২০২৬ সালের ২ জুন জাগো নিউজ ২৪-এর লাইফস্টাইল বিভাগে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী খাবার মধুভাতের পরিচিতি ও রেসিপি নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। তার আগের দিন, ১ জুন, অভিনেত্রী জয়া আহসান প্রথমবার মধুভাত খাওয়ার একটি ভিডিও ফেসবুকে শেয়ার করেন এবং দেশ রূপান্তরের খবর অনুযায়ী, সেই ভিডিও ঘিরে খাবারটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে কৌতূহল তৈরি হয়। মধুভাত হলো বিন্নি বা সুগন্ধি চালের ভাতের সঙ্গে জালা চালের গুঁড়া মিশিয়ে সারারাত ঢেকে রেখে তৈরি করা এক ধরনের মিষ্টি ভাত। নামে মধু থাকলেও এতে মধু দেওয়া হয় না; এর মিষ্টতা আসে অঙ্কুরিত ধান থেকে তৈরি জালা চালের গুঁড়া থেকে।
জাগো নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, কোনো অঞ্চলের মানুষের কাছে তাদের নিজস্ব খাবার কেবল খাদ্য নয়, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও আবেগের অংশ। প্রতিটি জেলার কিছু নিজস্ব খাবার সেই অঞ্চলের ইতিহাস ও জীবনধারার পরিচয় বহন করে। বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতিতে ভাত, মাছ ও ভর্তা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, চট্টগ্রামের মানুষের কাছে তেমনই বিশেষ জনপ্রিয় একটি খাবার মধুভাত। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই খাবার স্বাদের পাশাপাশি পারিবারিক সম্পর্ক ও সামাজিক রীতির সঙ্গেও জড়িয়ে আছে।
চট্টগ্রামের পারিবারিক রীতিতে মধুভাত
জাগো নিউজ জানায়, চট্টগ্রামে মধুভাত সাধারণত উৎসব, পারিবারিক আয়োজন ও বিশেষ অনুষ্ঠানে তৈরি হয়। অতীতে আশ্বিন ও কার্তিক মাসে মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে কলসিভর্তি মধুভাত পাঠানোর প্রচলন ছিল, যা ছিল মেয়ের প্রতি পরিবারের ভালোবাসা ও আন্তরিকতার প্রতীক। অনেক পরিবার এখনো সেই রীতি ধরে রেখেছে। গ্রামীণ চট্টগ্রামে অতিথি আপ্যায়ন কিংবা পারিবারিক মিলনমেলায় মধুভাত পরিবেশন একসময় খুবই সাধারণ বিষয় ছিল, আর এর স্বাদ ও ঘ্রাণ এখনো অনেকের শৈশবের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলায় ২০২৫ সালের ৪ মে প্রকাশিত এক ফিচারে এই রীতির আরও বিবরণ পাওয়া যায়। সেখানে বলা হয়, আগে যার ঘরে মধুভাত রান্না হতো, তিনি বাটি ভরে আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের বাড়িতে পাঠাতেন। নববিবাহিত মেয়ের বিয়ের প্রথম বছরে শ্বশুরবাড়িতে কলসভর্তি মধুভাত পাঠানো ছিল বাধ্যতামূলক রীতি। ফলের মৌসুমে ফল, কোরবানির ঈদে মাংস কিংবা বিয়ের তিন দিন পর দুধ-কলা পাঠানোর মতোই নিয়ম করে মধুভাত পাঠানোর চল ছিল, এবং বিশ্বাস করা হতো যে এতে দুই পরিবারের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়। একসময় আত্মীয়দের বাড়িতে মধুভাত না পাঠানোকে শোভন মনে করা হতো না।
