সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৬°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৭৩%বাতাস ৩ কিমি/ঘ

পিরোজপুরের পালপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৬০ রকমের দেশি ফলের উৎসব

শিশুদের দেশি ফল চেনাতে ২০২৬ সালের ২৩ জুন পিরোজপুর সদরের পালপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৬০ রকমের বেশি দেশি ফল নিয়ে বার্ষিক ফল উৎসব হয়েছিল।

পিরোজপুরের পালপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৬০ রকমের দেশি ফলের উৎসব
ফল

পিরোজপুর সদর উপজেলার পালপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ২০২৬ সালের ২৩ জুন, মঙ্গলবার, দুপুরে ৬০ রকমের বেশি দেশি ফল নিয়ে ফল উৎসবের আয়োজন করা হয়েছিল। 'খেলে ফল বাড়ে বল' প্রতিপাদ্য সামনে রেখে বিদ্যালয়ের অডিটোরিয়ামে আলোচনা সভা ও ফলের প্রদর্শনী হয়। প্রধান শিক্ষকের ভাষ্য অনুযায়ী, শিশুরা যাতে দেশি ফল চিনতে পারে এবং সেগুলোর পুষ্টিগুণ সম্পর্কে জানতে পারে, সে জন্যই প্রতিবছর এই উৎসব করা হয়। আয়োজনে প্রধান অতিথি ছিলেন পিরোজপুরের জেলা প্রশাসক আলমগীর হোসেন।

উৎসবের দিন বিদ্যালয়ে যা হলো


জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পালপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নিজেই এই আলোচনা সভা ও ফল উৎসবের আয়োজক ছিল। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোল্লা বখতিয়ার রহমান। উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ও পৌর প্রশাসক মাহমুদুর রহমান মামুন, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম এবং উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শওকত হোসেন। শিক্ষা ও কৃষি, দুই দপ্তরের কর্মকর্তাদের একসঙ্গে উপস্থিতি আয়োজনটির উদ্দেশ্যকেই তুলে ধরে: বিদ্যালয়ের শিশুদের কাছে দেশের মাটিতে জন্মানো ফলকে পরিচিত করা।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সোহেলী আসফিয়া বলেন, 'প্রতিবছরই ফল উৎসবের আয়োজন করা হয়। স্কুলের বাচ্চারা যাতে দেশি ফলগুলো চিনতে পারে এবং পুষ্টি গুণাগুণ সম্পর্কে জানতে পারে, এ কারণেই এই আয়োজন। এবছর ৬০ রকমেরও বেশি ফল দিয়ে ফল উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে।'

পঞ্চম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী জাগো নিউজকে বলে, 'স্কুলে ফল উৎসব হচ্ছে। ফলগুলো দেখে খুব ভালো লাগছে। একসঙ্গে এতগুলো ফল এর আগে কখনো দেখিনি। প্রত্যেকটা ফল থেকে একটু একটু করে খেয়েছি।' অভিভাবক নিলুফা বেগম বলেন, 'বিদ্যালয়ে এমন ব্যতিক্রমী আয়োজন খুবই ভালো লেগেছে। বাচ্চারাও অনেক আনন্দিত। বিদেশি ফলের চেয়ে দেশি ফলে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।'

দেশি ফল নিয়ে জেলা প্রশাসকের বক্তব্য


প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক আলমগীর হোসেন দেশি ফলের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, 'দেশি ফলের প্রতি বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। দেশীয় ফলগুলোতে অনেক পুষ্টিগুণ থাকে। বিদেশি ফলে কেমিক্যাল থাকতে পারে, যা শিশুদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ায়।' বিদেশি ফলে রাসায়নিক থাকার বিষয়টি তাঁর নিজের মত হিসেবে এসেছে; এ নিয়ে কোনো পরীক্ষার ফল বা নির্দিষ্ট তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

