সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৬°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৭৩%বাতাস ৩ কিমি/ঘ

রাষ্ট্রের প্রকৃতিতেই খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার শেকড়, বলছে বাংলাদেশ নিয়ে একটি বই

২০২৬ সালের ৪ জানুয়ারি জাগো নিউজে প্রকাশিত এক মতামতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আব্দুল বায়েস অধ্যাপক মোহাম্মদ মোজাহিদুল ইসলামের একটি বইয়ের পর্যালোচনা করেন, যার মূল যুক্তি হলো বাংলাদেশে লাখো মানুষের অভুক্ত থাকার কারণ সম্পদের অভাব নয়, রাষ্ট্রের প্রকৃতি।

রাষ্ট্রের প্রকৃতিতেই খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার শেকড়, বলছে বাংলাদেশ নিয়ে একটি বই
এগ্রোবিজ

২০২৬ সালের ৪ জানুয়ারি অনলাইন সংবাদমাধ্যম জাগো নিউজের মতামত বিভাগে 'খাদ্য নিরাপত্তার রাজনীতি' শিরোনামে একটি লেখা প্রকাশিত হয়। লেখক জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আব্দুল বায়েস। লেখাটি ছিল 'হোয়াই নেশনস ফেইল টু ফিড দ্য পুওর: দ্য পলিটিক্স অফ ফুড সিকিউরিটি ইন বাংলাদেশ' (দেশগুলো কেন গরিবদের খাওয়াতে ব্যর্থ হয়: বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তার রাজনীতি) বইয়ের পর্যালোচনা, যার লেখক একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মোজাহিদুল ইসলাম। খাদ্যের জোগান বাড়ছে, সরকার গরিবের জন্য নানা খাদ্য কর্মসূচি চালাচ্ছে, তবু বাংলাদেশে লাখো মানুষ কেন অভুক্ত বা আধপেটা থাকে, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বায়েস বইটির আশ্রয় নেন এবং বইয়ের উত্তরটিকে যুক্তিসংগত মনে করেন: সমস্যার শেকড় স্বয়ং রাষ্ট্রের প্রকৃতিতে।

প্রচলিত দাওয়াই যে প্রশ্নের উত্তর দেয়নি


বায়েস লেখা শুরু করেন এই পর্যবেক্ষণ দিয়ে যে রাজনীতিবিদ, নীতিনির্ধারক এবং সমাজ-সচেতন মহলে খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি অধুনা অহরহ উচ্চারিত হচ্ছে। কারণ সহজেই অনুমেয়: দেশের জনসংখ্যার একটা বড় অংশ, বিশেষত চরম দরিদ্র খানাগুলো, তীব্র খাদ্য সংকটে নিপতিত। তাঁর ভাষায়, এই দেশে খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ক গবেষণা, সেমিনার ও কনফারেন্সের কমতি ছিল না, এখনও নেই।

কিন্তু তাঁর মতে, এর বেশির ভাগই সনাতনী ধারায় রোগ ধরার কৌশল: উৎপাদন, ক্রয়ক্ষমতা, সচেতনতা ও পুষ্টিকর খাবার বাড়িয়ে খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের একগুচ্ছ সুপারিশমালা পেশ করা। আবার অনেক ক্ষেত্রে এসব সুপারিশের উৎস বহিঃস্থ অর্থায়নে করা কনসালট্যান্টদের প্রতিবেদন। তিনি লিখেছেন, এতে ফি বছর খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নে হয়তো প্রান্তিক উন্নতি ঘটেছে, কিন্তু বড়সড় ধাক্কার অভাবে এখনও লাখ লাখ মানুষ অভুক্ত কিংবা আধপেটায় জীবন কাটায়।

তাঁর কাছে এতদিনকার 'আবিষ্কৃত' কারণগুলো যে সঠিক নয়, তার প্রমাণ লেখাটির কেন্দ্রে থাকা এক বৈপরীত্য: খাদ্যের জোগান বাড়ছে, সরকার বিশেষ বিশেষ কর্মসূচিতে গরিবের জন্য খাদ্যের ব্যবস্থা করছে, অথচ মানুষ খাদ্যের অভাবে ধুঁকছে। 'গলদটা তা হলে কোথায়?', প্রশ্ন রাখেন তিনি।

বই ও তার লেখক


বায়েস লিখেছেন, এই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে সম্প্রতি তাঁর বুকশেলফে জায়গা নিয়েছে বইটি। তাঁর বর্ণনায় এটি ম্যানোহার প্রকাশিত (২০২২) ৩১৩ পৃষ্ঠার হার্ডকভার বই, যেখানে মোহাম্মদ মোজাহিদুল ইসলাম অর্থনীতি, রাজনীতি ও ইতিহাসের বাতাবরণে মোট সাতটি অধ্যায়ে খাদ্য নিরাপত্তার সার্বিক বিষয় বিশ্লেষণ করেছেন। আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থা রাউটলেজ বইটির যে সংস্করণের তালিকা দিয়েছে, তাতে কপিরাইট বছর ২০২৩ এবং পৃষ্ঠা ৩১৮; সেখানে লেখকের পরিচয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ও সভাপতি। সূচিপত্রে মুখবন্ধ ও ভূমিকার পর আছে 'খাদ্য নিরাপত্তা, রাষ্ট্র ও প্রাতিষ্ঠানিক কার্যকারিতা', 'বাংলাদেশে ক্ষুধার রাজনৈতিক উৎস', 'খাদ্যের লভ্যতা ও প্রবেশগম্যতার সমস্যা', 'বাংলাদেশে সুশাসন, খাদ্যের লভ্যতা ও খাদ্য নিরাপত্তা' এবং 'সুশাসন, রাষ্ট্র ও খাদ্যে প্রবেশগম্যতা' শিরোনামের অধ্যায়, শেষে উপসংহার।

