সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৮°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৬২%বাতাস ৫ কিমি/ঘ

শীতে গোয়ালঘরের যত্ন: উষ্ণ, শুকনো ও মশা-মাছিমুক্ত রাখার উপায়

উষ্ণ, শুকনো, হিমেল হাওয়ামুক্ত আর মশা-মাছি কম এমন গোয়ালঘর শীতে গরুকে সুস্থ রাখে। প্রাণিসম্পদ পরামর্শ ও গবেষণা কী বলে, আর মশা তাড়াতে ধোঁয়া দিলে আগুনের ঝুঁকি কতটা, জেনে নিন।

শীতে গোয়ালঘরের যত্ন: উষ্ণ, শুকনো ও মশা-মাছিমুক্ত রাখার উপায়
লাইভস্টক

২০২৩ সালের জানুয়ারির শুরুতে কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটে যখন শীত আর ঘন কুয়াশা জেঁকে বসেছিল, তখন লালমনিরহাট সদর উপজেলার ধরলা নদীর তীরের চর কুলাঘাট গ্রামের ৬০ বছর বয়সী এক কৃষক দ্য ডেইলি স্টার বাংলাকে বলেছিলেন, ঠান্ডা ও কুয়াশার কারণে তিনি ঠিকমতো পশুর খাবার জোগাতে পারছেন না। তিন মাস ধরে তাঁর ছয়টি গরুর মধ্যে তিনটি থেকে দুধ পাচ্ছিলেন, আর দৈনিক দুধ প্রায় ৯ লিটার থেকে নেমে সাড়ে ৫ থেকে ৬ লিটারে দাঁড়িয়েছিল। কুড়িগ্রাম জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (অতিরিক্ত) ডা. ইউনুস আলী তখন বলেছিলেন, গবাদি পশুর গায়ে চটের বস্তা জড়িয়ে দিতে হবে, আর গোয়ালঘর পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখলে পশু ঠান্ডার প্রকোপ থেকে রক্ষা পাবে।

তবে শীতের গোয়ালঘরের সমস্যা শুধু ঠান্ডা নয়। ২০২৪ সালের মার্চে চট্টগ্রামের বোয়ালখালীতে এক রাতে বাছুর জন্মের পর মশা তাড়াতে গোয়ালে মশাল জ্বালানো হয়েছিল; সেখান থেকে আগুন ছড়িয়ে পাশাপাশি ছয়টি গোয়ালঘর পুড়ে যায়। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, দুটি গরু মারা গেছে, দগ্ধ হয়েছে আরও ১৭টি।

দ্য এগ্রো নিউজে ২০২৫ সালের ১ নভেম্বর, শীতের শুরুতে, প্রথম প্রকাশিত এই নির্দেশিকায় জানানো হচ্ছে গোয়ালঘর কীভাবে উষ্ণ, শুকনো এবং যতটা সম্ভব মশা-মাছিমুক্ত রাখা যায়: তাজা বাতাস বন্ধ না করে হিমেল হাওয়া আটকানো, বিছানা শুকনো রাখা, কামড়ানো পোকা কেন ক্ষতিকর, সেগুলোর প্রজননস্থল কীভাবে সরাতে হয়, আর মূল লেখায় বর্ণিত গোবরের ধোঁয়ার পদ্ধতি সম্পর্কে গবেষণা কী বলে ও তাতে আগুনের ঝুঁকি কতটা।

শীতে গোয়ালঘর কেন গুরুত্বপূর্ণ


প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের (ডিএলএস) প্রকাশনা ‘লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্লান্স ২০২৩-২৪’ অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ সালে দেশে গরু ছিল ২৫০.১৩ লাখ এবং মহিষ ১৫.২৪ লাখ। সে বছর দুধ উৎপাদন হয়েছিল ১৫০.৪৪ লাখ মেট্রিক টন, যেখানে চাহিদা ছিল ১৫৮.৭৮ লাখ মেট্রিক টন। দ্য ডেইলি স্টার বাংলা ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে জানায়, শুধু লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামেই প্রায় তিন লাখ পরিবার প্রায় ২৭ লাখ গরু, ছাগল ও মহিষ পালন করে।

