বাংলাদেশের জাতীয় ফল কাঁঠাল গ্রামের উঠোন থেকে শহরের বাজার পর্যন্ত সবার চেনা। ২০২৬ সালের ৪ জুলাই কাঁঠাল দিবস উপলক্ষে জাগো নিউজ ২৪ এই ফল নিয়ে কিছু কম জানা তথ্য তুলে ধরে। কেউ কাঁঠাল ভালোবাসেন মিষ্টি স্বাদের জন্য, কেউ এড়িয়ে চলেন তীব্র গন্ধের কারণে। উদ্যানতত্ত্বের একটি প্রামাণ্য গ্রন্থ, মার্কিন কৃষি বিভাগের পুষ্টি তথ্যভান্ডার ও দেশের সংবাদমাধ্যমের তথ্য মিলিয়ে সেই তথ্যগুলো এখানে যাচাই করে দেওয়া হলো।
গাছে ধরা সবচেয়ে বড় ফল
যুক্তরাষ্ট্রের পারডু বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকাশিত উদ্যানবিদ জুলিয়া মর্টনের 'ফ্রুটস অব ওয়ার্ম ক্লাইমেটস' গ্রন্থ অনুযায়ী, গাছে ধরা সব ফলের মধ্যে কাঁঠালই সবচেয়ে বড়। একটি কাঁঠাল ২০ থেকে ৯০ সেন্টিমিটার লম্বা ও ১৫ থেকে ৫০ সেন্টিমিটার চওড়া হতে পারে। সাধারণত এর ওজন হয় ৪.৫ থেকে ২০ কেজি, কখনো ৫০ কেজি পর্যন্ত।
এত ভারী ফল ডালের আগায় ধরে না। কাঁঠালের ফুলের ছোট ও মোটা বোঁটা বের হয় গাছের কাণ্ড ও বড় শাখা থেকে, খুব পুরোনো গাছে মাটিঘেঁষা গোড়া থেকেও। তাই ফল ঝোলে কাণ্ড আর মোটা ডালের গায়ে। উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী গাছটি ৩০ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে।
কাঁঠালের ভেতরে হলুদ রঙের কোয়া থাকে, প্রতিটি কোয়ায় একটি করে বিচি। মর্টনের হিসাবে একটি ফলে ১০০ থেকে ৫০০টি পর্যন্ত বিচি থাকতে পারে। কাঁচা বিচি হজম হয় না, কারণ এতে হজমের উৎসেচক ট্রিপসিনের কাজে বাধা দেওয়ার একটি উপাদান থাকে। সেদ্ধ করলে বা সেঁকলে তা নষ্ট হয়ে যায়।