পর্যালোচনা অনুযায়ী, পরিমাণগত ও গুণগত দুই পদ্ধতি অবলম্বনে লেখা বইটির উদ্দেশ্য কিছুটা ব্যতিক্রমধর্মী। উৎপাদন বা পুষ্টি নিয়ে আরেকটি কারিগরি গবেষণা না করে এখানে মূলত রাজনৈতিক অর্থনীতির পদ্ধতি (পলিটিক্যাল ইকোনমি অ্যাপ্রোচ) ব্যবহার করে বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষিত এবং এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের ভূমিকা পর্যালোচনা করা হয়েছে। বায়েসের ভাষায়, মূল প্রশ্ন হলো বিদ্যমান খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতি, সম্পদ এবং সর্বোপরি সুশাসনের প্রকট অভাবের পরিপ্রেক্ষিতে দেশের ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য সরকার কীভাবে সাড়া দেয়, আর সেই সাড়ার সীমাবদ্ধতা কী এবং কেন।

পর্যালোচনা বলছে, লেখক মনে করেন বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তার বহুমাত্রিক দৃষ্টিকোণের সঙ্গে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি জড়িত, এবং খাদ্য নিরাপত্তার নিশ্চায়ক হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বা রাষ্ট্রের সক্ষমতার বিষয়টি অবজ্ঞা করার মতো নয়। রাউটলেজের বিবরণও নিজের ভাষায় একই কথা বলে: বইটি মনে করে প্রচলিত পদ্ধতিগুলো অর্থনৈতিক বা পুষ্টিগত সমস্যার কেবল আংশিক রোগনির্ণয় দেয়; রাজনৈতিক ব্যবস্থা বিশ্লেষণে বইটি 'নিও-প্যাট্রিমোনিয়ালিজম' ধারণা ব্যবহার করে; নীতি প্রণয়ন থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত খাদ্য নিরাপত্তার বাধাগুলো পরীক্ষা করে; এবং বলে, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মূল কারণ সরকারের প্রকৃতির গভীরেই প্রোথিত।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে বইয়ের লেখক শিক্ষকতা করেন এবং পর্যালোচক একসময় উপাচার্য ছিলেন, ঢাকা থেকে প্রায় ৩২ কিলোমিটার দূরে সাভারের কাছে ৬৯৭.৫৬ একর জমির ওপর অবস্থিত। বাংলাপিডিয়া একে বাংলাদেশের প্রথম আবাসিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে উল্লেখ করেছে। ১৯৭০ সালের ২০ আগস্ট এর শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর অধ্যাদেশ জারি হয়, আর শুরুতে অর্থনীতি, ভূগোল, পরিসংখ্যান ও গণিত, এই চারটি অনার্স বিভাগ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির যাত্রা।

সাভারে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো কলা ভবন; এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস পড়ান বইটির লেখক। ছবি: সৈয়দ সাজিদুল ইসলাম / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)
সাভারে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরোনো কলা ভবন; এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস পড়ান বইটির লেখক। ছবি: সৈয়দ সাজিদুল ইসলাম / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)

খাদ্য নিরাপত্তা বলতে কী বোঝায়


বইয়ের কেন্দ্রীয় এই ধারণার একটি দীর্ঘ দাপ্তরিক ইতিহাস আছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ২০০৬ সালের একটি নীতিপত্র জানায়, শব্দটি প্রথম আসে ১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি, যখন ১৯৭৪ সালের বিশ্ব খাদ্য সম্মেলন খাদ্য নিরাপত্তাকে সংজ্ঞায়িত করে জোগানের ভিত্তিতে: সব সময় মৌলিক খাদ্যদ্রব্যের পর্যাপ্ত বৈশ্বিক জোগান এবং এর দামের স্থিতিশীলতা। ১৯৮৩ সালে এফএও জোর দেয় প্রবেশগম্যতার ওপর: সব মানুষ যেন সব সময় প্রয়োজনীয় মৌলিক খাদ্যে শারীরিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রবেশাধিকার পায়। ১৯৮৬ সালে দারিদ্র্য ও ক্ষুধা নিয়ে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদন দীর্ঘস্থায়ী খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা, যা চলমান দারিদ্র্য ও নিম্ন আয়ের সঙ্গে যুক্ত, আর প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অর্থনৈতিক বিপর্যয় বা সংঘাতজনিত সাময়িক খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পার্থক্য টানে।

আজ সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত সংজ্ঞাটি গৃহীত হয় ১৯৯৬ সালের বিশ্ব খাদ্য শীর্ষ সম্মেলনে: খাদ্য নিরাপত্তা তখনই বিদ্যমান, যখন সব মানুষ সব সময় সক্রিয় ও সুস্থ জীবনের জন্য তাদের খাদ্যচাহিদা ও খাদ্যরুচি মেটায় এমন পর্যাপ্ত, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্যে শারীরিক ও অর্থনৈতিক প্রবেশাধিকার পায়। এফএওর নীতিপত্র একে চারটি মাত্রায় ভাগ করেছে:

  • লভ্যতা: দেশীয় উৎপাদন বা আমদানির (খাদ্য সহায়তাসহ) মাধ্যমে উপযুক্ত মানের পর্যাপ্ত পরিমাণ খাদ্যের জোগান;
  • প্রবেশগম্যতা: পুষ্টিকর খাদ্যতালিকার উপযোগী খাদ্য সংগ্রহের জন্য ব্যক্তির পর্যাপ্ত সম্পদ বা 'এনটাইটেলমেন্ট' (অধিকারযোগ্যতা) থাকা;
  • ব্যবহার: পর্যাপ্ত খাদ্য, নিরাপদ পানি, পয়োনিষ্কাশন ও স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে খাদ্যকে কাজে লাগিয়ে পুষ্টিগত সুস্থতায় পৌঁছানো;
  • স্থিতিশীলতা: সব সময় পর্যাপ্ত খাদ্যে প্রবেশাধিকার, যাতে অর্থনৈতিক বা জলবায়ুগত সংকটের মতো আকস্মিক ধাক্কায় কিংবা মৌসুমি খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মতো চক্রাকার ঘটনায় তা হারানোর ঝুঁকি না থাকে।

এর দ্বিতীয় মাত্রাতেই রাজনীতির প্রবেশ। এফএও এনটাইটেলমেন্টকে সংজ্ঞায়িত করেছে এমন সব পণ্যগুচ্ছ হিসেবে, যার ওপর একজন মানুষ তার সমাজের আইনি, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার মধ্যে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারে। ধারণাটি এসেছে অমর্ত্য সেনের ১৯৮১ সালের বই 'পভার্টি অ্যান্ড ফেমিনস: অ্যান এসে অন এনটাইটেলমেন্ট অ্যান্ড ডিপ্রাইভেশন' থেকে; এফএওর নীতিপত্র বলছে, এই বই দেখিয়েছে উৎপাদন, শ্রম, বাণিজ্য ও হস্তান্তরভিত্তিক ব্যক্তিগত অধিকারযোগ্যতা কীভাবে খাদ্যে প্রবেশাধিকার নির্ধারণ করে। নীতিপত্রটি আরও বলে, খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে অনাহার ও ফসলহানির সরাসরি যোগ যত ক্ষীণ হচ্ছে, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতাকে একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক নির্মাণ হিসেবে বিশ্লেষণের ধারা তত জোরালো হয়েছে। বায়েসের বর্ণনায় মোজাহিদুল ইসলামের বইটি এই চিন্তাধারারই অংশ।

বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া খাদ্য নিরাপত্তাকে দুই স্তরে ব্যাখ্যা করে। পারিবারিক খাদ্য নিরাপত্তা নির্ভর করে পরিবারের উপার্জনকারীরা সব সদস্যের জন্য সব সময় পর্যাপ্ত খাদ্য জোগাড় করতে পারেন কি না তার ওপর; জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা নির্ভর করে গোটা জাতির জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য নিশ্চিত করার সরকারি সক্ষমতার ওপর। জ্ঞানকোষটি বলছে, বাংলাদেশে জাতীয় পর্যায়ের খাদ্য নিরাপত্তা দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে সরাসরি প্রভাবিত করে, এবং এটি মোট খাদ্য উৎপাদন, অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ, খাদ্য সহায়তা, আমদানি সক্ষমতা ও নানা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়ের সঙ্গে জড়িত।

বইয়ের বর্ণনায় যে রাষ্ট্র সেবা পৌঁছাতে পারে না


পর্যালোচনা অনুযায়ী, এখান থেকেই বইটি দাবি করে যে বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার শেকড়ে গভীরভাবে প্রোথিত কারণটি হলো স্বয়ং রাষ্ট্রের প্রকৃতি (নেচার অফ বাংলাদেশ স্টেট), এবং তার সঙ্গে সেই রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো, যেগুলো রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যে সংযোগ ঘটায়। এই ব্যাখ্যায় দেশে লাখো মানুষ অভুক্ত থাকে সম্পদের অপ্রতুলতার জন্য নয়, রাষ্ট্রের প্রকৃতির কারণে। লেখক মনে করেন, নিওপ্যাট্রিমোনিয়াল (neopatrimonial) বাংলাদেশ রাষ্ট্রে দুর্বল প্রশাসনিক ক্ষমতা, অকার্যকর প্রতিষ্ঠান এবং সংগতিপূর্ণ চিন্তারীতির অভাবে উন্নয়নমূলক ও অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে সরকারি প্রচেষ্টা বারবার ব্যর্থ হয়।

বায়েস বইয়ের আরেকটি উদ্বেগের কথা তুলে ধরেছেন: সরকারের যতটুকু দক্ষতা আছে, তাও ক্রমান্বয়ে ক্ষয়িষ্ণু, ফলে জনগণের দোরগোড়ায় সেবা হয়ে ওঠে 'সোনার হরিণ'। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, বইয়ের বর্ণনায় এই নিওপ্যাট্রিমোনিয়াল সরকারগুলো টিকে থাকে পৃষ্ঠপোষকতামূলক রাজনীতিতে, যেখানে ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিনিময় সম্পর্ক সরকারের করণীয় নির্ধারণ করে। পর্যালোচনা বলছে, এভাবে দেখলে নিওপ্যাট্রিমোনিয়াল সরকার সুশাসনের, এবং উন্নয়নেরও, সরাসরি বিপরীত বস্তু (অ্যান্টিথিসিস)। যেহেতু এই রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য সমাজ ও রাষ্ট্রের দুর্বল সংযোগ, রাষ্ট্রের দুর্বল ধারণক্ষমতা এবং পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতি, তাই এমন পরিস্থিতিতে খাদ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করার কাজটি দুরূহ হয়ে দাঁড়ায়।