সরকারি পরামর্শেও শীতের যত্নের কেন্দ্রে রয়েছে গোয়ালঘর। ২০১৮-১৯ সালের শীতে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে মিলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কৃষি আবহাওয়া তথ্যসেবা (বামিস) মৌলভীবাজার, পঞ্চগড়, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও চুয়াডাঙ্গার খামারিদের পরামর্শ দেয়: রাতে পশুকে গোয়ালের নিচে রাখতে হবে, গোয়ালের খোলা অংশ চটের বস্তা দিয়ে ঢেকে দিতে হবে, আর নবজাতক বাছুর ও গোয়ালঘর পরিষ্কার ও শুকনো রাখতে হবে। ২০২০ সালের ২ জানুয়ারির বামিস বুলেটিনেও বলা হয়, রাতের তাপমাত্রা কমে আসায় পশুকে চালার নিচে রাখতে এবং শুকনো বিছানার ব্যবস্থা করতে হবে।

শীতেই মশা বাড়তে শুরু করে। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে দ্য ডেইলি স্টার জানায়, ঢাকায় কীটতত্ত্ববিদেরা নভেম্বরকে ‘কিউলেক্স মৌসুমের’ শুরু হিসেবে চিহ্নিত করেন; কীটতত্ত্ববিদ ড. মনজুর চৌধুরী বলেছিলেন, কালবৈশাখী না আসা পর্যন্ত মশার ঘনত্ব বাড়তেই থাকবে। প্রতিবেদনটি ঢাকা শহর নিয়ে, তবে কিউলেক্স মশা জন্মায় যেখানেই নোংরা, বদ্ধ পানি জমে।

বগুড়ার পল্লী উন্নয়ন একাডেমির (আরডিএ) ডেইরি খামারে বকনা বাছুরের শেড। ছবি: Ibrahim Husain Meraj / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
বগুড়ার পল্লী উন্নয়ন একাডেমির (আরডিএ) ডেইরি খামারে বকনা বাছুরের শেড। ছবি: Ibrahim Husain Meraj / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

তাজা বাতাস বন্ধ না করে হিমেল হাওয়া আটকানো


সবচেয়ে সহজ কাজটি বামিসের পরামর্শেই আছে: গোয়ালের খোলা অংশ চটের বস্তা দিয়ে ঢেকে দেওয়া, যাতে ঠান্ডা বাতাস সরাসরি পশুর গায়ে না লাগে। কুড়িগ্রামের কর্মকর্তা এর সঙ্গে যোগ করেছিলেন গোয়ালঘর পলিথিনে ঢাকা আর পশুর গায়ে চটের বস্তা জড়ানোর কথা।

ঢাকা গোয়ালেও বাতাস চলাচল দরকার। আয়ারল্যান্ডের কৃষি ও খাদ্য উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ টিগ্যাস্ক এবং ইউনিভার্সিটি কলেজ ডাবলিনের গবেষকেরা বিদ্যমান গবেষণা পর্যালোচনা করেন; টিগ্যাস্ক তা প্রকাশ করে ২০২৪ সালের ১৮ মার্চ। তাতে দেখা যায়, বাছুরের ঘরে শ্বাসতন্ত্রের রোগের ঝুঁকি বাড়ানোর সবচেয়ে জোরালো প্রমাণ রয়েছে ধুলা, অ্যামোনিয়া, হিমেল হাওয়া এবং বিছানার দুর্বল ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে।

গবেষকেরা হিমেল হাওয়া বা ড্রাফট বলতে বুঝিয়েছেন বাছুরের উচ্চতায় সেকেন্ডে ০.৫ থেকে ০.৮ মিটারের বেশি গতির বাতাস; অতিরিক্ত খোলা বা বাতাসের মুখে থাকা ঘরে এমন হাওয়া বেশি লাগে। আবার তাঁরা লিখেছেন, বাতাস চলাচল খুবই গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কথা, কারণ এতে বাতাসে অ্যামোনিয়া, ধুলা ও জীবাণু জমে উঠতে পারে না।

