সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৮°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৬২%বাতাস ৫ কিমি/ঘ

রাতে ফোটে, ভোরে ঝরে: হেমন্তের সকালে শিউলি ফুলের পরিচয়

২০২১ সালের অক্টোবরের শেষে হেমন্তের শিশিরভেজা সকালে ঝরা শিউলির ছবি তুলে ধরেছিল বাংলানিউজ২৪। রাতে ফোটা, ভোরে ঝরা এই ফুলের উদ্ভিদ-পরিচয়, ঋতু, প্রাকৃতিক রং ও চাষের তথ্য নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে।

রাতে ফোটে, ভোরে ঝরে: হেমন্তের সকালে শিউলি ফুলের পরিচয়
ফুল

২০২১ সালের অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে, হেমন্তের শুরুর দিনগুলোতে, অনলাইন সংবাদমাধ্যম বাংলানিউজ২৪ শিউলি ফুল নিয়ে একটি ছবিভিত্তিক ফিচার প্রকাশ করে। তাতে শিশিরে ভেজা সকালে গাছতলায় ঝরে থাকা শিউলির দৃশ্য তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, শিউলিকে অনেকে শেফালি নামেও ডাকেন, ফুলটি রাতে ফোটে আর সকালেই ঝরে যায়, রেখে যায় সুগন্ধ। শিউলি ঝরার সময় এলে শরতের শেষ লগ্ন আর হেমন্তের আগমনী বার্তা মেলে, একদিকে নবান্নের ডাক, অন্যদিকে শীতের আগমনী।

ফিচারটি কোনো একক ঘটনার খবর নয়; এটি ঋতুর পালাবদলের একটি চেনা ছবি। সেই ছবির পেছনের উদ্ভিদটি কী, কেন রাতে ফোটে আর ভোরে ঝরে, বাংলাদেশের ছয় ঋতুর হিসাবে শিউলির সময় কোনটি, আর এর কমলা বোঁটা থেকে কীভাবে রং তৈরি হয়, এই লেখায় নির্ভরযোগ্য উদ্ভিদবিদ্যা ও জ্ঞানকোষের তথ্য দিয়ে সেসব বিষয় তুলে ধরা হলো। সব তথ্য ২০২১ সালের অক্টোবর বা তার আগে প্রকাশিত সূত্র থেকে নেওয়া।

হেমন্তের ভোরে শিউলিতলা


বাংলানিউজ২৪-এর ফিচারে শিউলিতলার যে ছবি আঁকা হয়েছিল, তা গ্রাম ও শহরের অনেক মানুষের চেনা। প্রতিবেদনের বর্ণনায়, সাদা ফুলের ভেতর থেকে লাল আর হলুদের মিশ্রণ যখন সূর্যের মতো উঁকি দেয়, তখন সকালের মিষ্টি আলোয় ভরে ওঠে শিউলিতলা, স্নিগ্ধতায় ভরে যায় পুরো সকাল। সবুজ পাতার ফাঁকে একেকটি ফুল সৌন্দর্য ছড়ায়, আর গাছের কলিরা নতুন দিনের অপেক্ষায় থাকে।

ফিচারে আরও বলা হয়, শিউলি কেবল কবিদেরই মুগ্ধ করেনি, যুগে যুগে এর অসংখ্য অনুরাগী তৈরি হয়েছে। শিশু থেকে বড়, সবার প্রিয় এই ফুলের গাছতলায় মৌমাছিসহ নানা পতঙ্গ ও পাখিও ভিড় করে বলে প্রতিবেদক লিখেছিলেন। শিউলিকে কখনো কখনো 'দুঃখের বৃক্ষ' বলা হয়, এ কথাও ফিচারে ছিল; কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল, দিনের আলোয় ফুলগুলো উজ্জ্বলতা হারিয়ে ফেলে।