নিওপ্যাট্রিমোনিয়ালিজম রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি পরিভাষা। সাধারণত এর উৎস ধরা হয় সমাজবিজ্ঞানী শমুয়েল এন. আইজেনস্ট্যাটের ১৯৭৩ সালের বই 'ট্র্যাডিশনাল প্যাট্রিমোনিয়ালিজম অ্যান্ড মডার্ন নিওপ্যাট্রিমোনিয়ালিজম'কে। তিনি শব্দটি নিয়েছিলেন ম্যাক্স ভেবারের 'প্যাট্রিমোনিয়ালিজম' থেকে, যা এমন এক শাসনব্যবস্থা বোঝায় যেখানে প্রশাসনিক ও সামরিক কর্মীরা কেবল শাসকের কাছে দায়বদ্ধ। জার্মান ইনস্টিটিউট অফ গ্লোবাল অ্যান্ড এরিয়া স্টাডিজের গেরো এর্ডমান ও উলফ এঙ্গেলের ২০০৬ সালের এক গবেষণাপত্রের ভাষায়, নিওপ্যাট্রিমোনিয়াল ব্যবস্থায় পৈতৃক বা ব্যক্তিনির্ভর শাসন এবং যুক্তিসিদ্ধ আমলাতান্ত্রিক শাসনের উপাদান পাশাপাশি থাকে, কখনো একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ক্রিস্টোফার ক্ল্যাপহ্যাম একে বর্ণনা করেছেন এমন এক সাংগঠনিক রূপ হিসেবে, যেখানে আনুষ্ঠানিকভাবে আইনানুগ-যৌক্তিক ভিত্তিতে গড়া রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় ব্যক্তিনির্ভর সম্পর্ক ছড়িয়ে থাকে, ফলে সরকারি পদ ব্যক্তিগত লাভে ব্যবহৃত হয়।

ধারণাটির সমালোচকও আছেন। ১৯৯৮ সালে অর্থনীতিবিদ থান্ডিকা মকান্দাওয়ারে যুক্তি দেন, যেসব রাষ্ট্রকে নিওপ্যাট্রিমোনিয়াল বলা হয়, তারা নানা ধরনের নীতি নিয়েছে, যার কিছু পুরোপুরি উন্নয়নমুখী; শাসনের একটি ধরন বর্ণনার বাইরে এই অভিধা কোনো রাষ্ট্র কোন নীতি নেবে এবং তাতে কতটা সফল হবে, সে বিষয়ে খুব কমই বলে।

বায়েস নিজে বইয়ের যুক্তি থেকে একটি দৃঢ় সিদ্ধান্তে পৌঁছান। তাঁর মতে, আপাতদৃষ্টে মনে হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে যে বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজটি নেহাত কঠিন; প্রতিশ্রুতিবদ্ধ আমূল সংস্কার ছাড়া, অর্থাৎ তোষণ ও শোষণমূলক রাজনীতি-বেষ্টিত রাষ্ট্রীয় কাঠামো থেকে বেরোতে না পারলে মুক্তি নেই। তাঁর চোখে এর বড় প্রমাণ, স্বাধীনতার ৫০ বছরের বেশি পরও দেশের মানুষের একটা বড় অংশের খাদ্য নিরাপত্তা নেই। প্রবাদের ভাষায় তিনি লেখেন, কুয়োতে পচা ব্যাঙ রেখে পানি সেচে লাভ নেই।

বইয়ের চার পর্যবেক্ষণ এবং খাজনা-খোঁজার মূল্য


বায়েস লিখেছেন, বইটির কিছু পর্যবেক্ষণ হৃদয় কাড়ে, মনে হয় যেন তাঁদেরই মনের কথা। তিনি চারটি পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন:

  • লেখকের মতে, বাংলাদেশে বাজার ব্যবস্থাপনার নামে যা চলে তা নিছক রাজনৈতিক ও লোকদেখানো; আসল কার্যকারণ নিয়ে মাথাব্যথা খুব কম এবং তা রাজনৈতিক লাভ সর্বোচ্চ করায় নিবেদিত, ফলে জননীতি বাজারের দক্ষতা বাড়াতে অক্ষম;
  • সরকারি খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থা, ভূমি সংস্কার, প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধি কিংবা নীতি বাস্তবায়ন, যেটাই হোক, 'আংশিক সংস্কার' ধারণা একটি ফাঁদ পাতে, যার ফলে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে ব্যর্থতা অনিবার্য হয়ে ওঠে;
  • বাংলাদেশ এমনিতেই একটি দুর্বল রাষ্ট্র, তার ওপর নিওপ্যাট্রিমোনিয়াল কাঠামোয় তোষণমূলক রাজনীতি এবং নিম্নমানের আমলাতন্ত্র রাষ্ট্রের সক্ষমতাকে আরও সংকুচিত করে রাখে;
  • রাষ্ট্রের ক্ষয়িষ্ণু সক্ষমতার পাশাপাশি প্রাক-ঔপনিবেশিক প্রথাগুলো সমাজ ও রাষ্ট্রের সংযোগ দুর্বল করে রেখেছে, ফলে সমাজের জন্য নীতি বাস্তবায়ন অনেকটাই অধরা থাকছে।