অ্যামোনিয়া একটি ক্ষতিকর গ্যাস; নোংরা বিছানায় প্রস্রাব ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে ভেঙে এটি তৈরি হয়। দীর্ঘ সময় বেশি মাত্রার অ্যামোনিয়ার সংস্পর্শে থাকা বাছুরের ফুসফুসে ক্ষতের ঝুঁকি বেশি পাওয়া গেছে, আর ভালো নিষ্কাশন ও নিয়মিত নোংরা বিছানা সরালে তা এড়ানো যায়। পর্যালোচনায় আরও বলা হয়, বাতাস চলাচল কম হলে বা খাবার ধুলাময় হলে ঘরে ধুলা জমে, আর বেশি ধুলার সঙ্গেও ফুসফুসের ক্ষতের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তাই দুই পরামর্শ একসঙ্গে মানতে হবে: পশু যেখানে দাঁড়ায় ও শোয়, সেখানে খোলা অংশ ঢেকে ঠান্ডা বাতাস আটকাতে হবে, কিন্তু গোয়াল এমনভাবে বন্ধ করা যাবে না যে অ্যামোনিয়া ও ধুলা জমে।

শুকনো মেঝে ও শুকনো বিছানা


বামিসের দুই পরামর্শেই পরিষ্কার, শুকনো গোয়াল আর শুকনো বিছানার কথা আছে। টিগ্যাস্কের পর্যালোচনা এর কারণ ব্যাখ্যা করে। বাছুরের নিচে পুরু, ভেজা বিছানা থাকলে শ্বাসতন্ত্রের রোগ বেশি দেখা গেছে, সম্ভবত বেশি অ্যামোনিয়া তৈরি হওয়ায়। আর যেসব বাছুরকে এত পুরু বিছানা দেওয়া হয়েছিল যে শুয়ে থাকলে পা দেখা যায় না, তারা সুরক্ষিত ছিল, সম্ভবত বিছানা ঠান্ডা থেকে আড়াল দেয় বলে।

শুকনো মেঝে মাছির বিরুদ্ধেও কাজ করে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউইয়র্ক স্টেট ইন্টিগ্রেটেড পেস্ট ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রামের ২০০৯ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত একটি তথ্যপত্র বলছে, ঘরের মাছি ডিম পাড়ে পশুর মল, গোবরের স্তূপ, পড়ে থাকা খাবার, বিছানা ও অন্যান্য পচনশীল জৈব বস্তুতে; আর স্টেবল ফ্লাই বা গোয়ালের কামড়ানো মাছি জন্মায় ভেজা খড় ও গোবর, পড়ে থাকা খাবার এবং পচা লতাপাতায়। মাছির বাচ্চাকে এসব বস্তুর মধ্যে ১০ থেকে ২১ দিন থাকতে হয়, তাই প্রতি সপ্তাহে এগুলো সরালে মাছির জীবনচক্র ভেঙে যায়। গোয়ালঘরের জন্য তথ্যপত্রের পরামর্শগুলো হলো:

  • পশুর নিচে জমা গোবর ও বিছানার স্তর অন্তত সপ্তাহে একবার পরিষ্কার করতে হবে।
  • যেখানে গরু বেঁধে রাখা হয়, সেখানে পেছনের নালা প্রতিদিন পরিষ্কার করতে হবে।
  • চাড়িতে পড়ে থাকা ভেজা খাবার এবং সাইলোর আশপাশে জমা খাবার অন্তত সপ্তাহে একবার সরাতে হবে।
  • গোয়াল থেকে বের করা গোবর ও বিছানা যতটা সম্ভব পাতলা করে ছড়াতে হবে, যাতে দ্রুত শুকায়, আর যে নিষ্কাশনের ত্রুটিতে গোবর কাদার সঙ্গে মেশে, তা ঠিক করতে হবে।

