয়।
বিসিকের সহায়তার আশ্বাস
বিসিক পাবনার উপমহাব্যবস্থাপক শামীম হোসেন প্রতিবেদককে বলেন, ‘বড়ি তৈরি করে উদ্যোক্তাদের বাড়তি উপার্জন অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে উদ্যোক্তারা যদি আমাদের সহযোগিতা চান তবে অবশ্যই সেটি দেওয়া হবে। প্রয়োজনে স্বল্প সুদ ও সহজ শর্তের ঋণ পেতে সহযোগিতা করা হবে। বিক্রয় বিপণনে সহযোগিতার পাশাপাশি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা হবে।’
বিসিক বেসরকারি খাতে ক্ষুদ্র, কুটির ও গ্রামীণ শিল্পের প্রসারের দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি সংস্থা। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, ১৯৫৭ সালের ১৪ মার্চ পাস হওয়া আইনে পূর্ব পাকিস্তান ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন হিসেবে এর যাত্রা শুরু, ১৯৭২ সালে নাম হয় বিসিক। সময়ের সঙ্গে সংস্থাটির কাজ যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানি থেকে সরে আসে প্রসার ও উন্নয়নে: পরামর্শসেবা, শিল্পনগরী, নকশা কেন্দ্র, উদ্যোক্তা ও ট্রেডভিত্তিক দক্ষতা প্রশিক্ষণ, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঋণপ্রাপ্তিতে সহায়তা, এবং ক্ষুদ্র উৎপাদকদের পণ্যের প্রচারে মেলা ও প্রদর্শনী। বাংলাপিডিয়ার তালিকায় বিসিকের ৪টি আঞ্চলিক কার্যালয়, ৬৪টি শিল্প সহায়ক কেন্দ্র, ৭৪টি শিল্পনগরী ও ১৫টি দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্র রয়েছে, সঙ্গে ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট।
অন্য এলাকার বড়ি কারিগরদেরও এমন আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের সিরাজগঞ্জ প্রতিবেদনে তাড়াশের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, কুমড়া বড়ি তৈরির মাধ্যমে অনেক মানুষের জীবনমান উন্নত হয়েছে, প্রয়োজনীয় ঋণের ব্যবস্থা করে দিয়ে ব্যবসা বৃদ্ধিতে সহযোগিতা করা হবে। ২০২১ সালের জানুয়ারির আত্রাই প্রতিবেদনে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বলেন, গ্রামীণ নারীরা উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও সহযোগিতা পেলে নিজেদের ভাগ্য উন্নয়নের পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবেন।
ঘরে তৈরি খাবার পরিচ্ছন্ন রাখা
কুমড়া বড়ি হাতে তৈরি হয় বাড়ির রান্নাঘর ও আঙিনায়, শুকানো হয় খোলা জায়গায়; তাই ঘরে তৈরি যেকোনো খাবারের মতো এর ক্ষেত্রেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) খাদ্য পরিচ্ছন্নতার সাধারণ নিয়মগুলো প্রযোজ্য। প্যান আমেরিকান হেলথ অর্গানাইজেশন (পাহো/ডব্লিউএইচও) ২০১৫ সালের ২১ ডিসেম্বর ডব্লিউএইচওর ‘নিরাপদ খাদ্যের পাঁচ চাবিকাঠি’ এভাবে তুলে ধরে:
- নিরাপদ পানি ও উপকরণ ব্যবহার করুন: নিরাপদ পানি ব্যবহার করুন বা পানি শোধন করে নিরাপদ করে নিন, তাজা ও ভালো খাবার বেছে নিন, ফল ও সবজি ধুয়ে নিন, মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার ব্যবহার করবেন না।
- হাত, বাসনপত্র ও কাজের জায়গা পরিষ্কার রাখুন: খাবার ধরার আগে এবং রান্নার সময় বারবার হাত ধুয়ে নিন, টয়লেট ব্যবহারের পর হাত ধুয়ে নিন, খাবার তৈরিতে ব্যবহৃত সব জায়গা ও সরঞ্জাম পরিষ্কার করুন, আর রান্নার জায়গা পোকামাকড়, ইঁদুর ও অন্য প্রাণী থেকে সুরক্ষিত রাখুন।
- খাবার ভালোভাবে রান্না করুন, রান্না করা খাবার আবার গরম করলে ভালোভাবে গরম করুন।
- নিরাপদ তাপমাত্রায় খাবার রাখুন: রান্না করা খাবার ঘরের তাপমাত্রায় দুই ঘণ্টার বেশি ফেলে রাখবেন না।
- কাঁচা মাংস, মুরগি ও সামুদ্রিক খাবার অন্য খাবার থেকে আলাদা রাখুন, কাঁচা খাবারের জন্য আলাদা ছুরি ও কাটার বোর্ড ব্যবহার করুন।
বড়ি কারিগরদের ক্ষেত্রে প্রথম দুটি চাবিকাঠি প্রতিবেদনে বর্ণিত ধাপগুলোর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত: ডাল ভেজানো ও ধোয়ার পানি, পাটা বা ডাল পেষার মেশিন, যে কাপড়ে পেস্ট বসানো হয়, আর শুকাতে দেওয়া বড়িকে পাখি, পোকামাকড় ও প্রাণী থেকে সুরক্ষিত রাখা। বড়ি খাওয়া হয় তরকারিতে রান্না করে।
ছবি: সুজয়২৫ / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাপিডিয়া (এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ), বাংলা ট্রিবিউন, প্রথম আলো, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), প্যান আমেরিকান হেলথ অর্গানাইজেশন / বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা




মন্তব্য
(০)