চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলায় বছরে প্রায় ৭০ কোটি টাকার স্ট্রবেরি উৎপাদন হয় বলে জানিয়েছিলেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নয়ন মিয়া। ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ জাগো নিউজে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, জেলায় স্ট্রবেরি চাষির সংখ্যা প্রতি বছর বাড়ছে এবং এখানকার ফল জেলার চাহিদা মিটিয়ে ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় যাচ্ছে। তবে স্থানীয় বাজার না থাকায় বিপণন নিয়ে ভুগছিলেন চাষিরা।
শিবগঞ্জের কোথায় চাষ, কোন জাত
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় যে স্ট্রবেরি চাষ হয় তা আমেরিকান ফেস্টিভ্যাল জাতের। সবচেয়ে বেশি চাষ হয় শিবগঞ্জের কালুপুর, ভাঙ্গাব্রিজ, পারকালুপুর ও পারদিলালপুর এলাকায়। এসব এলাকায় স্থানীয় বাজার নেই, তাই চাষিরা নিজেরাই ফল বিক্রির জন্য ঢাকাসহ অন্য অঞ্চলে পাঠান।
শিবগঞ্জ দেশের সবচেয়ে পশ্চিমের উপজেলা; এর উত্তর ও পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলা। চাঁপাইনবাবগঞ্জ আমের জন্য পরিচিত, কিন্তু আমে লোকসান দিয়ে সেখানকার চাষিরা কয়েক বছর ধরে স্ট্রবেরির দিকে ঝুঁকছেন। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে বাংলানিউজটোয়েন্টিফোরের এক প্রতিবেদনে জেলা কৃষি বিভাগের বরাতে বলা হয়, ২০২২ সালে জেলার প্রায় ২০০ বিঘা জমিতে ৪০৫ মেট্রিক টন স্ট্রবেরি উৎপাদিত হয়েছিল এবং পরের মৌসুমে চাষের জমি বেড়ে দাঁড়ায় ৭৫৮ বিঘায়, যার ৭৪০ বিঘাই শিবগঞ্জে। চাষিরা তখন জানিয়েছিলেন, শিলাবৃষ্টি, ঝড় ও রোগবালাইয়ে আমের চাষ ব্যাহত হচ্ছে, অথচ স্ট্রবেরির মৌসুম শীতের মাঝামাঝি বলে আবহাওয়াজনিত ক্ষতি কম।

চাষিরা যা বলছিলেন
শাহবাজপুর ইউনিয়নের পারদিলাম গ্রামের চাষি আনারুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘কয়েক বছর থেকেই আম গাছ কেটে বাণিজ্যিকভাবে স্ট্রবেরি চাষ শুরু করেছি। রমজান মাসে বেড়েছে এর চাহিদা। দামও পাওয়া যাচ্ছে ভালো।’
অনার্স শেষ করা তরুণ আহসান সজিব কৃষি কর্মকর্তাদের সহায়তায় সেই মৌসুমে ২ বিঘা জমিতে স্ট্রবেরি চাষ করেন। তিনি বলেন, প্রথম দিকে মানুষ তাঁকে নিয়ে উপহাস করত; এখন তিনি দিনে ৫০ কেজির বেশি স্ট্রবেরি ৬০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছেন, দিনে আয় ৩০ হাজার টাকা এবং খরচ বাদে লাভ ১৫ হাজার টাকার বেশি।
দুর্লভপুর ইউনিয়নের কালোপুর গ্রামের শাফিক আলী বলেন, ‘আমাদের গ্রামের চিত্রই পরিবর্তন করে দিয়েছে স্ট্রবেরি। গ্রামের সিংহভাগ মানুষ এখন স্ট্রবেরি চাষ করে।’ আরেক চাষি আব্দুল করিম জানান, আমে দীর্ঘদিন লোকসান দিয়ে তিনি স্ট্রবেরি চাষ শুরু করেন; আগের বছর তেমন লাভ না হলেও সেই মৌসুমে ২ বিঘা জমির স্ট্রবেরি তখন পর্যন্ত ১৫ লাখ টাকায় বিক্রি করেছেন।

দেশে স্ট্রবেরি চাষের পটভূমি
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারির প্রতিবেদনে কৃষি কর্মকর্তাদের বরাতে বলা হয়, দেশে ছোট পরিসরে স্ট্রবেরি চাষ শুরু হয় ২০০৭-০৮ সালের দিকে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. মনজুর হোসেন ১৯৯৬ সালে জাপান থেকে কয়েকটি জাত আনেন; সেগুলো এ দেশের আবহাওয়ায় টেকেনি, পরে গবেষণা চালিয়ে উপযোগী জাত খুঁজে বের করেন এবং ২০০৭ সাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে বড় পরিসরে চাষ শুরু হয়। সেখানে শত শত চাষিকে প্রশিক্ষণ ও চারা দেওয়া হয়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দেশে ২৮০ হেক্টর জমিতে প্রায় ১ হাজার ৫৯৪ টন স্ট্রবেরি উৎপাদিত হয়েছিল, কিন্তু ক্রেতার অভাবে চাষিরা কেজি ১০ থেকে ২০ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হন এবং পরের বছর উৎপাদন নেমে আসে ৪৫০ টনে। ২০২১-২২ অর্থবছরে ১০১ হেক্টর জমিতে প্রায় ৭৮৯ টন উৎপাদন হয়। স্ট্রবেরি দ্রুত পচনশীল বলে বাজারজাত করাও কঠিন, প্রতিবেদনে এ কথাও বলা হয়।
স্থানীয় বাজারের দাবি, রপ্তানির চেষ্টা
চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মুনজের আলম মানিক জাগো নিউজকে বলেন, ‘স্ট্রবেরির বাম্পার ফলন হলেও নেই স্থানীয় বাজার ব্যবস্থা। এতে বিপণনে বাধাগ্রস্ত হচ্ছেন চাষিরা। আমের মতো স্থানীয় বাজার ব্যবস্থা থাকলে আমরা আরও লাভবান হতাম।’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নয়ন মিয়া বলেন, শুধু শিবগঞ্জেই বছরে প্রায় ৭০ কোটি টাকার স্ট্রবেরি উৎপাদন হয়, তাই বিদেশে রপ্তানির চেষ্টা চলছে; রপ্তানি হলে জেলার অর্থনীতি চাঙা হবে। তাঁর মতে, অল্প বিনিয়োগে বেশি মুনাফা হওয়ায় চাষিদের আগ্রহ বেশি, তবে ঝুঁকিও আছে: ‘বাজার ধরতে না পারলে চাষিরা ক্ষতির সম্মুখীনও হতে পারেন।’

ছবি: Shixart1985 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)
সূত্র: জাগো নিউজ, বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর (১৫ জানুয়ারি ২০২৩), দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩), উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)