পর্যালোচনা অনুযায়ী, বইটির বেশ কিছু জায়গা দখল করেছে খাজনা-খোঁজা (রেন্ট সিকিং), দুর্নীতি ও 'অপশাসন', চাঁদাবাজি, বাজারের ব্যর্থতা এবং পরিসংখ্যানগত ত্রুটি নিয়ে বিস্তর তাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক ও প্রায়োগিক আলোচনা। লেখক মনে করেন, এগুলোর দাপুটে উপস্থিতিতে খাদ্যের লভ্যতা ও খাদ্যে প্রবেশগম্যতা দুটিই হুমকির মুখে। উদাহরণ হিসেবে পর্যালোচনা বলছে, সরকারি স্তরে খাজনা-খোঁজা ও দুর্নীতির কারণে সরকারি হস্তক্ষেপ, বিশেষত খাদ্য বিতরণ ও সংগ্রহে, প্রত্যাশিত ইতিবাচক প্রভাব রাখতে পারেনি।

অর্থনীতির ভাষায় খাজনা-খোঁজা বা রেন্ট সিকিং হলো নতুন সম্পদ সৃষ্টি না করে জননীতি বা অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করে নিজের বিদ্যমান সম্পদ বাড়ানো। ১৯৬৭ সালে গর্ডন টালক এবং ১৯৭৪ সালে অ্যান ক্রুগারের গবেষণাপত্রের পর থেকে বিষয়টি অর্থনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।

ইংরেজি দৈনিক দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২৪ সালের ১৫ অক্টোবর বইটির ভিত্তিতে একটি ফিচার প্রকাশ করে, যেখানে বইয়ের যুক্তির আরও বিস্তারিত ছিল। ফিচারটি জানায়, বইটির মতে দেশীয় কৃষি উৎপাদন বাড়াতে ব্যর্থতায় রাষ্ট্রের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট, যা দেশকে আমদানি ও খাদ্য সহায়তার ওপর নির্ভরশীল রাখে। আমদানিনির্ভরতা কেন অনির্ভরযোগ্য, তার চারটি কারণ বইটি দেখিয়েছে: বিশ্ব চালের বাজারের অনিশ্চয়তা; সরকারের ধীর সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং শক্তিশালী আগাম সতর্কতা ব্যবস্থার অভাব, যদিও বন্যা ও খরাই জোগানের ওঠানামার প্রধান কারণ; বেসরকারি খাদ্যশস্য ব্যবসায়ীদের দুর্বল নিয়ন্ত্রণ, যাকে বইটি পৃষ্ঠপোষকতা ও দুর্বল সুশাসনের সঙ্গে যুক্ত করেছে; এবং ট্রেডিং কর্পোরেশন অফ বাংলাদেশ (টিসিবি), যা খাজনা-খোঁজা, দুর্নীতি ও অদক্ষতার কারণে কার্যকরভাবে আমদানি ব্যবস্থাপনা করতে পারে না।

একই ফিচার অনুযায়ী, বইটি সরকারি খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থাকে অত্যন্ত রাজনৈতিকভাবে প্রণোদিত মনে করে, যা এর মানবিক লক্ষ্যকে দুর্বল করে; বাজেট বরাদ্দের প্রবণতা দেখে খাদ্য নিরাপত্তায় রাষ্ট্রের অঙ্গীকার নিয়ে প্রশ্ন তোলে; সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচি ঝুঁকিপূর্ণ দরিদ্রদের চাহিদা পুরোপুরি মেটায় না বলে মনে করে; এবং বলে, খাদ্য নিয়ে সুবিবেচিত সিদ্ধান্তের জন্য প্রয়োজনীয় পরিসংখ্যান সেবা দিতেও রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে।

বইয়ের আলোচ্য সরকারি খাদ্য ব্যবস্থা


বইটি যেসব হাতিয়ার খতিয়ে দেখেছে, সেগুলো পুরোনো। বাংলাপিডিয়া জানায়, খাদ্য মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন ও তদারকিতে চলা জাতীয় খাদ্যনীতি প্রণীত হয় ১৯৮৮ সালে। এর লক্ষ্যের মধ্যে ছিল খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, ফসল তোলার মৌসুমে উৎসাহব্যঞ্জক দামে কৃষকের কাছ থেকে খাদ্যশস্য সংগ্রহ, নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে খাদ্য পৌঁছানো, মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ দাম এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় খাদ্য নিরাপত্তা মজুত বা বাফার স্টক গড়ে তোলা। এই নীতির আওতায় সরকার ফসল তোলার মৌসুমে শস্য কেনে এবং অভাবের মৌসুমে যুক্তিসংগত দামে মানুষের কাছে বিক্রি করে। জ্ঞানকোষটি আরও বলছে, নীতিটি খাদ্যশস্য নিয়ে, মাছ, মাংস, সবজি, ডাল বা তেল নিয়ে নয়, তাই এটি পূর্ণাঙ্গ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না।

দুটি কর্মসূচি এই কাজের বড় অংশ ভোক্তার কাছে পৌঁছে দেয়। খোলাবাজারে বিক্রি (ওএমএস) কর্মসূচিতে খাদ্য অধিদপ্তর কেন্দ্র ও ট্রাক থেকে ভর্তুকি দামে চাল ও আটা বিক্রি করে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের খবর অনুযায়ী, ২০২২ সালের ১ সেপ্টেম্বর দেশজুড়ে ওএমএস আবার শুরু হলে ২ হাজার ৩৬৩টি কেন্দ্রের প্রতিটিতে দিনে দুই টন করে চাল দেওয়ার কথা ছিল; সেখানে টিসিবির ফ্যামিলি কার্ডধারীরা অগ্রাধিকার পেতেন এবং মাসে দুবার ৫ কেজি করে চাল কিনতে পারতেন ৩০ টাকা কেজি দরে, আর কার্ড না থাকলে জাতীয় পরিচয়পত্র দেখিয়ে একই পরিমাণ চাল কেনা যেত; ঢাকায় ৫০টি ট্রাক থেকেও চাল বিক্রির কথা ছিল।