এই শেষ কথাটির সমর্থন মেলে উদ্ভিদটির বৈজ্ঞানিক নামেই। শিউলির প্রজাতিগত নাম আর্বর-ট্রিস্টিস, লাতিনে যার অর্থ 'বিষণ্ন গাছ'। ইংরেজিতেও একে 'ট্রি অব সরো' বা দুঃখের গাছ বলা হয়, কারণ দিনের বেলা ফুলগুলো উজ্জ্বলতা হারায়। আর গণের নাম নিকট্যান্থেস এসেছে গ্রিক শব্দ থেকে, যার অর্থ রাতের ফুল।

শিউলি কোন গাছ: নাম ও পরিচয়


শিউলির বৈজ্ঞানিক নাম Nyctanthes arbor-tristis। সুইডিশ উদ্ভিদবিজ্ঞানী কার্ল লিনিয়াস ১৭৫৩ সালে প্রজাতিটির বর্ণনা দেন। আন্তর্জাতিক কৃষিবনায়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড অ্যাগ্রোফরেস্ট্রি সেন্টারের (আইসিআরএএফ) অ্যাগ্রোফরেস্ট্রি ট্রি ডেটাবেসে একে জলপাই পরিবারের, অর্থাৎ ওলিয়েসি গোত্রের উদ্ভিদ হিসেবে দেখানো হয়েছে। ওই ডেটাবেস জানায়, নিকট্যান্থেস একটি ছোট গণ, এতে প্রজাতি মাত্র এক বা দুটি। উদ্ভিদবিজ্ঞানীরা গণটিকে কখনো ওলিয়েসি, কখনো ভারবেনেসি গোত্রে রেখেছেন; কেউ কেউ ডিমেট্রা গণের সঙ্গে মিলিয়ে নিকট্যান্থেসি নামে আলাদা একটি গোত্রও করেছেন।

নাম জুঁই বা জেসমিনের মতো শোনালেও শিউলি আসল জুঁই নয়। জুঁই, বেলি ও মল্লিকা জাসমিনাম গণের উদ্ভিদ, আর শিউলি আলাদা গণ নিকট্যান্থেসের। ইংরেজিতে একে নাইট-ফ্লাওয়ারিং জেসমিন, নাইট জেসমিন বা কোরাল জেসমিন বলা হয়। বাংলায় শিউলি ও শেফালি দুই নামই চলে; সংস্কৃতে শেফালিকা, হিন্দিতে পারিজাত। আসামে একে শেৱালী, শ্রীলঙ্কায় সেপালিকা এবং মারাঠিতে প্রাজক্ত বলা হয়। ভারতের বিহারের মিথিলাঞ্চলে এর নাম হরশৃঙ্গার।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতেও শিউলি পরিচিত। আইসিআরএএফের তালিকা অনুযায়ী ইন্দোনেশিয়ায় একে স্রিগাডিং, মালয় ভাষায় সেরি গাডিং, লাও ভাষায় সালিকা, থাই ভাষায় কারানিকা এবং ভিয়েতনামি ভাষায় লাই তাউ বলা হয়। ফিলিপাইনে এর পরিচিত নাম কোরাল জেসমিন। এত ভাষায় এত নাম থাকাই বলে দেয়, এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বহুকাল ধরে মানুষ এই গাছ লাগিয়ে আসছে।

গাছ, পাতা, ফুল ও ফলের গড়ন


আইসিআরএএফের ডেটাবেসের উদ্ভিদতাত্ত্বিক বর্ণনা অনুযায়ী শিউলি বড় গুল্ম বা ছোট গাছ, উচ্চতায় ১০ মিটার পর্যন্ত হতে পারে। বাকল খসখসে ও ধূসর। ডালপালা ছড়ানো ও রুক্ষ, কচি ডাল চারকোনা। পাতা জোড়ায় জোড়ায় মুখোমুখি সাজানো, ডিম্বাকার, সাধারণত ৬ থেকে ১২ সেন্টিমিটার লম্বা ও ২ থেকে সাড়ে ৬ সেন্টিমিটার চওড়া। পাতার কিনারা মসৃণ বা কয়েকটি খাঁজযুক্ত, ওপরের পিঠ রোমের কারণে খুব খসখসে, নিচের পিঠ নরম রোমে ঢাকা, বোঁটা ছোট।