ফিচারটি চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ইতিহাসবিদ আবদুল হক চৌধুরীর বই 'চট্টগ্রামের সমাজ ও সংস্কৃতির রূপরেখা' থেকে উদ্ধৃত করেছে: "চট্টগ্রামে নববিবাহিত মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে প্রথম বছর মধুভাত পাঠানো বাধ্যতামূলক।" বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী আবদুল হক চৌধুরী (১৯২২-১৯৯৪) চট্টগ্রামের রাউজানে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বইয়ের মধ্যে রয়েছে 'চট্টগ্রামের ইতিহাস প্রসঙ্গ' (১৯৭৬), 'সিলেটের ইতিহাস প্রসঙ্গ' (১৯৮১), 'চট্টগ্রামের সমাজ ও সংস্কৃতির রূপরেখা' (১৯৮৮) ও 'চট্টগ্রাম-আরাকান' (১৯৮৯)। জাগো নিউজের প্রতিবেদনের শেষেও এই বইটিকে তথ্যসূত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
একই ফিচারে আগ্রাবাদে জন্ম ও বেড়ে ওঠা ৬৮ বছর পেরোনো এক গৃহিণী বলেন, "এসব খাবার পাঠানোর রীতি মানার মাধ্যমে আত্মীয়তার বন্ধন আরও দৃঢ় হয়, আম্মারা তাই বলতেন। আম্মার কাছ থেকেই আমরা শিখেছি। আমরা বিশ্বাস করি, এভাবে একসাথে কিছু খেলে ভালোবাসা বাড়ে।"
মধুভাত ঘিরে একটি লোকবিশ্বাসের কথাও টিবিএস লিখেছে। একসময় মধুভাত রান্না হতো রাতে, নিঃশব্দে; প্রচলিত বিশ্বাস ছিল, রান্নার সময় অনেক লোক জানলে মধুভাত ঠিকমতো "উঠে না"। তাই রাতে চুপচাপ নারকেল কাটা ও চাল ঘুঁটার কাজ চলত, আর সকালে খাবারের টেবিলে আসত মধুভাত। এই আয়োজন উপলক্ষে আপনজনদের দাওয়াতও দেওয়া হতো। চট্টগ্রামের লোকজ ঐতিহ্য অনুযায়ী মধুভাত তৈরির উপযুক্ত সময় গ্রীষ্মকাল ও ভাদ্র মাস, কারণ গরমে ভাত সহজে মধুভাতে রূপ নেয়; অনেকে বলেন, ভাদ্র মাসের মধুভাত সবচেয়ে মিষ্টি হয়।
নামে মধু, অথচ মধু নেই
টিবিএসের ফিচারের শিরোনামই ছিল, মধুর ব্যবহার ছাড়াই যে ভাতের স্বাদ হয় মধুর মতো মিষ্টি। সেখানে স্পষ্ট বলা হয়, মধুভাত তৈরিতে এক চিমটিও চিনি কিংবা এক ফোঁটাও মধু ব্যবহার করা হয় না। এর মিষ্টতার উৎস জালা চাল, যা দিয়ে তৈরি ভাত প্রাকৃতিকভাবেই মিষ্টি ও সুগন্ধি হয়। তবে যাঁরা বেশি মিষ্টি পছন্দ করেন, তাঁরা খাওয়ার সময় সামান্য চিনি মিশিয়ে নেন।
স্বাদ নিয়ে ফিচারটির বর্ণনা হলো, মধুভাত দেখতে ও খেতে অনেকটা ফিরনির মতো হলেও ফিরনিতে যেমন চিনি বা গুড় থাকে, মধুভাতে তা থাকে না, আর ফিরনির ঘ্রাণও এতে নেই। এর বদলে থাকে নিজস্ব এক প্রাকৃতিক মৌ মৌ গন্ধ এবং এক ধরনের টক-মিষ্টি স্বাদ। যাঁরা কখনো খাননি, তাঁদের কেউ কেউ ভাবেন, রাতভর মুখ বন্ধ করে রাখায় ভাতে দুর্গন্ধ হতে পারে; টিবিএস লিখেছে, বাস্তবে বিষয়টি উল্টো, আর অনেকে এই ঘ্রাণের কারণেই মধুভাতের প্রতি আকৃষ্ট।