একই দিন আবার শুরু হওয়া খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে ৫০ লাখ পরিবারকে মাসে ৩০ কেজি করে চাল দেওয়া হয় ১৫ টাকা কেজি দরে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে দৈনিক ইত্তেফাক জানায়, এই কর্মসূচিতে মার্চ ও এপ্রিলে আবারও ৫০ লাখ পরিবার ১৫ টাকা কেজি দরে ৩০ কেজি করে চাল পাবে।

খোলাবাজারে বিক্রি (ওএমএস) কর্মসূচিতে নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে কম দামে চাল বিক্রি, ধানমন্ডি, ঢাকা, ৩ জুলাই ২০২১। ছবি: প্রেস ইনফরমেশন ডিপার্টমেন্ট / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)
খোলাবাজারে বিক্রি (ওএমএস) কর্মসূচিতে নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে কম দামে চাল বিক্রি, ধানমন্ডি, ঢাকা, ৩ জুলাই ২০২১। ছবি: প্রেস ইনফরমেশন ডিপার্টমেন্ট / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)

বইটি যে প্রতিষ্ঠানকে আলাদা করে উল্লেখ করেছে, সেই ট্রেডিং কর্পোরেশন অফ বাংলাদেশ (টিসিবি) বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি স্বায়ত্তশাসিত রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, যা ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতির আদেশ নং ৬৮ বলে প্রতিষ্ঠিত হয়। শুরুতে এর কাজ ছিল সরকারের চাহিদামতো পণ্য আমদানি এবং বাজার স্থিতিশীল রাখতে ন্যায্য দামে তা বিতরণ। জ্ঞানকোষটি বলছে, ১৯৭২-৭৩ সালে দেশের মোট আমদানিতে টিসিবির অংশ ছিল ২৪.৮৪ শতাংশ, যা খোলাবাজার নীতির ফলে নেমে আসে মাত্র ০.৩ শতাংশে; প্রতিষ্ঠানটি চিনি, সয়াবিন তেল, ডাল ও ছোলা আমদানি করে ২ হাজার ৮৪৯ জন ডিলারের মাধ্যমে নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে বিক্রি করে।

কাগজে-কলমে নীতির পরিসর বেড়েছে। দ্য ডেইলি স্টারের খবর অনুযায়ী, ২০২১ সালের জুনে খাদ্য মন্ত্রণালয় জাতীয় খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নীতির কর্মপরিকল্পনা উন্মোচন করে, যে নীতি আগের বছর অনুমোদিত হয়েছিল; এটি ২০৩০ সালের মধ্যে ফল অর্জনের দশকব্যাপী পরিকল্পনা। পরিকল্পনায় ছিল পাঁচটি নীতিগত উদ্দেশ্য, ১৭টি কৌশল, ৬৪টি হস্তক্ষেপ-ক্ষেত্র এবং স্বল্প থেকে দীর্ঘমেয়াদি ২৭৫টি অগ্রাধিকারমূলক পদক্ষেপ। মন্ত্রণালয়ের খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিট (এফপিএমইউ) এফএওর কারিগরি সহায়তায় এটি তৈরি করে; সেই সহায়তা আসে ইউএসএআইডি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে চলা 'মিটিং দ্য আন্ডারনিউট্রিশন চ্যালেঞ্জ' (মাচ) প্রকল্পের মাধ্যমে, আর ১৮টি মন্ত্রণালয় ও সংস্থার পরিকল্পনা শাখার কর্মকর্তাদের নিয়ে গড়া পাঁচটি আন্তঃমন্ত্রণালয় দল এটি প্রণয়নে সহায়তা করে। বইয়ের যুক্তি মূলত এ ধরনের পরিকল্পনা আর ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে আসলে যা পৌঁছায়, তার মধ্যকার ফারাক নিয়ে।

বিতর্কের পেছনের পরিসংখ্যান


পর্যালোচনাটি প্রকাশের সময় হাতে থাকা সরকারি পরিসংখ্যান অগ্রগতি এবং বায়েসের বর্ণিত সমস্যার ব্যাপকতা, দুটিই দেখায়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর 'খাদ্য নিরাপত্তা পরিসংখ্যান ২০২৩' প্রকাশ করে। খাদ্য নিয়ে মানুষের অভিজ্ঞতা বিষয়ে আটটি প্রশ্ন ব্যবহার করে ২৯ হাজার ৭৬০টি খানার ওপর চালানো এই জরিপে দেখা যায়, ২১.৯১ শতাংশ খানা মাঝারি বা তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় এবং ০.৮৩ শতাংশ খানা তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ছিল।

ওই জরিপে মাঝারি বা তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার হার সবচেয়ে বেশি ছিল রংপুর বিভাগে, ২৯.৯৮ শতাংশ; এরপর সিলেটে ২৬.৪৮ শতাংশ, ময়মনসিংহে ২৬ শতাংশ এবং রাজশাহীতে ২৫.০১ শতাংশ; সবচেয়ে কম ঢাকা বিভাগে, ১৬.৪০ শতাংশ। গ্রামে এই হার ছিল ২৪.১২ শতাংশ, শহরে ২০.৭৭ শতাংশ এবং সিটি করপোরেশন এলাকায় ১১.৪৫ শতাংশ; সবচেয়ে দরিদ্র খানাগুলোর মধ্যে ৩৬.৮৪ শতাংশ, আর সবচেয়ে ধনী খানাগুলোর মধ্যে ১১.৪৩ শতাংশ।