মশা-মাছি গরুর জন্য কেন ক্ষতিকর


কামড়ানো পোকা শুধু বিরক্তির কারণ নয়। গরু ও মহিষের ভাইরাসজনিত রোগ লাম্পি স্কিন ডিজিজ (এলএসডি) ২০১৯ সালে বাংলাদেশে আসে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে বিশ্ব প্রাণিস্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউওএএইচ) এক আঞ্চলিক কর্মশালায় বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ভেটেরিনারি হাসপাতালের পরিচালক জানান, ২০১৯ সালের মাঝামাঝি দেশে প্রথম এলএসডি শনাক্ত হয়, ২০১৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ডব্লিউওএএইচকে তা জানানো হয় এবং পরে সারা দেশে রোগটি নিশ্চিত হয়। তিনি বলেন, বর্ষা-গ্রীষ্ম ও শরতে রক্তচোষা পোকা যখন বিপুল সংখ্যায় বাড়ে, তখনই রোগটি বেশি দেখা দেয়; এলএসডি নিয়ন্ত্রণের প্রধান বাধাগুলোর মধ্যে তিনি বাহক পোকা দমনের কথাও উল্লেখ করেন।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) ২০১৭ সালে ভেটেরিনারিয়ানদের জন্য প্রকাশিত এলএসডি মাঠ নির্দেশিকায় বলেছে, এ রোগে চামড়ায় গুটি ওঠে এবং এটি মূলত মশা, অন্যান্য রক্তচোষা পোকা ও মাছির মাধ্যমে ছড়ায়; স্টেবল ফ্লাই ও এডিস ইজিপ্টাই মশা ভাইরাসটি ছড়াতে পারে বলে প্রমাণ মিলেছে। এলএসডি দুধের উৎপাদন অনেক কমিয়ে দেয়, ষাঁড়কে বন্ধ্যা করতে পারে, গাভির প্রজননে সমস্যা ঘটায়, চামড়ার ক্ষতি করে এবং পরবর্তী সংক্রমণে মৃত্যুও ঘটাতে পারে। ২০১৯ সালে ভাইরাস রিসার্চ সাময়িকীতে স্প্রিগিন ও সহকর্মীদের পর্যালোচনায় বলা হয়, সাধারণ ঘরের মাছিরও এতে ভূমিকা থাকতে পারে।

রক্ত পান করছে একটি স্ত্রী কিউলেক্স কুইনকুইফ্যাসিয়েটাস মশা; ছবিটি যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) জন্য তোলা। ছবি: CDC / James Gathany / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)
রক্ত পান করছে একটি স্ত্রী কিউলেক্স কুইনকুইফ্যাসিয়েটাস মশা; ছবিটি যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) জন্য তোলা। ছবি: CDC / James Gathany / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)

মাছিরও নিজস্ব ক্ষতি আছে। কর্নেলের তথ্যপত্র অনুযায়ী, স্টেবল ফ্লাই দেখতে ঘরের মাছির মতো হলেও এর মুখে বিঁধিয়ে রক্ত চোষার অঙ্গ থাকে; এটি দিনে কয়েকবার রক্ত খায়, বেশির ভাগ সময় পা ও পেটে কামড়ায়। গরু ঘন ঘন পা ঠুকলে বুঝতে হবে এ মাছি আছে। আক্রান্ত পালে উৎপাদন কমে যায়, কারণ কামড় যন্ত্রণাদায়ক এবং মাছি তাড়াতে গিয়ে পশু ক্লান্ত হয়ে পড়ে।

স্টেবল ফ্লাই ডিম থেকে পূর্ণাঙ্গ হতে প্রায় ২১ দিন লাগে, আর একটি স্ত্রী মাছি ২০০ থেকে ৪০০টি ডিম পাড়ে। গ্রীষ্মের অনুকূল আবহাওয়ায় ঘরের মাছির জীবনচক্র ১০ দিনেই শেষ হতে পারে। ঘরের মাছি কামড়ায় না, কিন্তু রোগজীবাণু ও পরজীবী বহন করতে পারে, আর মাছির উপদ্রব খুব বেশি হলে দুধে ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বাড়তে পারে। উষ্ণ মাসগুলোতে গরু এসব মাছিতে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পায়; তাই আবহাওয়া বদলের আগেই প্রজননস্থল পরিষ্কার করে রাখা ভালো।