জাগো নিউজের রেসিপিতেও উপকরণের তালিকায় মধু নেই; সেখানে দুধের মিশ্রণে কনডেন্সড মিল্ক বা চিনি যোগ করার কথা আছে। অর্থাৎ ঘরে ঘরে চলে আসা মূল পদ্ধতিতে মিষ্টতা আসে কেবল জালা চাল থেকে, আর আধুনিক কিছু রেসিপিতে দুধ, কনডেন্সড মিল্ক বা চিনি দিয়ে বাড়তি মিষ্টি যোগ করা হয়।
জালা চাল কী, মিষ্টি আসে কোথা থেকে
টিবিএসের বিবরণ অনুযায়ী, বীজতলায় চারা তৈরির জন্য যে ধান ভিজিয়ে রাখা হয়, সেখান থেকেই তৈরি হয় জালা চাল। ধান ভিজিয়ে অঙ্কুরিত করা হয়, তারপর স্তূপ করে রেখে দেওয়া হয় ১০ থেকে ১৫ দিন। এরপর তা শুকিয়ে ঢেঁকিতে বা মেশিনে কুটে তৈরি হয় চালের গুঁড়া। এই গুঁড়াই মধুভাতের মূল উপাদান।
অঙ্কুরিত শস্য শুকিয়ে নেওয়ার এই পদ্ধতি বিশ্বজুড়ে মল্ট বা মাল্ট তৈরির পদ্ধতি হিসেবে পরিচিত। বিশ্বকোষের সংজ্ঞায়, মল্ট হলো এমন যেকোনো দানাশস্য, যাকে পানিতে ভিজিয়ে অঙ্কুরিত করা হয় এবং তারপর গরম বাতাসে শুকিয়ে অঙ্কুরোদ্গম থামিয়ে দেওয়া হয়। অঙ্কুরিত হওয়ার সময় শস্যে আলফা-অ্যামাইলেজ ও বিটা-অ্যামাইলেজ নামের এনজাইম তৈরি হয়, যা শস্যের শ্বেতসার বা স্টার্চকে গ্লুকোজ ও মল্টোজসহ বিভিন্ন ধরনের চিনিতে রূপান্তর করে। বার্লি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হলেও গম, রাই, ওট, ভুট্টার পাশাপাশি ধানও মল্ট তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
এই প্রেক্ষাপটে মধুভাতের প্রক্রিয়াটি বোঝা সহজ। গরম ভাতের সঙ্গে জালা চালের গুঁড়া মিশিয়ে উষ্ণ জায়গায় সারারাত ঢেকে রাখলে জালার এনজাইম ভাতের স্টার্চ ভেঙে চিনিতে পরিণত করে, ফলে কোনো মিষ্টি উপকরণ ছাড়াই ভাত মিষ্টি হয়ে ওঠে। জাগো নিউজ এই ধাপকে একটি বিশেষ গাঁজন প্রক্রিয়া বলেছে, যা মধুভাতের স্বাদকে সমৃদ্ধ করে; টিবিএসের বর্ণনায় এর টক-মিষ্টি স্বাদ ও নিজস্ব ঘ্রাণের কথাও আছে। গরমের মৌসুমে মধুভাত সহজে তৈরি হওয়ার লোকজ ধারণার সঙ্গেও উষ্ণ জায়গায় রাখার এই ধাপ মেলে।

মধুভাতের রেসিপি
জাগো নিউজের রেসিপিটি প্রথম আলোর লাইফস্টাইল বিভাগে ২০২০ সালের ২১ নভেম্বর প্রকাশিত 'চট্টলার পিঠা-পায়েস' রেসিপির সঙ্গে প্রায় মেলে, যেখানে নাসরীন আখতার চট্টগ্রাম অঞ্চলের মধু ভাতের উপকরণের পরিমাণও দিয়েছিলেন। প্রথম আলোর রেসিপি অনুযায়ী উপকরণ:
- পোলাওয়ের চাল দেড় কাপ
- বিন্নি চাল আধা কাপ
- নারকেল ১ কাপ
- কনডেন্সড মিল্ক স্বাদমতো
- গুঁড়া দুধ সিকি কাপ
- জালা চালের গুঁড়া এক কাপ
- লবণ স্বাদমতো
প্রণালি, প্রথম আলো ও জাগো নিউজের বর্ণনা মিলিয়ে:
- চাল ধুয়ে ১০ মিনিট পানিতে ভিজিয়ে রাখুন।
- একটি পাত্রে ৬ কাপ পানি ও ২ চা-চামচ লবণ দিয়ে ফোটান। পানি ফুটে উঠলে পানি ঝরানো চাল দিয়ে মাঝারি আঁচে নরম করে ভাত রান্না করুন; ভাত যেন হাঁড়ির গায়ে লেগে না যায়, সে জন্য কিছুক্ষণ পরপর কাঠি দিয়ে নেড়ে দিন।