দেশে খাদ্যের নিরাপত্তা দেখভালের দায়িত্বে আছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩-এর আওতায় ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে গঠিত এই সংবিধিবদ্ধ কর্তৃপক্ষ খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করে এবং খাদ্যে ভেজালের দায়ে জরিমানা ও দণ্ড দিতে এর নিজস্ব ভ্রাম্যমাণ আদালত রয়েছে।

দেশি ফলের ওপর জোর দেওয়ার পেছনে আমদানির হিসাবও আছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য তুলে ধরে দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে জানায়, আপেল ও কমলাসহ নানা ফলের জন্য দেশ এখনো আমদানির ওপর নির্ভরশীল; বছরে প্রায় ৮ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন ফল আমদানিতে খরচ হয় প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা।

বাংলাদেশে কত রকমের ফল জন্মায়


একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৬০ রকমের বেশি ফল জোগাড় করা সম্ভব হয়েছে, কারণ বাংলাদেশ ক্রান্তীয় ও উপক্রান্তীয় ফলে সমৃদ্ধ। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে দেশে সাধারণত ৯টি প্রধান এবং ৪৮টি অপ্রধান ফল উৎপাদিত হয়। সবচেয়ে বেশি চাষ হওয়া ফলের মধ্যে রয়েছে আম, কাঁঠাল, কালো জাম, আনারস, কলা, লিচু, লেবু, পেয়ারা, আতা, কদবেল, চালতা, পেঁপে, তেঁতুল, তরমুজ, কাজুবাদাম, ডালিম, তাল, জামরুল, জলপাই ও কুল। এর বাইরে বনে-জঙ্গলে জন্মানো এবং অল্প পরিসরে চাষ হওয়া অনেক অপ্রধান ফলও আছে, যেমন লটকন, ডেউয়া, গাব, গোলপাতার ফল ও বেত ফল।

বাংলাপিডিয়া আরও কিছু পরিচিত অপ্রধান ফলের তালিকা দিয়েছে: তেঁতুল, তাল, ডেউয়া, জলপাই, কামরাঙা, জামরুল, কাউ, লটকন, পানিয়ালা, অরবরই, চালতা, গাব, বিলাতি আমড়া, বিলাতি গাব, কদবেল, বেল, আতা ও আমলকী। একসময় এসব ফল গ্রামের বাড়ির আশপাশেই পাওয়া যেত; শহরের শিশুদের অনেকেই এখন এগুলোর নামও জানে না।

কৃষি কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২৬ সালের ১৮ জুন জানায়, বাংলাদেশে প্রায় ১৩০ প্রজাতির কম ব্যবহৃত ফল রয়েছে, যার প্রায় ৭০টি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে জন্মায় এবং সীমিত পরিসরে চাষ হয়। এসব ফল সংরক্ষণ ও জনপ্রিয় করতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) ২০২০ সালে প্রায় আড়াই কোটি টাকার তিন বছর মেয়াদি একটি কর্মসূচি চালু করেছিল, যার ফলে বিলুপ্তপ্রায় কয়েকটি ফল আবার চাষের আওতায় ফিরেছে।

জাতীয় ফল মেলা ও অচেনা ফলের প্রতি আগ্রহ


পালপাড়ার উৎসবের পাঁচ দিন আগে, ২০২৬ সালের ১৮ জুন, ঢাকার ফার্মগেটের কেআইবি কমপ্লেক্সে তিন দিনের জাতীয় ফল মেলা শুরু হয়েছিল। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মেলায় ৭৮টি স্টল ছিল এবং ১০০টির বেশি দেশি ও বিদেশি ফল প্রদর্শিত হয়। ডিএইর স্টলে প্রায় ৫০টি বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় ফলের প্রজাতি দেখানো হয়, যার বেশির ভাগ দেশের বিভিন্ন হর্টিকালচার সেন্টারে উৎপাদিত।

দর্শনার্থীদের বিশেষ আগ্রহ ছিল যেসব ফলে, প্রতিবেদনে সেগুলোর নাম এসেছে এভাবে:

  • কাউফল, করমচা, ডেউয়া ও আঁশফল
  • গাব, যজ্ঞডুমুর, চাম্বুল ও আতা
  • চালতা, অরবরই, বিলিম্বি ও শরিফা
  • সাতকরা, তৈকর, ডেফল, লুকলুকি, বৈচি ও মুনিয়া

ডিএইর মহাপরিচালক মো. আবদুর রহিম মেলায় বলেন, এর লক্ষ্য ভোক্তাদের মধ্যে দেশি ফল সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো। তিনি জানান, আম, কাঁঠাল, পেয়ারাসহ কয়েকটি ফল ইতোমধ্যে রপ্তানি হচ্ছে এবং রপ্তানি বাড়লে কৃষকেরা ভালো দাম পাবেন। একই প্রতিবেদনে এক অভিভাবক বলেন, শহরে বড় হওয়ায় তাঁর সন্তানেরা এসব ফলের অনেকগুলো আগে কখনো দেখেনি। পালপাড়ার বিদ্যালয়ের শিশুদের অভিজ্ঞতাও প্রায় একই রকম ছিল; একসঙ্গে এত ফল তারা আগে দেখেনি।

মেলার আরেক আকর্ষণ ছিল আম ও কাঁঠাল। দর্শনার্থীরা ল্যাংড়া, আম্রপালি, নাগ ফজলি, বারি-৪, হাড়িভাঙ্গা ও সূর্যপুরীর মতো জনপ্রিয় দেশি জাতের আমের পাশাপাশি থাই ক্যাটিমন, মিয়াজাকিসহ কয়েকটি আমদানি করা ও উন্নত জাতও দেখেছেন। কাঁঠাল থেকে তৈরি মূল্য সংযোজিত পণ্যও প্রদর্শিত হয়; গাজীপুরের এক উদ্যোক্তা জানান, তিনি কাঁঠাল থেকে আচার, চিপস ও কাবাবসহ ২২ ধরনের পণ্য তৈরি করেন। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মেলাটি ফল চাষ, পুষ্টি, প্রক্রিয়াজাত শিল্প, উদ্যোক্তা তৈরি ও রপ্তানির সম্ভাবনা তুলে ধরার একটি মঞ্চ হিসেবে কাজ করেছে।

মধুমাস: ফলের মৌসুম কখন


ফল উৎসবটি হয়েছিল জুনের শেষ সপ্তাহে, যখন দেশে ফলের ভরা মৌসুম। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, মে, জুন ও জুলাই মাসকে বাংলাদেশে ফলের উৎসবের মাস হিসেবে ধরা হয়, কারণ এ সময় প্রায় সব প্রধান ও অপ্রধান ফল পাকে এবং বাজারে আসে। দেশে উৎপাদিত মোট ফলের প্রায় ৫৪ শতাংশ বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ় ও শ্রাবণ মাসে সংগ্রহ ও বিক্রি হয়; বাকি ৪৬ শতাংশ আসে বছরের অন্য আট মাসে। এই সময়টিকে বলা হয় মধুমাস, যখন আম, কাঁঠাল, লিচু ও আনারস ওঠে।

বাংলাপিডিয়ায় প্রধান ফলগুলোর সংগ্রহের সময়ও দেওয়া আছে:

  • আম: জুন থেকে আগস্ট; দেশে চাষে ও বনে মিলিয়ে আমের প্রায় তিন হাজার জাত রয়েছে
  • কাঁঠাল: জুন থেকে সেপ্টেম্বর; একেকটি ফলের ওজন ৫০ কেজি পর্যন্ত হতে পারে
  • লিচু: জুন ও জুলাই; ভালো মানের লিচু হয় দিনাজপুর, রাজশাহী, যশোর ও খুলনা অঞ্চলে
  • পেয়ারা: জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর
  • কালো জাম: জুলাই
  • কুল বা বরই: ফেব্রুয়ারি ও মার্চ
  • পেঁপে, সফেদা, নারকেল ও কলা: সারা বছর