২০২৩ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত বিবিএসের খানা আয় ও ব্যয় জরিপ ২০২২-এর মূল ফলাফলে জাতীয় দারিদ্র্যের হার দাঁড়ায় ১৮.৭ শতাংশে, যা ২০১৬ সালে ছিল ২৪.৩ শতাংশ; অতিদারিদ্র্য দাঁড়ায় ৫.৬ শতাংশে, যা ২০১৬ সালে ছিল ১২.৯ শতাংশ। গ্রামে দারিদ্র্যের হার ছিল ২০.৫ শতাংশ, শহরে ১৪.৭ শতাংশ। একই জরিপে আয়ের গিনি সহগ ছিল ২০২২ সালে ০.৪৯৯, যা ২০১৬ সালে ছিল ০.৪৮২ এবং ২০১০ সালে ০.৪৫৮।

কনসার্ন ওয়ার্ল্ডওয়াইড ও ভেল্টহুঙ্গারহিলফের ২০২৪ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচক ২০২৪-এ বাংলাদেশের স্কোর ছিল ১৯.৪, ১২৭টি দেশের মধ্যে অবস্থান ৮৪তম, ক্ষুধার মাত্রা 'মাঝারি'। সূচকের নির্দেশক অনুযায়ী জনসংখ্যার ১১.৯ শতাংশ অপুষ্টিতে ভুগছিল, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ২৩.৬ শতাংশ খর্বকায় এবং ১১.০ শতাংশ কৃশকায় ছিল, আর শিশুমৃত্যুর হার ছিল ২.৯ শতাংশ। দেশটির স্কোর ২০০০ সালে ছিল ৩৩.৮, ২০০৮ সালে ৩০.৬ এবং ২০১৬ সালে ২৪.৭।

বাজারের দিক থেকেও চিত্রটি একই। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) ২০২৫ সালের ২৭ আগস্ট প্রকাশিত গ্রেইন অ্যান্ড ফিড আপডেট জানায়, দেশে চালের দাম সর্বকালের সর্বোচ্চে পৌঁছেছে; টিসিবির বাজারদরের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনটি বলে, ২০২৫ সালের জুলাইয়ে মোটা চালের গড় খুচরা দাম ছিল কেজিপ্রতি ৫৭.৫ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ১২.৩ শতাংশ বেশি। প্রতিবেদন অনুযায়ী এই দাম বাড়ার প্রধান কারণ ধান উৎপাদন ও চাল ছাঁটাইয়ের বাড়তি খরচ, সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি এবং বহু বাজার-অংশীদারে ভরা সরবরাহ শৃঙ্খলের অদক্ষতা। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, জুলাইয়ের মাঝামাঝি সরকার সরকারি গুদামের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্রে ৪ লাখ টন চাল কেনার পরিকল্পনা ঘোষণা করে এবং ১০ আগস্ট খাদ্য মন্ত্রণালয় ২৪২টি প্রতিষ্ঠানকে ৫ লাখ টন চাল আমদানির অনুমতি দেয়। দেশের প্রধান ধান বোরোর উৎপাদন প্রতিবেদনটি ২ কোটি ৫ লাখ টন বলে অনুমান করে।

বৈশাখ মাসে ঝড়ের আগে বোরো ধান ঘরে তুলছেন গ্রামবাংলার কৃষকেরা। ছবি: জাহিদ তুষার / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)
বৈশাখ মাসে ঝড়ের আগে বোরো ধান ঘরে তুলছেন গ্রামবাংলার কৃষকেরা। ছবি: জাহিদ তুষার / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)

বাংলাপিডিয়া বাংলাদেশে পারিবারিক খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠী হিসেবে ভূমিহীন কৃষক, দিনমজুর, নিঃস্ব নারীপ্রধান পরিবার এবং চর ও দ্বীপের মতো দুর্যোগপ্রবণ এলাকার মানুষকে চিহ্নিত করেছে। জ্ঞানকোষটি অক্টোবর-নভেম্বরে খাদ্য ঘাটতি ও উচ্চমূল্যের একটি মৌসুমি অভাবকালের কথাও বলেছে, এবং কর্মসংস্থান ও ক্রয়ক্ষমতা হারানোকে সাময়িক খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার কারণগুলোর মধ্যে উল্লেখ করেছে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে ক্ষুধা এক রাজনৈতিক প্রশ্ন


ক্ষুধার রাজনৈতিক শেকড় আছে, এই ধারণা এ অঞ্চলে নতুন নয়। বাংলাপিডিয়ার দুর্ভিক্ষ ভুক্তি বলছে, এখন এটা স্বীকৃত যে দুর্ভিক্ষ মূলত 'এনটাইটেলমেন্ট ব্যর্থতা' থেকে জন্ম নেয়। সেখানে অমর্ত্য সেনের বক্তব্য উদ্ধৃত হয়েছে যে খাদ্যে প্রবেশাধিকার কেবল খাদ্যের জোগানের ওপর নির্ভর করে না, বরং পরিবার ও সামাজিক গোষ্ঠীর খাদ্যের ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠার সক্ষমতাকে প্রভাবিত করে এমন নানা বিষয়ের ওপর নির্ভর করে; মাথাপিছু খাদ্য উৎপাদন ও লভ্যতা না কমলেও দুর্ভিক্ষ হতে পারে। পরিবারের অধিকারযোগ্যতা নির্ধারণকারী বাজারবহির্ভূত উপাদানের মধ্যে জ্ঞানকোষটি সামাজিক-রাজনৈতিক মর্যাদা, রাষ্ট্রের ভূমিকা, আইনব্যবস্থা ও গণমাধ্যমের ভূমিকার কথা বলেছে।

