পার্বত্য চট্টগ্রামের বুনোফল রসকো, যার আরেক নাম রক্তফল, ২০২৬ সালের এপ্রিলের শুরুতে রাঙ্গামাটি শহরের বাজারগুলোতে প্রতি কেজি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। আমদানিনির্ভর আপেলের দাম তখন কেজিপ্রতি ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা, অর্থাৎ পাহাড়ি এই ফলের দাম আপেলের চেয়েও বেশি। ২০২৬ সালের ৪ এপ্রিল রাঙ্গামাটি থেকে জাগো নিউজ ২৪ এ খবর দেয়। লাল রঙের টক-মিষ্টি স্বাদের ফলটি মার্চের মাঝামাঝি থেকে বাজারে উঠতে শুরু করে। রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের বনে লতানো গাছে এটি প্রাকৃতিকভাবে জন্মায়, আর পাহাড়ের অনেক পরিবার তখন বসতবাড়ির পাশে এর বীজ বুনতে শুরু করেছিল।
রাঙ্গামাটি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) অতিরিক্ত পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান পত্রিকাটিকে বলেন, ফলটি নিয়ে এখনো কোনো গবেষণা হয়নি। তাঁর ভাষায়, পার্বত্য তিন জেলার বিভিন্ন এলাকায় ফলটি দেখা যায়, বাজারেও এর ভালো চাহিদা আছে, আর পার্বত্য চট্টগ্রামের আবহাওয়া রসকো চাষের উপযোগী, তাই বাণিজ্যিকভাবে চাষ করে কৃষকেরা লাভবান হতে পারেন।
রসকো কী: মুনসিড পরিবারের এক কাষ্ঠল লতা
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রসকো পাহাড়ি বনে লতানো গাছে থোকা থোকা ধরে এবং পাকলে টকটকে লাল বা সিঁদুরে রঙের হয়। চাকমা ভাষায় এর নাম 'রসকো', ত্রিপুরা ভাষায় 'তাইথাক' আর মারমাদের কাছে 'লস্কর'। ভেতরের গাঢ় লাল রসের জন্য একে 'রক্তফল' বা 'রক্তগোটা'ও বলা হয়। ২০২৪ সালের ১০ জুন রাঙ্গামাটি থেকে প্রকাশিত প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনেও চাকমা ও ত্রিপুরা ভাষার একই নাম পাওয়া যায়। সেখানে ফলটিকে আঙুরের মতো থোকায় ঝোলা, কাঁচা অবস্থায় সবুজ ও পাকলে টকটকে লাল এবং স্বাদে টক-মিষ্টি বলে বর্ণনা করা হয়।
উদ্ভিদবিজ্ঞানে গাছটির নাম Haematocarpus validus (Miers) Bakh.f. ex Forman। পোর্ট ব্লেয়ারের আইসিএআর-সেন্ট্রাল আইল্যান্ড এগ্রিকালচারাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট এবং ত্রিপুরার সহযোগী গবেষকদের ২০১৮ সালে ভারতের কারেন্ট সায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে অঞ্চলভেদে ফলটির নামের তালিকা আছে: হিন্দিতে খুন ফল ও রক্ত ফল, বাংলায় রক্তগুলা ও লালগোলা, চাকমা ভাষায় রসকো, মারমা ভাষায় রাংগুইচি এবং ত্রিপুরাদের ভাষা ককবরকে থাইচাক। বাংলাদেশের দুটি গবেষণার শিরোনামেও স্থানীয় নাম রয়েছে: ২০১৪ সালের একটি গবেষণাপত্র ফলটিকে 'লালগুলা' নামে 'বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় একটি দেশজ নৃগোষ্ঠীগত ফল' বলেছে, আর ২০১৫ সালের আরেকটি গবেষণাপত্র একে 'রক্তগোটা' নামে 'বাংলাদেশের পাহাড়ি এলাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ ওষুধি ফলগাছ' বলে উল্লেখ করেছে।