ফুল ফোটে ডালের আগায় বা পাতার কোলে, ছোট ছোট থোকায়; প্রতিটি থোকায় দুই থেকে সাতটি ফুল। ফুলে আলাদা বোঁটা থাকে না, আর ফুলগুলো সুগন্ধি। বৃতি ঘণ্টার মতো, প্রায় ৫ মিলিমিটার লম্বা। পাপড়ির অংশটি দুই ভাগে চেনা যায়: নিচে কমলা রঙের একটি সরু নল, আর ওপরে পাঁচ থেকে আটটি ছড়ানো সাদা পাপড়ি-খণ্ড, যেগুলো ৫ থেকে ১৫ মিলিমিটার লম্বা এবং কিছুটা পাকানো। পুংকেশর দুটি, নলের মুখের কাছে বসানো। বাংলানিউজ২৪-এর ফিচারে সাদা ফুলের ভেতর থেকে যে লাল-হলুদ রং উঁকি দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল, তা এই কমলা নলেরই রং।

২০১৫ সালে ইন্ডিয়ান জার্নাল অব ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্সেসে প্রকাশিত শ্রীলঙ্কার গবেষকদের একটি প্রবন্ধে ফুলের বর্ণনায় বলা হয়েছে, শিউলির ফুল উভলিঙ্গ, অর্থাৎ একই ফুলে পুরুষ ও স্ত্রী অংশ থাকে; সুগন্ধি ফুলে ছয়টি সাদা পাপড়ি এবং প্রায় ১২ মিলিমিটার লম্বা একটি সরু, নলাকার, মসৃণ কমলা নল থাকে। পাপড়ির সংখ্যা যে সব ফুলে এক নয়, পাঁচ থেকে আটটির মধ্যে ওঠানামা করে, সেটি আইসিআরএএফের বর্ণনাতেও আছে।

শিউলির ফুটতে যাওয়া কুঁড়ি, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে, সেপ্টেম্বর ২০১২। ছবি: JDP90 (Joydeep) / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
শিউলির ফুটতে যাওয়া কুঁড়ি, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে, সেপ্টেম্বর ২০১২। ছবি: JDP90 (Joydeep) / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

ফুল ঝরে যাওয়ার পর ফল হয়। আইসিআরএএফের বর্ণনায় ফলটি চ্যাপ্টা ক্যাপসুল, হৃৎপিণ্ডের আকার থেকে প্রায় গোলাকার, আড়াআড়ি মাপে প্রায় ২ সেন্টিমিটার, পাকলে বাদামি। ফলের ভেতরে দুটি কোষ, প্রতিটিতে একটি করে চ্যাপ্টা বীজ। ফল পাকলে আগার দিক থেকে আড়াআড়ি ফেটে খোলে। মুক্ত বিশ্বকোষ উইকিপিডিয়ার ২০২১ সালের অক্টোবরের সংস্করণেও একই কথা আছে: ফল দুই খণ্ডের, চ্যাপ্টা, বাদামি, হৃৎপিণ্ডাকার থেকে গোলাকার, ব্যাস ২ সেন্টিমিটার, প্রতিটি খণ্ডে একটি বীজ।

আইসিআরএএফ আরও জানায়, শোভাবর্ধনের জন্য ভারতে শিউলির কয়েকটি আবাদি জাতও বর্ণিত হয়েছে, যেমন 'কর্ণফুল' ও 'সীয়া শৃঙ্গার'।

রাতে ফোটে, ভোরে ঝরে: শিউলির দৈনিক ছন্দ


শিউলির সবচেয়ে পরিচিত বৈশিষ্ট্যই এর সময়জ্ঞান। আইসিআরএএফের ডেটাবেসে প্রজনন-জীববিদ্যার অংশে বলা হয়েছে, ফুল খোলে সূর্যাস্তের সময়, আর সাধারণত পরদিন সূর্যোদয়ের পর শুকিয়ে যায়। উইকিপিডিয়ার বর্ণনাতেও আছে, প্রতিটি ফুল সন্ধ্যায় ফোটে এবং ভোরে শেষ হয়। ২০১৫ সালের শ্রীলঙ্কান গবেষণা-প্রবন্ধে লেখা হয়েছে, গাছটি রাতে ফুল দেয় এবং মধ্যরাত থেকেই ফুল ঝরতে শুরু করে। এ কারণেই ভোরে উঠে গাছতলায় গেলে মাটিতে সাদা-কমলা ফুলের বিছানা দেখা যায়, যে দৃশ্য বাংলানিউজ২৪-এর ফিচারের কেন্দ্রে ছিল।