স্টেবল ফ্লাই (স্টোমক্সিস ক্যালসিট্রান্স), রক্তচোষা এই মাছি ভেজা খড় ও গোবরে জন্মায়। ছবি: Pavel Krok ও Fir0002 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
স্টেবল ফ্লাই (স্টোমক্সিস ক্যালসিট্রান্স), রক্তচোষা এই মাছি ভেজা খড় ও গোবরে জন্মায়। ছবি: Pavel Krok ও Fir0002 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

প্রজননস্থল সরানো ও পোকা দূরে রাখা


এফএওর নির্দেশিকা বলছে, বদ্ধ পানি, তরল গোবর ও গোবরের মতো প্রজননস্থল কমানো এবং খামারের নিষ্কাশন ভালো করা পশুর আশপাশে পোকা কমানোর টেকসই, সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব উপায়। বাংলাদেশের একটি গোয়ালঘরের আশপাশে এর মানে হলো নালা, গর্ত ও পাত্রে জমে থাকা পানি, ভেজা গোবর, ভিজে যাওয়া বিছানা আর পচা খাবার সরিয়ে ফেলা।

মশারি ও পোকা তাড়ানোর ওষুধেরও সীমা আছে। নির্দেশিকা অনুযায়ী, গরু সব সময় ঘরে রাখা হলে মশারির কথা ভাবা যায়; গায়ে লাগানো রিপেলেন্ট অল্প সময়ের জন্য পোকা ও আঁটালি থেকে সুরক্ষা দেয়; আর পোকা দমন এলএসডির বিস্তার কমাতে পারে, পুরোপুরি ঠেকাতে পারে না। এফএও টিকাকেই সবচেয়ে ভালো সুরক্ষা বলেছে; ডব্লিউওএএইচের কর্মশালার উপস্থাপনা অনুযায়ী বাংলাদেশে গরুকে প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠানে (এলআরআই) তৈরি গোট পক্স টিকা দেওয়া হয়।

মাছির বিরুদ্ধে কর্নেলের তথ্যপত্র অল্প থেকে মাঝারি উপদ্রবে আঠালো ফিতা ব্যবহারের পরামর্শ দেয়, আর গোয়ালে স্বাভাবিকভাবে থাকা যেসব গুবরে পোকা, মাইট ও ক্ষুদ্র বোলতা মাছির ডিম, লার্ভা ও পিউপা মেরে ফেলে, সেগুলো রক্ষা করতে বলে। গোবরে কীটনাশক ছিটালে এই উপকারী পোকারাও মরে, তাই তথ্যপত্রটি রাসায়নিককে শেষ উপায় হিসেবে দেখে এবং লেবেলের নির্দেশ কঠোরভাবে মানতে বলে। এই নির্দেশিকায় কোনো কীটনাশক বা রিপেলেন্টের মাত্রা দেওয়া হয়নি: কোন পণ্য দরকার কি না, আর কতটুকু, তা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বা নিবন্ধিত ভেটেরিনারি চিকিৎসকের কাছ থেকে জেনে নিতে হবে।

মূল লেখায় বর্ণিত গোবরের ধোঁয়ার পদ্ধতি


মূল লেখায় রাতভর গোয়াল উষ্ণ ও মশামুক্ত রাখার একটি প্রচলিত উপায় দেওয়া হয়েছিল: ধীরে জ্বলা ঘুঁটে, যা এই উপকরণগুলো দিয়ে তৈরি:

  • গোবর
  • নিমপাতার গুঁড়া
  • চায়ের দোকানের ফেলে দেওয়া চা-পাতা
  • ইউক্যালিপটাস পাতার গুঁড়া
  • কাঠের গুঁড়া