ভারতের মেঘালয়ের নর্থ-ইস্টার্ন হিল ইউনিভার্সিটির গবেষকদের ২০২৫ সালের অক্টোবরে ডিসকভার প্ল্যান্টস সাময়িকীতে প্রকাশিত এক পর্যালোচনা অনুযায়ী, প্রজাতিটি মেনিস্পারমেসি বা মুনসিড পরিবারের সদস্য, যে পরিবারের উদ্ভিদে প্রচুর অ্যালকালয়েড থাকে। পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, Haematocarpus গণে দুটি প্রজাতি আছে এবং H. validus মূলত বাংলাদেশ, ভারত, লাওস, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে পাওয়া যাওয়ার তথ্য আছে। ভারতে এটি প্রধানত উত্তর-পূর্বের আসাম, অরুণাচল প্রদেশ, মেঘালয়, মিজোরাম ও ত্রিপুরার ক্রান্তীয় পর্ণমোচী ও চিরসবুজ বনে জন্মায়; পশ্চিমবঙ্গ এবং আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জেও এর দেখা মেলে। কারেন্ট সায়েন্সের গবেষণাপত্রে আরও বলা হয়েছে, ভারতের বাইরে বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর, পাকিস্তান ও থাইল্যান্ডেও প্রজাতিটির উপস্থিতির তথ্য রয়েছে।
বড় গাছে ভর করে বাঁচে যে লতা
কারেন্ট সায়েন্সের গবেষণাপত্রে রক্তফলকে এমন এক কাষ্ঠল লতা বলা হয়েছে, যা বড় গাছের অবলম্বনে বেড়ে ওঠে। এর পাতা উপবৃত্তাকার, ডিম্বাকার-উপবৃত্তাকার বা বিপরীত-ডিম্বাকার-উপবৃত্তাকার। আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে গবেষকেরা যে পাতাগুলো মেপেছিলেন, সেগুলো গড়ে ১২.৫০ সেন্টিমিটার লম্বা ও ৫.৬১ সেন্টিমিটার চওড়া, পাতার বোঁটা ১.৬ থেকে ২.৫ সেন্টিমিটার। ফুল ধরে ৪০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা মঞ্জরিতে, লতার মূল কাণ্ডে বা পাতার কক্ষে। ফুলের রং হালকা সবুজ থেকে হলদেটে, তাই উঁচু ডালের ফুল আশ্রয়দাতা গাছের পাতা থেকে আলাদা করে চেনা কঠিন। ডিসকভার প্ল্যান্টসের পর্যালোচনা যোগ করেছে, প্রজাতিটি ভিন্নবাসী, অর্থাৎ পুরুষ ও স্ত্রী ফুল আলাদা গাছে হয়, আর এর ফুল সরাসরি পুরোনো কাণ্ড থেকে বের হয়।
উদ্ভিদবিজ্ঞানের ভাষায় ফলগুলো ড্রুপ বা আঁটিযুক্ত ফল। এগুলো থোকায় ধরে, তবে একসঙ্গে পাকে না: একই থোকায় কিছু ফল সবুজ থাকতেই অন্যগুলো লাল হয়ে যায়। রং বদলায় সবুজ থেকে লালচে, শেষে গাঢ় লাল বা বেগুনি। খোসা সাধারণত পুরু এবং খাওয়া হয় না; বীজ ঘিরে থাকা রক্তলাল শাঁস থেকেই ফলটির ইংরেজি নাম ব্লাড ফ্রুট। আন্দামানের ফলের শাঁসে মোট দ্রবণীয় কঠিন পদার্থ, অর্থাৎ মিষ্টতার মাপ, ছিল ১৮ থেকে ১৯ ডিগ্রি ব্রিক্স।