- ভাত আঠালো হয়ে এলে আঁচ আরও কমিয়ে ঢাকনা দিয়ে ৫ মিনিট রাখুন, তারপর ঢাকনা সরিয়ে নেড়ে নিন।
- ১০ মিনিট পর পাত্র চুলা থেকে নামিয়ে অল্প অল্প করে জালা চালের গুঁড়া ছিটিয়ে ঘুঁটনি দিয়ে ভালো করে ঘুঁটে নিন।
- ভাতের ওপর আধা কাপ জালা চালের গুঁড়া চেপে বিছিয়ে দিন এবং পাত্রটি ঘরের কোনো উষ্ণ জায়গায় মোটা কাপড়ে ঢেকে ১২ ঘণ্টা রাখুন।
- ১২ ঘণ্টা পর দেখুন ভাতের ওপরের অংশ ফেটে গেছে কি না; ফেটে থাকলে মধুভাত তৈরি হয়েছে, তখন ভাত বাটিতে ঢেলে নিন।
- পরিবেশনের আগে নারকেল, গুঁড়া দুধসহ বাকি উপকরণ মিশিয়ে ভাতের ওপর ছিটিয়ে দিন।
জাগো নিউজের সংস্করণে একটি বাড়তি ধাপ আছে: আলাদা পাত্রে দুধ জ্বাল দিয়ে ঘন করে তাতে নারকেল কুচি, সামান্য লবণ এবং কনডেন্সড মিল্ক বা চিনি মিশিয়ে কিছুক্ষণ রান্না করা হয়। মিশ্রণ ঠান্ডা হলে তা ভাতের সঙ্গে ভালোভাবে মিশিয়ে বাটিতে ঢেলে ওপরে নারকেল ও গুঁড়া দুধ ছড়িয়ে পরিবেশন করা হয়। অনেকে মধুভাত কিছুটা পাতলা করে খান, আর গরমের দিনে ঠান্ডা মধুভাত বিশেষ জনপ্রিয়।
টিবিএসের বর্ণনায় ঘরোয়া প্রচলিত পদ্ধতিটি আরও সরল। বিন্নি চাল কিংবা সুগন্ধি নতুন আতপ চালের ভাত রান্না করে বড় ডেকচিতে তার ওপর জালা চালের গুঁড়া ছড়িয়ে ডাল ঘুটনি দিয়ে গরম ভাতের সঙ্গে ভালোভাবে মেশানো হয়। তারপর বড় পরিষ্কার পলিথিন বা কাপড় দিয়ে পাতিলের মুখ শক্ত করে বেঁধে সারারাত রাখা হয়। পরদিন সকালে বা দুপুরে খুললে দেখা যায়, ভাত পায়েস বা ফিরনির মতো রূপ নিয়েছে, তখনই তা খাওয়ার উপযুক্ত। পরিবেশনের সময় ওপরে কোড়ানো নারকেল ছড়ানো হয়, কেউ কেউ কিসমিস বা বাদামও যোগ করেন। আগে এভাবেই খাওয়া হতো; এখন অনেকে ফ্রিজে রেখে ঠান্ডা করে খেতে পছন্দ করেন।
বিন্নি চাল: আঠালো ভাতের উৎস
মধুভাতের ভাতের জন্য দুটি প্রতিবেদনেই বিন্নি চালের কথা আছে। বিন্নি হলো আঠালো চাল, ইংরেজিতে যাকে গ্লুটিনাস রাইস, স্টিকি রাইস বা ওয়াক্সি রাইস বলা হয়; এর বৈজ্ঞানিক নাম Oryza sativa var. glutinosa। বিশ্বকোষের বিবরণ অনুযায়ী এ চালের দানা অস্বচ্ছ, এতে অ্যামাইলোজ প্রায় থাকে না এবং অ্যামাইলোপেকটিন বেশি থাকে, আর রান্নার পর এটি বিশেষভাবে আঠালো হয়। স্টার্চের এই দুই উপাদানের মধ্যে অ্যামাইলোপেকটিনের ধর্মই এর আঠালো ভাবের কারণ।
নামে গ্লুটিনাস হলেও অন্য সব চালের মতো বিন্নি চালেও খাদ্য-গ্লুটেন (গ্লুটেনিন ও গ্লিয়াডিন) নেই; নামটি এসেছে এর আঠার মতো ঘনত্ব থেকে। এই চাল প্রধানত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে চাষ হয়; লাওস, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, মিয়ানমার, নেপাল ও ফিলিপাইনের পাশাপাশি বাংলাদেশেও এর চাষ আছে।