মধুমাসের বাইরের মাসগুলোতে ওঠে কুল, আমড়া, আমলকী, বেল, সফেদা, ডালিম ও কামরাঙার মতো ফল। ফলে জুনের শেষে আয়োজিত একটি উৎসবে মৌসুমি ফলের পাশাপাশি সারা বছরের ফলও একসঙ্গে সাজানো সম্ভব হয়।

পিরোজপুর ও তার ফল


পিরোজপুর বরিশাল বিভাগের একটি জেলা। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী জেলার আয়তন ১ হাজার ২৭৭ দশমিক ৮০ বর্গকিলোমিটার; এর উত্তরে গোপালগঞ্জ ও বরিশাল, দক্ষিণে বরগুনা, পূর্বে ঝালকাঠি এবং পশ্চিমে বাগেরহাট। জেলায় সাতটি উপজেলা: মঠবাড়িয়া, কাউখালী, জিয়ানগর, নাজিরপুর, নেছারাবাদ, পিরোজপুর সদর ও ভান্ডারিয়া। প্রধান নদী বলেশ্বর, স্বরূপকাঠি, কচা ও কালীগঙ্গা। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জেলার জনসংখ্যা ছিল ১১ লাখ ১৩ হাজার ২৫৭ এবং মানুষের আয়ের ৫০ দশমিক ৮২ শতাংশ আসত কৃষি থেকে।

উৎসবটি যে উপজেলায় হয়েছে, সেই পিরোজপুর সদরের আয়তন ১৬৬ দশমিক ৮১ বর্গকিলোমিটার। বাংলাপিডিয়া এই উপজেলার প্রধান ফল হিসেবে কলা, পেঁপে, নারকেল, তরমুজ, সুপারি ও আমড়ার নাম দিয়েছে; প্রধান রপ্তানি পণ্যের তালিকায় রয়েছে কলা, নারকেল, পান ও সুপারি। বাংলাপিডিয়ার ফলবিষয়ক নিবন্ধ অনুযায়ী, দেশের দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলে নারকেল প্রচুর জন্মায়, প্রতি গাছে গড়ে ৭০ থেকে ৮০টি নারকেল ধরে এবং সারা বছরই তা সংগ্রহ করা যায়।

জেলার নেছারাবাদ উপজেলা পেয়ারার জন্য পরিচিত। দ্য ডেইলি স্টার বাংলা ২০২৩ সালের ১০ আগস্ট ডিএইর তথ্য উদ্ধৃত করে জানায়, বরিশালের বানারীপাড়া, পিরোজপুরের নেছারাবাদ ও ঝালকাঠি সদর, এই তিন উপজেলার ৫৫টি গ্রামে পেয়ারার বাগান ও হাট ছড়িয়ে আছে, আর খালে নৌকায় পেয়ারা সাজিয়ে বিক্রি করেন চাষিরা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পেয়ারা হয় নেছারাবাদে: ৮৩৫ হেক্টর জমিতে অন্তত ৭ হাজার ৬৫৬ টন। ঝালকাঠি সদরে ৫৯১ হেক্টরে ৬ হাজার ৩৫৫ টন এবং বানারীপাড়ায় ২১০ হেক্টরে ২ হাজার ৯৪০ টন পেয়ারা হয়। স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এ অঞ্চলের ৯০ শতাংশের বেশি পেয়ারা ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ নানা জায়গায় যায়।

বাংলাপিডিয়া স্বরূপকাঠি এলাকার নামে পরিচিত একটি পেয়ারার জাতের বর্ণনা দিয়েছে: গাছ মাঝারি আকারের, ফল ডিম্বাকার থেকে গোল, ত্বক কিছুটা খসখসে, শাঁস সাদা, খুব মিষ্টি ও নরম এবং বিচি কম। পেয়ারা গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আমেরিকার ফল; অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি এটি এ অঞ্চলে আসে এবং এখন দেশে প্রায় ৫০টি জাত পাওয়া যায়।