২০২৫ সালের পর্যালোচনায় আগের বিভিন্ন গবেষণার মাপজোখ একসঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশের চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চলের ফলের গড় ওজন প্রায় ২৮ গ্রাম, দৈর্ঘ্য ৪ থেকে ৫ সেন্টিমিটার এবং প্রস্থ ২ থেকে ২.৫ সেন্টিমিটার; ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে মাপা ফলের ওজন ছিল প্রায় ১৫ থেকে ২১ গ্রাম। বাংলাদেশের ফলে ওজনের প্রায় ৬৪ শতাংশ খোসা, প্রায় ২২ শতাংশ শাঁস এবং প্রায় ১৪ শতাংশ বীজ। পর্যালোচকেরা লিখেছেন, চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চলের ফল আকারে বড় এবং এতে শাঁসের অংশ বেশি হওয়ায় চাষের জন্য ভালো গাছ বাছাইয়ে এগুলো সম্ভাবনাময়।
পর্যালোচনা অনুযায়ী, বনে লতাটি প্রধানত অক্ষত, আর্দ্র ও চিরসবুজ বনাংশে দেখা যায়, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১ হাজার মিটার বা তারও বেশি উচ্চতা পর্যন্ত, এবং বট, কাঁঠাল ও বাক্কাউরিয়া গণের বড় গাছ বেয়ে ওঠে। কারেন্ট সায়েন্সের গবেষণাপত্রে উল্লেখ আছে, প্রজাতিটি শুষ্ক আবহাওয়া ও অত্যন্ত অম্লীয় মাটিসহ নানা প্রতিকূল অবস্থা সহ্য করতে পারে বলে জানা যায়।

যে পাহাড়ি জেলাগুলোতে রসকো জন্মায়
জাগো নিউজ ২৪-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের গহিন বনে বা পাহাড়ের ঢালে রসকো প্রাকৃতিকভাবে জন্মায়। ফলটি মূলত মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত পাওয়া যায়। পাকা ফল সরাসরি খাওয়া যায়, অনেকে ভর্তা বা জ্যাম বানিয়েও খান। ভারতে কারেন্ট সায়েন্সের গবেষণাপত্র অনুযায়ী আন্দামান ও ত্রিপুরায় ফল পাকার প্রধান মৌসুম এপ্রিল থেকে জুন; ডিসকভার প্ল্যান্টসের পর্যালোচনা বলছে, উত্তর-পূর্ব ভারতে অক্টোবরে ফুল আসা শুরু হয় এবং মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত স্থানীয় বাজারে ফল বিক্রি হয়।
জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের একমাত্র বিস্তৃত পাহাড়ি অঞ্চল। দেশের দক্ষিণ-পূর্বে এর আয়তন প্রায় ১৩ হাজার ১৮৪ বর্গকিলোমিটার, যা দেশের মোট আয়তনের মোটামুটি এক-দশমাংশ। অঞ্চলটির দক্ষিণ-পূর্বে মিয়ানমার, উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য, পূর্বে মিজোরাম এবং পশ্চিমে চট্টগ্রাম জেলা। আশির দশকের শুরুতে এটিকে রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান এই তিনটি জেলায় ভাগ করা হয়।
বাংলাপিডিয়ায় অঞ্চলটির জলবায়ুকে ক্রান্তীয় মৌসুমি জলবায়ু বলা হয়েছে: নভেম্বর থেকে মার্চ শুষ্ক ও শীতল মৌসুম, এপ্রিল-মে প্রাক-বর্ষার খুব গরম ও রৌদ্রোজ্জ্বল সময়, আর জুন থেকে অক্টোবর উষ্ণ, মেঘলা ও আর্দ্র বর্ষাকাল। গড় বার্ষিক বৃষ্টিপাত উত্তর ও পূর্বাংশে প্রায় ২ হাজার ৫৪০ মিলিমিটার, দক্ষিণ ও পশ্চিমাংশে ২ হাজার ৫৪০ থেকে ৩ হাজার ৮১০ মিলিমিটার। পাহাড়ের মাটি প্রধানত হলদেটে-বাদামি থেকে লালচে-বাদামি দোআঁশ এবং অত্যন্ত অম্লীয়; পাহাড়, নদী ও খাড়া ঢাল ঘন বাঁশঝাড়, উঁচু গাছ আর লতাগুল্মের জঙ্গলে ঢাকা। ফলে মার্চ থেকে মে পর্যন্ত রসকোর মৌসুম শুষ্ক মৌসুমের শেষভাগ আর প্রাক-বর্ষার গরম মাসগুলো জুড়ে থাকে।