বাংলাদেশে বিন্নি চালের ব্যবহার কেবল মধুভাতে সীমাবদ্ধ নয়। প্রথম আলোর একই রেসিপি প্রতিবেদনে বিরুই বা বিন্নি চালের গুঁড়া দিয়ে নারকেল ও চিনির পুর দেওয়া বিন্নি চালের পিঠার রেসিপিও ছিল। সিলেট অঞ্চলে বিরইন নামে পরিচিত এই আঠালো চালের ভাত সকালের প্রচলিত খাবার।
পুষ্টি ও স্বাস্থ্য: যা বলা যায়
জাগো নিউজের মূল প্রতিবেদনে মধুর গ্লুকোজ ও ফ্রুক্টোজ, মধুর এনজাইম, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং সর্দি-কাশিতে স্বস্তির কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু মধুভাতে মধু থাকে না, আর প্রতিবেদনের নিজের রেসিপিতেও মধু নেই, তাই মধু-সংক্রান্ত সেই দাবিগুলো এই খাবারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় এবং এখানে রাখা হয়নি।
উপকরণগুলোর পুষ্টিমান নিয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) ফুডডেটা সেন্ট্রাল তথ্যভান্ডারে। সেখানে রান্না করা সাদা আঠালো চালের প্রতি ১০০ গ্রামে কার্বোহাইড্রেট ২১.১ গ্রাম, প্রোটিন ২.০২ গ্রাম ও চর্বি ০.১৯ গ্রাম দেখানো হয়েছে; অর্থাৎ এর প্রধান উপাদান শর্করা। মিষ্টি কনডেন্সড মিল্কের প্রতি ১০০ গ্রামে শক্তি ৩২১ কিলোক্যালরি, চিনি ৫৪.৪ গ্রাম, চর্বি ৮.৭ গ্রাম ও ক্যালসিয়াম ২৮৪ মিলিগ্রাম।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) স্বাস্থ্যকর খাদ্যবিষয়ক তথ্যপত্র অনুযায়ী, রান্নার সময় বা খাওয়ার সময় যোগ করা চিনি, এবং মধু, সিরাপ ও ফলের রসে থাকা চিনি হলো 'ফ্রি সুগার'। সংস্থাটির পরামর্শ, দৈনিক মোট শক্তির ১০ শতাংশের কম ফ্রি সুগার থেকে আসা উচিত, যা স্বাভাবিক ওজনের এবং দিনে প্রায় ২০০০ ক্যালরি গ্রহণকারী একজন মানুষের জন্য ৫০ গ্রাম বা প্রায় ১২ চা-চামচের সমান; ৫ শতাংশ বা তার কমে নামালে বাড়তি উপকার হতে পারে। তাই কনডেন্সড মিল্ক বা চিনি দেওয়া মধুভাত পরিমিত খাওয়াই ভালো। যাঁদের ডায়াবেটিস বা অন্য কোনো রোগ আছে, তাঁরা নিয়মিত এ ধরনের মিষ্টি খাবার খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
উৎপত্তি নিয়ে নানা মত
চট্টগ্রামে মধুভাতের প্রচলন ঠিক কবে শুরু হয়েছে, তা নিয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য নেই বলে টিবিএস জানিয়েছে। কাপাসগোলা এলাকার ৭৮ বছর পেরোনো এক বাসিন্দা ফিচারটিতে বলেন, তিনি তাঁর মা, চাচি ও দাদিকে মধুভাত রান্না করতে দেখেছেন, এখন তাঁর স্ত্রীও রান্না করেন। তাঁর কথায়, "আমার বড় বোনের বয়স হয়েছিল ১১০ বছর। তাকেও যেমন করতে দেখেছি, তেমনি মা আর দাদিকেও।"