জন্ম পশ্চিমঘাটে, চাষ এখন নানা মহাদেশে
কাঁঠালের আদি নিবাস ভারতের পশ্চিমঘাট পর্বতমালার বনাঞ্চল বলে ধারণা করা হয়। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এর ব্যাপক বাণিজ্যিক চাষ হয়: বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও দক্ষিণ চীনে। আফ্রিকার কেনিয়া ও উগান্ডায়ও কাঁঠালগাছ লাগানো হয়। ব্রাজিলে এটি এসেছিল উনিশ শতকের মাঝামাঝি; হাওয়াই ও ফ্লোরিডাতেও কাঁঠালগাছ আছে।
গাছে ফল আসতে শুরু করে চার থেকে চৌদ্দ বছরের মধ্যে। অনুকূল পরিবেশে একটি গাছ শত বছরের বেশি সময় ফল দিতে পারে, যদিও বয়স বাড়লে ফলন কমে যায়।
গন্ধ, পুষ্টি আর মাংসের বিকল্প
মর্টনের বর্ণনায়, পুরো পাকা না-কাটা কাঁঠাল থেকে তীব্র গন্ধ বের হয়, অথচ কাটা ফলের কোয়ায় আনারস ও কলার মতো সুবাস। পশ্চিমের অনেক দেশে কাঁঠাল কম জনপ্রিয় হওয়ার একটি বড় কারণ এই গন্ধ।
মার্কিন কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) ফুডডেটা সেন্ট্রাল অনুযায়ী, ১০০ গ্রাম কাঁচা অবস্থায় খাওয়া কাঁঠালের কোয়ায় থাকে ৯৫ কিলোক্যালরি, ৭৩.৪৬ গ্রাম পানি, ২৩.২৫ গ্রাম শর্করা, ১.৫ গ্রাম খাদ্যআঁশ, ১.৭২ গ্রাম আমিষ, ৪৪৮ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম, ২৯ মিলিগ্রাম ম্যাগনেশিয়াম, ১৩.৭ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি এবং ০.৩২৯ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি-৬। শর্করার বেশির ভাগই চিনি। মর্টন লিখেছেন, পাকা কাঁঠাল বেশি খেলে পেট খারাপ হতে পারে, তাই পরিমিত খাওয়াই ভালো।
কাঁচা কাঁঠাল দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তরকারিতে বহুদিনের চেনা। মার্কিন কৃষি সংবাদমাধ্যম এগ্রিকালচার ডাইভ ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে জানায়, কাঁচা কাঁঠাল আঁশযুক্ত ও চিবিয়ে খাওয়ার মতো, এর গঠন ছেঁড়া মাংসের মতো। তাই যুক্তরাষ্ট্রে স্যান্ডউইচ, টাকো ও বারবিকিউ সসের পদে মাংসের বদলে এটি ব্যবহৃত হচ্ছে। দ্য জ্যাকফ্রুট কোম্পানি ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে বার্গার চেইন স্ম্যাশবার্গারের সঙ্গে নিউইয়র্ক, নিউ জার্সি ও কলোরাডোর শাখায় কাঁঠালের প্যাটি চালু করে।

কাঠ, পশুখাদ্য ও বাংলাদেশের উৎপাদন
কাঁঠালের কাঠে উইপোকা ধরে না, ছত্রাক ও পচনও সহজে ধরে না। বয়সের সঙ্গে কাঠের রং কমলা বা হলুদ থেকে বাদামি বা গাঢ় লাল হয়। মর্টনের মতে আসবাবপত্রে এ কাঠ সেগুনের চেয়েও ভালো; ঘরবাড়ি, নৌকার দাঁড়, যন্ত্রপাতি ও বাদ্যযন্ত্রেও এর ব্যবহার আছে, ভারতের বীণা তৈরিতেও। কাঠের গুঁড়া ফুটিয়ে পাওয়া হলুদ রঙে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সুতি কাপড় রাঙানো হয়। গবাদিপশুও কাঁঠাল, এর বাড়তি খোসা ও কচি পাতা খায়।
দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য উদ্ধৃত করে জানায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে কাঁঠাল উৎপাদন ছিল ১০ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন, যদিও চাষের জমি প্রায় ৪ হাজার একর কমেছিল। দ্য ডেইলি স্টার ২০২৩ সালের জুনে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) এক বিজ্ঞানীর বরাতে জানায়, ভারতের পর বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম কাঁঠাল উৎপাদনকারী দেশ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যে ঢাকা অঞ্চলে কাঁঠাল সবচেয়ে বেশি হয়, এরপর চট্টগ্রামে। একই প্রতিবেদনে উদ্ভিদ সংগনিরোধ উইং জানায়, আগের অর্থবছরে দেশ থেকে ১ হাজার ৩০০ টন কাঁঠাল রপ্তানি হয়েছিল।

ছবি: A S M Jobaer / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, পারডু বিশ্ববিদ্যালয় (জুলিয়া মর্টন, ফ্রুটস অব ওয়ার্ম ক্লাইমেটস), মার্কিন কৃষি বিভাগ (ইউএসডিএ) ফুডডেটা সেন্ট্রাল, দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, দ্য ডেইলি স্টার, এগ্রিকালচার ডাইভ, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)