মিশ্রণটি দিয়ে ছোট ছোট ঘুঁটে বা ডু বানিয়ে রোদে শুকাতে হতো। শুকনো ঘুঁটে মাটির পাত্রে সারি করে সাজিয়ে খড় দিয়ে আগুন ধরানো হতো; আগুন ধরলে ওপরের ঘুঁটেগুলোতে হালকা পানি ছিটিয়ে দেওয়া হতো, যাতে সেগুলো তুষের আগুনের মতো সারা রাত ধিকিধিকি জ্বলে ধোঁয়া দেয়। মূল লেখায় চারটি সতর্কতাও ছিল: গবাদি পশুকে আগুন থেকে নিরাপদ দূরত্বে রাখা, আগুন যেন কোথাও ছড়িয়ে না পড়ে তা খেয়াল রাখা, রাতে মাঝে মাঝে দেখা, আর ছিদ্রযুক্ত ঢাকনাওয়ালা ধাতব পাত্রে ঘুঁটে জ্বালানো।

গবেষণায় দেখা গেছে, ধোঁয়া কিছু কামড়ানো পোকাকে দূরে রাখতে পারে। ২০১১ সালে মেডিকেল অ্যান্ড ভেটেরিনারি এন্টোমোলজি সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব গ্রিনিচের টর, মাংউইরো ও হল জিম্বাবুয়েতে আফ্রিকার রক্তচোষা মাছি সেৎসি থেকে গরু রক্ষার প্রচলিত পদ্ধতিগুলো যাচাই করেন। মোপানে কাঠ বা শুকনো গোবর পোড়ানোর ধোঁয়ায় ফাঁদে ধরা পড়া মাছি প্রায় ৫০ থেকে ৯০ শতাংশ কমে যায়; জীবিত গরুর সঙ্গে পরীক্ষায় ধোঁয়া আকৃষ্ট মাছির সংখ্যা প্রায় ৭০ শতাংশ কমায়, আর ১.৫ মিটার উঁচু কাঠ বা জালের টানা বেড়ার ঘের মাছির রক্ত খাওয়া প্রায় ৮০ শতাংশ কমায়। তবে সেৎসি মাছি, মশা নয়, আর পরীক্ষাগুলো হয়েছিল খোলা জায়গায়, বদ্ধ গোয়ালে নয়।

মশার ক্ষেত্রে, কেনিয়ার ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার অব ইনসেক্ট ফিজিওলজি অ্যান্ড ইকোলজির গবেষকেরা ২০০২ সালে জানান, পরীক্ষামূলক কুঁড়েঘরে লেবু-গন্ধী ইউক্যালিপটাসের (করিম্বিয়া সিট্রিওডোরা) পাতা সরাসরি পোড়ালে ম্যালেরিয়ার বাহক মশার ৫১.৩ শতাংশ দূরে থাকে। এটি ইউক্যালিপটাসের একটি প্রজাতি, এক ধরনের মশার ওপর পরীক্ষা, আর প্রায় অর্ধেক মশা তবুও সরে যায়নি।

২০১১ সালে ম্যালেরিয়া জার্নালে লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের মাইয়া ও মুরের পর্যালোচনায় বলা হয়, মশা তাড়াতে শত শত বছর ধরে গাছপালা পোড়ানো হচ্ছে, তবে নিমের কার্যকারিতার প্রমাণ মিশ্র; আর গাছ থেকে তৈরি মশা তাড়ানোর উপাদানকে সাধারণত ‘নিরাপদ’ ভাবা হয়, যা কখনো কখনো ভুল ধারণা। এই নির্দেশিকার জন্য এমন কোনো গবেষণা পাওয়া যায়নি যা ফেলে দেওয়া চা-পাতা বা কাঠের গুঁড়ার প্রভাব, কিংবা ধিকিধিকি জ্বলা ঘুঁটে গোয়াল কতটা গরম করে তা মেপেছে; কোনো প্রাণিসম্পদ কর্তৃপক্ষ উপকরণের পরিমাণ না দেওয়ায় মূল লেখার পরিমাণগুলো বাদ দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশে শুকাতে দেওয়া গোবরের ঘুঁটে, যা সাধারণত জ্বালানি হিসেবে পোড়ানো হয়। ছবি: Melanie Ko / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)
বাংলাদেশে শুকাতে দেওয়া গোবরের ঘুঁটে, যা সাধারণত জ্বালানি হিসেবে পোড়ানো হয়। ছবি: Melanie Ko / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)

