ঢাকাসহ সারা দেশের রাস্তা ও অলিগলিতে গড়ে ওঠা খাবারের দোকানগুলোকেও এখন ব্যবসার জন্য নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নিবন্ধন নিতে হবে। নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩-এর আওতায় কর্তৃপক্ষের তৈরি নিরাপদ খাদ্য (রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্স) প্রবিধানমালা, ২০২৬ সরকারি গেজেটে প্রকাশিত হয় ২০২৬ সালের ১৬ জুলাই। বিবিসি বাংলা ২৯ জুলাই জানায়, এই প্রবিধানমালা অনুযায়ী সড়ক বা ফুটপাতের খাবারের দোকান ও ছোট রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে খাদ্য আমদানিকারক ও প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত সবাইকে নিবন্ধন ও লাইসেন্সের আওতায় আসতে হবে।
প্রবিধানমালায় যা আছে
প্রবিধানমালা অনুযায়ী, খাদ্যপণ্য বা খাদ্য উপকরণ উৎপাদন, আমদানি, প্রক্রিয়াকরণ, মজুত, সরবরাহ বা বিক্রির সঙ্গে জড়িত কিংবা জড়িত হতে ইচ্ছুক সব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধন নিতে হবে, যাতে তাদের নাম ও ঠিকানা সংরক্ষিত থাকে। ছোট ও মাঝারি খাদ্য ব্যবসার নিবন্ধন থাকতে হবে, আর বিশেষ বা গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যপণ্য নিয়ে যারা কাজ করে তাদের লাইসেন্সও নিতে হবে। নিবন্ধনের মেয়াদ তিন বছর, যা নবায়ন করা যাবে।
- লাইসেন্স ছাড়া খাদ্য ব্যবসা করা যাবে না।
- খাদ্যপণ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, মজুত বা আমদানির জন্য প্রতিটি পণ্যের আলাদা উৎপাদন বা আমদানি লাইসেন্স লাগবে।
- কোনো পণ্য ব্র্যান্ড নাম ও মোড়কে বাজারজাত করতে হলে প্রতিটি ব্র্যান্ড ও মোড়কের জন্য আলাদা নিবন্ধন নিতে হবে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ গঠিত হয় ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে, ২০১৩ সালের নিরাপদ খাদ্য আইনের অধীনে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন এই সংবিধিবদ্ধ সংস্থার কাজ খাদ্য উৎপাদন, আমদানি, প্রক্রিয়াকরণ, মজুত, বিতরণ ও বিক্রি তদারকি করা এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় করা। কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, "খুবই ইতিবাচক একটি পদক্ষেপ হয়েছে এটি। আমরা হয়তো একদিনেই সব পরিবর্তন করতে পারবো না। তবে পর্যায়ক্রমে স্ট্রিট ফুডের দোকানগুলোও লাইসেন্সিংয়ের মাধ্যমে তদারকির আওতায় আসবে।" তিনি জানান, আবেদন প্রক্রিয়া সহজ রাখার এবং অনলাইনে আবেদনের সুযোগ দেওয়ার চেষ্টা থাকবে।

ঢাকার স্ট্রিট ফুডে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া
দেশে রাস্তার পাশে কত অস্থায়ী বা ভ্রাম্যমাণ খাবারের দোকান আছে, তার সঠিক হিসাব নেই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সবশেষ হিসাবে দেশে খাদ্য পরিবেশনকারী প্রতিষ্ঠান প্রায় সাড়ে চার লাখ, যার মধ্যে হোটেল-রেস্তোরাঁ ও চা-স্টলও আছে; ফাস্ট ফুডের দোকান প্রায় ৬৭ হাজার। ঢাকাসহ বড় শহরে বহু মানুষ নাশতা বা দুপুরের খাবারের জন্য এসব দোকানের ওপর নির্ভর করেন।
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের অর্থায়নে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. লতিফুল বারীর নেতৃত্বে করা এক গবেষণার ফল ২০২৪ সালের জুনে প্রকাশিত হয়। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার বিক্রেতাদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা ৪৫০টি নমুনার প্রতিটিতেই ব্যাকটেরিয়া পাওয়া যায়। দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চটপটি, ছোলামুড়ি, স্যান্ডউইচ, আখের রস, অ্যালোভেরার শরবত ও মিশ্র সালাদে ই. কোলাই, সালমোনেলা ও ভিব্রিও ব্যাকটেরিয়া মেলে মাত্রাতিরিক্ত পরিমাণে; এক প্লেট চটপটিতে গড়ে ৭ কোটি ২০ লাখ ই. কোলাই পাওয়া যায়। দূষিত পানি, ময়লা তোয়ালে, অপরিষ্কার হাত ও ধুলাবালিকে দূষণের উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেন গবেষকেরা।

ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, একই গবেষণায় দেখা যায় প্রতি ১০ হাজার ভোক্তার মধ্যে ই. কোলাইয়ে ২ জন, সালমোনেলায় ৪ জন ও ভিব্রিওতে ১ জন অসুস্থ হন; এত দূষণের পরও বেশির ভাগ মানুষ কেন অসুস্থ হন না, তার কারণ অজানা রয়ে গেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে বিশ্বে প্রায় ৮৬ কোটি ৬০ লাখ মানুষ, অর্থাৎ প্রায় প্রতি ৯ জনে ১ জন, প্রতি বছর দূষিত খাবার খেয়ে অসুস্থ হন এবং ১৫ লাখ ২০ হাজার মানুষ মারা যান।

বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুড অ্যান্ড রিসার্চ ল্যাবরেটরির প্রধান বিজ্ঞানী ড. লতিফুল বারী উদ্যোগটিকে যৌক্তিক বললেও এর বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন। বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, "বিধিমালাটি হওয়ায় এগুলো এখন একটা কাঠামোর ভেতর এলো। যদিও এগুলোর খাদ্য নিরাপদ কি না তা যাচাইয়ের সক্ষমতা সরকারের নেই।" তাঁর মতে, গবেষণাগার ও লোকবলের দিক থেকে সরকারের সক্ষমতা এখনো খুবই কম।
রমনা এলাকার চা-বিস্কুট বিক্রেতা লিটন শেখ ও পাশের ভাসমান দোকানের আবদুর রহিম বিবিসি বাংলাকে জানান, নিবন্ধনের নতুন নিয়মের কথা তাঁরা শোনেননি। বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইমরান হাসান বলেন, প্রবিধানমালাটি একতরফাভাবে করা হয়েছে এবং এতে শুধু লাইসেন্স বাণিজ্য বাড়বে। তাঁর ভাষায়, "এখানে অথরিটির ক্ষমতা বেড়েছে। কিন্তু বাস্তবায়ন কীভাবে হবে তার কোনো নির্দেশনা নেই। ফুড সেফটি একটি বিশাল চেইন। কোন ধাপে কীভাবে নিশ্চিত হবে তার কোনো ভিশনও এতে নেই।"
ছবি: Faizul Latif Chowdhury / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: বিবিসি বাংলা, দ্য ডেইলি স্টার, ঢাকা ট্রিবিউন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), উইকিপিডিয়া (বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ)




মন্তব্য
(০)