ফিচারে উল্লেখ আছে, অনেক গবেষকের মতে এই ঐতিহ্য প্রায় ১,৪০০ বছরের পুরোনো। একটি ধারণা হলো, বার আউলিয়ার আগমনের সময় সুফি সাধকেরা ইসলাম প্রচারের পাশাপাশি নিজেদের কিছু খাদ্যাভ্যাস স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মিশিয়ে দেন, আর মধুভাত হয়তো তারই একটি নিদর্শন, যেমনটি মেজবানের রেওয়াজ। আরেকটি ধারণা হলো, আরাকান আমলে মানুষ মধু মিশিয়ে ভাত খেত এবং সেখান থেকেই 'মধুভাত' নামটি এসেছে; সময়ের সঙ্গে নাম থেকে গেলেও রন্ধনপ্রণালি বদলে গেছে।
চট্টগ্রাম গবেষক হারুন রশীদ টিবিএসকে বলেন, "আমার কেন যেন মনে হয়, এটা দক্ষিণ দিক থেকে আসা সংস্কৃতি। ভাত তো দক্ষিণ দিক থেকেই এসেছে। সুফিদের উৎস এলাকা থেকে ভাতের প্রচলন বেশি ছিল না। তাই আমার কাছে আরাকানি ব্যাখ্যাটাই বেশি গ্রহণযোগ্য মনে হয়।" তিনি জানান, তাঁর পরিবারে তিন পুরুষ ধরে এই ঐতিহ্য চলে আসছে এবং এটি চাটগাঁইয়া অতিথি আপ্যায়নের অন্যতম উপাদান।
দুই ব্যাখ্যার পেছনেই চট্টগ্রামের দীর্ঘ ও বহুমাত্রিক ইতিহাস রয়েছে। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, নবম শতক থেকে আরব বণিকেরা চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে ব্যবসা করতেন। মুসলিম শাসনের আগে অঞ্চলটি কখনো আরাকান, কখনো বার্মার রাজাদের অধীনে ছিল। সোনারগাঁওয়ের সুলতান ফখরুদ্দিন মোবারক শাহ ১৩৪০ সালে চট্টগ্রাম জয় করেন; ১৫৩৮ সালের পর আরাকানিরা আবার এটি দখল করে, এবং মোগলদের বিজয়ের আগ পর্যন্ত পর্তুগিজ ও মগ জলদস্যুদের নিয়ন্ত্রণ চলে। ১৬৬৬ সালে মোগল সেনাপতি বুজুর্গ উমেদ খান পর্তুগিজদের বিতাড়িত করে মোগল শাসন প্রতিষ্ঠা করেন এবং মোগলেরা চট্টগ্রামের নাম রাখে ইসলামাবাদ। জেলার দর্শনীয় স্থানের তালিকায় বাংলাপিডিয়া সীতাকুণ্ডে বার আউলিয়ার মাজারের কথাও উল্লেখ করেছে।
চট্টগ্রাম জেলা ও এর খাদ্যসংস্কৃতি
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী চট্টগ্রাম জেলার আয়তন ৫২৮২.৯২ বর্গকিলোমিটার। এর উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য, দক্ষিণে কক্সবাজার, পূর্বে বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি এবং পশ্চিমে নোয়াখালী ও বঙ্গোপসাগর। পাহাড়, নদী, সমুদ্র, বন ও উপত্যকার সমন্বয়ে জেলাটির প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য অন্য জেলা থেকে আলাদা। কর্ণফুলী, হালদা ও সাঙ্গু এর প্রধান নদী; বার্ষিক মোট বৃষ্টিপাত ৩১৯৪ মিলিমিটার। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী জেলার জনসংখ্যা ৭৬,১৬,৩৫২, আর জেলার মানুষের আয়ের উৎসের মধ্যে কৃষির অংশ ৩৩.৫৩ শতাংশ। কর্ণফুলীর মোহনায় অবস্থিত চট্টগ্রাম শহর দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর এবং বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত।