একটি গাছ এক রাতে কত ফুল ঝরায়, সেই হিসাবও বিজ্ঞানীরা গুনে দেখেছেন। ১৯৫৯ সালের মে মাসে বিজ্ঞান সাময়িকী নেচারে (খণ্ড ১৮৩, পৃষ্ঠা ১৪১০) সুবোধ কুমার রায়ের একটি গবেষণা-নোট প্রকাশিত হয়, যার বিষয় ছিল শিউলি গাছে ফুলের গড়নের তারতম্য। তাতে লেখা হয়, শিউলি গাছ এক রাতে সর্বোচ্চ ১,৪৯২টি এবং এক মৌসুমে সর্বোচ্চ ৩২,৭৯০টি ফুল ঝরায়, আর কলকাতায় এই মৌসুম সাধারণত সেপ্টেম্বর থেকে জানুয়ারির শুরু পর্যন্ত চলে।

রায় তাঁর নোটে ব্যাখ্যা করেছিলেন, জীবপরিসংখ্যানের পথিকৃৎ গবেষকেরা ফুলে পাপড়ি, বৃতি ইত্যাদির সংখ্যার তারতম্য নিয়ে অনেক পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু তাঁরা কাজ করেছিলেন বীরুৎ বা নরম কাণ্ডের ছোট উদ্ভিদ নিয়ে, তাই অল্প সংখ্যক ফুল গুনতে পেরেছিলেন এবং এক গাছের সঙ্গে আরেক গাছের, কিংবা একই গাছের ভিন্ন সময়ের তারতম্যের তুলনা করতে পারেননি। প্রতি রাতে হাজারের বেশি ফুল ঝরাতে পারা শিউলি গাছ সেই তুলনার জন্য উপযুক্ত নমুনা হয়ে উঠেছিল।

ফুল ফোটার মৌসুম অবশ্য সব জায়গায় এক নয়। কলকাতার জন্য নেচারের নোট যেখানে সেপ্টেম্বর থেকে জানুয়ারির শুরুর কথা বলছে, সেখানে শ্রীলঙ্কার গবেষকেরা লিখেছেন, সে দেশে গাছটি সারা বছরই রাতে ফুল দেয়। বাংলা অঞ্চলে শিউলি শরতের ফুল হিসেবেই পরিচিত; উইকিপিডিয়াও লিখেছে, বাংলায় এর ফুল ফোটে শরৎকালে।

শরৎ থেকে হেমন্ত: ঋতুর পালাবদলে শিউলি


বাংলানিউজ২৪-এর ফিচার শিউলিকে বেঁধেছিল শরতের বিদায় আর হেমন্তের আগমনের সঙ্গে। বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়ার 'ঋতু' ভুক্তি সেই পালাবদলের পটভূমি দেয়। বাংলাপিডিয়া জানায়, বাংলাদেশকে ষড়ঋতুর দেশ বলা হয়; বাংলা বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী বছর ছয় ঋতুতে ভাগ: গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত, প্রতিটি দুই মাসের।

বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায় শরৎ ভাদ্র ও আশ্বিন মাস জুড়ে, অর্থাৎ মধ্য-আগস্ট থেকে মধ্য-অক্টোবর। বর্ষার ধূসর আকাশের কালো মেঘের জায়গায় এ সময় নীল আকাশে ভাসে সাদা মেঘ। ঋতুর শুরুতে দিন গরম ও ভ্যাপসা থাকলেও শেষ দিকে রাত ও সকাল ঠান্ডা হয়ে আসে, আর্দ্রতা কমায় আবহাওয়া আরামদায়ক হয়। জ্ঞানকোষটি লিখেছে, শরতে অনেক সুগন্ধি ফুল ফোটে: শিউলি, গোলাপ, বকুল, মল্লিকা, কামিনী ও মাধবী। জলাভূমিতে পদ্ম আর নদীর ধারে কাশফুল ফোটে, তাল পাকে, আর হিন্দু সম্প্রদায়ের বড় উৎসব দুর্গাপূজাও এই ঋতুতে পালিত হয়।