পিরোজপুরের কুড়িয়ানা খালে পেয়ারা বোঝাই নৌকা নিয়ে ভাসমান হাটের পথে চাষিরা। ছবি: Muktar Hossain / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
পিরোজপুরের কুড়িয়ানা খালে পেয়ারা বোঝাই নৌকা নিয়ে ভাসমান হাটের পথে চাষিরা। ছবি: Muktar Hossain / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

আমড়ায় শীর্ষে পিরোজপুর


পিরোজপুর সদরের প্রধান ফলের তালিকায় থাকা আমড়ায় পুরো জেলাই দেশের সামনের সারিতে। প্রথম আলো ২০২৫ সালের ৮ মে ডিএইর তথ্য উদ্ধৃত করে জানায়, বরিশাল বিভাগে ১ হাজার ৮৫৫ হেক্টর জমিতে আমড়ার চাষ হয় এবং বার্ষিক গড় উৎপাদন ২৪ হাজার ৬৮৪ মেট্রিক টন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি উৎপাদন পিরোজপুরে, ৮ হাজার ৬৭৭ মেট্রিক টন; এরপর ঝালকাঠি (৪ হাজার ৫৭৮ টন) ও বরিশাল (৩ হাজার ৩৮৪ টন)। চাষের জমির হিসাবে শীর্ষে ঝালকাঠি, ৬০২ হেক্টর।

একই প্রতিবেদন অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি আমড়া হয় ঝালকাঠি সদর এবং পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার বলদিয়া, মদরা, ঈদেলকাঠি, কুড়িয়ানা, সোহাগদল ও জলাবাড়ীসহ আশপাশের এলাকায়, যেখানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাণিজ্যিকভাবে আমড়া চাষ হয়। পেয়ারার মৌসুম শেষ হলে আমড়ার মৌসুম শুরু হয়, সাধারণত ভাদ্র মাস থেকে, এবং চলে প্রায় দুই মাস। নেছারাবাদের কুড়িয়ানা বাজার এ অঞ্চলের অন্যতম পাইকারি কেন্দ্র। সেখানকার এক ব্যবসায়ী প্রথম আলোকে জানান, মৌসুমে বাজারের অন্তত ২০ জন পাইকার প্রতিদিন ৫০০ থেকে ১ হাজার মণ আমড়া ঢাকায় পাঠান। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মৌসুমের শুরুতে প্রতি মণ আমড়া ৭০০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল, শেষ দিকে দাম উঠেছিল তিন হাজার টাকা পর্যন্ত।

২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল বিশ্ব মেধাস্বত্ব দিবসের অনুষ্ঠানে শিল্প মন্ত্রণালয় বরিশালের আমড়াকে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি দেয়। তবে প্রথম আলোর ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, সে বছর জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তেমন বৃষ্টি না হওয়া এবং অস্বাভাবিক তাপমাত্রায় আমড়ার ফুল ঝরে যাওয়ায় চাষিরা ফলন নিয়ে শঙ্কায় ছিলেন।

আমড়া; ছবিটি রাজশাহীতে তোলা। ছবি: Mirza Rashed Kaisar / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
আমড়া; ছবিটি রাজশাহীতে তোলা। ছবি: Mirza Rashed Kaisar / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

দেশে ফল উৎপাদনের চিত্র


বিবিএসের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য তুলে ধরে দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ২০২৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর জানায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের ফল খাত তরমুজ, কলা ও পেয়ারার উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বিদেশি জাতের ফলের বিস্তারে এগিয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা প্রধান হিসাবগুলো এমন:

  • তরমুজ: ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ৫ লাখ ৮১ হাজার ৬৭৭ মেট্রিক টন থেকে বেড়ে ১৯ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন; আবাদ ৬৪ হাজার ৭১৮ একর থেকে বেড়ে ১ লাখ ৪২ হাজার ৮১৭ একর
  • পাকা কলা: ৮ লাখ ১৩ হাজার ৫৬০ টন থেকে ৮ লাখ ৬২ হাজার ৬৯২ টন
  • পেয়ারা: ২ লাখ ৫৭ হাজার ৯৮৫ টন থেকে ২ লাখ ৬৬ হাজার ৪০৫ টন
  • আম: ১৮ লাখ ৯০ হাজার টন থেকে সামান্য কমে ১৮ লাখ ৭০ হাজার টন, যদিও আবাদ বেড়ে ৩ লাখ ৪৪ হাজার ২১৬ একর
  • জাতীয় ফল কাঁঠাল: প্রায় ১০ লাখ ২০ হাজার টন
  • ড্রাগন ফল: ৯ হাজার ৭৫৪ টন থেকে ১২ হাজার ৫২২ টন; মাল্টা: ১১ হাজার ৬৪ টন থেকে ১২ হাজার ৯২৯ টন

একই প্রতিবেদনে ডিএইর সতর্কতা উল্লেখ করা হয়: পর্যাপ্ত হিমাগার ও পরিবহন সুবিধার অভাবে পেঁপে ও পেয়ারার মতো ফলের ২৫ থেকে ৩৫ শতাংশ নষ্ট হয়। বাংলাপিডিয়াও উল্লেখ করেছে, মৌসুমি উৎপাদনের কারণে কৃষকেরা প্রায়ই ন্যায্য দাম পান না এবং ফল সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণ দেশের ফল খাতের বড় সমস্যা।

কাঁঠাল প্রসঙ্গে বাংলাপিডিয়া জানায়, এটি বাংলাদেশের জাতীয় ফল। পাকা কাঁঠালের কোষ টাটকা খাওয়া হয়, বিচি সেদ্ধ বা ভেজে নানা রান্নায় ব্যবহৃত হয় এবং কাঁচা কাঁঠাল সবজি হিসেবে রান্না হয়; খোসা ও পাতা গবাদিপশুর খাবার হয়। আম প্রসঙ্গে বাংলাপিডিয়া বলছে, দেশে আমগাছ বেশির ভাগই বসতবাড়ির আঙিনায় লাগানো হয়।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুর বাজারে আম বিক্রেতা। ছবি: Ferdous / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুর বাজারে আম বিক্রেতা। ছবি: Ferdous / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

শিশুর খাবারে ফলের পরিমাণ


উৎসবের প্রতিপাদ্য ছিল ফল খেলে শক্তি বাড়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি হালনাগাদ করা স্বাস্থ্যকর খাদ্যবিষয়ক তথ্যপত্রে জানায়, ১০ বছরের বেশি বয়সী প্রত্যেকের দিনে অন্তত ৪০০ গ্রাম ফল ও সবজি খাওয়ার চেষ্টা করা উচিত। ছোট শিশুদের জন্য পরিমাণ কিছুটা কম: ২ থেকে ৫ বছর বয়সীদের দিনে অন্তত ২৫০ গ্রাম এবং ৬ থেকে ৯ বছর বয়সীদের অন্তত ৩৫০ গ্রাম। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বেশির ভাগ শিক্ষার্থী এই শেষ বয়সসীমার মধ্যেই পড়ে।

ডব্লিউএইচওর তথ্যপত্র অনুযায়ী, টাটকা ফল ও সবজি ভালো পছন্দ; হিমায়িত বা টিনজাত ফল-সবজিও চলে, যদি তাতে বাড়তি চিনি বা লবণ না থাকে। ফলের রস খাওয়া যায়, তবে চিনি যোগ না করা রসেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ 'ফ্রি সুগার' থাকে, যা সীমিত রাখা উচিত। সংস্থাটি বলছে, পর্যাপ্ত ফল ও সবজিসহ স্বাস্থ্যকর খাদ্য সব ধরনের অপুষ্টি এবং ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, স্ট্রোক ও ক্যানসারের মতো অসংক্রামক রোগ থেকে সুরক্ষা দেয়।