আগুন ও ধোঁয়া: প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা যে ঝুঁকির কথা বলেন


খড়, চটের বস্তা আর পলিথিনে ভরা গোয়ালে যেকোনো আগুন থেকে অগ্নিকাণ্ড ঘটতে পারে। ২০২৪ সালের মার্চের বোয়ালখালীর ঘটনায় উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. সেতু ভূষণ দাশ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা খামারিদের সবসময় সচেতন করি গোয়ালে যেন আগুন বা দাহ্য কোনো কিছু না থাকে। গতকাল এখানে একটি বাছুরের জন্ম হয়। ওই গোয়ালে মশা তাড়াতে মশাল জ্বালানো হয়েছিল। সেখান থেকেই আগুনের সূত্রপাত।” তিনি জানান, দগ্ধ ১৭টি গরুর বেশির ভাগের শ্বাসনালী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আর গর্ভবতী তিনটির অবস্থা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।

২০২৫ সালের ২ মে রাতে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার বাঁশবাড়ি গ্রামে একটি গোয়ালঘরে আগুন লেগে দুটি গরু পুড়ে মারা যায় বলে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম জানায়; স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, রাতে মশা তাড়াতে একটি হাঁড়িতে কয়লায় আগুন জ্বালিয়ে ধোঁয়া তৈরি করে গোয়ালঘরে রাখা হয়েছিল। ২০২০ সালের এপ্রিলে ঢাকা টাইমস কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলায় একটি অগ্নিকাণ্ডের খবর দেয়, যাতে দুটি গরু, একটি ছাগল ও কয়েকটি হাঁস-মুরগি ও কবুতর মারা যায়; কৃষকের ধারণা, গোয়ালঘরে জ্বালানো মশার কয়েল থেকে আগুন লেগেছিল।

ধোঁয়া নিজেও বিপজ্জনক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১৪ সালের নভেম্বরে জানায়, ঘরের ভেতরের বায়ুদূষণজনিত রোগের মূল কারণ অদক্ষ চুলা, হিটার বা বাতিতে কাঠ, পশুর গোবর, ফসলের অবশিষ্টাংশ ও কাঠকয়লার মতো কঠিন জ্বালানি পোড়ানো থেকে নির্গত সূক্ষ্ম কণা ও কার্বন মনোক্সাইড। এই সতর্কতা মানুষের জন্য, যার মধ্যে আছেন বদ্ধ জায়গায় ধিকিধিকি জ্বলা গোবরের কাছে যাঁরা কাজ করেন বা ঘুমান।

সূত্রগুলো তাই একই দিকে ইঙ্গিত দেয়: প্রজননস্থল পরিষ্কার রাখা, বিছানা শুকনো রাখা, বাতাস চলাচল রেখে হিমেল হাওয়া আটকানো, এবং মশারি, রিপেলেন্ট ও টিকার বিষয়ে প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পরামর্শ নেওয়া। কর্মকর্তাদের পরামর্শ হলো গোয়ালে আগুন না রাখা। কেউ তবুও ধোঁয়া ব্যবহার করলে মূল লেখার প্রতিটি সতর্কতা মানতে হবে, আগুন কখনো অরক্ষিত রাখা যাবে না, আর আগে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে নিতে হবে।

কোথায় সাহায্য পাবেন


প্রতিটি উপজেলায় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের অধীনে প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতাল আছে; শীতে গোয়ালঘর, পোকা দমন ও এলএসডির টিকা নিয়ে প্রথমে সেখানেই জানতে হবে। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে কুড়িগ্রামে ডা. ইউনুস আলী জানিয়েছিলেন, গবাদি পশুর শীতজনিত জ্বর-সর্দি হচ্ছে, তবে চিকিৎসায় ভালোও হচ্ছে। কোনো পশু কাশলে, শ্বাস নিতে কষ্ট হলে, জ্বর এলে, খাওয়া বন্ধ করলে, চামড়ায় গুটি উঠলে বা আগুনে দগ্ধ হলে দেরি না করে নিবন্ধিত ভেটেরিনারি চিকিৎসক দেখাতে হবে; বোয়ালখালীতে দগ্ধ গরুগুলোর চিকিৎসায় পাঁচজন চিকিৎসকের একটি দল লেগেছিল। ওষুধ, কীটনাশক ও রিপেলেন্ট ব্যবহার করতে হবে শুধু ভেটেরিনারি চিকিৎসক ও পণ্যের লেবেলের নির্দেশমতো।