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, রাঙ্গামাটি জেলার আয়তন ৬ হাজার ১১৬.১১ বর্গকিলোমিটার, উপজেলা ১০টি, আর ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জনসংখ্যা ছিল ৫ লাখ ৯৫ হাজার ৯৭৯। এখানে চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর বাস, আর কাপ্তাই হ্রদ জেলার সবচেয়ে পরিচিত জলাধার। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে জেলার ৫৯.০৮ শতাংশ মানুষের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি। ২০০৭ সালে বাংলাদেশ জার্নাল অব প্ল্যান্ট ট্যাক্সোনমিতে প্রকাশিত পার্বত্য অঞ্চলের ওষুধি উদ্ভিদ নিয়ে এক জরিপে বলা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রামে অন্তত ১২টি জাতিগোষ্ঠী বাস করে। এদের মধ্যে চাকমারা সবচেয়ে বড় এবং তাঁরা মূলত রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ির একাংশে থাকেন; এরপর মারমারা, যাঁরা তিন জেলাতেই প্রায় সমানভাবে ছড়িয়ে আছেন, আর ত্রিপুরাদের বসতি প্রধানত খাগড়াছড়িতে।

দামে আপেলকেও ছাড়িয়ে
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুধবার ও শনিবার সাপ্তাহিক হাটের দিন ছাড়াও রাঙ্গামাটি শহরের বনরুপা, রাজবাড়ী, কল্যাণপুর, কলেজগেট ও তবলছড়ি বাজারে ফলটি বিক্রি হতে দেখা যায়। বিক্রেতারা জানান, চাহিদা প্রচুর এবং আকারভেদে প্রতি কেজি ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়।
বনরুপা বাজারের বিক্রেতা সুবল চাকমা পত্রিকাটিকে বলেন, ফলের ভেতরটা রক্তের মতো লাল রসে ভরা থাকে, আর রক্তস্বল্পতা দূর হয় এই বিশ্বাসে অনেকে আগ্রহ নিয়ে ফলটি খান। তিনি বলেন, 'পাহাড়ের বনে-জঙ্গলে আগে প্রচুর হতো। তখন তেমন দাম ছিল না। এখন গাছ খুব বেশি দেখা যায় না। দামও অনেক বেশি। প্রথমদিকে আমি ৫০০ টাকা কেজি বিক্রি করেছি। এখন ৪০০ টাকায় বিক্রি করছি।'
এমন দাম আগেও দেখা গেছে। ২০২৪ সালের জুনে প্রথম আলো জানায়, রসকোর চাহিদা বাড়লেও জোগান তাল মেলাতে পারছে না, কারণ পুরো ফলটাই প্রাকৃতিক বন থেকে সংগ্রহ করা হয়। রাঙ্গামাটির এক ব্যবসায়ী তখন পত্রিকাটিকে বলেন, সেই মৌসুমের শুরুতে তিনি প্রতি কেজি ৬০০ টাকায় বিক্রি করেছেন, পরে ৪০০ টাকায়। ডিএইর তৎকালীন উপপরিচালক মো. মনিরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেছিলেন, ফলটি কেবল পাহাড়ি এলাকায় প্রাকৃতিকভাবে জন্মায়, বাণিজ্যিক চাষের আগে গবেষণা দরকার এবং বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা জরুরি; তাঁর মতে, ফলটি খাবারের রং এবং রং তৈরির কাজেও ব্যবহার করা যায়।