হেমন্ত চতুর্থ ঋতু, কার্তিক ও অগ্রহায়ণ মাস জুড়ে, অর্থাৎ মধ্য-অক্টোবর থেকে মধ্য-ডিসেম্বর। বাংলাপিডিয়ার ভাষায়, এটি আসলে শরৎ ও শীতের মাঝের একটি রূপান্তরকাল। নভেম্বরের মাঝামাঝি সন্ধ্যা ঠান্ডা হয়ে আসে। দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্যের কারণে প্রচুর শিশির পড়ে। এ সময় কৃষকেরা ধান কাটায় ব্যস্ত থাকেন এবং নতুন ধানে নবান্ন উৎসব পালন করেন। ফিচারে শিউলিকে যে নবান্নের ডাক আর শীতের আগমনী বলা হয়েছিল, তার সঙ্গে জ্ঞানকোষের এই বর্ণনা মিলে যায়। ফিচারের শিশিরভেজা সকালও হেমন্তের এই ভারী শিশিরেরই ছবি।

বাংলাপিডিয়া একই সঙ্গে মনে করিয়ে দেয়, আবহাওয়ার দিক থেকে বাংলাদেশে আসলে তিনটি স্পষ্ট ঋতু: মার্চ থেকে মে পর্যন্ত বর্ষার আগের গরম মৌসুম, জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বর্ষা মৌসুম, আর নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শীতল শুষ্ক শীত মৌসুম। তবে মধ্য-অক্টোবর থেকে মধ্য-নভেম্বরের সময়টিকে শরৎ বা হেমন্তকাল বলা যায়, লিখেছে জ্ঞানকোষটি। অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে প্রকাশিত ফিচারটি তাই ঠিক এই সন্ধিক্ষণের ছবি তুলে ধরেছিল, যখন বর্ষার শেষ আর শীতের আগমনের মাঝে শিউলি ঝরতে থাকে।

বগুড়ার পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (আরডিএ) প্রাঙ্গণে একটি শিউলি গাছ। ছবি: Afifa Afrin / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
বগুড়ার পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (আরডিএ) প্রাঙ্গণে একটি শিউলি গাছ। ছবি: Afifa Afrin / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

কমলা বোঁটার রং: শিউলি থেকে প্রাকৃতিক রঞ্জক


শিউলির যে অংশটিকে সাধারণ মানুষ 'বোঁটা' বলে চেনেন, সেটি আসলে পাপড়ির কমলা নল। এই নলেই আছে রং। বাংলাপিডিয়ার 'রঞ্জক উদ্ভিদ' ভুক্তি জানায়, পৃথিবীতে বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এমন উদ্ভিদ আছে প্রায় ১৫০টি, যেগুলো থেকে বস্ত্র, চামড়া, খাবার, রং, বার্নিশ, কালি, কাগজ, কাঠ, ওষুধ ও প্রসাধনী রাঙানোর প্রাকৃতিক রং পাওয়া যায়। বাংলাদেশে এসব রং বেশি ব্যবহার হয় সুতি সুতা, কৃত্রিম আঁশ ও রেশমি কাপড় রাঙাতে। এই ভুক্তিতে শেফালিকা বা শেফালিকে একটি ছোট মাপের রঞ্জক উদ্ভিদ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যার ফুল থেকে হলুদ রং পাওয়া যায়। একই ভুক্তিতে খয়ের, মেহেদি, হলুদ, কুসুম ফুল ও অ্যানাটোর মতো অন্য রঞ্জক উদ্ভিদের কথাও আছে।

