রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) এগ্রোনোমি অ্যান্ড এগ্রিকালচারাল এক্সটেনশন বিভাগের গবেষকরা ক্রাউন টিস্যু পদ্ধতিতে হানিকুইন জাতের আনারস ফলাতে সফল হয়েছেন। জাগো নিউজ ২৪ ২০২৬ সালের ২০ মে জানায়, আগের দিন, ১৯ মে, বিশ্ববিদ্যালয়ের এগ্রো টেকনোলজি ল্যাবে এই পরিপক্ব আনারস সংগ্রহ করা হয়। দুজন এমএসসি ও একজন পিএইচডি শিক্ষার্থীর গবেষণার অংশ হিসেবে টিস্যু থেকে চারা তৈরি করে পরিচর্যার মাধ্যমে সেগুলোকে পূর্ণাঙ্গ গাছে রূপ দেওয়া হয়।
ছোট ক্রাউনের টিস্যু থেকে অনেক চারা
বিভাগের শিক্ষক ড. মো. গিয়াস উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘এগ্রো টেকনোলজি ল্যাবে আমাদের একটি টিস্যু কালচারাল ইউনিট এবং একটি নেট হাউজ আছে। হানিকুইন জাতের আনারসের একটি মাদার প্লান্ট থেকে আমরা টিস্যু কালচার করেছি এবং এখানে মেইনটেনেন্স করছি।’ তাঁর কথায়, এই জার্মপ্লাজম সে বছর দ্বিতীয় বছরে পড়ে; আগের বছর তিনটি এবং সে বছর ২১টি আনারস সংগ্রহ করা হয়।
চারা তৈরির ধাপ বোঝাতে তিনি জানান, আনারসের ভেতরের এক থেকে দেড় সেন্টিমিটার আকারের ছোট ক্রাউনের টিস্যু থেকে কাজ শুরু হয়। সেখান থেকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ দুই পথে পুনর্জনন (রি-জেনারেশন) ঘটে, আর একটি অংশ থেকে ৫০ থেকে ১০০টি পর্যন্ত খুব ছোট চারা পাওয়া যায়। চারাগুলো একটু বড় হলে সেগুলো আলাদা পটে সরিয়ে নেওয়া হয়। সাকার ব্যবহার করেও চারা তৈরির কথা বলেন তিনি।
গাছগুলো রাখা হয়েছে ড্রিপ সেচের টানেলে; পাইপ থেকে সেলফ ওয়াটারিং স্ট্রিপের মাধ্যমে গাছ পানি ও পুষ্টি পায়। ড. গিয়াস উদ্দিনের ভাষ্য, এই আনারস আবাদি জমিতে, ছাদবাগানে বা দেশের যেকোনো জায়গায় চাষ করা যায় এবং এর জন্য খুব বেশি পরিচর্যার দরকার হয় না।

হানিকুইন জাত ও দেশের আনারস এলাকা
হানিকুইন দেশে জলডুবি নামেও পরিচিত। ২০২৪ সালের আগস্টে ফ্রন্টিয়ার্স ইন সাসটেইনেবল ফুড সিস্টেমস সাময়িকীতে প্রকাশিত বাংলাদেশের আনারস চাষিদের নিয়ে এক গবেষণাপত্রে বলা হয়, পুষ্টিগুণ ও মিষ্টতায় হানিকুইন দেশের অন্য জাতগুলোর চেয়ে ভালো। ওই গবেষণা অনুযায়ী দেশের প্রধান আনারস এলাকা টাঙ্গাইলের মধুপুর ও মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল; রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, ময়মনসিংহ, গাজীপুর ও চট্টগ্রামেও আনারস চাষ হয়।
ঢাকা ট্রিবিউন ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জানায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাঙামাটি জেলায় ২ হাজার ৫৩৭ হেক্টর জমিতে আনারসের চাষ হয়, আর জেলার নানিয়ারচর উপজেলা ‘আনারসের রাজধানী’ হিসেবে পরিচিত। হানিকুইনের প্রচলিত মৌসুম এপ্রিল থেকে জুন।

পাহাড়ের ফল সমতলে আনার চেষ্টা
ড. গিয়াস উদ্দিন বলেন, দেশে আনারস মূলত পাহাড়ি এলাকায় হয়, যেখানে বৃষ্টি বেশি এবং মাটির পিএইচ কম। ‘আমরা যদি সেই মাটির পিএইচ মেইনটেইন করে কন্ডিশনটা ঠিক রাখতে পারি, তাহলে বাংলাদেশের সব জায়গায় আনারস চাষ করা সম্ভব,’ বলেন তিনি। গবেষণা শেষ হলে বাণিজ্যিকীকরণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহায়তা চাওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
আনারস (Ananas comosus) ব্রোমেলিয়েসি পরিবারের উদ্ভিদ; এর বুনো পূর্বপুরুষের আদি নিবাস দক্ষিণ ব্রাজিল ও প্যারাগুয়ের পারানা-প্যারাগুয়ে নদী অববাহিকা। যুক্তরাষ্ট্রের পারডু বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্রপ সংকলনে থাকা জুলিয়া মর্টনের ‘ফ্রুটস অব ওয়ার্ম ক্লাইমেটস’ গ্রন্থে বলা হয়েছে, আনারসের জন্য মাটির পিএইচ ৪.৫ থেকে ৬.৫ এর মধ্যে থাকা উচিত। একই গ্রন্থ অনুযায়ী ক্রাউন, স্লিপ, সাকার ও রেটুন দিয়ে আনারসের অঙ্গজ বংশবিস্তার করা হয়।
উপ-উপাচার্যের মূল্যায়ন
ল্যাব পরিদর্শনের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মোহা. ফরিদ উদ্দীন খান বলেন, ‘এই জাতের আনারস সম্পূর্ণ অর্গানিক এবং এতে কোনো ধরনের ক্ষতিকর জীবাণু বা অনিরাপদ চাষাবাদের প্রভাব নেই। নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে উৎপাদিত হওয়ায় এর স্বাদও অসাধারণ।’ তাঁর মতে, বাণিজ্যিকভাবে এ ধরনের আনারস চাষ করা গেলে দেশের বাইরেও রপ্তানির সুযোগ তৈরি হবে।
রাজশাহীর মতিহারে ১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০০ সালে একটি স্থানীয় কৃষি কলেজ একীভূত করে কৃষি অনুষদ গঠিত হয়। এগ্রোনোমি অ্যান্ড এগ্রিকালচারাল এক্সটেনশন বিভাগ এই অনুষদের অংশ।

ছবি: Mashkawat.ahsan / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, ফ্রন্টিয়ার্স ইন সাসটেইনেবল ফুড সিস্টেমস, ঢাকা ট্রিবিউন, পারডু বিশ্ববিদ্যালয় (জুলিয়া মর্টন, ফ্রুটস অব ওয়ার্ম ক্লাইমেটস), উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)