সীমান্তের ওপারেও স্থানীয় বাজারে ফলটি বিক্রি হয়। কারেন্ট সায়েন্সের গবেষণাপত্রে ২০১৭ সালে মধ্য আন্দামানের বাজারে প্রতি কেজি প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ ভারতীয় রুপি দামের উল্লেখ আছে, আর ২০২৫ সালের পর্যালোচনা বলছে, মেঘালয়ের গারো পাহাড়ে ২০০ থেকে ৫০০ গ্রামের একটি ছোট থোকা ১০০ রুপিতে বিক্রি হয়েছে। সেখানকার প্রবীণ গ্রামবাসী ও কবিরাজেরা গবেষকদের বলেছেন, একসময় ফলটি প্রচুর পাওয়া যেত এবং দামও কম ছিল।

বসতবাড়ির পাশে রসকোর আবাদ
প্রতিবেদনে বলা হয়, পাহাড়ি এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে ফলটি চাষের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে, কারণ এর চাহিদা পাহাড় ছাড়িয়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং সমতলের অন্যান্য এলাকায়ও ছড়িয়ে পড়ছে। অনেকেই বিক্রির উদ্দেশ্যে বসতবাড়ির পাশে এর বীজ বুনছেন।
নানিয়ারচর উপজেলার ঘিলাছড়ি ইউনিয়নের কৃষ্ণমাছড়া এলাকার সুব্রত বিকাশ চাকমা বাড়ির পাশে ফলটির আবাদ করেছেন। তিনি পত্রিকাটিকে বলেন, 'এই ফলের লতাটির বয়স ১৮ বছরের বেশি হবে। বীজ থেকে লতাটি লাগানোর ছয় থেকে সাত বছরের মধ্যে ফল এসেছে। এ পর্যন্ত প্রায় ৫০ হাজার টাকার ওপরে ফল বিক্রি করেছি।' বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, রাঙ্গামাটি শহরের উত্তরের নানিয়ারচর উপজেলার আয়তন ৩৯৩.৬৭ বর্গকিলোমিটার, যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জুড়ে কাপ্তাই হ্রদ।
রাঙ্গামাটি সদর উপজেলার কুতুকছড়ি ইউনিয়নের মৌনতলা এলাকার লক্ষ্মী কুমার চাকমার একটি রসকো লতা আছে, যা ১৫ বছর ধরে ফল দিচ্ছে। সে বছর তিনি ৭০ হাজার টাকার রসকো বিক্রির আশা করছিলেন এবং চাষ বাড়াতে আরও কয়েকটি লতা রোপণ করেছিলেন। প্রাকৃতিক বনের বড় গাছে রসকো লতা বেড়ে ওঠে জানিয়ে তিনি বলেন, 'ফলটি চাষ করতে হলে বড় গাছ লাগবে। যে গাছের স্থায়িত্ব অনেক বছর হয়। সাধারণত আম গাছে এই লতা ভালোভাবে বেড়ে ওঠে। বড় গাছের কোনো ক্ষতি না করে বছরের পর বছর বেঁচে থাকে লতাটি।'
লতাটি কীভাবে জন্মানো যায়, সে বিষয়ে ভারতের গবেষণায় কিছু তথ্য মেলে। কারেন্ট সায়েন্সের গবেষণায় আন্দামানের পাকা ফলের বীজ ভিজিয়ে রেখে নারকেলের ছোবড়ার গুঁড়োয় বোনা হয়। প্রথম ৪৫ দিনে কোনো পদ্ধতিতেই একটি বীজও গজায়নি, যাকে গবেষকেরা বীজের সুপ্তাবস্থার লক্ষণ হিসেবে দেখেছেন। ১১৫ দিনের মাথায় শুধু পানিতে ভেজানো বীজের প্রায় ৭৫ শতাংশ গজায়, আর সবচেয়ে ভালো পদ্ধতিতে অঙ্কুরোদগম হয় ৮৫.৪ শতাংশ। চারাগুলো সমান ভাগ মাটি ও গোবরসারে ভরা পলিব্যাগে সরিয়ে কাঠির খুঁটি দিয়ে রাখা হয়, মাঠে লাগানোর আগ পর্যন্ত। ২০২৫ সালের পর্যালোচনা বলছে, বীজ থেকে জন্মানো গাছ পরিণত হয়ে ফুল দিতে প্রায় সাত বছর লাগে, আর কাটিং বা ডাল থেকে জন্মানো গাছে লাগে প্রায় চার বছর।