বাংলাদেশে ফল খাওয়ার পরিমাণ বাড়লেও তা এখনো এই মানের নিচে। বিবিএসের খানা আয় ও ব্যয় জরিপ (হায়েস) ২০২২ অনুযায়ী, দেশে মাথাপিছু দৈনিক ফল গ্রহণ ২০০৫ সালের ৩২ দশমিক ৫ গ্রাম থেকে বেড়ে ২০২২ সালে ৯৫ দশমিক ৪ গ্রামে দাঁড়িয়েছে, জানায় দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস। ডব্লিউএইচওর ফল ও সবজি মিলিয়ে ৪০০ গ্রামের সুপারিশের সঙ্গে তুলনা করে প্রতিবেদনটি বলে, পুষ্টিকর খাবার গ্রহণে বাংলাদেশিরা এখনো আন্তর্জাতিক মানের চেয়ে পিছিয়ে।

দেশি ফলের পুষ্টিগুণের একটি উদাহরণ পেয়ারা। বাংলাপিডিয়া জানায়, পেয়ারা ভিটামিন সি ও পেকটিনের বড় উৎস; প্রতি ১০০ গ্রাম খাওয়ার উপযোগী অংশে ভিটামিন সি প্রায় ২৬০ মিলিগ্রাম, যদিও জাত, মৌসুম ও পরিপক্বতার ভেদে পুষ্টির পরিমাণ বদলায়। কাঁচা ও পাকা দুই অবস্থাতেই পেয়ারা খাওয়া যায়, আর এ থেকে জ্যাম, জেলি, জুস ও আচারও তৈরি হয়। কোনো শিশুর বিশেষ খাদ্যতালিকা বা রোগের কারণে খাবারে বিধিনিষেধ থাকলে কতটা ও কোন ফল দেওয়া যাবে, সে বিষয়ে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

ছবি: Shahnoor Habib Munmun / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

ফল

সম্পর্কিত খবর

ফল

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি চারটি তাজা আপেলের একটি যায় বিদেশে, রপ্তানি আয় রেকর্ড

২০২৫/২৬ বিপণন বছরে যুক্তরাষ্ট্র ১৮৭ কোটি পাউন্ড তাজা আপেল রপ্তানি করেছে, যা মোট তাজা উৎপাদনের প্রায় ২৬ শতাংশ। রপ্তানি আয় রেকর্ড ১১৬ কোটি ডলারে পৌঁছেছে; বড় ক্রেতা মেক্সিকো ও কানাডা।

ers_usda১৬ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
ফল

রাজবাড়ীর বাজিতপুরে দুই একরে চার হাজার ড্রাগন গাছ, দিনে উঠছে ৫০ মণ ফল

রাজবাড়ী সদরের বসন্তপুর ইউনিয়নের বাজিতপুরে জেলার সবচেয়ে বড় ড্রাগন বাগানে গাছপ্রতি ১০-১২ কেজি ফল ধরেছে; ভরা মৌসুমে দিনে প্রায় দুই হাজার কেজি ফল উঠছে, পাইকারি দর কেজি ১৫০ টাকা।

ঢাকা মেইল১৫ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
ফল

আপেলগাছের গোড়ায় লালচে গুঁড়া? সতর্ক করছে বিরল কাণ্ড ছিদ্রকারী পোকা

কানাডার ম্যানিটোবার কৃষি বিভাগ ফলচাষিদের রাউন্ডহেডেড অ্যাপল ট্রি বোরার নিয়ে সতর্ক থাকতে বলছে। এই লম্বা-শুঙ্গ গুবরে পোকার কীড়া জীবন্ত আপেল ও সাস্কাটুন গাছের ভেতরে তিন বছর পর্যন্ত সুড়ঙ্গ কাটে; কাণ্ডের গোড়ায় লালচে গুঁড়াই সবচেয়ে স্পষ্ট লক্ষণ।

Manitoba Co-operator১৫ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)