আইসিআরএএফের ডেটাবেসে এই রঙের ইতিহাস আরও বিস্তারিত। সেখানে বলা হয়েছে, রঞ্জক হিসেবে শিউলির ব্যবহার নিশ্চিতভাবেই অনেক পুরোনো। ফুলের উজ্জ্বল কমলা নলে জাফরানি-হলুদ রঞ্জক থাকে, যা একসময় রেশম রাঙাতে ব্যবহার হতো, কখনো কুসুম ফুল, হলুদ ও নীলের সঙ্গে মিশিয়ে। স্থানীয়ভাবে সুতি কাপড় রাঙাতেও এটি ব্যবহার হয়, আর বৌদ্ধ ভিক্ষুদের পোশাক রাঙাতে দামি জাফরানের সস্তা বিকল্প হিসেবেও এর প্রচলন ছিল।

রং করার পদ্ধতিও ডেটাবেসে বর্ণিত আছে। কমলা নলগুলো পানিতে ফুটিয়ে যে ক্বাথ তৈরি হয়, তাতে কাপড় ডুবিয়ে রাখা হয়। এতে জাফরানের মতো সুন্দর কমলা, হলুদ বা সোনালি রং আসে। তবে এই রং সহজে ধুয়ে যায় এবং রোদে দ্রুত ফিকে হয়ে পড়ে। রং টেকসই করতে রঙের পাত্রে লেবুর রস বা ফিটকিরি মেশানো হয়; তখন রংটি আলো, সাবান, ক্ষার ও অম্লের বিরুদ্ধে মাঝারি মাত্রায় টিকে থাকে।

রঙের রাসায়নিক পরিচয় নিয়েও তথ্য আছে। আইসিআরএএফ জানায়, রঞ্জকটির নাম নিকট্যান্থিন, যা জাফরানের রঞ্জক ক্রোসেটিনের সমগোত্রীয়। ২০১৪ সালে বায়োমেড রিসার্চ ইন্টারন্যাশনাল সাময়িকীতে প্রকাশিত শিউলি ফুলের নির্যাস নিয়ে একটি গবেষণায় নির্যাসে আলফা-ক্রোসেটিনের একটি এস্টার যৌগ শনাক্ত হওয়ার কথা বলা হয়েছে; একই প্রবন্ধ জানায়, শিউলিতে বিপুল সংখ্যক ফেনলজাতীয় যৌগ, ইরিডয়েড ও ক্যারোটিনয়েড পাওয়া গেছে। জাফরান আর শিউলির রঙের মিল তাই কেবল চোখের দেখা নয়, রসায়নেরও।

কোথায় জন্মায়, কীভাবে বাড়ে


আইসিআরএএফের তথ্য অনুযায়ী শিউলির আদি নিবাস নেপাল ও ভারতের উপক্রান্তীয় হিমালয় অঞ্চল। ভারতের দক্ষিণাংশ এবং থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে সম্ভবত এটি বাইরে থেকে আনা হয়েছে। এখন বিশ্বের ক্রান্তীয় ও উপক্রান্তীয় অঞ্চলের নানা দেশে এর ব্যাপক চাষ হয়। আদি অঞ্চলে গাছটি শুষ্ক পাহাড়ের ঢালে পাথুরে মাটিতে এবং শুষ্ক পর্ণমোচী বনের নিচের স্তরে জন্মায়। উইকিপিডিয়ার বর্ণনাতেও এটিকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্থানীয় প্রজাতি বলা হয়েছে।

গাছটি অনেক রকম পরিবেশে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। ডেটাবেস অনুযায়ী বিষুবীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১,৫০০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত এটি চাষ করা যায়, বৃষ্টিপাত মৌসুমি হোক বা সারা বছর ছড়ানো। গাছটি মাঝারি ছায়াও সহ্য করে। বাংলাদেশে বাড়ির উঠোন থেকে প্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণ পর্যন্ত শিউলি গাছ দেখা যায়; ওপরের ছবিটি বগুড়ার পল্লী উন্নয়ন একাডেমির একটি গাছের।

শিউলির বংশবিস্তারও সহজ। আইসিআরএএফ জানায়, বীজ বা কাটিং (ডাল কেটে লাগানো) দুইভাবেই সহজে চারা তৈরি করা যায়। গাছটি কেটে দিলে গোড়া থেকে আবার সহজে ডাল গজায়, আর ছাগল বা গরু এর পাতা খায় না। এ কারণে এটি বেড়া হিসেবেও লাগানো হয়।