একই পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, মেঘালয়ের গারো পাহাড়ে লতাটি কাঁঠাল, বার্মিজ গ্রেপ নামে পরিচিত বাক্কাউরিয়া রামিফ্লোরা, ডুমুরজাতীয় গাছ, শিমা ওয়ালিচি, শাল ও হরীতকীর মতো দেশি গাছে এবং সুপারি গাছে জোরালোভাবে বেড়ে ওঠে। পর্যালোচকেরা দেশি গাছ ও বাণিজ্যিক ফসলের সঙ্গে মিলিয়ে কৃষি-বনায়নে এর চাষের প্রস্তাব দিয়েছেন। তাঁরা বাধাগুলোও তুলে ধরেছেন: প্রথম ফলনের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা, বীজের সুপ্তাবস্থা, পরাগায়নকারীর ওপর নির্ভরশীল আলাদা পুরুষ ও স্ত্রী গাছ, কাটিং বা কলমে বংশবিস্তার নিয়ে গবেষণার ঘাটতি এবং কৃষকদের মধ্যে সচেতনতার অভাব। বাংলাদেশে যাঁরা লতাটি লাগাতে চান, তাঁরা উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শ নিতে পারেন।
গবেষণাগারে যা পাওয়া গেছে
ডিএই কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান জাগো নিউজ ২৪-কে বলেন, পুষ্টিগুণ হিসেবে ফলটিতে আঁশ ছাড়াও ভিটামিন এ, ভিটামিন সি ও ভিটামিন বি-৬ আছে। ফলটির নানা উপাদান নিয়ে মূলত ভারতে হওয়া গবেষণাগারের বিশ্লেষণে কিছু পরিমাপ পাওয়া যায়।
মেঘালয়ের উমিয়ামে অবস্থিত আইসিএআর রিসার্চ কমপ্লেক্স ফর নর্থ ইস্টার্ন হিল রিজিয়নের এক গবেষণা ২০২৩ সালের মার্চে ফ্রন্টিয়ার্স ইন নিউট্রিশন সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। এতে ২০১৯ ও ২০২০ সালে মেঘালয় থেকে সংগৃহীত নয়টি বুনোফল বিশ্লেষণ করা হয়। নয়টির মধ্যে রক্তফলেই রসের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি (৪৩.৭২ শতাংশ), আর মোট দ্রবণীয় কঠিন পদার্থ (১৮.২৭ শতাংশ), মোট চিনি (১১.২৭ শতাংশ), আর্দ্রতা (৮৮.৩৯ শতাংশ), অ্যাসকরবিক অ্যাসিড হিসেবে মাপা ভিটামিন সি (প্রতি ১০০ গ্রাম শাঁসে ৬৩.৮২ মিলিগ্রাম), মোট ক্যারোটিনয়েড (প্রতি ১০০ গ্রামে ১৮.৪৭ মিলিগ্রাম) ও মোট অ্যান্থোসায়ানিন রঞ্জক (প্রতি ১০০ গ্রামে ৩৫৪.০৪ মিলিগ্রাম) সবই ছিল সর্বোচ্চ। গবেষকেরা এর ভিটামিন সি-কে আপেল (প্রতি ১০০ গ্রামে ৭.৯৪ মিলিগ্রাম) ও কমলার (প্রতি ১০০ গ্রামে ১০.১৩ মিলিগ্রাম) মতো বাণিজ্যিক ফলের পরিমাপের সঙ্গে তুলনা করেছেন, তবে উল্লেখ করেছেন যে পেয়ারা ও আমলকী ভিটামিন সি-র অনেক বেশি সমৃদ্ধ উৎস।
২০২১ সালে জার্নাল অব ফুড সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে প্রকাশিত এক গবেষণায় ফলটিতে প্রচুর আয়রন পাওয়া যায়: শুকনো ওজনের প্রতি ১০০ গ্রামে ৫৭.২৯ মিলিগ্রাম। এতে সোডিয়ামের তুলনায় পটাশিয়ামের অনুপাতও খুব বেশি (২৮০.৬৫)। গবেষণায় ফলে ৫৪টি যৌগ শনাক্ত হয়, যার মধ্যে প্রধান কুইনিক অ্যাসিড, শুকনো ওজনের প্রতি ১০০ গ্রামে ২৯২.৯৫ মিলিগ্রাম। একই সাময়িকীতে ২০১৯ সালে পোর্ট ব্লেয়ারের গবেষকসহ একটি দলের গবেষণায় দেখা যায়, শাঁস অম্লীয়, পিএইচ ৩.০১ এবং মিষ্টতা ১৭ ডিগ্রি ব্রিক্স; পুরো পাকা ফলের শাঁসে প্রতি গ্রামে ৮.৭৬ মিলিগ্রাম অ্যান্থোসায়ানিন ছিল, যার প্রধান রঞ্জক পেলারগোনিডিন। গবেষকেরা ফলটিকে খাদ্য ও রং শিল্পের জন্য সম্ভাব্য প্রাকৃতিক রঞ্জক হিসেবে দেখেছেন।