ছবি: Ibrahim Husain Meraj / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সূত্র: দ্য এগ্রো নিউজ (নিজস্ব প্রতিবেদক), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (বামিসের প্রাণিসম্পদ পরামর্শ, ২০১৯ ও ২ জানুয়ারি ২০২০), প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্লান্স ২০২৩-২৪), দ্য ডেইলি স্টার বাংলা (৪ জানুয়ারি ২০২৩), দ্য ডেইলি স্টার (২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০), বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম (২০ মার্চ ২০২৪ ও ৩ মে ২০২৫), ঢাকা টাইমস (৯ এপ্রিল ২০২০), টিগ্যাস্ক (১৮ মার্চ ২০২৪), কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় নিউইয়র্ক স্টেট আইপিএম প্রোগ্রাম (২০০৯), এফএও (লাম্পি স্কিন ডিজিজ: ভেটেরিনারিয়ানদের মাঠ নির্দেশিকা, ২০১৭), বিশ্ব প্রাণিস্বাস্থ্য সংস্থা (আঞ্চলিক কর্মশালা, সেপ্টেম্বর ২০২৪), ভাইরাস রিসার্চ (স্প্রিগিন ও সহকর্মী, ২০১৯), মেডিকেল অ্যান্ড ভেটেরিনারি এন্টোমোলজি (টর ও সহকর্মী, ২০১১), ট্রানজ্যাকশনস অব দ্য রয়্যাল সোসাইটি অব ট্রপিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড হাইজিন (সেয়ুম ও সহকর্মী, ২০০২), ম্যালেরিয়া জার্নাল (মাইয়া ও মুর, ২০১১), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (১২ নভেম্বর ২০১৪)

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

লাইভস্টক

সম্পর্কিত খবর

লাইভস্টক

সৌরপ্যানেলের নিচে ভেড়া চরালে বাড়ে মৌমাছি, তবে সংখ্যা রাখতে হবে কম

কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, সৌরখামারে হেক্টরপ্রতি দুটি ভেড়া চরালে ঘাস কাটার তুলনায় উপকারী পোকা ৩৮ শতাংশ বাড়ে। খামারিদের জন্য ভেড়ার পাল পরিকল্পনার একটি সহায়ক টুলও তৈরি করেছেন গবেষকেরা।

Farms.com১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
লাইভস্টক

প্রোটিনের চাহিদায় বদলে গেল কানাডার দুধের বাজার, মাখনের উদ্বৃত্ত শেষ

দুগ্ধজাত প্রোটিনের চাহিদা বাড়ায় পাঁচ বছরের মধ্যে কানাডার দুধের বাজারে মাখনচর্বির কাঠামোগত উদ্বৃত্ত মিটে গেছে, দুধের দাম নির্ধারণেও এসেছে পরিবর্তন।

Manitoba Co-operator১৬ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
লাইভস্টক

সিকি হেক্টরে ওটের বীজ চাষ, ইথিওপিয়ার এক কৃষকের পারিবারিক ব্যবসা

ইথিওপিয়ার এক ক্ষুদ্র কৃষক মাত্র শূন্য দশমিক ২৫ হেক্টর জমিতে বীজের জন্য ওট চাষ করে প্রথম ফসল ৪৫ হাজার বির্রে বিক্রি করেন এবং পরের বছর চাষ বাড়ান। আইএলআরআইয়ের পশুখাদ্যের বীজকে ব্যবসায় রূপ দেওয়ার উদ্যোগের অংশ এটি।

ILRI১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)