চট্টগ্রামের খাদ্যসংস্কৃতির সবচেয়ে পরিচিত নাম মেজবান। বাংলাপিডিয়ায় আহমদ মমতাজ লিখেছেন, ফারসি শব্দ মেজবান অর্থ আতিথ্যকর্তা, আর মেজবানি অর্থ ভোজের আয়োজন। মৃত্যুবার্ষিকী, জন্ম, ব্যবসা শুরু, নতুন বাড়িতে ওঠা, বিয়ে বা নামকরণের মতো উপলক্ষে এই ভোজ হয়, যেখানে গরুর মাংস, নলা কাঁজি ও বুটের ডালসহ তিন-চার ধরনের তরকারি পরিবেশন করা হয়। ১৯৬৮ সালে চট্টগ্রাম সমিতির উদ্যোগে ঢাকায় মেজবানের আয়োজন শুরু হয়, পরে তা সিলেট, খুলনা ও দেশের বাইরেও ছড়িয়েছে। বাংলাপিডিয়ার জেলা নিবন্ধেও মুসলিম সম্প্রদায়ের মেজবানিকে জেলার বিশেষ লোকজ উৎসবের তালিকায় রাখা হয়েছে। মধুভাত যেমন আত্মীয়-প্রতিবেশীর ঘরে পাঠানোর খাবার, মেজবান তেমনই সবাইকে ডেকে খাওয়ানোর আয়োজন; দুটিতেই চট্টগ্রামের আতিথেয়তার রীতি ধরা পড়ে।

অন্য দেশে মল্ট দিয়ে মিষ্টি ভাত: কোরিয়ার সিখে
রান্না করা ভাতকে অঙ্কুরিত শস্যের সাহায্যে মিষ্টি করার কৌশল কেবল চট্টগ্রামে নয়। কোরিয়ার ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি পানীয় সিখে তৈরি হয় ভাত ও মল্ট দিয়ে। বিশ্বকোষের বিবরণ অনুযায়ী, রান্না করা ভাতের ওপর মল্টের পানি ঢেলে সাধারণত ৬২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে রাখা হয়, যতক্ষণ না ভাতের দানা ওপরে ভেসে ওঠে। এরপর তরল ছেঁকে নিয়ে যথেষ্ট মিষ্টি না হওয়া পর্যন্ত ফোটানো হয়; এতে আলাদা চিনি দেওয়া হয় না।
সিখে সাধারণত খাবারের পরে মিষ্টান্ন হিসেবে পরিবেশন করা হয়; একসময় রাজদরবারে খাবারের পর এটি পরিবেশন করা হতো, আর এখন কোরিয়ার দোকানে বোতলজাত সিখেও পাওয়া যায়। মধুভাত ও সিখের মধ্যে পার্থক্য হলো, সিখে মূলত পানীয়, আর মধুভাত পায়েস বা ফিরনির মতো ঘন খাবার; তবে দুটিরই মিষ্টতা আসে অঙ্কুরিত শস্যের এনজাইম থেকে।

হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য
টিবিএস লিখেছে, একসময় চট্টগ্রামের ঘরে ঘরে উৎসব করে মধুভাত রান্না হতো, কিন্তু এখন আর আগের মতো সেই আয়োজন দেখা যায় না। সময়ের অভাব, দীর্ঘ প্রস্তুতির ঝক্কি ও দ্রুত জীবনের চাপে অনেকে আগ্রহ হারিয়েছেন। এখন গ্রামের কিছু পরিবার এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে; শহরাঞ্চলে এটি প্রায় বিলুপ্ত এবং বর্তমান প্রজন্মের অনেকের কাছে মধুভাত অপরিচিত। একই সঙ্গে কেউ কেউ বাটিভর্তি মধুভাত অনলাইনে বিক্রিও শুরু করেছেন।
জাগো নিউজের প্রতিবেদনও একই কথা বলেছে: ফাস্টফুড ও আধুনিক খাবারের ভিড়ে অনেক ঐতিহ্যবাহী খাবার হারিয়ে যেতে বসলেও মধুভাত এখনো অনেক পরিবারের রান্নাঘরে জায়গা ধরে রেখেছে, কারণ এটি পারিবারিক ঐতিহ্য, স্মৃতি ও ভালোবাসার প্রতীক।
ছবি: AbuSayeed / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলা, প্রথম আলো, দেশ রূপান্তর, বাংলাপিডিয়া, ইউএসডিএ ফুডডেটা সেন্ট্রাল, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, উইকিপিডিয়া (মল্ট, গ্লুটিনাস রাইস, সিখে)





মন্তব্য
(০)