রক্তস্বল্পতা, জন্ডিস ও চুলকানি: প্রচলিত ব্যবহার ও সতর্কতা
ডিএই কর্মকর্তা পত্রিকাটিকে আরও বলেন, পাহাড়িরা এই ফলের লতা জন্ডিস ও চুলকানির ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করেন এবং ফলটি খেলে রক্তশূন্যতা দূর হয়; বনরুপা বাজারের বিক্রেতাও একই বিশ্বাসের কথা বলেছেন। গবেষণা সাহিত্যেও একই ধরনের প্রচলিত ব্যবহারের উল্লেখ আছে। কারেন্ট সায়েন্সের গবেষণাপত্র অনুযায়ী, প্রচলিত চিকিৎসায় ফল ও বীজ রক্তস্বল্পতায়, শিকড় চুলকানিতে এবং কচি ডগা জন্ডিসে ব্যবহার করা হয়, আর নিকোবরের জনগোষ্ঠী শরীর ব্যথায় পাতার ক্বাথ ব্যবহার করে। ২০২৫ সালের পর্যালোচনা বলছে, চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চলের চাকমা ও মারমা জনগোষ্ঠী জন্ডিসে কচি ডগা এবং চুলকানিতে শিকড় ব্যবহার করে; তাঁরা পিঠা ও পায়েসে ফলটি মেশান এবং পাকা ফল শুকিয়ে পরে খাওয়ার জন্য রেখে দেন।
এখানে উল্লেখ করা গবেষণাগুলো ফলে কী আছে তা মেপেছে; এর কোনোটিতেই মানুষের ওপর পরীক্ষা করে দেখা হয়নি যে ফলটি খেলে রক্তস্বল্পতা বা অন্য কোনো রোগ সারে কি না। যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা (এনএইচএস) অনুযায়ী, আয়রনের ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতা প্রায়ই রক্তক্ষরণ বা গর্ভধারণের কারণে হয়। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে হালনাগাদ করা এনএইচএসের নির্দেশনা হলো, চিকিৎসকের কাছে যাওয়া; চিকিৎসক সাধারণত রক্তের পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা (ফুল ব্লাড কাউন্ট) করান, আর মাত্রা কম হলে সাধারণত প্রায় ছয় মাসের জন্য আয়রন ট্যাবলেট দেন। এনএইচএস আয়রনসমৃদ্ধ খাবার হিসেবে গাঢ় সবুজ শাক, আয়রন মেশানো সিরিয়াল ও রুটি, মাংস, শুকনো ফল ও ডালের কথা বলে এবং চা, কফি, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার কমাতে পরামর্শ দেয়, কারণ এগুলো শরীরে আয়রন শোষণ কঠিন করে তুলতে পারে। রক্তস্বল্পতা, জন্ডিস বা দীর্ঘদিনের চর্মরোগের লক্ষণ থাকলে কোনো ফল বা লতার ওপর ভরসা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
বনে কমছে রসকোর লতা