শিউলির চ্যাপ্টা, হৃৎপিণ্ডাকার ফল, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে, অক্টোবর ২০১২। ছবি: JDP90 (Joydeep) / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
শিউলির চ্যাপ্টা, হৃৎপিণ্ডাকার ফল, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে, অক্টোবর ২০১২। ছবি: JDP90 (Joydeep) / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

রোগবালাইয়ের কথাও ডেটাবেসে আছে। ওইডিয়াম প্রজাতির ছত্রাকজনিত পাউডারি মিলডিউ রোগে পাতার কিছু ক্ষতি হতে পারে; ডেটাবেস অনুযায়ী গন্ধক ছিটিয়ে এ রোগ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এ ছাড়া ছত্রাকজনিত পাতার দাগ ও অন্যান্য রোগেও গাছ আক্রান্ত হতে পারে। ডেটাবেসে কোনো মাত্রা দেওয়া নেই; বাগানের শিউলি গাছে রোগ দেখা দিলে কী ওষুধ কতটুকু দিতে হবে, তা জানতে উপজেলা কৃষি অফিসারের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।

কাঠ, সুগন্ধি ও অন্যান্য ব্যবহার


ফুল আর রঙের বাইরেও শিউলির নানা ব্যবহারের কথা আইসিআরএএফ তালিকাভুক্ত করেছে:

  • সুগন্ধি: সুগন্ধি ফুলে যে উদ্বায়ী তেল থাকে, তা জুঁইয়ের তেলের মতো এবং সুগন্ধি হিসেবে ব্যবহার হয়।
  • কাঠ: কাঠ বেশ ভারী, গড়ে প্রতি ঘনমিটারে ৮৮০ কিলোগ্রাম, বাদামি, ঘন আঁশের ও মাঝারি শক্ত; কখনো কখনো তক্তা তৈরিতে এবং জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হয়।
  • চামড়া পাকা করা: বাকল ট্যানিং বা চামড়া পাকা করার উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
  • পালিশ: খসখসে পাতা কখনো কখনো কাঠ ও হাতির দাঁত পালিশ করতে ব্যবহার হয়।
  • বীজের তেল: বীজে প্রায় ১৫ শতাংশ ফ্যাকাশে হলদে-বাদামি তেল থাকে।

একটি সতর্কতাও ডেটাবেসে আছে: শিউলির বাকলে একটি গ্লাইকোসাইড ও কিছু অ্যালকালয়েড থাকে, যেগুলো প্রাণী ও মানুষের জন্য বিষাক্ত হতে পারে বলে সন্দেহ করা হয়। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া গাছের কোনো অংশ খাওয়া বা পান করা উচিত নয়।

আইসিআরএএফ আরও জানায়, ভারত ও শ্রীলঙ্কায় হিন্দু মন্দিরের কাছে এবং মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়াতেও শিউলি গাছ প্রায়ই লাগানো হয়। ২০১৫ সালের গবেষণা-প্রবন্ধটি জানায়, শ্রীলঙ্কায় গাছটি প্রায় সারা দেশে বৌদ্ধ মন্দির ও বাগানে দেখা যায়। উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী ভারতে এর ফুল দিয়ে মালা গাঁথা হয় এবং পূজায় ব্যবহার হয়। ভারতের ত্রিপুরার বরক সংস্কৃতিতে গাছটিকে জন্ম ও মৃত্যুর চক্রের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হয়। বাংলাপিডিয়া যে দুর্গাপূজাকে শরতের উৎসব বলেছে, সেই সময়টিই শিউলি ফোটার কাল।