১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ নিয়ে জ্ঞানকোষটির বিবরণ সংযোগটি স্পষ্ট করে। সেখানে বলা হয়েছে, সে বছর খাদ্য ঘাটতিতে পড়া অন্য দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের সংকটের শেকড় ছিল আংশিকভাবে সমাজের ঐতিহাসিক বিবর্তনে, আংশিকভাবে তীব্র বন্যার মুখে খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থার দুর্বল ব্যবস্থাপনায়। একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ১৯৭১ সালের যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি, দুর্বল প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা, আন্তর্জাতিক মূল্যস্ফীতি এবং বৈশ্বিক খাদ্য, সার ও তেল সংকট, বিদ্যমান সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্যের সঙ্গে মিলে দুর্ভিক্ষে রূপ নেয়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় রংপুর, ময়মনসিংহ ও সিলেট জেলা, যেগুলো ১৯৪৩ সালের মহাদুর্ভিক্ষেও মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হয়েছিল; দুর্ভিক্ষের প্রকোপ সবচেয়ে তীব্র ছিল জুলাই থেকে অক্টোবর। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ২০২৪ সালের ফিচারটিও বইয়ের যুক্তির পটভূমি হিসেবে এই দুর্ভিক্ষের কথা স্মরণ করেছে।

পর্যালোচকের মূল্যায়ন


বায়েস লেখাটি শেষ করেন জোরালো সুপারিশ দিয়ে। তাঁর মতে, মোহাম্মদ মোজাহিদুল ইসলামের বইটি নীতিনির্ধারক তো বটেই, সমাজবিজ্ঞানীদের জন্যও আশু পাঠ্য, আর খাদ্য সংকট নিয়ে চলমান আলোচনায় এর অবদান অপরিসীম। তিনি লেখেন, বইটিতে আছে খাদ্য নিরাপত্তার রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের পর্যালোচনা, এবং সম্ভবত খাদ্য নিরাপত্তা বিধানে সরকারি অবদানের ওপর বিশ্লেষণধর্মী পর্যালোচনার এটিই প্রথম প্রয়াস। তাঁর মূল্যায়নে বইটি শুধু কারিগরি বা অর্থনীতির লেন্সে লেখা হয়নি, লেখা হয়েছে বহুশাস্ত্রীয় (মাল্টিডিসিপ্লিনারি) দৃষ্টিকোণ থেকে।

তাঁর দুটি ছোট আপত্তিও ছিল। বইয়ের উপশিরোনাম, 'দ্য পলিটিক্স অফ ফুড সিকিউরিটি ইন বাংলাদেশ', শিরোনাম হলে আরও আকর্ষণীয় হতে পারত বলে তাঁর ধারণা; আর দু-একটি অধ্যায় আরেকটু সংক্ষিপ্ত হলে পাঠক স্বস্তি পেতেন। উঁচু মানের এই বইয়ের একটি বাংলা সংস্করণের আশা জানিয়ে তিনি লেখাটি শেষ করেন।

ছবি: প্রেস ইনফরমেশন ডিপার্টমেন্ট / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, রাউটলেজ, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, এফএও, বাংলাপিডিয়া, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বাসসের মাধ্যমে), প্রথম আলো, ঢাকা ট্রিবিউন, দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ (দ্য ডেইলি স্টারের মাধ্যমে), দ্য ডেইলি স্টার, দৈনিক ইত্তেফাক, উইকিপিডিয়া

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

এগ্রোবিজ

সম্পর্কিত খবর

ফসল

ইংল্যান্ডে যবের ফলন ১৪ বছরে সর্বনিম্ন, গম সামান্য বেশি

যুক্তরাজ্যের কৃষি মন্ত্রণালয় ডেফরার প্রাথমিক হিসাবে ইংল্যান্ডে যব উৎপাদন ১১ শতাংশ কমে ৩৭ লাখ টন হয়েছে, গম ০ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ১ কোটি ৮ লাখ টন; গমের তুলনায় পশুখাদ্যের যব বিক্রি হচ্ছে অনেক কম দামে।

Farmers Weekly১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
এগ্রোটেক

নিজস্ব কারখানা ছেড়ে চুক্তিভিত্তিক ও যৌথ কারখানায় ঝুঁকছে উদ্ভিজ্জ মাংস

চাহিদা অনিশ্চিত থাকায় উদ্ভিজ্জ মাংসের ব্র্যান্ডগুলো নিজস্ব কারখানার বদলে চুক্তিভিত্তিক উৎপাদন, যৌথ অবকাঠামো ও মাংস প্রক্রিয়াকরণের পুরোনো যন্ত্রপাতির দিকে ঝুঁকছে বলে জানিয়েছেন শিল্পসংশ্লিষ্টরা।

FoodNavigator১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
এগ্রোবিজ

সারের দাম দেখার প্ল্যাটফর্ম ক্লিয়ারকস্টে বিনিয়োগ, সালফার সংকটে কমছে ফসফরাস

কৃষকদের সারের দাম ও চালান দেখার এবং সরবরাহ চুক্তির সুযোগ দেওয়া কানাডার স্টার্টআপ ক্লিয়ারকস্ট সিরিজ এ তহবিল পেয়েছে; ২০২৭ সালের শুরুতে উত্তর আমেরিকাজুড়ে নতুন প্ল্যাটফর্ম চালু করবে তারা।

AgNavigator১৬ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)