বনরুপা বাজারের বিক্রেতার কথা, এখন আর লতা তেমন দেখা যায় না, বৈজ্ঞানিক সাহিত্যেও তার প্রতিধ্বনি আছে। কারেন্ট সায়েন্সের গবেষণাপত্র বলছে, বাংলাদেশে প্রজাতিটিকে 'সংকটাপন্ন' (ভালনারেবল) হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছিল এবং পরের এক প্রতিবেদনে একে 'অত্যন্ত হুমকির মুখে' বলা হয়; দুটি প্রতিবেদনই মানুষের ক্রমবর্ধমান কর্মকাণ্ড ও জলবায়ুগত কারণকে দায়ী করে দ্রুত সংরক্ষণের আহ্বান জানায়। গবেষণাপত্রে আরও বলা হয়েছে, মেঘালয়ে একে 'মহাবিপন্ন' (ক্রিটিক্যালি এনডেঞ্জারড) শ্রেণিতে রাখা হয়েছিল। ২০২৫ সালের পর্যালোচনায় উল্লেখ আছে, আইইউসিএনের লাল তালিকায় রক্তফল বিপন্ন হিসেবে তালিকাভুক্ত নয়, তবে বহু স্থানীয় ও আঞ্চলিক গবেষণায় একে বিপন্ন, সংকটাপন্ন বা হুমকির মুখে থাকা প্রজাতি বলা হয়েছে, এবং ২০১৫ সালের বাংলাদেশি এক গবেষণায় একে অত্যন্ত হুমকির মুখে থাকা ও সংরক্ষণে বিশেষ মনোযোগ প্রয়োজন এমন প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
পর্যালোচনায় উত্তর-পূর্ব ভারতে প্রজাতিটি কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে আবাসস্থল ধ্বংস ও বন উজাড়, অটেকসই আহরণ, জুম চাষ, বাণিজ্যিকভাবে একক সুপারি চাষ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং সচেতনতার অভাবকে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রায় সব ফল এখনো বন থেকেই সংগ্রহ করা হয় বলে কারেন্ট সায়েন্সের গবেষকেরা যুক্তি দিয়েছেন, বসতবাড়ির বাগানে লতাটির চাষ বনের গাছের ওপর চাপ কমাতে পারে এবং একই সঙ্গে স্থানীয় মানুষের পুষ্টির একটি উৎস হতে পারে।
বাংলাদেশের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর খাদ্যতালিকায় ফলটি এখনো জায়গা ধরে রেখেছে। বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউট, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশ জার্নাল অব এগ্রিকালচারে প্রকাশিত বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলা নিয়ে এক গবেষণায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ব্যবহার করা ২৩টি পরিবারের ৩৫টি বুনো খাদ্যফল নথিভুক্ত হয়েছে। সেখানে যে ফলগুলো সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়, তার মধ্যে Haematocarpus validus বা রক্তফলের নাম রয়েছে।
ছবি: অ্যাডাম জোন্স / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ২.০)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রথম আলো, কারেন্ট সায়েন্স (আইসিএআর-সেন্ট্রাল আইল্যান্ড এগ্রিকালচারাল রিসার্চ ইনস্টিটিউট, ২০১৮), ডিসকভার প্ল্যান্টস (নর্থ-ইস্টার্ন হিল ইউনিভার্সিটি, ২০২৫), ফ্রন্টিয়ার্স ইন নিউট্রিশন (আইসিএআর রিসার্চ কমপ্লেক্স ফর নর্থ ইস্টার্ন হিল রিজিয়ন, ২০২৩), জার্নাল অব ফুড সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (২০১৯ ও ২০২১), বাংলাদেশ জার্নাল অব এগ্রিকালচার (২০২৪), বাংলাদেশ জার্নাল অব প্ল্যান্ট ট্যাক্সোনমি (২০০৭), বাংলাপিডিয়া, যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা (এনএইচএস)





মন্তব্য
(০)