গবেষণাগারে শিউলি: কী পরীক্ষা হয়েছে, কী হয়নি


দক্ষিণ এশিয়ার প্রচলিত চিকিৎসাপদ্ধতিতে শিউলির পাতা, ফুল ও বীজের নানা ব্যবহারের কথা প্রচলিত আছে, এবং বিজ্ঞানীরা এসব দাবি গবেষণাগারে পরীক্ষা করে দেখছেন। ২০১৪ সালের বায়োমেড রিসার্চ ইন্টারন্যাশনালের গবেষণায় ছায়ায় শুকানো শিউলি ফুলের নির্যাসের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট গুণ এবং গবেষণাগারে চাষ করা মানুষের কয়েক ধরনের ক্যানসার কোষের বৃদ্ধি কমানোর ক্ষমতা পরীক্ষা করা হয়। ২০১৫ সালে শ্রীলঙ্কার গবেষকেরা ইঁদুরের ওপর শিউলি ফুল গরম পানিতে ভিজিয়ে তৈরি নির্যাসের প্রদাহরোধী প্রভাব পরীক্ষা করেন; তাঁরা লিখেছেন, সে দেশের কিছু প্রচলিত চিকিৎসকের দাবিটি এর আগে বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করা হয়নি।

এ ধরনের গবেষণা হয়েছে কোষ বা প্রাণীর ওপর, মানুষের ওপর নিয়ন্ত্রিত চিকিৎসা-পরীক্ষায় নয়। তাই এগুলোকে কোনো রোগের চিকিৎসা হিসেবে ধরা যায় না। আগেই বলা হয়েছে, বাকলের কিছু উপাদান বিষাক্ত হতে পারে বলে সন্দেহ আছে। কোনো স্বাস্থ্য সমস্যায় শিউলির পাতা, ফুল বা বীজ ব্যবহারের কথা ভাবলে আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

ছবি: Navendulad / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

সূত্র: বাংলানিউজ২৪ (অক্টোবর ২০২১), বাংলাপিডিয়া (ঋতু; রঞ্জক উদ্ভিদ), ওয়ার্ল্ড অ্যাগ্রোফরেস্ট্রি সেন্টার (আইসিআরএএফ) অ্যাগ্রোফরেস্ট্রি ট্রি ডেটাবেস, নেচার (সুবোধ কুমার রায়, মে ১৯৫৯), বায়োমেড রিসার্চ ইন্টারন্যাশনাল (২০১৪), ইন্ডিয়ান জার্নাল অব ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্সেস (২০১৫), উইকিপিডিয়া (অক্টোবর ২০২১ সংস্করণ)

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

ফুল

সম্পর্কিত খবর

জৈব

গরুর চারণের আচ্ছাদন ফসলে সূর্যমুখী, সেই মাঠেই ফুল তুলতে আসেন দর্শনার্থী

কানাডার ম্যানিটোবার আর্নেসের দুগিদ পরিবার পুনরুৎপাদনশীল চারণের আচ্ছাদন ফসলে কাটা ফুলের সূর্যমুখী জাত যোগ করেছে। এখন একই মাঠ তাদের গরুর খাবার জোগায়, আবার দর্শনার্থীদের নিজ হাতে ফুল তোলার দিনেও ভিড় টানে।

Manitoba Co-operator১৫ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
ফুল

আগুনরঙা সুগন্ধি পানামা রোজ: গোলাপ নয়, রঙ্গনের আত্মীয়; কাটিংয়েই চারা

মিরপুরের জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানে ফোটা কমলা-লাল পানামা রোজ (Rondeletia odorata) পানামা ও কিউবার গুল্ম; অক্টোবর থেকে মে পর্যন্ত ফোটে, ১০-১৫ সেন্টিমিটার ডাল কেটে পুঁতলে তিন থেকে পাঁচ সপ্তাহে শিকড় গজায়।

সমকাল১৪ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
ফুল

পাবনার বিল-ঝিলে লাল-সাদা শাপলার সমারোহ, তবু কমছে শাপলা জন্মানোর জায়গা

গাজনার বিল, ডিকশির বিল, চলনবিলসহ পাবনার জলাশয়ে এখন লাল ও সাদা শাপলা ফুটেছে; তবে জলাশয় ভরাট, অপরিকল্পিত মাছ চাষ আর কীটনাশকে শাপলার জায়গা সংকুচিত হচ্ছে বলে জানান স্থানীয়রা।

দেশ রূপান্তর১২ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)